• ঢাকা
  • রবিবার, ০১ আগস্ট, ২০২১, ১৬ শ্রাবণ ১৪২৮
প্রকাশিত: জুলাই ১৪, ২০২১, ১২:০২ এএম
সর্বশেষ আপডেট : জুলাই ২৭, ২০২১, ০৯:৪৩ পিএম

আফগানিস্তানে মুক্ততন্ত্র বনাম মোল্লাতন্ত্র

আফগানিস্তানে মুক্ততন্ত্র বনাম মোল্লাতন্ত্র

মধ্যযুগ থেকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আফগানিস্তান একদিকে ছিল ধর্মান্ধ দেশ; অন্যদিকে উনবিংশ শতাব্দী থেকে ১৯১৯ খ্রি পর্যন্ত সে ছিল কার্যত দুই বৃহৎ প্রতিবেশী রাশিয়া ও ব্রিটিশ ভারতের বাফার স্টেট। তবুও ঘোর অন্ধকার অমানিশার মধ্যেও দু’এক সময় আলোকবাতি জ্বলে উঠেছিলো সেখানেও।

বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে আফগানিস্তানে আমানুল্লাহ খান (১৮৯২-১৯৬০) নামের এক আমির সেই রকম এক আলোকবাতি রূপে জ্বলে উঠেছিলেন। ১৯১৯ সালের ২০ ফ্রেব্রয়ারি আফগান আমির হাবিবুল্লাহ খান নিহত হলে তাঁরই তৃতীয় পুত্র আমানুল্লাহ খান আফগানিস্তানের আমির পদে অধিষ্ঠিত হন। আমির পদে অধিষ্ঠিত হয়েই তিনি ব্রিটিশের অধীনতা হতে মুক্তির লক্ষ্যে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন যা তৃতীয় অ্যাংলো-আফগান যুদ্ধ নামে পরিচিত। এক মাস যুদ্ধের পর আফগানরা সেই যুদ্ধে জয়লাভ করেন। যুদ্ধে জয়লাভ করেই আমানুল্লাহ খান সংস্কার কাজে মনোনিবেশ করেন। তিনি উপলদ্ধি করেন যে, শিক্ষা, সামরিক ও আর্থিক এদের মধ্যে কোন জায়গায়টিতে উন্নতি না করতে পারলে ব্রিটিশের ন্যায় সুপার পাওয়ারের বিরুদ্ধে টিকে থাকা অসম্ভব হবে।

তিনি ধর্মীয় শিক্ষার পরিবর্তে ধর্মনিরপেক্ষ পাশ্চাত্য শিক্ষা চালু করেন। ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েদের জন্য স্কুল খোলেন, বয়স্ক শিক্ষা চালু করেন, যাযাবরদের জন্যেও শিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত করেন। তাঁর স্ত্রী রানী সোরাইয়া তারজি ছিলেন তাঁর মতোই বিজ্ঞানমনস্ক, যুক্তিবাদী ও আধুনিক চিন্তা-চেতনার অধিকারী। রানীর পিতা মাহমুদ তারজি ছিলেন আমানুল্লাহ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বাংলার মুসলিম নারী জাগরণে রোকেয়া সাখাওয়াত যেমন অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করেন, তেমনি রানী সোরাইয়া তারজি আফগানিস্তানে নারী জাগরণের অগ্রদূত হিসেবে ভূমিকা রাখেন। ১৯২১ সালে তিনি মেয়েদের জন্য প্রথম প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন। এরপরে তিনি আরও পাঁচটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন এবং সেগুলো দেখভাল করেন। তিনি মেয়েদের উচ্চ শিক্ষার্থে ইউরোপ ও তুরস্কে প্রেরণ করেন। আমানুল্লাহ তাঁর নিজ কন্যা মালিহাকে চিকিৎসক হিসেবে গড়ে তোলেন। আমির ও রানী শত শত বছরের প্রাচীন প্রথা নারীদের পর্দা প্রথায় শিথিলতা আনেন। রানী নিজেও পর্দা প্রথায় বিশ্বাসী ছিলেন না, পর্দা পরিধান করতেন না। পাশ্চাত্য শিক্ষা ও পাশ্চাত্য পোশাক ছিল আমির ও রানীর পছন্দ। তাঁরা ছিলেন নারীকে চার দেয়ালের মধ্যে অবরুদ্ধ করে রাখার ঘোর বিরোধী। তাঁরা নারী পুরুষের ভেদ মানতেন না। পর্দাকে তাঁরা মনে করতেন নারীর বন্দিত্বের প্রতীক। এ জন্য তাঁরা নারীদেরকে পর্দার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করেন। তিনি বাল্যবিবাহ ও বহু বিবাহের নিন্দা করেন। তিনি স্কুল পড়ুয়া বালকদের বিয়ে করাকে সমীচীন মনে করতেন না। তিনিই আফগানিস্তানের প্রথম আমির বা বাদশাহ যিনি এক বিবাহ করেছিলেন এবং এক স্ত্রীতেই সন্তুষ্ট ছিলেন। তিনি বিয়ের ক্ষেত্রে মেয়েদের পছন্দের স্বাধীনতা, উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে সমান অধিকার এবং নারী নির্যাতনরোধে আইন প্রণয়ন করেন। তিনি দাস প্রথা ও শিশুশ্রম নিষিদ্ধ করেন এবং সংস্কার কাজের জন্য ৭৬টি ডিক্রি জারি করেন।

