• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ১৩ মে, ২০২১, ৩০ বৈশাখ ১৪২৮
প্রকাশিত: মার্চ ২৫, ২০২১, ০১:৩৭ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : মার্চ ২৫, ২০২১, ০১:৩৭ পিএম

বাংলাদেশ ভারত

সম্পর্কের সোনালি সুতো

সম্পর্কের সোনালি সুতো

 

 

একদেশে একটাই চাঁদ উঠতো। সেই চাঁদ এখন দুই দেশে। চাঁদ তো দুটো নয়। একটাই। এক চাঁদের আলোয় ভেসে যায় প্রাচীন জনপদের ভুখণ্ড।

১৯৪৭ সালে মর্মান্তি দেশভাগের সময় মানচিত্র দুই টুকরো হয়ে গেলেও চাঁদ সেই একটাই। একই নদীর জল গড়িয়ে আসে দুই দেশের শরীর ভিজিয়ে। একই জলে ধুয়ে যায় ভারত। ধুয়ে যায় বাংলাদেশ।

সম্পর্কের সুতোটা যেমন প্রকৃতি বেঁধে রেখেছে তেমনি দুই দেশের মানুষের বন্ধুত্ব জড়িয়ে রেখেছে সম্পর্কের সোনালি সুতোয়। ভাই-ভাই সম্পর্কে বা বন্ধুর বন্ধুত্বে কখনো ধুলোবালি পড়লেও সেটা টেকেনি। সম্পর্কের উষ্ণতায় সেই ধুলো উড়ে যায়।  

এক জনপদে দুই দেশের মানুষের ইতিহাসের পথে জন্ম নেয়া মূল্যবোধে বন্ধুত্বের-সম্পর্কে বিশেষত্ব তৈরি হয়েছে। এখন চলছে মার্চ মাস। এই সেই মার্চ। ১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানি সেনারা বাঙালি নিধন শুরু করেছিল। সেই ভয়ার্ত সময়ে ভারত দেখিয়েছে সম্পর্কের সুতো কতটা মজবুত হতে পারে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা সম্পর্কে কখনো তিক্ততার পরিবেশ তৈরি হলেও বন্ধুত্বের মহত্বে সেই তিক্ততা দাঁড়ায়নি। এমনকি কূটনৈতিক দর-কষাকষিতেও তেতো হয়নি দুই দেশের সম্পর্ক।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অকুণ্ঠ সমর্থনের মধ্যদিয়ে মধ্য দিয়ে মজবুত হয় সম্পর্কের সোনালি সুতো। সেই সময়ের কথা আজো শ্রদ্ধায় স্মরণ করে বাংলাদেশের মানুষ। ভারত মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের আত্মমর্যাদা ও স্বাধীন সত্তাকে স্বীকার করে নিতে দেরি করেনি। বিনিময়ে বাংলাদেশও কার্পণ্য করেনি প্রতিদান দিতে। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারতের নিরাপত্তাসংক্রান্ত আগ্রহগুলো আমলে নিয়ে ১৯৭২ সালে দীর্ঘমেয়াদি বন্ধুত্ব ও নিরাপত্তা চুক্তিতে জড়ায় বাংলাদেশ।

স্বাধীনতা-উত্তরকালে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এ ধরনের সহযোগিতা যথার্থ ছিল বলেই অনেকেই মনে করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে এগিয়ে নিতে বাড়ায় বন্ধুত্বের হাত বাড়ায় ভারত।

মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সরকার ও জনগণের মধ্যে ভাবনার সম্পকের্র সুতো অনেকটাই দুর্বল হয় ১৯৭৫ সালে। সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর। এরপর অনেক রাতে চাঁদ উঠেছে। গঙ্গা-যমুনায় গড়িয়েছে অনেক জল। ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতা গ্রহণের পর শক্তিশালী হতে থাকে সম্পর্কের সুতো। ১৯৯৬-র ডিসেম্বরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গা নদীর পানিবণ্টনের বিষয়ে ৩০ বছর মেয়াদি একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ ক্ষেত্রে ভারতের কেন্দ্রে রাজনৈতিক পরিবর্তন ও কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের নতুন বিন্যাসকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের নতুন সরকার পানির হিস্যা অর্জনে সফল হয়।

