• ঢাকা
  • শনিবার, ১০ এপ্রিল, ২০২১, ২৭ চৈত্র ১৪২৭
প্রকাশিত: মার্চ ৩, ২০২১, ০৫:২৬ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : মার্চ ৩, ২০২১, ০৫:২৬ পিএম

মুশতাকের ‘বিনিময়ে’ ফিরে পাওয়া কিশোর

মুশতাকের ‘বিনিময়ে’ ফিরে পাওয়া কিশোর

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দশ মাসের বেশি সময় ধরে আটক কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর অবশেষে জামিন পেয়েছেন। সাতবারের চেষ্টায় উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেলেন তিনি। হাইকোর্টে মুশতাক আহমেদেরও জামিনের আবেদনও ছিল। কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিত এক মৃত্যুতে তার জামিনের শুনানির দরকার পড়েনি। লিখিত হলফনামায় আদালতকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে মুশতাক আহমেদ আর নেই! জামিনের আগেই মুশতাক উঠে গেছেন সব কিছুর ঊর্ধ্বে। লৌকিক মুক্তির দরকার পড়ছে না আর তার, তিনি চিরমুক্ত!

মুশতাকের মৃত্যু কি জামিনের পথ খুলে দিলো কিশোরের? কারণ একের পর এক জামিনের আবেদন প্রত্যাখ্যানের পর তারা আদৌ জামিন পাবেন কি না এমনই সন্দেহ ডালপালা মেলছিল। একই মামলায় গ্রেপ্তার রাষ্ট্রচিন্তা নামের এক জার্নালের সদস্য দিদারুল ভূঁইয়া ও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালক মিনহাজ মান্নান জামিন পেলেও কিশোর-মুশতাকের জামিন আবেদন বারবার নাকচ হয়েছে। অসুস্থতা নিয়ে আদালতে হাজির হওয়া সত্ত্বেও, অসুস্থতার কথা আদালতকে জানানো সত্ত্বেও মানবিক দিকটিও থেকেছিল উপেক্ষিত। সবশেষ ২৪ ফেব্রুয়ারি লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর আগের দিনও তাদের জামিনের আবেদন নামঞ্জুর হয়েছে। বারবার এই জামিন আবেদন প্রত্যাখ্যানের সঙ্গে তাদেরকে রাখা হয়েছিল কাশিমপুরের হাই-সিকিউরিটি জেলে, এতখানি কঠোর তাদের প্রতি! এই কঠোর অবস্থান, হয়রানির মুখে থাকা মুশতাক আহমেদ ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে কারা হেফাজতে থাকা অবস্থায় মারা গেছেন। তার এই মৃত্যুকে তার আইনজীবীরা ‘স্বাভাবিক মৃত্যু নয়’ বলে দাবি করেছেন। যদিও ময়নাতদন্ত বলছে স্বাভাবিক মৃত্যু। কিন্তু নির্যাতন কি কেবলই শারীরিক নির্যাতন হয়? মানসিক যে নির্যাতন তার কি কোনো মূল্য নেই? বিবিধ নির্যাতনেই মারা গেছেন মুশতাক বললে কি অত্যুক্তি হবে? হবে না বলেই ধারণা।

মুশতাক মৃত্যু দিয়ে প্রমাণ করেছেন জামিন তার জন্যে ছিল না। তার অসুস্থতাকেও বারবার অগ্রাহ্য করেছে নিম্ন আদালত। মুশতাকের এই মৃত্যু হাই কোর্টে তাদের জামিনের আবেদনকেও হয়ত এগিয়ে আনতে প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। কারণ হাই কোর্টে তাদের এই জামিনের আবেদন করা হয়েছিল প্রায় দেড় মাস আগে, ২১ জানুয়ারি। হাই কোর্টে এই জামিনের আবেদন অপেক্ষমান ছিল, শুনানির জন্যে সামনে আসেনি। এসেছে মুশতাকের মৃত্যুর পর। ১ মার্চ এই জামিন আবেদন শুনানির জন্য আদালতে ওঠে। শুনানির দিন মুশতাকের মৃত্যুর বিষয়টি লিখিতভাবে হলফনামা দেওয়ার কথা জানানো হলে আদালত আজকের জন্যে আদেশের দিন ধার্য করে দেন, এবং সেই অনুযায়ী সংক্ষিপ্ত শুনানিতে কার্টুনিস্ট কিশোরের ছয় মাসের জামিন দেন হাই কোর্ট।

