• ঢাকা
  • শুক্রবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ৯ আশ্বিন ১৪২৮
প্রকাশিত: জুন ২৪, ২০২১, ০১:০৭ এএম
সর্বশেষ আপডেট : জুন ২৩, ২০২১, ০৭:১২ পিএম

অটিজম শিশু আমাদের সম্পদে পরিণত হোক

অটিজম শিশু আমাদের সম্পদে পরিণত হোক

রূপম চক্রবর্ত্তী ।। প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

অফিসে যাওয়ার পথে অটিজম বাচ্চাদের একটি গাড়ি দেখি। যে গাড়ি করে ছোট ছোট অটিজম বাচ্চাদের স্কুলে নিয়ে যাওয়ার চিত্র দেখি। সারা পৃথিবীতে বেড়ে চলেছে অটিজম। কিন্তু অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার (এএসডি) নিয়ে জনমানসে এখনও সচেতনতা তলানিতেই। বিশ্ব অটিজম দিবসের প্রাক্কালে সে কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন চিকিৎসকরাও। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে শিশুর সামাজিক আচরণ যে ভাবে বদলানো উচিত, স্নায়বিক কারণে এ অসুখে তা হয় না। অথচ সচেতনতার অভাবে এই নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার চিনতেই পারেন না অভিভাবকরা। তাই এ রোগ সম্পর্কে আরও বেশি করে প্রচার দরকার বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এবং জরুরি, একেবারে শৈশবেই এ রোগকে চিহ্নিত করা।

অটিজম বংশগত বা মানসিক রোগ নয়, এটা স্নায়ুগত বা মানসিক সমস্যা। এ সমস্যাকে ইংরেজিতে নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার বলে থাকে। অটিজমকে সাধারণভাবে শিশুর মনোবিকাশগত জটিলতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অটিজমের লক্ষণগুলো একদম শৈশব থেকেই, সাধারণত তিন বছর থেকে প্রকাশ পেতে থাকে এ সমস্যা। অটিজমে আক্রান্তরা সামাজিক আচরণে দুর্বল হয়, পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে কম সক্ষম হয়। অটিজম একটি মানসিক রোগ যা বিশেষত বাচ্চাদের মধ্যে পাওয়া যায়। অটিজমে শিশুরা অন্য্ বাচ্ছাদের তুলনায় আলাদা রকম আচরণ করে যেমন বারবার একই জিনিস পুনরাবৃত্তি করা। এই রোগ সাধারণত এক থেকে পাঁচ বছরের শিশুদের মধ্যে দেখা যায়। অটিজমে আক্রান্ত শিশুরা অন্য শিশুদের থেকে আলাদা হয় ।

সন্তানের জন্মের সময় মা বাবারা বুঝতে পারেন না যে তাদের বাচ্চা অটিজম রোগে আক্রান্ত।তবে আস্তে আস্তে অটিজমের সমস্যাগুলি দেখা দেয় এবং সন্তানের মাতা পিতা বুঝতে পারেন। যখন তাদের শিশু সঠিকভাবে কথা বলতে পারে না এবং যখন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা হয় তখন শিশু উত্তর দিতে অসুবিধা বোধ করে । একটা কথা বারবার পুণরাবৃত্তি করে । অন্য্ ব্যক্তির চোখে চোখ রাখতে অসুবিধা বোধ করে এবং নতুন মানুষের সাথে কথা বলতে ভয় পায়ে । অটিজম রোগকে মানসিক রোগ, বলে ধরা হয় । অটিজমের কারণে মস্তিষ্কের বিকাশ হয় না। মানুষ জড়িত সব রোগের মধ্যে অটিজম তৃতীয় স্থানে রয়েছে ।

অটিজমে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজেকে জগতের বাইরের কেউ হিসাবে ভাবেন । উইকিপিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পারি বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি দিবস যা প্রতিবছর ২রা এপ্রিল পালিত হয়। এই দিনটিতে জাতিসংঘ বিশ্বজুড়ে তার সদস্য দেশগুলিকে অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (এএসডি) আক্রান্ত ব্যক্তিদের সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণে উৎসাহিত করে। দিবসটি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ কর্তৃক ‘৬২/১৯৯ ধারা অনুযায়ী মনোনয়ন লাভ করে। ‘বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস’ প্রস্তাবটি ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে পাস হয়েছিল এবং সেটি গৃহীত হয়েছিল একই বছরের ১৮ ডিসেম্বর। এটি প্রস্তাব করেছিলেন জাতিসংঘে কাতারের প্রতিনিধিবৃন্দ যাদের মধ্যে ছিলেন প্রিন্সেস শিখা মোজাহ বিনতে নাসের আল-মিসনদ এবং তার স্বামী, কাতার রাজ্যের আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল-থানি।

সকল সদস্যরাষ্ট্র তাঁদের এ প্রস্তাবকে সমর্থন করে। বিশ্ব অটিজম দিবস স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত জাতিসংঘের সাতটি দিবসের মধ্যে অন্যতম।এইদিন সেইসকল পৃথক পৃথক অটিজম সংস্থাগুলি ঐক্যবদ্ধ হয় যারা বিশ্বজুড়ে এরকম মানসিক বিকাশসংক্রান্ত ব্যাধিতে আক্রান্তদের সম্পর্কে গবেষণা, রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা প্রদান এবং তাদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার মতো মতো বিষয়গুলি নিয়ে কাজ করে।. এই অটিজম আক্রান্ত ছেলে মেয়েরা একা থাকতে পছন্দ করে না।এবং তাদের দলে খেলতেও ভালো লাগে না।

প্রতিদিন এক ধরণের খেলা খেলতে পছন্দ করে। অচেনা কারুর সাথে কথা বলে না। তারা সাধারণ বাচ্চাদের মতো ব্যবহার করেনা না।তারা প্রশ্নের উত্তর দিতে অসুবিধা বোধ করে এবং একটি কথাই বার বার পুনরাবৃত্তি করে। কথা বলার সময় অটিজমে আক্রান্ত শিশু কথা বলার আঙ্গুল এবং হাতের ব্যবহার করে না। তারা খুব অস্থির হয়ে যায়। তারা নিজেকে খুব সক্রিয় মনে করে। তারা যে কোন কাজ এক্সট্রিম লেবেলে করে থাকে । তারা খুব দক্ষ হয় না এবং অন্যান্য বাচ্চাদের থেকে পৃথক হয় ।কারো দিকে তাকিয়ে হাসে না কিংবা আদর করলেও ততটা সাড়া দেয় না। অনেকে আবার আদর ও পছন্দ করে না।

সাধারণভাবে অটিষ্টিক শিশুরা একই কথা বারবার বলে এবং একই কাজ বার বার করতে পছন্দ করে। তবে সকল অটিস্টিক শিশুরা একই রকম আচরন করবে তা ঠিক নয়।এই রোগ তিন বছর বয়সে সহজেই সনাক্ত করা যায়। বাচ্চাদের বিকাশ খুব ধীরগতিতে হয়। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন দেশের অনগ্রসর, বঞ্চিত, অসহায়, প্রতিবন্ধী, অটিস্টিক এবং জন্মগতভাবে কিংবা অন্য যেকোন কারণে শারীরিক ও মানসিকভাবে সমস্যাগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর কল্যাণ, উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ ও ক্ষমতায়নের জন্য বহুমাত্রিক সেবা প্রদান করছে। দেশের প্রতিবন্ধী এ জনগোষ্ঠীকে বিনামূল্যে ফিজিওথেরাপি ও অন্যান্য চিকিৎসা সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে ২০০৯-২০১০ অর্থ বছরে দেশের পাঁচটি জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র চালু করা হয়।

এসব কেন্দ্রের সাফল্যের ভিত্তিতে ২০১৪-১৫ অর্থ বছর পর্যন্ত দেশের ৬৪টি জেলায় ১০৩টি কেন্দ্র চালু করা হয়। পর্যাক্রমে সকল উপজেলা প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র, অটিজম কর্ণার, টয় লাইব্রেরী কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে। ইতোমধ্যে স্থাপিত কেন্দ্রসমূহে এ যাবৎ প্রায় ১ লক্ষ ১০ হাজার প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে বিভিন্ন ধরনের প্রায় ১১ লক্ষ ১৮ হাজার সেবা (Service Transaction) প্রদান করা হয়েছে। জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের আওতায় পরিচালিত ১০৩টি প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রে একটি করে অটিজম ও নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী (এনডিডি) কর্নার স্থাপন করা হয়েছে। উক্ত ১০৩টি কেন্দ্র হতে অটিজম সমস্যাগ্রস্থ শিশু/ব্যক্তিদের বিভিন্ন সেবা প্রদান হচ্ছেঃ যেমন সনাক্তকরণ, ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি,স্পিচ এ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি, অডিওমেট্রি, অপটোমেট্রি, সাইকো, সোস্যাল কাউন্সেলিং, গ্রুপ থেরাপির মাধ্যমে খেলাধুলা ও প্রশিক্ষণ,অভিভাবকদের কাউন্সেলিং। বর্তমান সরকার অটিজম শিশুদের জন্য বিভিন্ন প্রশংসনীয় কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।