পরের বছর ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে চুক্তি ভারতের সমর্থন ছাড়া সম্ভব হতো না। এই চুক্তির মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয়। শেখ হাসিনা সরকারের সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থান ভারতের জন্য তিনটি সুযোগ সৃষ্টি করে। এর ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদ উত্থানের সম্ভাবনাকে শক্ত হাতে দমন করায় বাংলাদেশে ভারতবিরোধী শক্তি দুর্বল হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারকে নৈতিক সমর্থন জানায় মোদী সরকার। পাশাপাশি বাংলাদেশের সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে ভারত তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার দুর্লভ সুযোগ লাভ করে। এছাড়া উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার করে ট্রানজিটের সুবিধা লাভ ভারতের অনুকূলে যায়। বস্তুত বর্তমান সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই বাংলাদেশ সরকার ভারতীয় উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বিদ্রোহীদের ব্যাপারে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে। একাজে ভারত সরকারকে সহযোগিতার হাত বাড়ায় বাংলাদেশ। সম্পর্কের সুতোয় কাছাকাছি আসে আদর্শগত নৈকট্য। সন্ত্রাসবিরোধী কাজ এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়ে বাংলাদেশ ও ভারত একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে ভারতের মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার জন্য ট্রানজিটের সুবিধা এবং ভারতকে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের সুবিধা দিতে রাজি হয়। অথচ বাংলাদেশ থেকে নেপালে যাওয়ার জন্য ট্রানজিট দেয়ার ব্যাপারে ভারত নিশ্চুপ।

কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও মজবুত করতে উদ্যোগী ভারত। ২০০৮ এ নির্বাচনে মহাজোট সরকারের জয়লাভের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্কের উন্নয়নে একটি নতুন প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। কিন্তু মিয়ানমারে রোহিঙ্গা গণহত্যার ব্যাপারে ভারতকে পাশে পায়নি বাংলাদেশ। যদিও রেল-সড়ক-নদীপথে যোগাযোগ আজ অনেক বেশি। বেড়েছে পণ্য পরিবহণ। বেড়েছে ভিসার সংখ্যা। তিস্তার জল নিয়ে এখনও সমাধানে আসা যায়নি, পানির হিস্যা থেকে বাংলাদেশ বঞ্চিত, কিন্তু আরও কয়েকটি নদীর জলবণ্টন নিয়ে চুক্তি হয়েছে। চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে আমাদের আলোচনা করতে হবে।

ছিটমহল হস্তান্তর চুক্তিতে প্রায় নজিরবিহীন ভাবে সাত হাজার একরের বিনিময়ে প্রায় সতেরো হাজার একর জমি বাংলাদেশকে প্রত্যর্পণ করেছে ভারত। কিন্তু সম্প্রতি ভারতে নতুন করে নাগরিকত্বের তালিকা তৈরির পর দুই দেশের ভেতর অস্বস্তিও তৈরি হয়েছে। ভারতের ভেতরে বাংলাদেশীদের প্রবেশ নিয়েও যে কটূক্তি এসেছে তা নিয়েও দুই দেশের ভেতর অস্বস্তি তৈরি হয়।

চিন-বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের আবহে ইন্ডিয়ান অয়েল বাংলাদেশের গ্রামীণ স্তর পর্যন্ত জ্বালানি গ্যাস সরবরাহ করার উদ্যোগ নিয়েছে। বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশের জন্য ভারতের যে আর্থিক সহায়তার তহবিলের ৩০ বিলিয়ন ডলারের আট বিলিয়ন শুধু বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দ। উল্টো দিকে ভারতের জন্য বাংলাদেশ হলো চতুর্থ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের দেশ। এসব কিছু ভারতের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব আরো স্পষ্ট করে। তবে কিছু বৈষম্য ও অন্যায়ের জায়গা যে নেই তা নয়! সীমান্তে হত্যা না করার প্রতিশ্রুতি ভুলে যাচ্ছে ভারত। একটি সম্পর্কের ভিত্তি যে গণমানুষ তাদের ভাবনায় নেতিবাচকতা জিইয়ে রাখা কাজের কথা নয়। উপমহাদেশে বাড়তে থাকা চিনা প্রভাবের কারণে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক হয়তো আজ এক সন্ধিক্ষণে, যা কেবল দ্বিপাক্ষিক নয়, বহুমাত্রিক।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় যে সুসম্পর্কের শুরু, সুবর্ণজয়ন্তীতে এসে দু’দেশের সম্পর্কের চেহারা কেমন দাঁড়াবে— সেটাই ঠিক করবে উপমহাদেশের ভবিষ্যৎ। তাই সম্পর্কের সুতো মজবুত করার ভেতর দিয়ে বাংলাদেশ-ভারত এখন অনেক কাছাকাছি। বাড়ছে বন্ধুত্বের আকাশ। সেই আকাশে একটাই চাঁদ। বন্ধুত্বের আকাশটা বড় করতে বাংলাদেশের ৫০তম জন্মদিনে দেশে আসছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। নিশ্চয়ই আরো উজ্জ্বল হবে সম্পর্কের সুতো। হবে আরো মজবুত। হবে আরো টানটান। 

    

লেখক: সাংবাদিক