• ঢাকা
  • শনিবার, ১৫ মে, ২০২১, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
প্রকাশিত: এপ্রিল ৮, ২০২১, ০৭:১২ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : এপ্রিল ৮, ২০২১, ০৮:০১ পিএম

প্রসঙ্গ: তসলিমা নাসরিন

প্রসঙ্গ: তসলিমা নাসরিন

ক্রিকেটার মঈন আলী সাক্ষাৎকার নিতে আসা কোনো নারী সাংবাদিকের দিকে তাকান না। তিনি কথা বলেন অন্য দিকে তাকিয়ে। বিষয়টি জেনে আমি নিজেকে দিয়ে দৃশ্যটা কল্পনা করার চেষ্টা করলাম। একজন স্পোর্টস জার্নালিস্ট হিসেবে আমি মঈন আলীকে প্রশ্ন করছি। তিনি উত্তর দিচ্ছেন, কিন্তু আমার দিকে তাকাচ্ছেন না। কারণ কী? কারণ একজন সাংবাদিক পরিচয়ের আগে আমি উনার কাছে একজন নারী। ধর্মীয় শিক্ষা মঈন আলীকে এই আচরণে উদ্বুদ্ধ করেছে। একজন সাংবাদিকের জন্য একজন ক্রিকেটারের কাছ থেকে পাওয়া এই আচরণ কি যথেষ্ট অপমানের নয়?

এক দীর্ঘ সংগ্রামরত নারীবাদী হিসেবে তসলিমা নাসরিন যদি মঈন আলীর এই বিষয়টি নিয়ে একটি যুক্তিপূর্ণ সমালোচনা করতেন, তবে সেটি নারীবাদ, নারী সমাজ এবং পুরো বিশ্বের সভ্যতা-ভব্যতার জন্য উপকারে আসত। কিন্তু দুর্ভাগ্য এই যে, তসলিমা মঈনকে নিয়ে কোনো যুক্তিযুক্ত আলোচনায় যাননি, অকারণেই তীব্র, কূট এবং বিদ্বেষমূলক মন্তব্য ছুড়ে দিয়েছেন। এই মন্তব্য দেশ ও জাতি, নারী ও পুরুষ, আস্তিক ও নাস্তিক, ধর্মান্ধ ও আধুনিক, কারোই আদতে কোনো কাজে আসবে না। মঈন আলী জার্সিতে মদের লোগো বসাতে দেবেন না বলে তিনি ক্রিকেটার না হলে আইএসআইএস তে যোগ দিতেন, এরচেয়ে বালখিল্য মন্তব্য আর কিছু হতে পারে বলে মনে হয় না। এতে বোঝা যায়, তসলিমা নাসরিনের বুদ্ধি বিবেচনা তার বয়স অনুপাতে পরিণত হতে পারে নি। যেসব কথা আমরা বন্ধুদের মহলে আড্ডার ছলে হাসতে হাসতে বলে থাকি, উনি টুইটারে ফেসবুকে বসে সেই একই ভঙ্গিতে নানা সময়ে নানা মন্তব্য ছুড়ে দেন। অথচ উনি একজন খ্যাতিমান নারীবাদী, আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত লেখক। তার গাম্ভীর্য, পরিণত আচরণ ইত্যাদির প্রত্যাশায় থাকি আমরা, যারা এক সময় তার ‘নির্বাচিত কলাম’ কিংবা ‘আমার কিছু যায় আসে না’ পড়ে অনুপ্রাণিত, উদ্বুদ্ধ ও মুগ্ধ হয়েছিলাম। কিন্তু দুঃখজনক হলো, দিনের পর দিন তিনি আমাদের হতাশার সাগরে ফেলে নির্বিকার আত্মপ্রেমে মগ্ন হয়ে আছেন।

