• ঢাকা
  • শুক্রবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ৯ আশ্বিন ১৪২৮
প্রকাশিত: জুন ২৬, ২০২১, ১২:৫১ এএম
সর্বশেষ আপডেট : জুলাই ২৬, ২০২১, ১২:৩০ এএম

ইরানের জ্ঞানদীপ্ত স্বৈরতন্ত্র বনাম খামেনিদের মোল্লাতন্ত্র

ইরানের জ্ঞানদীপ্ত স্বৈরতন্ত্র  বনাম খামেনিদের মোল্লাতন্ত্র

লেখক || রেজাউল করিম সহকারী অধ্যাপক  ইতিহাস বিভাগ, সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ, ফরিদপুর।

ইরানের পূর্ব নাম পারস্য। পারস্যের জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন-সংস্কৃতির কাছে মুসলিম সভ্যতা, মুসলিম বিশ্ব এমনকি পৃথিবীও ঋণী। সম্রাট সাইরাস থেকে সম্রাট দরায়ুস পর্যন্ত মানে খ্রিস্টপূর্ব ৫৫৯ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০ পর্যন্ত ছিল পারস্য সাম্রাজ্য। ছিল এই সাম্রাজ্যের শৌর্য-বীর্য, গৌরব। সেই গৌরবে আজো পার্সিয়ানরা গৌরবান্বিত বোধ করেন। খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০ খ্রিস্টাব্দে গ্রিক বীর আলেকজান্ডার পারস্য দখল করলে শুরু হয় গ্রিক শাসন এবং তা বহাল থাকে খ্রিস্টপূর্ব ১৫০ পর্যন্ত। খ্রিস্টপূর্ব ১৫০-২২৬ খ্রিস্টপূর্ব পর্যন্ত পার্সিয়ান যাযাবর, ২২৬-৬৫০ পর্যন্ত সাসানিড রাজবংশ, ৬৫০-১০৩৭ পর্যন্ত আরবরা, ১০৩৭-১২১৯ পর্যন্ত তুর্কিরা, ১২১৯-১৫০০ পর্যন্ত মোঙ্গলরা, ১৫০০-১৭২২ সাফাভি রাজবংশ পারস্য শাসন করে।
 
তারপরে যাযাবর গোত্রপতিরা পারস্য শাসন করতে থাকে। যাযাবরদের আমলে পারস্যের কেন্দ্রীয় শাসন ছিল না বললেই চলে। ১৯২৫ সালে রেজা শাহ পাহলভীর হাতে যাযাবর কাজার বংশের পতন ঘটে। শুরু হয় পাহলভী বংশের শাসন। নাসিরুদ্দিন তুসি রচিত ‘আখলাক-ই-নাসিরী', গ্রন্থ থেকে জানা যায়, রেজাশাহ যখন ক্ষমতা নেন, তখন পারস্যের সমাজব্যবস্থা হিন্দুদের বর্ণপ্রথার ন্যায় চার শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল। ১ম শ্রেণি-আলেম ও শিক্ষিত সম্প্রদায়, ২য় শ্রেণি- সৈনিক, ৩য় শ্রেণি-ব্যবসায়ী ও ৪র্থ শ্রেণি-কৃষক। সেই সাথে ছিল শিয়া মুজতাহিদগণ কর্তৃক ব্যাখ্যাকৃত ধর্মীয় আইন। 


রেজা শাহ বেশি শিক্ষিত ছিলেন না। তিনি কোনো দিন ইউরোপেও যাননি। কিন্তু তিনি ছিলেন ইউরোপীয় ধ্যান-ধারণায় বিশ্বাসী প্রগতিশীল আধুনিক পুরুষ, ধর্মীয় গোঁড়ামিমুক্ত, মহান সংস্কারক, আধুনিক ইরানের প্রবর্তক। তিনি প্রথমে পারস্যকে ঐক্যবদ্ধ কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনে নিয়ে আসেন। পারস্যে শিক্ষা বলতে ছিল ধর্মীয় শিক্ষা। রেজাশাহ ধর্মীয় শিক্ষাকে ঐচ্ছিক করে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করেন। এতে ধর্মীয় শিক্ষক ও ধর্মীয় নেতাদের মর্যাদাহানি ঘটে। তিনি আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট খোলেন। ১৯৩৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতি বছর ১০০ ছাত্রকে বৃত্তি প্রদান করে সরকারি খরচে পড়াশোনা করতে ইউরোপ পাঠান। চালু করেন নৈশ স্কুল। মেয়েদের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেন, অফিস আদালতে মেয়েদের জন্য চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করেন। ধর্মীয় আইনে বিয়েতে নিবন্ধন নেই। তিনি বিয়েতে নিবন্ধন আইন প্রবর্তন করেন এবং আইন করে মেয়েদের বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার দেন। রেজা শাহের ছেলে মোহাম্মদ রেজা শাহ ১৯৬৩ সালে আইন করে পুরুষের একাধিক বিয়ে করার অধিকার খর্ব করেন। একান্ত প্রয়োজন হলে ১ম স্ত্রীর অনুমতি নিয়ে ২য় বিয়ে করা যাবে আইনে এই বিধান প্রণয়ন করেন।