সদ্য জামিনপ্রাপ্ত কার্টুনিস্ট কিশোর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে যে মামলায় অভিযুক্ত সে মামলার অপর আসামিদের মধ্যে দিদারুল ভূঁইয়া জামিনে রয়েছেন। ব্যবসায়ী মিনহাজ মান্নান অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন, তবে অব্যাহতির আগেই তিনিও জামিন পেয়েছিলেন। এই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সরকার যখন প্রণয়ন করে তখন থেকে এই আইনের বিরুদ্ধে সচেতন মানুষদের প্রতিবাদ ছিল। কিন্তু সরকার সেসবের তোয়াক্কা করেনি। তথ্যপ্রযুক্তি আইনের নিবর্তনমূলক সাতান্ন ধারা বিলুপ্ত করার সময়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে আরও বিস্তৃতভাবে সেটাই সন্নিবেশ করে। সরকার কথা দিয়েছিল এই আইনের অপব্যবহার হবে না। কিন্তু কথা রাখেনি সরকার।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক প্রতিবাদের কার্যকারণ কারা হেফাজতে থাকা লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যু। ছয়-ছয়বার জামিন চেয়েও পাননি মুশতাক। কারাগারে ছিলেন দশমাসের কাছাকাছি সময়। এই সময়ে বিচারকার্য শুরু হয়নি। মামলার যে অভিযোগপত্র দেওয়া হয় সেটারও গ্রহণযোগ্যতা পায়নি, পুনঃতদন্তের আবেদন এসেছে। এই আইনের অধীনে দায়ের মামলার তদন্তের জন্যে প্রাথমিকভাবে ষাট দিনের বাধ্যবাধকতার পর অতিরিক্ত যে পনেরো দিনের বর্ধিত সময় রয়েছে [৪০(১)(খ)] সেটাও মানেনি তদন্তকারী কর্মকর্তা। এছাড়াও এই আইনের ৪০(১)(গ) দফায় বলা আছে, ‘‘দফা (খ) এর অধীন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো তদন্ত কার্য সম্পন্ন করিতে ব্যর্থ হইলে তিনি উহার কারণ লিপিবদ্ধ করিয়া বিষয়টি প্রতিবেদন আকারে ট্রাইব্যুনালকে অবহিত করিবেন, এবং ট্রাইব্যুনালের অনুমতিক্রমে, পরবর্তী ৩০ (ত্রিশ) দিনের মধ্যে তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করিবেন।’’

অথচ এসবের কিছুই মানা হয়নি এই মামলার ক্ষেত্রে। গ্রেপ্তারের নয়মাসের বেশি সময় পর দিয়েছে অভিযোগপত্র। গোঁজামিলের অভিযোগপত্রে যাদের সাক্ষী করা হয়েছে তারা কেউ পুলিশের কাছে সাক্ষ্য দেননি বলেও একটি গণমাধ্যমের কাছে বলেছেন। এছাড়া গণমাধ্যম বলছে, অভিযোগপত্রে সাক্ষী যাদের করা হয়েছে তারা গ্রেপ্তারকৃতদের বাড়ির পিওন কিংবা দারোয়ান, এবং তাদের কথিত সাক্ষ্যেই দেওয়া হয় অভিযোগপত্র। এছাড়াও বিদেশে থাকা মামলার আসামিদের দেওয়া হয় অব্যাহতি। তাদের এই অব্যাহতি দানের কী কারণ সেটা জানে কেবলই তদন্তকারী কর্মকর্তা। তবে মামলার সাক্ষীদের সাক্ষ্যের যে ফিরিস্তি এসেছে গণমাধ্যমে, তাতে মনে হয় অব্যাহতিপ্রাপ্তদের কোনো বাড়ির কোনো পিওন কিংবা কেয়ারটেকার পাওয়া যায়নি বলে তাদেরকে অব্যাহতিই দেওয়া হয়। ভাবা যায়, কতটা গোঁজামিলের এই মামলা। এই মামলা যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তাতে আর সন্দেহের অবশিষ্ট থাকে না।