তসলিমা নাসরিন আমার জীবনের একটি সময়ের তীব্র প্রেমের নাম। যখন আমি জানতামই না নারীবাদ কি বস্তু! অথচ রিকসা করে যাওয়ার সময় আমার টিনএইজ উরুতে হাত চেপে ধরেছিল কোনো এক ‍পুরুষ, বারান্দায় দাঁড়ালে গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোক লুঙ্গি তুলে তার যৌনাঙ্গ দেখাতো ১৩ বছর বয়সী আমাকে। আমার বুকের ভেতরে থাকা অজানা অচেনা দহন আর রাগকে টেনে বের করে এনেছিলেন তসলিমা নাসরিন। আমি প্রথম জেনেছিলাম, যা কিছু ঘটেছে তাতে আমার দোষ নেই। দোষ এই সমাজের, যে সমাজ নিয়ন্ত্রণ করছে পুরুষ।

তসলিমা নাসরিনের দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন আমাকে কষ্ট দেয়। সত্যি কথা বলতে, আমি বিষয়টা নিয়ে বেশিক্ষণ ভাবতেও পারি না। আমি নিজে এই পরিস্থিতিতে পড়লে হয়তো নিজেই আউলে যেতাম। রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়তাম। কিন্তু একই সাথে আমি এটিও ভাবি, দুনিয়া জুড়েই তো প্রতিবাদী লেখক, শিল্পীকে নির্বাসিত করা হয়েছে। মুখ চেপে ধরা হয়েছে। কারাগারে বন্দি করা হয়েছে। হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু শেষ অব্দি নিজেদের লড়াইটুকু জারি রাখাটাই তো মহৎ লেখকের অসাধারণত্ব। তারা যা পারেন, আমরা সাধারণরা তো তা পারি না। তাই বিদেশ বিভুঁইয়ে বসে, নির্বাসিত জীবনকে মেনে নিয়ে একের পর এক নতুন সৃষ্টি করে চলেন তারা। যুদ্ধ শুরু করেছেন, থেমে যাবার জন্য নয় নিশ্চয়ই।

বিগত কয়েক বছর ধরে ফেসবুক টুইটারে আমি তসলিমা নাসরিনের এমন কোনো লেখার সন্ধান পাইনি যা আমাকে সমৃদ্ধ করতে পারে। বরং সেই গৎবাঁধা পুরোনোকেই বয়ে নিচ্ছেন। সঙ্গে আছে নিজের প্রতি অগাধ প্রেমের নিদর্শন, সমালোচনা নিতে না পারার মানসিকতা এবং নিজেকে ছাড়া আর কোনো দিকে মনোযোগ দিতে না পারার মনোভাব।

বাংলাদেশের নারীবাদ আন্দোলনকে তসলিমা দেখেন ব্যর্থ আন্দোলন হিসেবে। আমি এতে রাগ বা ক্ষোভ রাখি না। এটা তাঁর ব্যক্তিগত মতামত। কিন্তু আমার জানবার আছে তাঁর কাছে, দূরে থেকে হলেও এদেশের তরুণ একাকী নারীবাদীদের প্রতি তিনি তাঁর দায়বদ্ধতা কবে কতটুকু পালন করেছেন? যে নারীবাদীরা প্রতিনিয়ত অনলাইনে, বাস্তবে, সমাজে, পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, কবে কোন সুক্ষণে তসলিমা নাসরিন তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন? তাদের দুটো ভাল কথা বলেছেন! তাদেরকে এতটুকু শক্তি যুগিয়েছেন!

না, এরকম কোনো রেকর্ড নেই। সেই বহুকাল আগে ক্লাস নাইন-টেনে তাঁর ‘লজ্জা’ কি ‘ভ্রমর কইয়ো গিয়া’ কিংবা ‘শোধ’ পড়ে অনুপ্রাণিত হওয়ার পর, নারীবাদ যুদ্ধে অবতীর্ণ যখন তরুণ আমরা, তখন তসলিমার যে ছায়া, ভালোবাসা, পরামর্শ ও প্রেম আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম, তার কিছুই কখনো আমরা পাইনি। এর বদলে তিনি ক্রমাগত তাচ্ছিল্য করে গেছেন, ইগনোর করেছেন এবং আমাদের কখনো ধারণই করেননি নিজের ভেতরে। অথচ আমরা তাকে মনের সিংহাসনে রানীর আসনে তেমনি বসিয়ে রেখেছিলাম!

