• ঢাকা
  • শনিবার, ১৫ মে, ২০২১, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
প্রকাশিত: মার্চ ২৯, ২০২১, ১১:২৪ এএম
সর্বশেষ আপডেট : মার্চ ২৯, ২০২১, ১১:৩৮ এএম

গেম অন

অবসরের ঘোষণায় হারানোরই বা কী ছিল মাশরাফির!

অবসরের ঘোষণায় হারানোরই বা কী ছিল মাশরাফির!

সাকিব বললেন। মাশরাফি বলছেন। ধারাবাহিকভাবে বলছেন। গেলো কয়েকদিনে মাশরাফি বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে যেভাবে বলছেন, তা দেখে শুনে মনে হতে পারে ধারাবাহিক সিরিয়াল। যার নাম হতে পারে, ‘ম্যাশ দ্য আনটোল্ড স্টোরি’। 

কিন্তু না। মাশরাফির কথায় খুব বেশি নতুন কিছু নেই। দেশের জার্সি পরে ক্রিকেট সার্কিটে নামা একজন ক্রিকেটারের হার-জিত তার একার থাকে না। ঐ জার্সির সঙ্গে দেশের মানুষের স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা- মান সম্মানের দায়িত্বও  কাঁধে তুলে নেন। আর মাশরাফি বাংলাদেশ ক্রিকেটে বড় এক নাম। উজ্জ্বল এক তারকা। যিনি এখন আর শুধু ক্রিকেটাঙ্গনের মানুষ নন। জাতীয় পর্যায়ে এ প্রজন্মের তারকা রাজনীতিবিদও। কিন্তু তার কথায় রাজনীতির মারপ্যাঁচ তেমন একটা নেই। তিনি যা বলছেন, খুব সোজাসাপটা বলছেন। যেখানে ক্ষোভ-আক্ষেপ-হতাশা-আত্মসমালোচনা এবং সমালোচনা আছে। সমালোচনার সুরটা খুব চড়া। তবে সেই সমালোচনাকে অন্যায় বা অযৌক্তিক মনে হয় না। তার সমালোচনার তীর বোর্ড সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। বাংলাদেশ ক্রিকেট পরিচালনায় যে পরিমাণ অপেশাদারিত্বের পরিচয় দিচ্ছেন তারা, তাতে সাকিব-মাশরাফিদের সমালোচনা হজম তাদের করতেই হবে।

সাকিব একটা ডিজিটাল প্লাটফর্মে সাক্ষাৎকার দেওয়ার পরই ফুঁসে উঠেছিলেন বোর্ডের কয়েকজন পরিচালক। খুব দ্রুত প্রতিক্রিয়া দিলেন। সাকিবকে আইপিএলে খেলতে অনুমতি দেয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে, এমন কথাও বললেন। জনমানসে প্রশ্ন জাগলো, তাহলে কি প্রতিভা আর পাওয়ারের মধ্যে লড়াই শুরু হলো! সাকিব যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফিরলেন। প্র্যাকটিসও করলেন। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর অনুষ্ঠানে যোগ দিলেন। পর দিনই কলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে আইপিএল খেলতে ভারতে উড়ে গেলেন। সাধারণ মানুষের বুঝতে বাকি রইলো না প্রতিভাই পাওয়ার হাউজের অন্দরমহল। তাই প্রতিভা বনাম পাওয়ারের লড়াইটা বাতাসে ভেসে বেড়ানো কুন্ডলিকা! কলকাতাগামী সাকিবের বিমানের বাতাসে সেই কুন্ডলিকা মিলিয়ে গেলো।

আর মাশরাফি যা বলছেন, তার জবাব দেবেন কে? ক্রিকেটের বাইশ গজ থেকে অবসর না নিয়েই রাজনীতির মাঠে নেমেছেন মাশরাফি। রাজনীতি কিছুটা হলেও বোঝেন। তাই তার ছোড়া সমালোচনার ডেলিভারিগুলোকে ‘ডাক’ করে ছেড়ে দিতে হচ্ছে। কারণ, খেলতে গেলে প্যাভিলিয়নে ফিরতে হতে পারে। তা ছাড়া মাশরাফির কথার উত্তর দেবেন কী! কথাগুলো তো অসত্য নয়। তবে মাশরাফি এই কথাগুলোতো আরও আগে বলতে পারতেন। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট থেকে তাকে অবসরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। শ্রীলঙ্কায় নেমেই তাকে যা বলা হয়েছিল, তাতে অবসরের ঘোষণা দেওয়া ছাড়া তার সামনে অন্য কোন পথ খোলা ছিল না। তিনি সেই পথেই হাঁটলেন। কিন্তু অবসরের কারণটা ব্যাখ্যা করলেন না। ক্রিকেট ক্যারিয়ারের শেষ বেলায় এসে তিনি বলছেন। আবার গত বিশ্বকাপে আট ম্যাচে এক উইকেট পাওয়ার পর ওয়ানডে দলে জায়গা পাওয়ার আশা তিনি করতে পারেন না, সেটাও বলছেন। এখন তার মুখে খানিকটা হতাশা আর আক্ষেপ মেশানো সুর, ‘এভাবে যেন অন্যদের বিদায় না হয়।’ 