সমাজে নারীরা ছিল অবহেলিত, পর্দা দ্বারা ঘেরা, চার দেয়ালে বন্দি। রেজা শাহ পর্দাপ্রথাকে ঘৃণা করতেন। একে তিনি মধ্যযুগীয় বর্বর জীবনবোধের প্রতীক মনে করতেন। পর্দাপ্রথা বিলোপে তিনি দৃঢ়সংকল্প হন। তিনি নিজের স্ত্রী-কন্যাকে ইউরোপীয় পোশাক স্কার্ট পরিয়ে অনুষ্ঠানে হাজির করতেন। ১৯২৮ সালে কুম-এ অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে শাহবানুকে নিয়ে হাজির হলে সেখানকার ধর্মীয় নেতা -এর নিন্দা জানান। তিনি ঐ ধর্মীয় নেতাকে পাকড়াও করে বেত্রাঘাতের আদেশ দেন। এরপর থেকে অভিজাত মহিলাগণ বোরখা ত্যাগ করে আধুনিক পোশাক পরিধান করতে শুরু করেন। স্কুলে আধুনিক পোশাক পরিহিত মহিলা শিক্ষক নিযুক্ত করেন। মসজিদে তিনি চেয়ার প্রবর্তন করেন। পাগড়ি পরিধান ছিল ধর্মীয় ও আভিজাত্যের প্রতীক। পাগড়িকে তিনি মনে করতেন পশ্চাৎপদ ব্যাপার। ইউরোপীয় হ্যাটের সংস্করণে তিনি ‘পাহলভী হ্যাট’ প্রবর্তন করেন। ১৯৩৫ সালের এক আইন দ্বারা এটি ইরানবাসীদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়। মহাকবি ফেরদৌসি রচিত ‘শাহনামা’য় বর্ণিত বীরপুরুষদের ইরানের শক্তি ও শ্রেষ্ঠত্বের নিদর্শন মনে করেন। তাঁর মতে, পারসিয়ানরা হচ্ছে খাঁটি এরিয়ান (আর্য)। এরিয়ানদের দেশের নাম হবে ইরান। ১৯৩৫ সালে তিনি পারস্যের নতুন নাম রাখেন ইরান যা আজো বহাল আছে। ফারসি ভাষাকে আরবি ভাষার প্রভাবমুক্ত করার চেষ্টা করা হয়। আরবি নামের স্থলে ফারসি নাম ব্যবহার করা হয়। সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের নামে বিভিন্ন বিশেষণ ব্যবহার করা হতো। রেজা শাহ সেসব বিশেষণ পরিহার করে নামের আগে মিস্টার, মিস, ম্যাডাম ব্যবহারের নির্দেশ দেন। 

রেজা শাহ ধর্মীয় বিচার ও ধর্মীয় আদালতের স্থলে আধুনিক ও ধর্মনিরপেক্ষ আইন-আদালত চালু করেন। মোল্লাদের বিচারিক ক্ষমতা রহিত করে সৃষ্টি করেন আধুনিক জজ, উকিল শ্রেণির। ১৯২৫ সালে প্রণয়ন করেন আধুনিক বাণিজ্যিক ও ফৌজদারি আইন এবং ১৯২৬ সালে দেওয়ানি আইন। ১৯২৭ সালে করেন আইন মন্ত্রণালয়। ইরানে ওলামায়েদের অনেক ওয়াকফ সম্পত্তি ছিল। সেগুলো তিনি সরকারিভুক্ত করেন এবং এর আয় দিয়ে স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের নির্দেশ দেন। ১৯২৮ সালে তিনি কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রীয় ব্যাংক এবং কৃষকদের ঋণ সহায়তা দিতে ১৯৩৩ সালে কৃষি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৩২ সালে রিয়াল মুদ্রা প্রতিষ্ঠা করেন। দেশময় রাস্তাঘাট, রেল লাইন স্থাপন করে যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন। 