আমির আমানুল্লাহ খান ১৯২৩ সালে আফগানিস্তানে প্রথম সংবিধান দেন। তাতে তিনি নাগরিক অধিকার ও ব্যক্তি স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেন। ১৯২৩ সালে তিনি সেকিউলার ফৌজদারি, দেওয়ানি ও বাণিজ্যিক আইন ও আদালত উপহার দেন। আইনের চোখে সবাই সমান। এ জন্য তিনি উপজাতি গোত্র প্রধান ও অভিজাতদের বিশেষ অধিকার ও  রাজকীয় ভাতা এবং খান-সরদার উপাধি বন্ধ করে দেন। তিনি পীর-ফকির ও তাদের মাজার পূজা পছন্দ করতেন না এবং মাজারকে কেন্দ্র করে তীর্থমেলা বা ওরস বন্ধ করে দেন। এই সিদ্ধান্ত হিতে বিপরীত হয়। সেসময় তাঁর সেনাবাহিনীর বহু সদস্য ছিলেন পীরদের অনুসারী। সেনাবাহিনী এটা ভালোভাবে নেয়নি। তিনি ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসার মোল্লাদের আফগানিস্তানে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। কোনো মোল্লাকে ফতোয়া দিতে হলে তার সরকারি সনদ থাকতে হবে। তাঁর কাছে মোল্লা মানে পুরাতন। এতে নতুনত্ব কিছু নেই। তিনি সকল ধর্মের লোকদের ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদান করেন। তিনি বাধ্যতামূলক সামরিক শিক্ষা চালু করেন। তিনি সামরিক একাডেমিতে শিখ ও হিন্দুদের প্রশিক্ষক নিযুক্ত করেন। তিনি ব্রিটিশের কবলমুক্ত হয়ে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেন। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করেন। তিনি সোভিয়েতের সহযোগিতা নিয়ে বিমান বন্দর ও বিমান প্রশিক্ষক, বিমান বাহিনী গড়ে তোলেন। তিনি বিমান বহরে ১৩টি বিমান যুক্ত করেন। তিনি টেলিগ্রাফ, টেলিফোন ও ডাক সেবা চালু করেন। তিনি ১৯২৮ সালে জাতীয় ব্যাংক (Bank-I-Melli) প্রতিষ্ঠা করেন, মুদ্রা সংস্কার করেন। তিনি সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রদান করেন। সংস্কারের ক্ষেত্রে তিনি তুরস্ককে বেশি অনুসরণ করেন। তিনিই প্রথম জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করেন। তিনি ইউরোপ ও এশিয়ার সাথে বাণিজ্য বৃদ্ধি করেন। তিনি দেশে রাস্তাঘাট, অবকাঠমো গড়ে তোলেন। আমানুল্লাহ খান ১৯২৪ সালে নিজেকে আমিরের স্থলে বাদশাহ হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। কিভাবে আইনসভা গঠন করা যায় এ জন্য তিনি ১৯২৮ সালে ইউরোপ সফরে যান।

এদিকে বাদশাহ আমানুল্লাহ খানের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সরকার ও আফগান মোল্লারা বসে নেই। ব্রিটিশরা দেখলো আমানুল্লাহ তো শক্তিশালী হয়ে উঠছে। আর মোল্লারা দেখে এই বাদশাহের আমলে তাদের মর্যাদা, প্রভাব-প্রতিপত্তি ধূলিসাৎ হয়ে যাচ্ছে, নারীরা ঘর ছেড়ে বাইরে বেরুচ্ছে, পুরুষের মাথায় উঠছে। সুতরাং, তারা বাদশাহ  আমানুল্লাহ খানের বিরুদ্ধে ফতোয়া দেন- বাদশাহ আমানুল্লাহ কাফের, ইসলামের শত্রু। আরও বলা হলো- তিনি শূকরের মাংস খান। মোল্লারা উঠে পড়ে লাগে তাঁর বিরুদ্ধে। অন্যদিকে ব্রিটিশ ছিল আমানুল্লাহর শত্রু। তাঁর কাছে তারা পরাজিত হয়েছে। পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়ার সময় এসেছে। ব্রিটিশ মোল্লাদের অর্থ, অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করতে থাকে। অস্ত্রের দিক দিয়ে সরকারি বাহিনীর চেয়ে মোল্লারা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। 

এমন পরিস্থিতিতে ১৯২৮ সালের ৯ জানুয়ারি মোল্লারা ১৮ দফা দাবি পেশ করে বসে। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম দাবি ছিল- রানী সোরাইয়াকে তালাক দিতে হবে; তাঁর পরিবারের সদস্যদের নির্বাসনে পাঠাতে হবে। তবে রানীর বাবা পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ তারজিকে বিচারের কাঠগোড়ায় দাঁড় করাতে হবে। [মোল্লারা মনে করতেন, রানী সোরাইয়া তারজির প্রভাবে বাদশাহ ইসলাম থেকে সরে গেছেন, আর মাহমুদ তারজি হচ্ছেন বাদশাহর সংস্কার কাজের পরামর্শ দাতা।] অবিলম্বে মেয়েদের স্কুলসমূহ বন্ধ করতে হবে। যে ৫০ জন মেয়েকে চিকিৎসাবিদ্যা শেখাতে তুরস্কে পাঠানো হয়েছে তাদেরকে ফেরত আনতে হবে। পর্দা প্রথা চালু করতে হবে। সংস্কারমূলক সকল নতুন আইন ও আদেশ বাতিল করতে হবে। ব্রিটেন ব্যতীত সকল দেশের সাথে বৈদেশিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। কর কমাতে হবে। শরিয়া আইন চালু করতে হবে এবং মোল্লাদের মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে। (Amin Saikal, Modern Afganistan, পৃষ্ঠা, ৮৭-৮৮)। 

বাদশাহ আমানুল্লাহ খান ঘৃণাভরে তাদের দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। তখন মোল্লারা তাঁর পদত্যাগের দাবিতে গৃহযুদ্ধ বাঁধিয়ে দেয়। তাদের সাথে যোগ দেয় দস্যু সরদার হবিবুল্লাহ কালাকান ওরফে বাচা-ই-সাক্কা। মোল্লারা একজন ডাকাতকে মেনে নিলেন, কিন্তু একজন বাদশাহকে তারা সহ্য করলেন না। কারণ, বাদশাহ একজন সংস্কারক, নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। শরিয়াহ আইন অনুযায়ী একজন ডাকাতের শাস্তি এক হাত, এক পা কর্তন। ডাকাতের বেলায় শরিয়াহ আইন প্রযোজ্য হয় না, প্রযোজ্য হয় সংস্কারকের বেলায়। বাদশাহ আমানুল্লাহ তাঁর বড় ভাই এনায়েতুল্লাহ খানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে পরিবারসহ ব্রিটিশ ভারতে আশ্রয় নেন (১৪ জানুয়ারি, ১৯২৯)। এনায়েতুল্লাহ খান মাত্র তিনদিন ক্ষমতায় ছিলেন। তাঁর কাছ থেকে ডাকাত সরদার বাচা-ই-সাক্কা ক্ষমতা কেড়ে নেন। কিন্তু তাতেও গৃহযুদ্ধ বন্ধ হয়নি। ১৯২৯ সালের ১৩ অক্টোবর নাদির খান সাক্কাকে পরাজিত করে মোহাম্মদ নাদির শাহ নাম ধারণ করে আফগানিস্তানের শাসন ক্ষমতায় আরোহণ করেন। নাদির খান ছিলেন আমানুল্লাহ খানের চাচাতো ভাই এবং সেনাপতি। সংস্কার নিয়ে বাদশাহের সাথে দ্বিমত হলে তাকে সেনাবাহিনী থেকে সরিয়ে ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত করা হয়। গৃহযুদ্ধে তিনি আফগানিস্তানে প্রত্যাবর্তন করেন এবং এক পর্যায়ে রাজা হন। তিনি ১৯৩৩ সালে আততায়ীর হাতে নিহত হলে তাঁর ছেলে জহির শাহ ক্ষমতায় আসেন। ১৯৭৩ সালে দাউদ খান বাদশাহ জহির শাহকে উৎখাত করে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত করে নিজেকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করেন। ১৯৭৮ সালে দাউদ খানের নিকট থেকে কমিউনিস্টরা ক্ষমতা নেন। কমিউস্টদের সহযোগিতা করতে ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে সেনা প্রেরণ করেন।

আফগানিস্তানে কমিউনিস্ট শাসন টিকিয়ে রাখতে সোভিয়েত ইউনিয়ন সেনা প্রেরণ করলে আমেরিকার মাখা খারাপ হয়ে যায়। আমেরিকা তখন কমিউনিস্ট বিরোধী মোল্লাদের উসকে দেয়, অর্থ, অস্ত্র, প্রশিক্ষণ দিয়ে সৃষ্টি করে মাদ্রাসা পড়ুয়া ছাত্রদের দিয়ে তালেবান সংগঠন। তখনকার আমেরিকার সহযোগী শক্তি পাকিস্তান তালেবানের আশ্রয় ও প্রশিক্ষণের কাজে লেগে পড়ে। সৌদি আরব অর্থ দিয়ে সাহায্য করে। আমেরিকার প্রিয়পাত্র সৌদি ধনকুব পুত্র ওসামা বিন লাদেনকে কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে কাজে লাগানো হয়। লাদেন প্রতিষ্ঠা করেন আল কায়েদা নামক এক গেরিলা সংগঠন । তালেবান ও আল কায়েদার গেরিলা আক্রমণে ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের সেনা ফিরিয়ে নেয়। শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। গৃহযুদ্ধ শেষে তালেবান ক্ষমতায় আসে। ১৯৯১ সালে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গেলে আমেরিকার কাছে তালেবান, আল কায়েদা, লাদেন গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। শুরু হয় গুরু শিষ্যের দ্বন্দ্ব। দ্বন্দ্বের এক পর্যায়ে শিষ্য গুরুর গায়ে আঘাত করে বসে। অর্থাৎ ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তারিখে লাদেনের নির্দেশে আল কায়েদা আমেরিকায় বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র টুইন টাওয়ারে আঘাত করে। বিশ্বের সর্বোচ্চ ১১০ তলা দুটি ভবন বোমা মেরে গুড়িয়ে দেয়। তাতে ৩০০০ লোক মারা যায়, ৬০০০ আহত হয়, ১০ বিলিয়ন ডলার আর্থিক ক্ষতি হয়।

গুরু মারা শিষ্যের এই বেয়াদবি গুরু কোনোভাবেই বরদাস্ত করলেন না। আমেরিকা তার মদদপুষ্ট প্রিয় সংগঠন তালেবান ও আল কায়েদাকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে। ২০০১ সালে সে আফগানিস্তান আক্রমণ করে তালেবান উৎখাত করে দেয়।  প্রিয় শিষ্য, পরে কুলাঙ্গার শিষ্য লাদেনকে শেষ করে দেয়। কিন্তু তালেবান ও আল কায়েদার শিকড় উৎপাটন করতে পারেনি। অবশেষে দীর্ঘ ২০ বছর আফগানিস্তানে অবস্থানের পর আমেরিকা ও ন্যাটো বাহিনী ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২১ এর মধ্যে আফগানিস্তান ছেড়ে যাচ্ছে। তবে ধর্মীয় উন্মাদনাই বলুন; আর স্বাধীন চেতনাই বলুন পৃথিবীর পরাশক্তিগুলোও আফগানদের বশীভূত করতে পারেনি। ব্রিটিশও পারেনি, সোভিয়েত ইউনিয়ন পারেনি, আমেরিকাও পারেনি। অন্যদিকে আফগানরা নিজেরাও নিজেদের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটাতে পারেনি। যুদ্ধ ও সন্ত্রাস তাদের পেয়ে বসেছে। তারা সেই যুদ্ধ -হয় অন্যের সাথে করে; না হয় নিজেদের মধ্যে করে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, তালেবান মোল্লারা আবার আফগানিস্তানের ক্ষমতায় আসছে। কেননা মার্কিন বাহিনীর সাহায্য ব্যতীত বর্তমান আফগান সরকারের পক্ষে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। গৃহযুদ্ধ লাগার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

আফগানিস্তানের মোল্লাদের জন্য মোল্লাতন্ত্রই মহৌষধ; মুক্ততন্ত্র, মানবাধিকার, বাক-স্বাধীনতা সেখানে প্রযোজ্য নয়। মুক্ততন্ত্র যদি প্রযোজ্য হতো, তাহলে বাদশাহ আমানুল্লাহ খান সেখানে পূজিত হতো। আমানুল্লাহ খানকে যেদিন উৎখাত করল, সেদিন থেকেই আফগানিস্তানের কপালে আগুন লাগল। সে আগুন আর নিভছে না। মোল্লারা বাদশাহ আমানুল্লাহ খানকে ঘৃণা করলেও আলোকিত মানুষের কাছে তিনি আজও পূজনীয়। পাকিস্তানের জাতীয় কবি আল্লামা ইকবাল তাঁর একটি কাব্যগ্রন্থ (পায়ামে মাশরিক) আমানুল্লাহর প্রতি সম্মান জানিয়ে তাঁর নামে উৎসর্গ করেন। বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমানুল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান জানিয়ে ‘আমানুল্লাহ’ নামে ৬৬ লাইনের এক বিশাল কবিতা লিখেন। তার প্রথম দু’টি চরণ হলো-

‘খোশ আমদেদ আফগান শের! অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠ আজ-
 সালাম জানায় মুসলিম-হিন্দ্ শরমে নোয়ায়ে শির বে- তাজ!’

(নজরুল রচনাবলী, ৩য় খণ্ড, কাব্য জিঞ্জীর, কবিতা আমানুল্লাহ, ঢাকা, বাংলা একাডেমি, পৃ. ১৫২-১৫৪)।

 

লেখকঃ সহযোগী অধ্যাপক  ইতিহাস বিভাগ, সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ, ফরিদপুর।।

 

দ্রষ্টব্যঃ- প্রকাশিত লেখাটি লেখকের একান্ত নিজস্ব মতামত এবং এর দায়-​দায়িত্বও লেখকের একান্ত নিজস্ব।