• ঢাকা
  • রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১, ১৬ ফাল্গুন ১৪২৭
প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৬, ২০২১, ০৯:৪৯ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : জানুয়ারি ২৭, ২০২১, ০২:৩১ পিএম

ধর্ষণ আইন পাল্টে দেয়া গ্রেস টেম ও আমরা

ধর্ষণ আইন পাল্টে দেয়া গ্রেস টেম ও আমরা

গ্রেস টেমকে যখন তার স্কুলের অংকের শিক্ষক নিকোলাস বিস্টার ধর্ষণ করতে শুরু করে, তখন গ্রেসের বয়স ১৫। আর শিক্ষকের বয়স ৫৮। গ্রেস তখন স্কলারশিপ পাওয়া মেধাবী ছাত্রী। ছোটবেলায় তার আরেকটা যৌন হয়রানির ঘটনা ছিল, ফলে মানসিক সমস্যায় ভুগতো সে। নিকোলাস বিস্টার এই সুযোগটা নিলো। গ্রেসের সাথে বন্ধুর মতো মিশতে শুরু করে সে। এরপর নিজের অফিস রুমে নিয়ে টানা সাত মাসে অন্তত ত্রিশবার ধর্ষণ করে ১৫ বছরের গ্রেসকে। এটি ২০১০ সালের ঘটনা। 

বুদ্ধি হবার পর যখন এই বিভীষিকাময় ঘটনার কথা প্রকাশ্যে সবাইকে জানাতে চাইলো গ্রেস, তখন তা করার অনুমতি ছিল না গ্রেসের। রাষ্ট্রীয় আইনই তার মুখ বন্ধ করে রেখেছিল। অস্ট্রেলিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র তাসমানিয়ার ‘গ্যাগ ল’ ছিল এমনই। যৌন নিপীড়নের শিকার কোনো মেয়ে তার নির্যাতনের কথা প্রকাশ্যে বলতে পারবে না। সেজন্য হাইকোর্টের বিশেষ অনুমতি লাগবে আর দিতে হবে বড় অংকের টাকা। এরপর ছদ্মনামে বলা যাবে কথাগুলো।

অনেকগুলো টাকা খরচ করে বলার অনুমতি নিয়েছিল সে। তারপর থেকে গত দশ বছর ধরে ছদ্মনামে বলে আসছে আর বিচার চাইছে। এতদিন গ্রেস টেমের ছদ্মনাম ছিল জে ডো। মজার ব্যাপার হলো, যৌন নির্যাতনের শিকার মেয়েরা প্রকাশ্যে কথা বলতে পারবে না আইনের কারণে। এদিকে, নির্যাতক কিন্তু প্রকাশ্যে গলা উঁচু করে বলেছে গ্রেসকে ধর্ষণ করার গল্প। ঘটনার ১০ বছর পর ফেসবুকে নিকোলাস বিস্টার দাম্ভিক স্ট্যাটাস দেয় গ্রেসকে নিপীড়নের গল্প লিখে। কী লিখেছিল জানেন? লিখেছিল-"The majority of men in Australia envy me. I was 59, she was 15 going on 25. It was awesome."

অবাক হচ্ছেন? না, অবাক হবেন না। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে ধর্ষণের উৎপত্তিস্থল আসলে এই দম্ভটিই। পুরুষের আধিপত্যের আর দখলের ক্ষমতার দম্ভ। যৌনতা নয়। আর রাষ্ট্রের আইন, সমাজের ভিক্টিম ব্লেমিং, কুসংস্কার, প্রাগৈতহাসিক মনোভাব ধর্ষককে উৎসাহ যোগায়। ঠিক যেরকম হয়েছে গ্রেসের ক্ষেত্রে। বিস্টার তাকে বলেছে, কাউকে এসব বলবে না। বললে লোকেই তোমাকে খারাপ বলবে। বেশ্যা বলবে।