রেজা শাহের সময়ে কৃষি, শিল্পে, অর্থনীতিতে ইরান যথেষ্ট উন্নতি লাভ করে। ১৯২৫ সালে ইরানের রাষ্ট্রীয় বাজেটটি ছিল ১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, ১৯৪১ সালে তা বেড়ে হয় ১৬৬.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন জার্মানির পক্ষে। ফলে ১৯৪১ সালের আগস্ট মাসে সোভিয়েত ইউনিয়ন উত্তর ইরান এবং ব্রিটেন দক্ষিণ ইরান দখল করে নেয়। রাজধানী তেহরানকে রাখে নিরপেক্ষ অঞ্চল। মিত্রপক্ষের নির্দেশে তিনি পদত্যাগ করে ২০ বছর বয়সী পুত্র মোহাম্মদ রেজা শাহের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে আফ্রিকায় চলে যান। পুত্র মোহাম্মদ রেজা পাহলভী পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে দেশ শাসন করতে থাকেন। ইরানের জমি ছিল সামন্ত প্রভুদের অধীনে। অর্থনৈতিক দাসত্বের কারণে কৃষকরা ভূমি মালিকের বিরুদ্ধাচারণ করতে সাহস করত না। ফলে সাংবিধানিক শাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিটি নির্বাচনে জমিদার শ্রেণি তাদের বর্গাচাষীদের ভোটে নির্বাচিত হতেন।  শাহ কৃষকদের জমি দিতে চাইলেন, কিন্তু কাজটি সহজ ছিল না। পিতা রেজা শাহের বিশাল জমি ছিল। ১৯৫১ সালে সে জমির একাংশ তিনি ২৫ বছরে ২৫ কিস্তিতে বর্গাচাষীদের মাঝে বিক্রি করে দেন। ১৯৬০ সালে তিনি আরেকটি আইন করেন, সেচ অঞ্চলে ৪০০ হেক্টর এবং সেচহীন অঞ্চলে ৮০০ হেক্টরের অধিক কেউ জমির মালিক থাকতে পারবে না। ভূমি সংস্কার আইন বাস্তবায়নের জন্য ১৯৬২ সালের অধ্যাদেশে ১৯৬২-৬৩ সালের জন্য ২ বিলিয়ন রিয়াল অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়। এভাবে নানা সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণের ফলে ইরানে এক নবযুগের সূচনা হয়। 

অন্যদিকে ইরানের ধর্মান্ধ মোল্লারা চুপ করে বসে থাকেনি। পাহলভী রাজবংশ ইরানে যত উন্নয়নই করুক না কেন তাতে সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মান্ধ জনগোষ্ঠীর মন গলেনি। তারা রেজা শাহের সংস্কারকে ধর্মবিরুদ্ধ হিসেবেই দেখেছে। ইরানে শিয়ারা সংখ্যাগরিষ্ঠ। সুন্নিদের তুলনায় শিয়ারা ধর্মীয় নেতাদের প্রতি বেশি অনুগত ও সংবেদনশীল। ধর্মীয় ইমাম হচ্ছে তাদের সর্বশেষ ভরসাস্থল। পাহলভী আমলে ধর্মীয় নেতারা ছিলেন কোনঠাসা, উপেক্ষিত। অথচ আগে তারা ছিলেন ধর্মগুরু, শিক্ষক, আলেম, সম্ভ্রান্ত অভিজাত। ধর্মীয় সংস্থাসমূহের মালিকানাধীন বিপুল ভূ-সম্পত্তি ছিল, তা বাজেয়াপ্ত করায় তারা ছিল ক্ষিপ্ত। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নিয়মিত চাঁদা দিয়ে তাদেরকে টিকিয়ে রাখেন।  তারা উঠে পড়ে লাগলেন পাহলভী রাজবংশের বিরুদ্ধে। ১৯৭৮ সালে মোল্লারা শাহকে ‘নমরূদ’ রূপে আখ্যায়িত করে। অদূরদর্শী কমিউনিস্টরাও শাহের বিরুদ্ধে চলে যায়। শাহ ছিলেন আমেরিকা পন্থী। বিপদের দিনে আমেরিকাও শাহের পাশে দাঁড়ায়নি। শাহ আবার ‘নিউক্লিয়ার পাওয়ার’ -এর অধিকারী হতে চাইলে আমেরিকা তাতে সায় দেয়নি। এজন্য শেষদিকে আমেরিকার সাথেও তাঁর দূরত্ব তৈরি হয়।