ভালো কথা। তবে একজন রাসেল ডোমিঙ্গোর কফির দাওয়াতের অপেক্ষায় আপনি থাকবেন কেন? আপনি তো মাশরাফি বিন মোর্ত্তজা। বাংলাদেশ ক্রিকেটে লড়াই নামক শব্দটাকে আপনি আমদানি করেছেন। আপনার হাত ধরে বাংলাদেশ ক্রিকেট অনেক জয় পেয়েছে। আপনার সাফল্যের আলোয় অন্যরা উদ্ভাসিত হয়েছেন। আপনার চেয়ে তারাই বেশি প্রচারের আলো কেড়ে নিয়েছেন! আবার তারাও আপনাকে নিয়ে সমালোচনা করেন! প্রেসিডেন্ট বক্সের সেই সমালোচনা আপনাদের নেটওয়ার্কেও আবার ধরা পড়ে।

কিন্তু মাশরাফি, এই সব সমালোচনা কি আপনার ক্ষেত্রে নতুন কিছু! ফ্ল্যাশব্যাকে ফিরে যান আপনার ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে। বাংলাদেশ ক্রিকেটে আপনার মহাউত্থান। আপনাকে নিয়ে বাঙালির উথাল-পাথাল আবেগ। শুধু বাঙালি কেন, আপনার আবির্ভাবে তোলপাড় পড়ে যায় ক্রিকেট বিশ্বে। যে নিউজিল্যান্ডে এখন বাংলাদেশ হাবুডুবু খাচ্ছে, সেই নিউজিল্যান্ডের ওয়েলিংটন পোস্টের এক পাতার অর্ধেক জুড়ে আপনার ছবি। বাকি অর্ধেকে আপনার ইন্টারভিউ। আর হেডলাইন ছিল ‘দ্য নড়াইল এক্সপ্রেস’। পত্রিকাটা এখনও অনেকের সংগ্রহে আছে। ছাপার অক্ষরে সত্যটাই স্থায়ীভাবে প্রকাশ করা হয়েছিল। সেই আপনি যখন ইনজুরিতে পড়ে মালিবাগের ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালের বিছানায় শুয়েছিলেন বেশ কয়েকদিন ধরে, তখন ক’জন খোঁজ নিয়েছিলেন আপনার! বরং সেই সময়ের বোর্ডকর্তাদের অনেকের মুখে শুনেছি, ‘ও চলে না! ও শেষ!’ আপনি লড়াই করে নিজেকে প্রমাণ করেছেন। কিন্তু তাদের দু’একজন দিব্যি এখনো বোর্ডে। তাদের কাছে আপনার তো নতুন করে প্রমাণ করার কিছু নেই।

তবে হ্যাঁ, প্রমাণ করার একটা জায়গা আপনার ছিল। আর সেটা নিজের কাছে। প্রমাণ করার সেই মঞ্চটাও পেয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু কেন যে হেলায় হারালেন! লর্ডস। বিশ্বকাপের ম্যাচ। প্রতিপক্ষ পাকিস্তান। বাংলাদেশের শেষ ম্যাচ। গ্যালারি ভর্তি দর্শক। সেখানে বাঙালির আবেগেরও অভাব ছিল না। ম্যাচের আগের দিন খেলবেন কি খেলবেন না, সেই দোলাচলে না দুলে যদি বলে দিতেন, ‘আমি খেলছি। পাকিস্তানের বিপক্ষে আমিই দলকে নেতৃত্ব দেব। আর এটাই আমার ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ।’ বাকি পৃথিবী যা-ই মনে করুক, তাতে কিছু যায় আসে না। সেদিন ‘অবসর’ নামক শব্দটা আপনার মুখ দিয়ে বের হলে আট ম্যাচে এক উইকেট এই পরিসংখ্যান ভাবীকাল এমনিতেই ধুয়ে দিতো। লর্ডসে বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচ খেলে অবসরে যাওয়ার সৌভাগ্য ক’জনের হয়েছে। তাও বলে কয়ে। আপনার টেলিভিশন ইন্টারভিউর সিরিয়াল দেখতে দেখতে একটা প্রশ্ন মনের কোনে উঁকি দিচ্ছে, ঐ সাহসটুকু কেন দেখাতে পারলেন না! হারানোর কী এমন ছিল আপনার? কী ভয় স্পর্শ করেছিল আপনাকে? পরিসংখ্যান দিয়ে অনেকে মাপতে চান আপনাকে। কেউ বলছেন আপনি বাংলাদেশের সফলতম অধিনায়ক। কেউ বলছেন, আপনি ক’টা টেস্ট জিতিয়েছেন বাংলাদেশকে! আসলে পরিসংখ্যান দিয়ে মাশরাফি বিন মোর্ত্তজাকে পুরোপুরি দেখা যাবে না। পরিসংখ্যান বইয়ের আড়ালেই রয়ে গেছে আপনার অধিকাংশ কীর্তি।

ভবিষত ক্রিকেট ঐতিহাসিকরা আপনাকে যেভাবেই দেখুন না কেন, আপনি আপনার ক্রিকেট ক্যারিয়ারের গোধূলি বেলায় দাঁড়িয়ে। তার আগে সাহসী হয়ে বলে যান। কিছু লোকও যদি জানে। যদি ভাবে। সেটাই বা কম কী? পাথরটা সরিয়ে জায়গা না নিতে পারেন। কিন্তু নড়ালেন তো খানিকটা।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলাম লেখক