রাষ্ট্রও বলতে গ্রেসকে দেয়নি এতোদিন। অবশেষে হ্যাশট্যাগ ‘লেট হার স্পিক’ আন্দোলন এই অসভ্য আইনটি বাতিল করতে বাধ্য করেছে তাসমানিয়ান সরকারকে। আর বিস্টারের শাস্তি হয়েছে আড়াই বছরের। শিশুকে যৌন নির্যাতন ও পর্ণগ্রাফি মামলায়। আর গ্রেস? এই সোমবার ‘অস্ট্রেলিয়ান অব দ্য ইয়ার’ হিসেবে গ্রেস টেমের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। গ্রেস এখন এক পরিচিত নাম। এক অনুপ্রেরণার নাম। তাসমানিয়ার ‘গ্যাগ ল’ বাতিল হয়েছে।

ইন্টারনেটে গ্রেস টেমের গতকালের ভাষণ দেখতে দেখতে ভাবছিলাম অনেক কথা। এগারো বছর আগের ঘটনা। গ্রেস এখন ২৬ বছরের। ১৫ বছর বয়সে ঘটে যাওয়া যৌন নিপীড়নের ঘটনা সে বর্ণণা করেছে। এটাকে হ্যাশট্যাগ মিটু-ও বলা যায়। সে লড়াই চালিয়ে গেছে। এবং প্রত্যেকটা সমাজে যা হয়, সেটি তার ক্ষেত্রেও ঘটেছে। মুখ চেপে ধরা। উল্টো দোষারোপ করা। গ্রেস তার হাতে ট্যাটু করেছে, যেখানে লেখা- ইট মাই ফিয়ার।

‘ভয়’ পিতৃতান্ত্রিক সমাজের মূল হাতিয়ার নারীকে দমন করার- ক্রমাগত তাকে ভয় দেখানো হয়। তাকে চাপে রাখা। নানান রকম হুমকি ধমকি দেয়া এবং সেই সাথে অজস্র অনুৎপাদনশীল কাজ একতরফাভাবে তার উপর চাপিয়ে দিয়ে তাকে দিনভর খাটিয়ে নেয়া, ব্যস্ত রাখা। পিতৃতন্ত্র নারীকে শেখায় শারীরিক পবিত্রতা বলে একটি বস্তু আছে, সে বস্তুটি একমাত্র নারীরই থাকতে হয়, পুরুষের নয়। আবার এই পবিত্রতাই পুরুষের পরম আরাধ্য, তাই পুরুষ ক্রমাগত নারীর এই পবিত্রতার দিকে হাত বাড়াবে। কিন্তু নারীকেই যেকোনো মূল্যে তাকে রক্ষা করতে হবে। প্রাণ গেলেও শরীরের পবিত্রতা নষ্ট হতে দেয়া যাবে না। আর যদি তা নষ্ট হয়ে যায় কোনো পুরুষের দ্বারা, তবে সেটি সেই পুরুষের দোষ নয়, দোষ নারীটিরই। কারণ সে নিজেকে রক্ষা করতে পারেনি। এর অর্থ নারীটি বেশ্যা, নারীটি কুলটা, চরিত্রহীন, খারাপ ও নষ্টা।

অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, ইউরোপ থেকে শুরু করে ভারত, বাংলাদেশ আফ্রিকা চীন জাপান- কোনো সমাজই এই পিতৃতান্ত্রিক অসভ্য দর্শন থেকে নিজেকে শতভাগ মুক্তি দিতে পারেনি। এমনকি রাষ্ট্রও এই সামাজিক অসভ্যতাকে লালন করছে বহু ক্ষেত্রে। ভিক্টিম ব্লেমিং চলছে প্রতিটি দেশে, সমাজে। নির্যাতনের শিকার হয়েও মুক্তি মিলছে না নারীর, নির্যাতনের বিচার চাইবার আগেই মুখ চেপে ধরা হচ্ছে, ভিক্টিম ব্লেমিং হচ্ছে।