যাই হোক, কিশোর-মুশতাক-দিদারুলদের বিরুদ্ধে মামলা যখন হয়েই গেছে তখন আদালতে প্রমাণ হবে তারা দোষী না নির্দোষ। এখানে অনলাইন ট্রায়ালের দরকার পড়ছে না। তবে বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে যা জানা যাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে ‘আই অ্যাম বাংলাদেশি’ শিরোনামের যে ফেসবুক পেজ দিয়ে অভিযুক্তরা কথিত ‘রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র’ করেছিলেন সেই পেজের গ্রেপ্তার না হওয়া অ্যাডমিনদের বাদ দেওয়ার পেছনে নিশ্চয়ই অন্য কারণ রয়েছে। ওই পেজ যদি হয় কথিত ষড়যন্ত্রের উৎস তবে কেন ওখানকার বাকিদের বাদ দিয়ে কেবলই মুশতাক-কিশোর-দিদারুলের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র? কী সে কারণ সেটা অদ্যাবধি কেউ পরিষ্কার করে বলেনি, তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির যোগের যে কথা প্রচার হয়েছে তার সত্যাসত্য আমরা জানি না। যখন আলোচনায় এসেছে কোনো নাম তখন এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া উচিত। কারণ মামলার অভিযোগপত্রে অন্যরা বাদ গেলেও বাদ যাননি বিশেষ তিনজন। সঙ্গত কারণে প্রভাবশালীর নাম উল্লেখ করছি না। কারণ কেউ অভিযোগ উত্থাপন করলেই কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করা যায় না, যতক্ষণ না পর্যন্ত সে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক কিংবা দালিলিকভাবে নিষ্পত্তি হয়!

আদালত প্রমাণ করবে করুক, কিন্তু তার আগে জামিনপ্রাপ্তির যে অধিকার সেটা থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন মুশতাক আহমেদ ও কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর। মুশতাক আহমেদ তো জামিন না পেয়ে কারা হেফাজতে থাকা অবস্থায় মারাও গেছেন। কিশোর জামিন পেয়েছেন মুশতাকের মৃত্যুর পর সারাদেশে এই আইনের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভের পর। অথচ তারা আগেও জামিন পেতে পারতেন, যেমনটা আগে পেয়েছিলেন রাষ্ট্রচিন্তার দিদারুল ভূঁইয়া ও ব্যবসায়ী মিনহাজ মান্নান। অন্যদের ক্ষেত্রে আদালত সদয় হলেও অপ্রত্যাশিতভাবে কিশোর-মুশতাকের ক্ষেত্রে ছিলেন কঠোর। এখানে তাই যতটা না বিধিবিধানের বিষয় তারচেয়ে বেশি প্রভাবের বলে যে আশঙ্কা তা কি সত্যিই অমূলক?

নিজে মরে গিয়ে কিশোরের জামিনের অধিকারের পথ খুলে দিয়েছেন মুশতাক আহমেদ। এটা যদিও তার ইচ্ছামৃত্যু ছিল না, ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যু। কারা হেফাজতে মুশতাক আহমেদের এই মৃত্যু সামনে এনেছে বারবার জামিন না দেওয়ার বিষয়টি। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহারের বিষয়টি। এই আইনের বিরুদ্ধে ক্ষীণ প্রতিবাদ থাকলেও এর আগে এমন বিক্ষোভ ছিল না। মুশতাকের মৃত্যু মানুষের মধ্যকার সমূহ ভয়কে দূরে ঠেলেছে। ভয় দেখাতে যে আইন, সেই ভয়কে জয় করেছে মুশতাকের মৃত্যুতে সংক্ষুব্ধ হওয়া মানুষেরা। তাই প্রতিবাদ হয়েছে রাজপথে, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে।

কার্টুনিস্ট কিশোর জামিন পেয়েছেন। তিনিও অসুস্থ বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবী ও পরিবারের সদস্যরা। এখন দরকার তার সুচিকিৎসার। তিনি সুস্থ হয়ে উঠলে আমরা নিশ্চয়ই জানবো কারাগারে এবং কারাগারে যাওয়ার আগে কোনো বাহিনী কর্তৃক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন কি না? অমিত প্রতিভাবান কার্টুনিস্ট কিশোর দশ মাসের কারাবাসে, হয়রানি-নির্যাতনে মানসিক শক্তি হারিয়ে ফেলবেন এমনটা আমরা বিশ্বাস করতে চাই না। আমরা বিশ্বাস করতে চাই শারীরিক অসুস্থতাজনিত সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে তিনি আরও বেশি শক্তিমান হয়ে উঠবেন। তার এই শক্তি আমাদের পাথেয় হতে পারে। তার এই শক্তির হাত ধরে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে বিদ্যমান বাকস্বাধীনতা পরিপন্থী ও গণবিরোধী ধারাসমূহের বিরুদ্ধে প্রবল গণমত সংগঠনের মাধ্যমে আসবে এই আইনের সংশোধনী কিংবা বাতিলের সিদ্ধান্ত। 

লেখক : প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক