• ঢাকা
  • শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২১, ৩ বৈশাখ ১৪২৮
প্রকাশিত: এপ্রিল ৪, ২০২১, ০৪:৫৬ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : এপ্রিল ৪, ২০২১, ০৭:০০ পিএম

যে কারণে মামুনুল হকের বিচার চাই

যে কারণে মামুনুল হকের বিচার চাই

হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের মহাসচিব মাওলানা মুহাম্মদ মামুনুল হককে নিয়ে তোলপাড় সারাদেশে। না, এবার ধর্মের নামে বিভক্তি সৃষ্টিকারী অথবা রাজনৈতিক ও সরকারবিরোধী কোনো কর্মসূচি নয়; এবার তিনি ধরা খেয়েছেন এক ‘নারীসহ’। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের রয়েল রিসোর্টে শনিবার এক নারীসহ যাওয়ার পর স্থানীয়দের ঘেরাওয়ের মুখে পড়েন এই ইসলামি বক্তা। পুলিশও আসে ওখানে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত একাধিক ভিডিওতে ভয়বিহ্বল মামুনুল হক সঙ্গে থাকা নারীকে তার ‘দ্বিতীয় স্ত্রী’ বলে পরিচয় দেন। প্রশ্নের মুখে নামও বলেন মেয়েটির, তবে কী তার ঠিকানা সেগুলো বলতে চাননি অথবা বলতে পারেননি তিনি। এরপর ঘটে অন্য ঘটনা যেখানে হেফাজত কর্মীরা দলবেঁধে ওই রিসোর্টে হামলা ও ভাঙচুর চালিয়ে মামুনুল হককে ছিনিয়ে নেয়। পুলিশও ছিল ওখানে। কিন্তু তারা বাধা দেয়নি। হেফাজতকর্মীরা বিনাবাধায় তাকে ছিনিয়ে নিয়ে যেতে সমর্থ হয়।

মামুনুল হকের বক্তব্যে জানা যায়, মেয়েটির নাম আমিনা তাইয়্যেবা। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একাধিক ভিডিওতে মেয়েটিকে বলতে শোনা যায় তার নাম জান্নাত আরা। আবার পুলিশের কাছ থেকে হেফাজতকর্মীরা তাকে ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর ফাঁস হওয়া এক অডিওতে প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে আলাপকালে মামুনুল হক জানান, মেয়েটি জনৈক শহিদুলের স্ত্রী। বাসায় এসে তিনি স্ত্রীকে বিস্তারিত বলবেন বলেও আশ্বস্ত করেন। এসময়ে তার ‘প্রথম স্ত্রীকে’ কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে তিনি কী বলবেন সেগুলোও শিখিয়ে দেন মামুনুল। এদিকে, প্রথম স্ত্রীর কাছে মামুনুল হক ওই মেয়েটিকে শহিদুল ইসলামের স্ত্রী বলে উল্লেখ করলেও শনিবার রাত ১০টার পর ফেসবুক লাইভে এসে দাবি করেন, ‘ওই নারীর স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পর তিনি তাকে বিয়ে করেছেন’। ফেসবুকে যখন মামুনুল হক লাইভ করছিলেন তখন তার পাশে বিমর্ষ হয়ে থাকা ভাইয়েরাও উপস্থিত ছিলেন।

স্থানীয় জনতার কাছে ধরা খেয়ে মামুনুল হক দাবি করছিলেন এটা তার ‘দ্বিতীয় স্ত্রী’, আবার প্রথম স্ত্রীকে ফোনে বলেছিলেন, ‘শহিদুল ইসলাম ভাইয়ের ওয়াইফ’; আবার ছাড়া পাওয়ার পর ভাইদের সঙ্গে নিয়ে ফেসবুক লাইভে এসে বলছেন, ‘ওই নারীর স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পর তিনি তাকে বিয়ে করেছেন’। এক নারীকে নিয়ে মামুনুল হকের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে একাধিক বক্তব্য প্রশ্নের জন্ম দেয়— আদৌ ওই নারীর সঙ্গে কি তার এরকম কোনো সম্পর্ক আছে, নাকি এটা স্রেফ সময়ভিত্তিক সম্পর্ক? এই প্রশ্নের উত্তর আপাত নেই। তবে অবস্থাদৃষ্টে যা মনে হচ্ছে, মামুনুল হক ওই নারীকে বিয়ে করেছেন বলে যে দাবি করছেন এটা মূলত শেষ মুহূর্তে পরিস্থিতিকে সামাল দেওয়ার জন্যে। আর এখানে সাক্ষী হতে হচ্ছে তার পরিবার। পরিবারের সদস্যরা এখানে স্রেফ পরিস্থিতি সামাল দিতে মামুনুলের এই ‘সম্পর্ককে’ কবুল করতে হচ্ছে!

ওই নারী মামুনুল হকের বিবাহিত স্ত্রী, নাকি বান্ধবী, নাকি ক্ষণিক অবকাশসঙ্গী— এটা মুখ্য বিষয় নয়। মুক্তচিন্তাভিত্তিক সমাজকাঠামোর অংশীজনেরা এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। তবে নারীকে স্রেফ চারদেয়ালের মধ্যকার বন্দি জীব হিসেবে যারা ভাবে, প্রচার চালায় তাদের এমন দ্বিচারিতা অনেককে অবাক করে বৈকি! মামুনুল হক এখানে সবাইকে স্রেফ বোকা বানিয়েছেন। ক্ষণিকের অবকাশসঙ্গী হিসেবে যে নারীকে নিয়ে তিনি গিয়েছেন, সেই নারীর সঙ্গে তার সম্পর্কও তাই প্রশ্নবিদ্ধ। যদিও তিনি এবং তার অন্ধ মুরিদেরা একবাক্যে এই সম্পর্কের উপসংহার টেনেছেন। তাদের এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ মূলত মামুনুলের প্রতি তাদের অন্ধবিশ্বাসের প্রকাশ ছাড়া আর কিছুই নয়। হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা ভাঙচুর চালিয়ে বলা যায়, জোরপূর্বক মামুনুলকে ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর তারা বিজয়ীর হাসি হেসেছেন। এই বিজয়ী হাসির সঙ্গে মামুনুলের প্রতি ওই নারীর প্রতি সম্পর্ক বিষয়ক কোনো প্রশ্ন নেই। ‘স্ত্রী ছাড়া কাউকে তিনি সঙ্গে রাখতে পারেন না’ আছে এমন অন্ধবিশ্বাস!

যাই হোক, ওই নারী যদি মামুনুল হকের স্ত্রী হন তবে তাকে অবরুদ্ধ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো উচিত হয়নি। ওই নারী যদি মামুনুল হকের বান্ধবীও হন তবু তাকে এভাবে উপস্থাপন করা ঠিক হয়নি। কারণ এই মামুনুল হকসহ ধর্মীয় বক্তারা অন্যদের উদ্দেশে যে বার্তাই দিক না কেন নারী-পুরুষ সম্পর্ক চিরায়ত, মধুর এবং পবিত্র। এখানে তৃতীয় পক্ষের মোরাল পুলিশিং অনুচিত। তারা সমাজকে যেভাবে গড়তে চান সেটা পশ্চাৎপদতা, অনগ্রসর চিন্তা, এবং নারীকে স্রেফ ভোগ্যপণ্য হিসেবে উপস্থাপন। তারা নারী-পুরুষের সম্পর্ককে ‘পাপ’ হিসেবে দেখতে ও দেখাতে আগ্রহী। কিন্তু সমাজবাস্তবতা সেটা স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করে না। তারা আধুনিক সমাজব্যবস্থায় বসে মধ্যযুগীয় চিন্তার প্রসারে ব্যস্ত থাকলেও সমাজ প্রতিনিয়ত তাদের সেই প্রচারণাকে বাতিল বলে আখ্যা দিয়ে আসছে।

মামুনুল হকরা দেশে শরিয়া আইন ব্যবস্থা চালু করার দাবি জানান। তাদের দাবিকৃত সেই শরিয়া আইন এই ঘটনাকেও অপরাধ বলে মনে করে। তাদের প্রচারিত বিশ্বাস এই ‘বহুগামিতাকে’ মনে করে ‘পাপ’। তবু অগ্রসর চিন্তার মানুষেরা তাদের প্রচারিত সেই শরিয়া আইনের বাস্তবায়ন এখানে চায় না। আদর্শিক দিক থেকে বিরোধী অবস্থানে থাকলেও এখানে মামুনুল হকের ক্ষেত্রেও আমরা কোনো ধরনের শরিয়া আইনের প্রয়োগের দাবি জানাতে পারি না। প্রথমত এই শরিয়া আইন আমাদের দেশে প্রচলিত নয়, এবং এই আইন কিংবা বাস্তবায়ন হোক সেটাও আমরা চাই না।

মামুনুল হক কিংবা কথিত ধর্মীয় চিন্তাবিদেরা ‘বহুগামী’ কিনা এটা নিয়েও আমার মাথাব্যথা নেই। এই ‘বহুগামী’ চরিত্র তাদের প্রচারে ‘পাপ’ হতেও পারে, এজন্যে অন্যদের ক্ষেত্রে তাদের সমগোত্রীয়রা শাস্তির দাবিও করতে পারেন। কিন্তু স্রেফ এই কারণে আমি মামুনুল হকদের বিচার চাই না। কারণ এই অভিযোগকে বড় করে দেখলে মামুনুল হকের অপরাপর অপরাধগুলো হালকা করে দেখা হয়ে যাবে। বছরের পর বছর ধরে প্রকাশ্যে বিভিন্ন সভা-সমাবেশ-ধর্মীয় সম্মেলনে তারা সাম্প্রদায়িক বিভক্তি, নারী বিদ্বেষের যে হূল ফোটাচ্ছেন এটা কোনোভাবেই বহুগামী চরিত্রের কথিত পাপ দিয়ে ঢেকে রাখা যায় না। এই বিভক্তি ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে তারা যা করছেন সেটা রীতিমতো মানবতাবিরোধী অপরাধ। ধর্মীয় দৃষ্টির কথিত পাপ মানবতাবিরোধী অপরাধকে ঢাকতে পারে না। সাম্প্রদায়িক বিভক্তি, নারী বিদ্বেষ, উসকানির জন্যে তাদের বিচার হওয়া জরুরি, এবং এটাই গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।

মোরাল পুলিশিং দিয়ে সমাজ বদলানো যাবে না। সমাজকে বদলাতে হবে অপরাধীদের শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে। মামুনুল হকরা অপরাধী। তাদের অপরাধগুলোকে সামনে এনে সেগুলোরই বিচার করার দরকার। স্ত্রী নাকি বান্ধবী— এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে লাভ নেই; সমাজ ও দেশের জন্যে ক্ষতিকর সাম্প্রদায়িক কীটদের বিচারের আওতায় আনাই হোক অগ্রাধিকার।