• ঢাকা
  • সোমবার, ০১ মার্চ, ২০২১, ১৭ ফাল্গুন ১৪২৭
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২১, ০৮:১৭ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২১, ০৮:১৭ পিএম

ষড়যন্ত্রের জালে বিপন্ন রাজনীতি-৩৪

এক রাজনৈতিক দুর্বৃত্তের কাহিনি-০১

এক রাজনৈতিক দুর্বৃত্তের কাহিনি-০১

এরশাদ বাংলাদেশের কার্টুনিস্টদের অত্যন্ত প্রিয় চরিত্র। তার মতো এমন বিচিত্র আচরণের মানুষ এদেশের রাজনীতিতে বোধহয় একেবারেই বিরল। পঁচাত্তরের পর বাংলাদেশে যখন সামরিকতন্ত্রের পুনর্বাসন শুরু হলো তখন বাংলাদেশে দুজন সামরিক শাসকের ধরণ আমরা দেখেছিলাম। প্রথমজন ছিলেন জিয়াউর রহমান, যিনি অত্যন্ত নিষ্ঠুর, ক্ষমাহীন এবং উচ্চাভিলাষী। পাকিস্তানি প্রভুদের গোপন অঙ্গুলিহেলনে তিনি যে কতসংখ্যক সামরিক এবং বেসামরিক জনমানুষের হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন, তা ইতিহাসের পাতা উল্টালেই স্পষ্টভাবে বোঝা যাবে। আমরা জানি, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে জিয়াউর রহমানের সংযুক্তি ছিল আকস্মিক। পাকিস্তানি যুদ্ধ জাহাজ সোয়াতের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরে আনা অস্ত্র, যা মুক্তিযুদ্ধপিয়াসী জনগণকে হত্যা করার জন্য পরিকল্পনা করা হয়েছিল, সেই জাহাজের সমস্ত অস্ত্র খালাস করার দায়িত্ব পালন করছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান। কিন্তু মাঝপথে তাকে নিবৃত্ত করেন ই পি আর-এর মেজর রফিক, মেজর খালিকুজ্জামানসহ কয়েকজন। একথা বললে বোধয় অত্যুক্তি হবে না যে, জিয়াউর রহমান আত্মরক্ষার কারণেই বাধ্য হয়ে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু এরপরও তিনি নানাভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের ব্যাপারটি এড়িয়ে যাওয়ার অনেক রকম চেষ্টা করেন। সামরিক বাহিনীর মধ্যে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তাদের মধ্যে এক ধরনের অন্তর্কলহের সৃষ্টি করেছেন। এমনকি কলকাতায় মুক্তিযুদ্ধকালে এমন কিছু অনভিপ্রেত বিষয়ের অবতারণা করা হয়, যার ফলে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের মধ্যে প্রচণ্ড ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এবং রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলে সেই সঙ্কটের সাময়িক নিরসন ঘটে।

এছাড়া আরেকটি বিশেষ ঘটনার কথা মেজর রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম তাঁর ‘লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে’ গ্রন্থটির এক পর্যায়ে উল্লেখ করেছিলেন। কোনো এক অজ্ঞাতনামা রহস্যময় বিদেশি নাগরিকের ইশারায় জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম থেকে দুই দিনের জন্যে নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিলেন এবং পরে ফেরত এসে তিনি তার অনুগত সেনাবাহিনীর একাংশ নিয়ে চট্টগ্রাম নগর পরিত্যাগ করে হাটহাজারীর দিকে চলে গিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালে জিয়াউর রহমানের এই রহস্যজনক আচরণে কিছু গুঞ্জন সৃষ্টি হয়েছিল এবং মুক্তিযুদ্ধ চলার পুরো সময়ে তার নানা পদক্ষেপ অনেক ধরনের প্রশ্নের জন্ম দেয়। অবশ্য পরবর্তীকালে পঁচাত্তরের মর্মান্তিক পটপরিবর্তনের শেষে জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা দখল এবং নিষ্ঠুরতার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনের ভেতর দিয়ে তার হিংস্র চরিত্র উন্মোচিত হয়।