ভ্রাম্যমাণ ওয়ান স্টপ থেরাপি সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সুবিধা বঞ্চিত অটিজমসহ প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী এবং প্রতিবন্ধিতার ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের ৩২টি মোবাইল থেরাপি ভ্যানের মাধ্যমে বিনামূল্যে থেরাপিউটিক সেবা প্রদান করা হচ্ছে। ৩২টি মোবাইল থেরাপি ভ্যানের মাধ্যমে জুন ২০২০ পর্যন্ত বিনামূল্যে নিবন্ধিত থেরাপিউটিক সেবা গ্রহিতার সংখ্যা ৩,৩৯,০৫৫ জন এবং প্রদত্ত সেবা সংখ্যা ৭,৯০,৮৬৬ টি। এছাড়া, জুন ২০১৭ থেকে বাংলাদেশ সচিবালয়ে একটি মোবাইল থেরাপি ভ্যান ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। উক্ত ক্যাম্পের মাধ্যমে সপ্তাহে ৩দিন কর্মকর্তা/কর্মচারীদের বিনামূল্যে থেরাপিউটিক সেবা প্রদান করা হচ্ছে। জুন ২০২০ পর্যন্ত নিবন্ধিত সেবা গ্রহীতা ১৩৮৪ জন এবং তাঁদের প্রদত্ত সেবা সংখ্যা ২১৭৩১ জন।

এখনো অনেক পরিবারই আছে যারা অটিজম সঠিকভাবে বুঝতে বা শনাক্ত করতে পারেন না। ফলে সেসব পরিবারের জন্ম নেয়া বিশেষ শিশুটিকে বছরের পর বছর সমাজের সবার কাছ থেকে আলাদা করে রাখা হয়।সামাজিক কোনও আচার অনুষ্ঠানে তাদের অংশগ্রহণ তো দূরের কথা অনেক ক্ষেত্রে সমাজের মানুষেরাও তাদের দূরে সরিয়ে রাখে এক ধরনের কুসংস্কার থেকে।এখনো বাংলাদেশে বহু পরিবার আছে যেখানে অটিজম আক্রান্ত মানুষের চিকিৎসার ব্যাপারে পুরনো মানসিকতা খুব একটা বদলায়নি। অটিজম নিয়ে মানুষের ধারণা কতটা বদলেছে এ বিষয়ে ডক্টর শাহীন আখতারের কাছে জানতে চাইলে তিনি বিবিসিকে জানান, গ্রামের দিকে অনেকেই জানেননা অটিজম কি, সেটা যে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী নয় সেটা বুঝে উঠতে পারেনি। অনেকে এখনো বুদ্ধি প্রতিবন্ধীদের পাগল মনে করে, আবার অনেকে মনে করে যে, বুদ্ধি প্রতিবন্ধী, মানে বোকা। কিন্তু এসব ধারণার কোনটাই ঠিক না।

বহুদিনের প্রাচীন ধারণা মোতাবেক বেশিরভাগ পরিবারই তাদের অটিজম আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা বা শিক্ষার বাইরে রাখছে। তবে সে অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে ধীরে ধীরে। বিবিসিকে ডক্টর শাহীন আখতার আরও বলেন,  ‘এখন অনেক বাবা মা-ই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে চিকিৎসার জন্য ছেলেমেয়েদের এখানে নিয়ে আসছেন’ মোটামুটি বেশিরভাগ অটিস্টিক শিশু অত্যন্ত সম্ভাবনাময় হয়। প্রতি ১০ জন অটিস্টিক শিশুর মধ্যে একজনের ছবি আঁকায়, গানে, গণিতে বা কম্পিউটারে খুবই দক্ষতা থাকে। অটিস্টিক শিশুকে ঠিকমতো পরিচর্যা করতে পারলে পরবর্তীতে সে অনেক গুণী কেউ একজন হয়ে উঠতে পারে। এখন তারাও সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখেন। অটিস্টিক শিশুর মধ্যে কোনো না কোনো প্রতিভা বা বিশেষ গুণ লুকিয়ে আছে।

নিবিড় পরিচর্যা করলে তারা সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে। একই সঙ্গে তাদের সুপ্ত গুণাবলীও প্রকাশ পায়। তাই অটিজম শিশুদের প্রতি সর্বদা মমতা ও স্নেহের পরশ বুলিয়ে দিতে হবে। অটিজম শিশুদের উন্নয়নে বাংলাদেশে অগ্রদূত হিসেবে কাজ করছেন সম্মানিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কন্যা সায়মা ওযাজেদ হোসেন পুতুল। আমাদের মনে রাখতে হবে বাংলাদেশে দিন দিন অটিজম আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বাড়ছে। তবে যে হারে বাড়ছে, সেই অনুপাতে তাদের জন্য স্কুলের সংখ্যা অপর্যাপ্ত। জেলা শহরগুলোতে শিশুদের শিক্ষার কোনো সুযোগ নেই বললেই চলে। গুটিকয়েক স্কুলের শিক্ষাব্যবস্থা যা আছে তাও অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এই অটিজম শিশুদের সম্পদে পরিণত করার জন্য বর্তমান সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলোর সঠিক বাস্তবায়ন প্রত্যাশা করছি।