শিয়ারা ইমামে বিশ্বাসী। ইমাম আয়াতুল্লাহ খামেনি শাহের বিরুদ্ধে ধর্ম বিপ্লবের ডাক দেন। ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বর মাসে মোল্লাদের ডাকে লক্ষ লক্ষ লোক রাজপথে নেমে আসে। বিস্ময়কর যে, যে নারীদের জন্য পাহলভী বংশ এতো কিছু করলেন, তারাও মোল্লাদের ডাকে সাড়া দিয়ে রাস্তায় নামলেন। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করে আইন করলে দাস মালিকদের সাথে দাসরাও আব্রাহাম লিংকনের বিরদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। ইরানে রেজা শাহ পাহলভীর অবস্থাও হয় সে রকম। কেননা নারীদের বন্দিদশা থেকে মুক্ত করতে গিয়ে তিনি মোল্লাদের রোষাণলে পড়েন। আর সে নারীরাই তাঁর বিরুদ্ধে যায়। ইসলামি বিপ্লবের ফলে আয়াতুল্লাহ খামেনির নেতৃত্বে মোল্লারা ইরানের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসেন আর রেজা পাহলভী মিশরে আশ্রয় নেন। শুরু হয় ইরানে মোল্লাতন্ত্রের শাসন।

মোল্লাতন্ত্রের বিধান অনুযায়ী ধর্মীয় নেতা হিসেবে ইরানের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হলেন আয়াতুল্লাহ খামেনি। রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠান তাঁর নিকট দায়ী। সম্প্রতি ইরানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হল। ইব্রাহিম রাইসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন। আগস্ট মাসে তিনি দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন। ইরানের প্রেসিডেন্টগণ জনগণের সেবা করার চেয়ে খামেনির সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। তাঁর ইঙ্গিত ছাড়া ইরানে প্রেসিডেন্ট হওয়া যায় না। কেননা ইরানে কোনো রাজনৈতিক দল নেই,  রাজনৈতিক দল গঠনের অধিকার নেই। পঞ্চাশের দশকে শাহ সীমিত পরিসরে হলেও মিল্লিয়ুন (পরে ইরান নেভিন) ও মারদুম নামে দুইটি রাজনৈতিক দলের অনুমোদন দিয়েছিলেন। খামেনি আমলে তাও নেই। ইচ্ছা করলেই প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়া যায় না। নির্দলীয়ভাবে প্রেসিডেন্ট হতে হয়। প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার জন্য খামেনির নিকট আবেদন করতে হয়। যত আবেদনই পড়ুক, তিনি সর্বোচ্চ চারজনকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য অনুমতি দেন। যে চারজনকে অনুমতি দিয়ে থাকেন, কেবলমাত্র  তারাই নির্বাচন করতে পারেন। ২০২১ সালের নির্বাচনে ৭০০ জন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন। তাদের মধ্য থেকে খামেনি  প্রাথমিকভাবে ৭ জনকে অনুমতি দিলেও  চূড়ান্ত পর্যায়ে ৪ জনকেই নির্বাচনে  অংশগ্রহণ করতে অনুমোদন করেছিলেন।