এর পরের যে সামরিক শাসক হুসেইন মোহম্মদ এরশাদ। রাজনীতির নাট্যমঞ্চে পা রেখেই তিনি বাঙালি জাতির আরেক দুষ্টগ্রহ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেন। শঠতা, কপটচারিতা বারবার মিথ্যাচার ও ভণ্ডামিতে এরশাদ সাহেবের কোনো জুড়ি ছিল না। তিনি সম্ভবত বাংলাদেশের একমাত্র  রাষ্ট্রপতি যিনি  মুখোশের আবরণেই আমৃত্যু তার কুৎসিত চেহারা ঢেকে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। রাষ্ট্রক্ষমতাকে এতখানি কদর্য ব্যবহার বোধহয় পৃথিবীর কোথাও কখনো কোনো রাষ্ট্রপ্রধান করেননি। যদি পৃথিবীর তাবৎ স্বেচ্ছাচারী, স্বৈরাচার এবং নিকৃষ্টতম শাসকের তালিকা প্রণয়ন করা হয়, তাহলে অবশ্যই তার নাম প্রথম দশজনের মধ্যে থাকবে বলে আমার ধারণা। এরশাদ হলেন সেই মানুষ যিনি জিয়াউর রহমানের পর বাংলাদেশে পাকিস্তানের দুই নম্বর সামরিক এজেন্টের গোপন দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কেন একথা বলছি তারও যুক্তি আছে।

কে এই এরশাদ তারও একটা সংক্ষিপ্ত পরিচয় এখানে দেওয়া দরকার। ভারত-পাকিস্তান বিভাগের পর পিতার সঙ্গে তিনি কুচবিহার মহকুমার দিনহাটা থেকে রংপুরে চলে আসেন। স্কুল শেষ করে রংপুর কারমাইকেল কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে ১৯৫২ সালের সেই ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন পান। লক্ষ করার বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশের বাঙ্গালির ধারাবাহিক সংগ্রামের কোনো পর্যায়ে তো তার কোনো সংশ্লিষ্টতাই পাওয়া যায় না। এমনকি সেই সময় বাঙালির পক্ষে তার কোনো প্রকার অনুভূতির কোনো চিহ্নমাত্রের আভাসও পাওয়া যায় না।  সত্যি বলতে কি জিয়া এবং এরশাদ এই দুজনের মধ্যেই বাঙালির কোনো ছাপই কখনো দেখা যায়নি। অথচ এরশাদ নাকি কবিতা-টবিতা লিখতেন বলে তার চাটুকারেরা দাবি করে। শুধু এই নয় তার বন্দনাকারীরা তার কাব্যপ্রতিভা নিয়ে অনেক কথার ফুলঝুরি ছড়িয়েছে। আর একথাও ঠিক যে ধুরন্ধর এরশাদ খুব ভালোভাবেই বুঝতেন কোন দেবতা কোন ফুলে প্রসন্ন হয়। তার এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই তিনি বিভিন্ন সময়ে অনেক পেশাগত ধাপ অনায়াসে অতিক্রম করতে সক্ষম হন।

কী অমার্জনীয় অপরাধ তিনি আজীবন করে গেছেন, তার কি হিসাব করেছেন, না সবাই বিস্মৃতপরায়ণ বা ক্ষমাসুন্দর মনোভাব নিয়ে ইতিহাসের সেই অন্ধকার অধ্যায়গুলো চলে যেতে দিয়েছেন?  
কী সব ভয়ঙ্কর অপরাধ করেছেন স্বৈরাচার এরশাদ? খুব সংক্ষেপে তার অপকর্মের ফিরিস্তি তুলে ধরা যেতে পারে।

আগের অন্য সময় বাদ দিয়ে শুধু একাত্তর সালের কথাই প্রথম শুরু করি। একাত্তর সালে এরশাদ পাকিস্তানেই ছিলেন সেনাবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায়। তিনি তখন পাকিস্তানি সামরিক জান্তার অত্যন্ত প্রিয়পাত্র। তিনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের অত্যন্ত অনুগ্রহভাজন আর ইয়াহিয়ার নারীমাংসলোলুপ  পাশবিকতার ঐকান্তিক অনুসারী। ইয়াহিয়া খান এরশাদকে এতখানি বিশ্বাস করতেন যে, যেসব বাঙালি অফিসার এবং সৈনিক বাংলাদেশের পক্ষে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে গিয়ে ধরা পড়েছেন কিংবা পালাতে পেরেছেন,  তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ইয়াহিয়া খানের সামরিক জান্তা একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছিল। এরশাদকে বানানো হয় সেই ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান। ভাবা যায়? যখন বাঙালি জাতি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সেই একাত্তরে মরণপণ লড়াই করে চলেছে তখন ইয়াহিয়া খান গঠিত ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান এরশাদ সাহেব। শুধু তাই নয়, পাকিস্তানের সামরিক জান্তাকে শর্তহীন সাহায্য করার পুরস্কার হিসেবে আইয়ুব খান তাকে পাকিস্তানের সর্বোচ্চ  খেতাব ‘নিশান-ই-পাকিস্তান’ উপাধিতে ভূষিত করেন। পাকিস্তানের প্রতি এই আনুগত্যের প্রতিদান তিনি পুরোপুরিই দিয়েছেন তার শাসনামলে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি দুইবার পাকিস্তান থেকে ঢাকায় এসেছেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ কিংবা মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাপারে তার চূড়ান্ত অনীহা প্রদর্শন করে তার পাকিস্তানেই তিনি ফেরত গেছেন। তিনি এমন চাতুর্যের সঙ্গে তার ভূমিকা পালন করেছেন যে, কেউ কখনো যেন তাকে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর এজেন্ট হিসেবে ধরতে না পারে। তিনি পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীতে দায়িত্ব পালনের সময় অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে পাকিস্তানে আটক সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী এবং ভারতবিরোধী কুমন্ত্রণা দিতে শুরু করেন। তার ফলে স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশে অবস্থানকারী এবং পাকিস্তান প্রত্যাগতদের মধ্যে ভয়াবহ এবং আত্মঘাতী বিভাজন শুরু হয়। পাঠক, যদি একটু খেয়াল করেন তাহলে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগরে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে যে অন্তর্দ্বন্দ্ব, ভুল বোঝাবুঝি বা সামরিক বাহিনীর সদস্যদের অন্তর্কলহ এসবের পেছনে যে  গোপন খেলা চলছিল, তা কোনোভাবেই তুচ্ছ নয়। জিয়া এবং এরশাদ এই বিভেদের বীজ সুনিপুনভাবে বপণ করেছেন। বছরের পর বছর এই বীজের গোড়ায় ক্রমাগত জলসিঞ্চন করে এমন এক ভয়ঙ্কর বিষবৃক্ষের জন্মদান করা হয়েছে, যার কারণে এই জাতির মধ্যে সৃজনবিনাশী মানসিকতার উদ্ভব ঘটেছে। এক অস্বাভাবিক বিকৃতি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত অহংকার, শুভচেতনার যাবতীয় স্বপ্ন, সুনীতি এবং সৎকর্মের স্বপ্নসৌধকে আঘাতের পর আঘাতে জর্জরিত করে চলেছে। জিয়া-এরশাদের অপকর্মের কারণে বাংলাদেশ এবং এই জাতিকে যে কি পরিমাণ মূল্য দিতে হচ্ছে তার আরও বিস্তারিত বিবরণ পরবর্তী সময়ে উল্লেখ করা হবে। 

লেখক : সম্পাদক, দৈনিক জাগরণ