সে যাই হোক, দুঃখবোধ ছিল, আছে। তবু তসলিমা নাসরিনকে আমরা ফলো করেছি। কারণ তিনি কী বলেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা। এই প্রত্যাশা আমাদের পিছু ছাড়েনি। কিন্তু আবারো দুঃখজনক যে, তিনি মূল জায়গায় আঘাত না হেনে ক্রমাগত এদিক ওদিক গুলি ছুড়ে বেরিয়েছেন, নিজের ব্যক্তিগত রাগ ক্ষোভ যত্রতত্র উগড়ে দিয়েছেন। তার কাছে যখন আমরা প্রত্যাশা করেছি উচ্চমানের কোনো লেখা, শক্ত অবস্থানের ডাক, অনুপ্রেরণা- তখন তিনি দিনের পর দিন আলমিরা খুলে সুন্দর বোমকাই পরে ছেলেমানুষী আনন্দে মেতেছেন আর বিষণ্ণতা এলে এক নাগাড়ে সকলকে বকে চলেছেন। এই ছেলেমানুষী আমরা সবাই করি, সত্য। তবে, একটি বয়সের পর নিজের দায়বদ্ধতা, দায়িত্ব আর কথার ওজনটিকেও নজরে রাখতে হয় বৈকি। কারণ বহু মানুষ তো তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। মানুষের ভালবাসা আর প্রত্যাশা কি এতটাই তুচ্ছ?

আমাদের একজন তসলিমা নাসরিন ছিলো, যাকে আমরা নারীবাদের কান্ডারি মনে করতাম। যার দিকে তাকিয়ে লড়াই করার শক্তি পেতাম। কিন্তু একটা সময় লক্ষ্য করলাম, দেশের মেয়েদের প্রতি তিনি আর মনোযোগ রাখতে পারছেন না, যতটা মনোযোগ দিচ্ছেন শিবলিঙ্গে জল ঢালতে, কিংবা একেবারে একশ আশি ডিগ্রি উল্টে গিয়ে তীব্র সমালোচনা করতে। হ্যাঁ, জরুরি এটাও। কিন্তু সেই সমালোচনাটা আমরা চেয়েছিলাম গঠনমূলক, ধারাবাহিকভাবে। একেক সময় একেক কথা শুনে বিভ্রান্ত হতে চাইনি আমরা।   

নারীবাদ আন্দোলন একতাবদ্ধ আন্দোলন। বাংলাদেশেও নারীবাদের সফলতা নির্ভর করবে নারীবাদীদের জোটবদ্ধ শক্তির উপর। এই শক্তির পেছনে তসলিমা হয়ে উঠতে পারতেন একজন বড় বোন, শিক্ষক, মেন্টর ও নেতা। কিন্তু সে প্রত্যাশায় বালিজল ঢেলে উনি পড়ে আছেন টুইটারে মঈন আলীর মদের লোগো থেকে আইএসআইএস যাবার তত্ত্ব দেবার মতো নিতান্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন হাস্যকর একটি তুচ্ছ কমেন্ট করায় ব্যস্ত থেকে।

নারীবাদীদের কেউ ভালোবাসে না। এই দেশ নারীবাদীদের ঘৃণা করার দেশ। এ সত্য মাথায় নিয়েই আমরা পথ চলি। তাই আমাদের পথ খুব কষ্টের, বেদনার। এই সহজ সত্য আমরা জেনে গেছি। তসলিমা, আপনিও তো এসব জানেন, তবু কেন বারবার বেদনাহত হন? আমরা আপনাকে ভালবাসি। এই ভালবাসাটুকুকে আপনি গ্রহণ করেন কি না, জানি না। হয়তো করেন না। কারণ সমালোচনা আপনি নিতে পারেন না। তাতে কিছু যায় আসে না। আপনার প্রতি আমাদের ভালবাসা ও প্রত্যাশা তবুও ফুরিয়ে যায়নি। একদিন আপনি সত্যিই আমাদের প্রত্যাশার জায়গাটি স্পর্শ করতে পারবেন, সেই প্রত্যাশাও আমাদের শেষ হয়ে যায়নি।

 

লেখক: সম্পাদক, ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টর