রেজা পাহলভীর আমলে রাজতন্ত্র ছিল। তাঁরাও স্বৈরাচারী ছিলেন। তবে, তাঁরা ছিলেন জ্ঞানদ্বীপ্ত স্বৈরাচার (Enlightened Despotic), ইউরোপে প্রিন্স মেটারনিক যেমন ছিলেন ফরাসি বিপ্লববিরোধী। ফরাসি বিপ্লবকে তিনি বলতেন ‘গ্যাংরিন’। একে উত্তপ্ত লৌহদন্ড দ্বারা পুড়িয়ে ফেলতে হবে, নচেৎ সমগ্র দেহে ছড়িয়ে পড়বে। ইরানের খামেনিও তদ্রূপ পাশ্চাত্য বিরোধী। পাশ্চাত্য শিরোমণি আমেরিকাও তেমনি তার বিরুদ্ধে অবরোধ দিয়ে রেখেছে। ফলে ইরানের অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই নাজুক। ইরানে ১ মার্কিন ডলার মুদ্রা মান হচ্ছে ২ লক্ষ রিয়াল। যদিও সরকারিভাবে বলা ৪২০০০ রিয়াল। মানুষের কর্মসংস্থান নেই। বানের জলের মতো ছাত্র-যুবকরা ইরান ছাড়ছে। যে যেদিকে পারছে পালাচ্ছে, বিশেষ করে ইউরোপ-আমেরিকায় যাচ্ছে। প্রতিবাদ আন্দোলন কঠোর হস্তক্ষেপে দমন করা হচ্ছে। ইরানি জনগণ টের পাচ্ছে শাহদের বাদ দিয়ে খামেনিদের ক্ষমতায় এনে কী মহাভুল করেছে! কিন্তু উপায় নেই। ইব্রাহিম রাইসি বিচারক থাকাকালে শত শত আন্দোলনকারীকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছেন। তিনি খুবই কট্টরপন্থী। তাকে মানবাধিকার কমিশন মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত করেছে। তিনি প্রেসিডেন্ট হওয়ায় খামেনির ভবিষ্যত নিরাপদ হলো। কট্টরপন্থীরা জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্নদিকে প্রবাহিত করার জন্য মাঝে মাঝে আমেরিকা ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হুমকি দেয়। যেমন খামেনি ইসরায়েলের অস্তিত্ব স্বীকার করেন না। পৃথিবীর বুক থেকে ইসরায়েলকে ধ্বংস করাই ইরানের উদ্দেশ্য। খামেনি ‘স্যাটানিক ভার্সেস’ বই লেখার জন্য ব্রিটিশ নাগরিক সালমান রুশদির মৃত্যুদন্ড ফতোয়া জারি করেন। ধর্মীয় আবেগ এক জিনিস, বাস্তবতা আরেক জিনিস। রুশদির মৃত্যুদন্ড কার্যকর করতে পেরেছে? ইসরায়েলকে ধ্বংস করে দেয়া এতো সহজ? ইসরায়েল জাতিসংঘের সদস্য, তার পেছনে রয়েছে সুপার পাওয়ার আমেরিকা। তাছাড়া ইসরায়েল নিজেই মহাশক্তিধর দেশ। তাকে ধ্বংস করতে গেলে ইরান নিজে টিকে থাকতে পারবে? তাছাড়া ইসরায়েলিরাও তো মানুষ। ইসরায়েলেও ২০% মুসলমান আছে। ইরানের বাসনাও যদি হয় মানুষ হত্যা করা, তাহলে সে ইসরায়েলের চেয়ে ভালো -এই দাবি করে কিভাবে? ইরান একদিকে ইসরায়েল-আমেরিকার বিরোধিতা করে, অন্যদিকে চীনের প্রতি বন্ধুত্বের হাত বাড়ায়। চীন উইঘুর মুসলমানদের শেষ করে দিচ্ছে সেদিকে কোনো মুসলিম দেশের ভ্রূক্ষেপ নেই। ইরানের নিজের অর্থনৈতিক অবস্থাই বেহাল। তারমধ্যে সে সিরিয়া, ইয়েমেনে প্রক্সি যুদ্ধে জড়িত, হিজবুল্লাহর মতো সংগঠনের পৃষ্ঠপোষক। ইরান হচ্ছে শিয়া প্রধান দেশ। সুন্নিরা তো শিয়াদের মুসলমানই মনে করেন না। সুযোগ পেলে সুন্নিরা পৃথিবীকে শিয়ামুক্ত করে ছাড়বে। তাই ধর্মান্ধের প্রতিযোগিতা পরিহার করে বিজ্ঞানের, যুক্তির প্রতিযোগিতা করা দরকার। কিন্ত মুসলমানদের সমস্যা হলো তারা নতুনকে স্বাগত জানাতে পারে না, জ্ঞান-বিজ্ঞানের দিকে ধাবিত হতে পারে না। তারা পুরাতনকে আঁকড়ে ধরে থাকে, আনপ্রোডাকটিভ বিষয় নিয়ে মাথা ঘামায়। এ জন্য অতি দুঃখে কাজী নজরুল ইসলাম ‘খালেদ’ কবিতায় বলেছেন-
“বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে আমরা তখনো বসে,
বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজেছি ফেকা হাদিস চষে।” 

যে ইরানে আল রাযি, আল ফারাবি, ওমর খৈয়াম, ইমাম গাজ্জালী, শেখ সাদী, আত্তার, হাফিজ, রুমি, জামির জন্ম, যারা ছিলেন মুক্তচিন্তা ও জ্ঞানবিজ্ঞানের ধারক-বাহক, সেই ইরানে আজ মোল্লাতন্ত্র! কোথায় যাচ্ছি আমরা?

 

দ্রষ্টব্যঃ- প্রকাশিত লেখাটি লেখকের একান্ত নিজস্ব মতামত এবং এর দায়-​দায়িত্বও লেখকের একান্ত নিজস্ব।