আমাদের দেশে যখন হ্যাশট্যাগ মিটু’র একটা জোয়ার এলো, তখন দেখেছি, সমাজ কতটা ভণ্ড আর মিসোজিনিস্ট হতে পারে। নারীর প্রতি বিদ্বেষ কতটা গভীরে বহন করে এই সমাজ যে পূর্ণবয়স্ক নারী তো বটেই, এমনকি অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের প্রতি যৌন নির্যাতনেও তারা সহানুভূতিশীল নয়, যার প্রমাণ মাত্র কিছুদিন আগে কলাবাগানে ধর্ষণের ঘটনায় ১৭ বছরের মেয়েটির মৃত্যুর ভেতর দিয়ে আবারো আমরা টের পেলাম।

গ্রেস টেমের ঘটনাটা অত্যন্ত শিক্ষনীয় এবং এর থেকে আমাদের দেশের মেয়েদের ভীষণ রকম অনুপ্রাণিত হবার আছে। সমাজ শুধু নয়, রাষ্ট্রীয় আইনও গ্রেসের মুখ আটকে রেখেছিল। সব ধরণের প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে টানা দশটা বছর যুদ্ধ করেছে সে। মিডিয়া এবং নারীবাদী অ্যাক্টিভিস্টরা তার সঙ্গে ছিলেন। গ্রেসের লড়াই রাষ্ট্রকে একটা কালো আইন বদলাতে বাধ্য করেছে। অপরাধীকে শাস্তি দিয়েছে। লক্ষ্য করুন, ঘটনাটি ১১ বছর আগের, তবু শাস্তি কিন্তু হলো। আমাদের দেশে হ্যাশট্যাগ মিটু’র কালে লোকজনের মুখে বারবার একই কথা শুনেছি- ‘‘সেই কোনকালের কথা, এতদিন পর আবার ঘেটে ময়লা বের করা কেন?”

যৌন নির্যাতনের ঘটনা এরকম কোনো ঘটনা নয়, যে জীবন থেকে, স্মৃতি থেকে এই দুঃসহ যন্ত্রণার অধ্যায় ইরেজার ঘষে মুছে ফেলা যায়, না ফেলা উচিত। গ্রেস বলেছে, বিস্টারের নির্যাতনের স্মৃতি তাকে কীভাবে এখনো তাড়া করে। তার শিশু মনের ওপর কি ভয়াবহ দাগ রেখে গেছে এ ঘটনা! যে নির্যাতন নারীর জীবনকে ওলটপালোট করে দেয়, সেই নির্যাতন কখনো ভুলে যাবার বিষয় নয়, বাদ দেওয়ার বিষয় নয়, নীরবে সহ্য করার, যন্ত্রনা লালন করার নয়। বরং নিপীড়কের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করার ভেতর দিয়েই নারী কিছুটা মানসিক শান্তি পেতে পারে। কোনো সভ্য সমাজে নিপীড়ক মাথা উঁচু করে চলতে পারে না। সে শাস্তি পেতে বাধ্য। নিপীড়নের ঘটনা লুকিয়ে রাখবার কোনো কারণ নেই।

নারীকে মুখ খুলতে দিতে হবে। বিচার চাইবার পথ খুলে দিতে হবে। পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে নারীবান্ধব হতে হবে। পিতৃতন্ত্রের যে নোংরা জাল সমাজ ও রাষ্ট্রের পরতে পরতে জড়িয়ে গেছে সেই জাল টেনে ছিড়তে হবে। এজন্য হাজার হাজার গ্রেস টেমকে এগিয়ে আসতে হবে সামনে। লজ্জা, ভয়, দ্বিধা আর সংকোচের মুখে সপাটে চড় মেরে নিজের অধিকার আদায়ে মুখ খুলতে হবে। তবেই নারী পাবে মানুষের জীবন। নাহলে মুখবন্ধ পশুর মতো আজীবন টেনে নিতে হবে পুরুষতন্ত্রের অসভ্য জোয়াল।

 

লেখক: সম্পাদক, ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টর