• ঢাকা
  • শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২১, ৩ বৈশাখ ১৪২৮
প্রকাশিত: মার্চ ২, ২০২১, ০৫:৩৮ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : মার্চ ২, ২০২১, ০৭:৩৬ পিএম

কালো মেয়ে কেন ‘তবু সুন্দর’?

কালো মেয়ে কেন ‘তবু সুন্দর’?

‘কালো, তবু সুন্দর’— এমন শিরোনামের সঙ্গে দুজন নারীর ছবি। ফিচারটি প্রকাশ পেয়েছে আজ (২ মার্চ) প্রথম আলোর ফ্যাশন পাতা নকশায়। যথারীতি প্রকাশের পরপরই শিরোনাম নিয়ে বেধেছে হৈচৈ। শিরোনামটি চোখে পড়লেই খুব স্বাভাবিকভাবে মাথায় যা আসে তা হলো, কালো আদতে খারাপ, কুৎসিত, বাজেই হওয়ার কথা, ‘তবু’ কালো সুন্দর।

বিউটি মিথ নিয়ে পৃথিবী জুড়ে তোলপাড় হচ্ছে। সৌন্দর্যের ধারণাটা একদম উল্টে যাচ্ছে দ্রুত। ফেমিনিজম বা নারীবাদ যত বেশি মানুষের বোধের জায়গাটিতে স্থান করে নিতে থাকবে, বিউটি মিথের নামে যে বজ্জাতি হাজার বছর ধরে আমাদের ভেতরে গেঁড়ে বসেছে, তাও ক্রমে আমাদের মন ও মগজ থেকে সরে যেতে বাধ্য হবে। আমরা শিখবো, সৌন্দর্যের কোনো ধরাবাধা সংজ্ঞা থাকতে পারে না। মোটা চিকন কালো সাদা বাদামী তামাটে দিয়ে কাউকে বিচার করা যায় না। বিউটি মিথগুলোকে চ্যালেঞ্জ করছি আমরা। আমাদের মগজের ভেতরে থাকা বর্ণবিদ্বেষকে নির্ণয় করতে শিখছি। এরকম মুহুর্তে দেশের জনপ্রিয় জাতীয় দৈনিক লিখে দিলো—কালো, তবু সুন্দর। এই ‘তবু’ শব্দটি এত হতকুচ্ছিত চেহারা নিয়ে আর কখনো আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়নি।

হ্যাঁ, আমাদের মনে রাখতে হবে, একা প্রথম আলোকে দায়ী করে লাভ নেই। দেশের প্রতিটি গণমাধ্যম, বিজ্ঞাপনী সংস্থা, সৌন্দর্য প্রতিষ্ঠান, কর্পোরেট জগত এই অশ্লীল বিউটি মিথকে অবলম্বন করেই টিকে আছে। সময় বদলে যাবে, তবু তারা যেন তাদের জায়গা থেকে একচুল নড়বে না সহজে।

আচ্ছা, বলুন তো, এই যে এতগুলো দৈনিক, এত এত তাদের ফ্যাশন পাতা, এদের কাউকে কখনো প্রচলিত বিউটি মিথ অনুসারে নির্ণীত সৌন্দর্যের বাইরে গিয়ে কোনো মডেলকে নির্বাচন ও উপস্থাপন করতে দেখেছেন? শাড়ি, গহনা, প্রসাধনী, এমনকি ঘরদোর সাজাবার জিনিসপাতি, যাই হোক, প্রতিটি জিনিসের পণ্যের মডেল হন হালকা পাতলা, উজ্জ্বল গাত্রবর্ণ, ঝকঝকে ত্বক, ভালো কেশরাশি এবং সমাজে প্রতিষ্ঠিত সংজ্ঞানুসারে ‘সুন্দর’ মেয়ে। প্রচলিত সংজ্ঞার বাইরে কোনো নারী বা পুরুষ কি কখনও মডেল হয়েছেন? ধরুন, যাকে আমাদের সমাজ সুন্দর বলে না, রূপসী বা রূপবান বলে না, এমন কোনো চেহারা কি কোনোদিন মডেল হিসেবে এসেছে পত্রিকার পাতায়? টিভি বিজ্ঞাপনে? বিলবোর্ডে?

