• ঢাকা
  • শনিবার, ১৫ মে, ২০২১, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
প্রকাশিত: মে ৪, ২০২১, ০১:৫১ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : মে ৪, ২০২১, ০৩:১২ পিএম

গেম অন

টেস্ট ক্রিকেটের দাবি মেটাতে পারছেন কি তামিমরা?

টেস্ট ক্রিকেটের দাবি মেটাতে পারছেন কি তামিমরা?

শ্রীলঙ্কার কাছে শেষ টেস্টে বাংলাদেশ যেভাবে হারল, তাতে ক্রিকেটমহলে হা-হুতাশ দেখা যাচ্ছে কি! বাঙালি ক্রিকেট সমাজ উচ্চকিত গবেষণায়ও ব্যস্ত নন। জনমানসেও এই হারের পর তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া নেই! না থাকাটা আর্শ্চযের কিছু নয়। কারণ, টেস্ট ক্রিকেটটা তো বাংলাদেশ এ রকমই খেলে! টেস্ট ক্রিকেট নিয়ে  এ দেশের মানুষের মধ্যে তেমন স্পন্দনও নেই। এ দেশে ক্রিকেটের যে সামাজিক উত্থান, তা সীমিত হয়ে পড়েছে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে। আর সামাজিক মাধ্যমে। তাই দেশের মাটিতে আফগানিস্তান, ক্ষয়ে যাওয়া ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে হার কিংবা আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে শ্রীলঙ্কার কাছে বিশাল ব্যবধানে হারে কোনো হাহাকার নেই। আসলে টেস্ট ক্রিকেটের ‘রিং টোনটা’ই এ দেশের মানুষের কানে বাজছে না।

টেস্টে বাংলাদেশকে সাম্প্রতিক সময়ে আরও দুর্দশাগ্রস্ত দেখাচ্ছে। ঠিক টিম হয়ে উঠতে যে জিনিসগুলো দরকার, তার সঠিক মিশেল হচ্ছে না। শ্রীলঙ্কায় প্রথম টেস্টে দলের ব্যাটসম্যানরা রান পেলেন। বড় স্কোর গড়লেন। বাংলাদেশ ইনিংস ডিক্লেয়ার করল। কিন্তু বোলারদের লংকান ব্যাটসম্যানরা একেবারে ক্লাব পর্যায়ে নামিয়ে আনলেন। ফিল্ডিংয়ে স্লিপে দাঁড়ানোর মতো কোনো ফিল্ডার খুঁজে পাওয়া যায় না! আর সিলি পয়েন্ট কিংবা ফরোয়ার্ড শর্ট লেগে দাঁড়িয়ে ব্যাটসম্যানের শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ শুনতে চান না কেউ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টেস্ট ক্রিকেটও অনেক বদলে গেছে এটা ঠিক। টেস্ট ক্রিকেটে অনেকে অনেক দর্শন নিয়ে এসেছেন। কিন্তু কিছু জায়গায় সামান্যতম নড়চড় হয়নি। সেটা আপনি যে দেশ থেকে যে সময়ের ক্রিকেট দর্শনেরই আমদানি ঘটান না কেন। টেকনিক-টেম্পারামেন্ট-স্কিল এই তিনটা জিনিস বাদ দিয়ে আপনি খুব বেশি দূর এগোতে পারবেন না। টেকনিকে কেউ একেবারে নিখুঁত নন। হতে পারে না। টেস্ট ক্রিকেট অনেক বেশি পরীক্ষা নেয় টেম্পারমেন্টের। এই জায়গাটায় খুব ভালোভাবে উৎরে যেতে পারছেন না বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। লঙ্কানদের বিপক্ষে এই সিরিজে তামিম ইকবালের দিকেই তাকান। রান পেয়েছেন। ইনিংস শুরু করেছেন আগ্রাসী মেজাজে। আর নিজের নামের পাশে দুই টেস্টে অন্তত গোটা ‍দুয়েক সেঞ্চুরি লেখাতে পারতেন। কিন্তু পারলেন না। তার কারণ, তার ওই আগ্রাসী মেজাজ। টেস্ট ক্রিকেটে বোলারকে ঠেঙিয়ে শুধু রান করলেই হয় না। আপনার কাছ থেকে দল আরও কিছু চায়, তা হলো পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজের স্কিলের পরীক্ষা।

