• ঢাকা
  • শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২১, ৩ বৈশাখ ১৪২৮
প্রকাশিত: এপ্রিল ৩, ২০২১, ০৩:৫৭ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : এপ্রিল ৩, ২০২১, ০৪:১১ পিএম

গেম অন

নিউজিল্যান্ডে বিপর্যয় সত্যিই কি অনিবার্য ছিল

নিউজিল্যান্ডে বিপর্যয় সত্যিই কি অনিবার্য ছিল

মহাবির্পযয় বলা যাবে না। তবে বির্পযয় বললে ভুল হবে না। নিউজিল্যান্ড সফরে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের পারফরম্যান্স সত্যিই হতাশার। বেদনার। দুঃখের। কিন্তু এই সফরে এটা কি অনির্বায ছিল? দেশের ক্রিকেট বিজ্ঞজন থেকে সাধারণ মানুষ এই বির্পযয়ের নানা ব্যাখ্যা করছেন।

নিউজিল্যান্ডে বাংলাদেশ দলের ব্যর্থতা নিয়ে এত আলোচনা, এত সমালোচনা, এত চর্চা দেখেশুনে মনে হচ্ছে অকস্মাৎ বাংলাদেশ ক্রিকেটে অন্ধকার নেমে এলো! দুই দশকের বেশি সময় আগে থেকে নিউজল্যান্ড সফর করছে বাংলাদেশ নিয়মিত। পরিসংখ্যানের খাতা ওল্টালে আপনি ভালো কিছু পাবেন না। অন্তত দলীয় পারফরম্যান্সে। আজ পর্যন্ত নিউজল্যিান্ডের মাটিতে একটা জয় নেই বাংলাদেশের! তবে এবার যা হলো তাকে ব্যর্থতা বললে পুরোপুরি বোঝানো যায় না। ভরাডুবি বলা ভালো।

তবে এই ভরাডুবি কি অনিবার্য ছিল! প্রশ্নটা নেটজগতে ঘুরপাক খাচ্ছে। বাংলাদেশ দলের সাবেক এক অধিনায়ক তাঁর ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন, “এটাই হবার কথা ছিল।” এরপর এই কথাগুলো ফেসবুকে মানুষের দেয়ালে দেয়ালে ছড়িয়ে পড়েছে। ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড যাকে বলে ভাইরাল। তিনি যা লিখেছেন, সেখানে তিনটা বিষয়কে বড় কারণ হিসেবে দেখেছেন। এক. গেল কয়েক বছর ধরে ঘরোয়া ক্রিকেটকে ‘ক্রিমিনালাইজড’ করা। যার কাছাকাছি বাংলা হতে পারে, ঘরোয়া ক্রিকেটে দুর্বৃত্তায়ন। দুই. দলের ভেতরে দল। তিন. তারকা বন্দনায় দেশ কনসেপ্টটা উধাও হয়ে গেছে। যিনি লিখেছেন, তিনি বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেট খেলেই তারকা খ্যাতি পেয়েছিলেন। বাংলাদেশ দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ইংল্যান্ডের মাটিতে বাংলাদেশ প্রথম বিশ্বকাপ খেলেছিল তাঁর অধিনায়কত্বে। আর দেশের অভিষেক টেস্টেই সেঞ্চুরি করেন তিনি। ক্রিকেট-উত্তর জীবনে তাঁর বসবাস ক্রিকেটের উন্নত বিশ্ব অস্ট্রেলিয়ায়। ক্রিকেট নিয়ে কাজ করছেন ক্রিকেটের সবোর্চ্চ আন্তর্জাতিক সংস্থা আইসিসিতে। তাঁর পর্যবেক্ষণকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তিনি শ্যাওলাধর্মী চিন্তাভাবনায় বিশ্বাসী নন। ক্রিকেটের উন্নত বিশ্বে বসবাস আর আইসিসিতে কাজের সুবাদে তাঁর ক্রিকেটীয় দর্শন ভিন্ন। পৃথিবীর যেখানেই বসবাস করেন আর যে কাজটাই তিনি করেন না কেন, এ দেশের মানুষ আমিনুল ইসলাম বুলবুলকে একটু অন্যভাবে দেখেন। বলতে পারেন, শ্রদ্ধার চোখেই দেখেন।

‘নিউজিল্যান্ড বিপর্যয়’ নিয়ে তিনি যা লিখেছেন, তার সঙ্গে অনেকে একমত না-ও হতে পারেন। তবে পয়েন্টগুলো খতিয়ে দেখা উচিত। সত্যিই আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেট কি গুরুত্ব পাচ্ছে ক্রিকেট কর্তাদের কাছে! ঘরোয়া ক্রিকেট যেভাবে হচ্ছে পৃথিবীর অন্য কোনো টেস্ট প্লেয়িং দেশে কি এভাবে হয়! ঢাকার ক্রিকেট লিগ একসময় ছিল দেশজ ক্রিকেটের প্রাণভ্রমরা। সেটাকে মোটামুটি গলা টিপে মারার অবস্থা! গণমাধ্যমে বারবার খবর রেরিয়েছে, খেলার আগেই ফলাফল নির্ধারিত হয়ে থাকে। বছর দুয়েক আগে বাংলাদেশ স্পোর্টস জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন সেমিনার পর্যন্ত করেছে ঢাকার ক্রিকেট লিগের এই দুরবস্থা নিয়ে। এক একটা দেশের ক্রিকেট সভ্যতা এবং সংস্কৃতি এক একভাবে গড়ে ওঠে। বাংলাদেশ ক্রিকেট দাঁড়িয়ে থাকার বড় এবং শক্ত পিলারের নাম ঢাকার ক্লাব ক্রিকেট। সেটা নড়বড়ে করে দেওয়া হয়েছে অনেক আগেই। এই লিগ এখন আর কোনো ক্রিকেটার তুলে আনে না। এই লিগের আয়োজন শুধু বোর্ডের কাউন্সিলরশিপ তৈরির জন্য। সেখানে আইনের ভেতর থেকে বেআইনি যত রকমের কাজ করা যায় তার সবই করা হয়। এর পাশাপাশি যে মাঠ আর উইকেটে জাতীয় লিগ হচ্ছে, তা টেস্ট প্লেয়িং একটা দেশে কল্পনা করা যায় না। অন্য টেস্ট প্লেয়িং দেশের ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট দূরে থাক, পাড়া-মহল্লার ক্রিকেটও এর চেয়ে ভালো মাঠ আর উইকেটে হয়! হাই পারফরম্যান্স ইউনিট-এইচপি নামক ফ্যাক্টরি থেকে প্রতিভা বেরিয়ে আসবে না। প্রতিভা তুলে এনে তাদের আরও ঔজ্জ্বল্য বাড়ানোই এইচপির কাজ। কিন্তু সেই কাজগুলো কি ঠিকঠাক মতো হচ্ছে?

বাংলাদেশ দলের গত কয়েক বছরে যেটুকু যা সাফল্য, তার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছেন দলের পাঁচ সিনিয়র ক্রিকেটার মাশরাফি-সাকিব-মুশফিক-তামিম-মাহমুদ উল্ল্যাহ। তবে তাদের ‘পঞ্চপাণ্ডব’ বানানো মিডিয়ার হাইপ। কিন্তু তরুণরা উঠে এসে সেভাবে পারফর্ম করতে পারছেন না কেন ধারাবাহিকভাবে? এত বিদেশি কোচিং স্টাফ তারা কী করছেন? কাঁড়ি কাঁড়ি ডলার যাদের গুনে দেওয়া হচ্ছে, তারা কী দিচ্ছেন, সেই ব্যালান্সশিটটা মেলানো দরকার। বিসিবির বেশির ভাগ বড় কর্মকর্তাই ব্যবসায়ী। তারা ভালো করেই জানেন লস দিয়ে কোনো প্রজেক্ট বেশি দিন কেউ টানবেন না। জবাবদিহি শুধু ক্রিকেটারদের নয়, সবার থাকতে হবে। দলের ভেতর জুনিয়র ক্রিকেটাররা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে থাকবেন কেন? পারফর্ম করে তাদেরই প্রথম শ্রেণিতে উন্নত হওয়ার কথা। হয় তারা পারছেন না অথবা তাদের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। কোনটা সঠিক, সেই উত্তর টিম ম্যানেজমেন্টের কাছ থেকেই আসতে হবে। কারণ, ড্রেসিংরুমের খবর তো আর মিডিয়ার জানার কথা নয়। তবে হ্যাঁ, বাংলাদেশ ক্রিকেটে তারকা বন্দনা একটু বেশি। তামিম ইকবাল নিউজিল্যান্ডে টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেললেন না, ব্যক্তিগত কারণে। কিন্তু সেই কারণটা একেবারেই ব্যক্তিগত থেকে গেল এখন পর্যন্ত। সাকিব আল হাসান আইপিএল খেলার জন্য বিসিবিকে চিঠি দিলেন। সেটা প্রকাশ হলো, ভুলভাবে তিনি টেস্ট খেলতে চান না! কিন্তু তামিমের ব্যক্তিগত কারণ একেবারেই ব্যক্তিগতই থেকে গেল! এটাও ওই তারকা বন্দনার অংশ। সেটা খোদ বোর্ডের ভেতরই।

আসলে আমাদের ক্রিকেট পরিকাঠামো থেকে ক্রিকেট প্রশাসন সব জায়গায় কোনো না কোনো ভাইরাসের সংক্রমণ হয়েছে। তার প্রতিষেধক হিসেবে কোনো ভ্যাকসিন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না! নিউজিল্যান্ড বিপর্যয়ের পর আমিনুল ইসলাম বুলবুল যে ক্রিকেটীয় ল্যাবের সাম্পল টেস্ট রিপোর্ট দিয়েছেন, সেখানে একটা বাক্য তাঁর মতো ব্যক্তিত্বের কাছ থেকে স্থূল বেমানান মনে হয়েছে : ‘শুধু অপেক্ষায় ছিলাম কলাপসটা কখন হবে!’ আপনি দেশ খুঁজে না পাওয়ার যে আক্ষেপের কথা বলেছেন, সেখানে দেশ কনসেপ্ট একটু উচ্চমার্গীয় শব্দ। তারপাশে আপনার এই বাক্যটা একটু বেসুরোভাবে কানে বাজে!

লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলাম লেখক