না, আসেনি। সহজে আসবেও না। যদি আসে, তাহলে পণ্য বেচাবিক্রি হবে না বলে উনারা আশংকা করেন। পণ্য বেচাটাই তো মূল কথা। পুঁজিবাদী সমাজে পণ্য বেচার জন্য উনারা বর্ণবিদ্বেষী, পুরুষতান্ত্রিক যে কোনো কিছুই প্রচার করতে পারেন। উনারা তো সমাজ বদলের কোনো অঙ্গীকার করেন নাই। উনাদের কোন দায়ও নাই। তাহলে কিসের জন্য উনারা লোকের মনোভঙ্গি বদলে দেওয়ার কাজ করবেন? বরং উনারা এমন কিছু করবেন যাতে অল্পশিক্ষিত, পুরুষতান্ত্রিক, বর্ণবিদ্বেষী লোকজনের মন কেড়ে নিতে পারেন। উনারা বিক্রি করবেন ফর্সা হবার সাবান, ত্বক উজ্জ্বল করার ক্রিম, সুন্দর দেহবল্লরী বানানোর ওষুধ। আর এসব পণ্যের জন্য বেছে নেবেন উপযুক্ত মডেল, যা সমাজ তার মস্তিষ্কের ভেতরে লালনপালন করে।

সমাজ পরিবর্তন একটি কঠিন কাজ। তবু এই কঠিন কাজটি গণমাধ্যমের করা উচিত। অথচ এদেশে প্রায়ই এই গণমাধ্যমকে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় প্রাগৈতিহাসিক ভূমিকায়। তাই আজও সিনেমার নায়িকার ফিগার মাপে মাপে খাপে খাপ। সুন্দর ঝলমলে ঢেউ খেলানো চুল, ত্বক যেন গোলাপের পাপড়ি। এসব যার নেই, সে সিনেমার নায়িকা হয় না। ঠিক তেমনি সিক্স প্যাক ছাড়া নায়ক হয় না, নায়কের মুখ চোখ শরীর দিয়ে ঠিকরে বেরোয় সমাজের ঠিক করে দেয়া পুরুষালী সৌন্দর্য।

বিউটি মিথ আমাদের মগজের কোষে কোষে ঢুকে বসে আছে। আমাদের মন সেই মিথ অনুসারেই দেখতে অভ্যস্ত। এই অভ্যস্ততা ভালো কিছু নয়। এটি এক ধরণের অসভ্য অভ্যস্ততা। যে অভ্যস্ততা মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরি করে। কাউকে ছোট, কাউকে বড় করে। কাউকে ভালো আর কাউকে খারাপ বলে রায় দিয়ে দেয়। এই বিউটি মিথকে তাই সভ্যতার মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়েছে।

সৌন্দর্য একটি আপেক্ষিক বিষয়। আপনি যাকে অসুন্দর বলছেন, সে অসুন্দর নয়। আপনার মনের ভেতরে গেঁড়ে বসে থাকা হাজার বছরের অভ্যস্ত চিন্তা আপনার মস্তিষ্ককে দিয়ে ভাবাচ্ছে যে এটি অসুন্দর, আর ওটি সুন্দর। সুন্দর, অসুন্দর আপনার মস্তিষ্ক ঠিক করে নেয়, কারো গায়ের রঙ বা শরীরের আকার নয়, মুখের কারুকার্য নয়। যারা এখনো এইসব বিউটি মিথকে চিরন্তন বলে মনে করেন, তারা একদিন বাতিলের খাতায় চলে যাবে। হোক সেটা প্রথম আলো কি আর কোনো বড় পত্রিকা, কি গণমাধ্যম কিংবা বিজ্ঞাপনী সংস্থা। যে লেখক, সাংবাদিক ও প্রতিষ্ঠান এইসব পুরুষতান্ত্রিক অসভ্য চেতনা মগজে ধরে রাখবেন, তারাও একদিন আস্তকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবেন। তাই সময় থাকতেই নিজেকে শুধরে নিতে হবে সবাইকে। আধুনিক সভ্য মানুষ হয়ে উঠবার চর্চা শুরু করতে হবে।

 

লেখক: সম্পাদক, ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টর