আপনি উইকেটে টিকে থাকলে আপনার নামের পাশে রান আসবে। দলের স্কোরও বড় হবে। শ্রীলঙ্কা টেস্টটা জিতল। হয়তো আপাত মনে হবে—অভিষেকেই দুর্দান্ত বল করা প্রাভিন জয়াবিক্রমার টেস্ট। ১৭৮ রানে ১১ উইকেট নিয়েছেন এই বাঁহাতি স্পিনার, কিন্তু ত্রিমানে, করুনারত্নের সেঞ্চুরিকে ছোট করে দেখারও সুযোগ নেই। টেস্ট শ্রীলঙ্কা জিততেই পারে। কিন্তু প্রতিপক্ষের  কারও এমন পারফরম্যান্স ছিল না, যা লঙ্কানরা মনে রাখবেন। শুধু জেতা দিয়ে টেস্ট ম্যাচকে ভাবীকাল বিচার করে না, সেটা সবার জানা। কিন্তু এই টেস্ট বাংলাদেশের কোনো ক্রিকেটারের এমন কোনো পারফরম্যান্স নেই, যা দিয়ে ক্রিকেট ইতিহাস তাকে ওপরের দিকে রাখবে।

শ্রীলঙ্কায় সিরিজ হারের মধ্যে আবার অনেকে অনেক কিছু পাওয়ারও হিসাব-নিকাশ করবেন। পরিসংখ্যান তুলে ধরে কিছুটা তুষ্টি খুঁজবেন। মুমিনুল দেশের বাইরে প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি পেলেন। নাজমুল হোসনে শান্ত, দীর্ঘ সময় যার ব্যাটে রানের খরা তিনি একটা বড় সেঞ্চুরি করলেন। তাসকিন ফর্মে ফেরার ইঙ্গিত দিলেন। কিন্তু এগুলোতে সব তাদের নিজস্ব ক্রিকেটীয় অ্যাকাউন্টে জমা পড়ল। বাংলাদেশও একটা টেস্ট ড্র করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বড় হারের ধাক্কায় বিধ্বস্ত টিমটাই দেশে ফিরছে।

একটা প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, টেস্ট ক্রিকেটে এই বিপর্যস্ত চেহারা কবে কাটিয়ে উঠবে বাংলাদেশ? আবেগ সরিয়ে রেখে বাস্তবের রুক্ষ জমিনে দাঁড়িয়ে একটাই উত্তর- টেস্ট ক্রিকেটের ন্যূনতম চাহিদা যেদিন মেটাতে পারবেন ক্রিকেটাররা। কিন্তু ক্রিকেটারদেরও একটা চাহিদা থাকে। সেটা মেটানোর দায় আছে অন্যদের। বেশি করে লম্বা ইনিংসের ম্যাচ খেলার সুযোগ। দেশের মাটিতে বিভিন্ন ধরনে উইকেটে খেলা। এই চাহিদা মেটানোর প্রশ্নে হয়তো সরাসরি ’না’ নেই। কিন্তু এমন সহজ –সরল নিষ্পাপ ভঙ্গিতে কর্তাদের মুখ থেকে একটা উত্তর আসে, তাতে মনে হয়; টেস্ট নয়, ক্রিকেটগ্রহে বাংলাদেশ পা রেখেছে শুধু সীমিত পরিসরের ক্রিকেট খেলতে!

করোনাকালে ‘সীমিত পরিসরে’ কথাটা বেশি উচ্চারিত হচ্ছে। কিন্তু ক্রিকেটে করোনাকালের আগে থেকেই পরোক্ষভাবে বাংলাদেশ ক্রিকেট কর্তারা সীমিত পরিসরের কথা শুনিয়ে আসছেন! ‘আমরা টেস্টে ভালো নই।’ পরোক্ষভাবে বলা—সীমিত ওভারের ম্যাচই আমাদের খেলা! আমাদের ক্রিকেট সংস্কৃতিও সেভাবে তৈরি হচ্ছে। সীমিত ওভারের ক্রিকেট নিয়েই যত উত্তেজনা-উন্মাদনা-মাতামাতি। এই সীমিত ওভারের চক্রব্যূহে আমরা ঢুকে পড়েছি। বেরোনোর রাস্তাই জানা নেই। তামিম-মুশফিক-মুমিনুলদের কাছে টেস্ট ক্রিকেট অবশ্যই আরও অনেক কিছু দাবি করে। কিন্তু সে দাবি মেটাবেন তারা কীভাবে?

 

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট