• ঢাকা
  • বুধবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২১, ১২ কার্তিক ১৪২৮
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৭, ২০২১, ০১:১৫ এএম
সর্বশেষ আপডেট : সেপ্টেম্বর ৭, ২০২১, ১১:১৫ এএম

প্রথম পর্ব

নারীর সম-অধিকারে ধার্মিকদের এত আপত্তি কেন?

নারীর সম-অধিকারে ধার্মিকদের এত আপত্তি কেন?
ছবি- জাগরণ গ্রাফিক্স ডেস্ক।

পিতামাতার সম্পত্তিতে নারী-পুরুষের সমান অধিকার দেয়ার কথা বললে ধার্মিকরা ক্ষেপে যান। হোক সে হিন্দু ধার্মিক বা মুসলিম ধার্মিক। নারী অধিকারের বিরুদ্ধে সব ধার্মিক এক। আমার বোধে আসে না নারী সম্পত্তিতে সম-অধিকার পেলে ধার্মিকদের সমস্যা কোথায় বা তাদের ক্ষতি কী? তারা স্রষ্টার নামে ধর্মকর্ম করেন। স্রষ্টাকে মহান, ন্যায় বিচারক ও ন্যায়ের প্রতীক হিসেবে অভিহিত করেন। তাঁর কাছে আপন-পর, জাত-পাত-বর্ণ, নারী-পুরুষ বলতে কিছু নেই। সবই সমান। তাই যদি হয়, তাহলে নারী-পুরুষে, জাত-পাতে, ধর্ম-বর্ণে বৈষম্য কার সৃষ্টি? একই পিতার বীজে, একই মাতার উদরে, একই স্রষ্টার সৃষ্টি হয়ে একজনে অধিকার পাবে, আর এক জন পাবে না- এটা কেমন কথা? এটা কি ন্যায় বিচারের কথা? ধার্মিকেরা হয়তো বলবেন, “স্রষ্টা তো নারীদের অধিকার দেয়নি, আমরা কিভাবে দেব?” স্রষ্টা একজনকে দেবেন, আর এক জনকে দেবেন না, তাহলে তাঁকে কি ন্যায় বিচারক বলা যায়? তাহলে স্রষ্টা কি খেয়ালী যে যা খুশি তাই করবেন! যে স্রষ্টা মানুষে-মানুষে বৈষম্য সৃষ্টি করবেন, মানুষকে কষ্ট দেবেন, তাহলে সে স্রষ্টার কি কোনও দরকার আছে? এ জন্যই কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় বলেছেন,

''আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দেই পদ-চিহ্ন;

আমি স্রষ্টা-সূদন শোক-তাপ-হানা খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন।''

যারা সৃষ্টিকর্তার নামে মানুষে-মানুষে, নারী-পুরুষে বৈষম্য জিইয়ে রাখেন, তারা কি সৃষ্টিকর্তার মহিমা প্রচারের নামে তাঁকে অপমান করেন না? নারীকে সম্পত্তিতে সম-অধিকার দেয়া যাবে না- এ কথা কি স্রষ্টা কোথাও বলেছেন? ধার্মিকেরা বলেন, স্রষ্টা এক ও অদ্বিতীয়। স্রষ্টা যদি এক ও অদ্বিতীয় হয়ে থাকেন, তাহলে তিনি কিভাবে একজনকে বলেন- নারী পৈত্রিক সম্পত্তিতে কোনও অধিকার পাবে না; আরেকজনকে বলেন- নারী পৈত্রিক সম্পত্তির পুত্রের অর্ধেক পাবে; কাউকে বলেন- নারী-পুরুষ সমান পাবে; আবার কাউকে এ বিষয়ে কিছুই বলেননি! 

ধর্মগ্রন্থগুলো অধ্যয়ন করলে দেখা যায়, এগুলোতে রয়েছে পুরুষের প্রাধান্য। নারীকে পুরুষের অধীনস্থ, দাসী করে রাখার জন্য যা দরকার তার সবই রয়েছে ধর্মগ্রন্থে। এ জন্যই হয়তো রোকেয়া সাখাওয়াত (১৮৮০-১৯৩২) বলেন, “ধর্মগ্রন্থগুলি পুরুষ রচিত বিধি ব্যবস্থা ভিন্ন আর কিছুই নহে। আমাদিগকে অন্ধকারে রাখিবার জন্য পুরুষগণ ওই ধর্মগ্রন্থগুলিকে ঈশ্বরের আদেশপত্র বলিয়া প্রকাশ করিয়াছেন।” (নবনূর, ভাদ্র সংখ্যা, ১৩১১ এবং আহমদ শরীফ রচনাবলী, ৭ম খণ্ড, পৃ, ৯৯)। তিনি আরো বলেন, “আমাদের যথাসম্ভব অধঃপতন হওয়ার পর দাসত্বের বিরুদ্ধে কখনও মাথা তুলিতে পারি নাই; যখনই কোন ভগ্নী মস্তক উত্তোলনের চেষ্টা করিয়াছেন, অমনি ধর্মের দোহাই বা শাস্ত্রের বচনরূপ অস্ত্রাঘাতে তাঁহার মস্তক চূর্ণ হইয়াছে।” (হুমায়ুন আজাদ, নারী-  পৃ. ২৮৬)।

নারীর অধিকারের বিরুদ্ধে সব মৌলবাদীরা এক হলেও এ ক্ষেত্রে হিন্দু মৌলবাদীরা এগিয়ে রয়েছেন। এরা কখনও মানুষে-মানুষে বৈষম্য নিরসনের কথা বলেন না, মানবাধিকারের কথা বলেন না, নারী-পুরুষের সম-অধিকারের কথা বলেন না, মানবতার কথা বলেন না। যারা এ সব কথা বলেন তাদেরকে তারা নাস্তিক, অধার্মিক, অবিশ্বাসী (কাফের) হিসেবে অভিহিত করে ফতোয়া দেন। তারা বলবেন সাম্প্রদায়িক কথা, নর-নারীর বিভাজনের কথা।

মনুসংহিতা মতে, শুদ্র ও নারী সম্পত্তির মালিক হতে পারবে না।

ভারতে কত অমানবিক প্রথা বিরাজমান ছিল বলে শেষ করা যাবে না। ব্রিটিশ সরকার বহু অমানবিক প্রথা আইন করে নিষিদ্ধ করেছে। আর ধার্মিকেরা তা বহাল রাখার জন্য দাবি করেছে, আবেদন করেছে, আন্দোলন করেছে। ব্রিটিম সরকার তাদের কাছে মাথা নত করেনি। করলে আজও তা বহাল থাকত আর ধার্মিকেরা সেসবের পক্ষে কুযুক্তি দিয়ে সাফাই গাইত। সেসকল কিছু উল্লেখযোগ্য অমানবিক প্রথার উল্লেখ করছি-

১. ১৭৯৫ সালের অধিনিয়ম ১১ দ্বারা ব্রিটিশরা শুদ্রদের সম্পত্তির মালিক হওয়ার অধিকার দিয়েছিল। মনুসংহিতার বিধান মতে, শুদ্রদের সম্পত্তিতে মালিক হওয়ার অধিকার ছিল না। কোনও শুদ্র যদি ব্রাহ্মণের স্ত্রীও হতো, ওই স্ত্রীর গর্ভে ব্রাহ্মণের পুত্রও ব্রাহ্মণ বা ক্ষত্রিয় স্ত্রীর পুত্রের সমান অংশীদার হতো না। মনুসংহিতা মতে, এক ব্রাহ্মণের ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শুদ্র স্ত্রী থাকলে, সম্পত্তির ১০ ভাগের ৪ ভাগ পাবে ব্রাহ্মণ স্ত্রীর পুত্র, ৩ ভাগ পাবে ক্ষত্রিয় স্ত্রীর পুত্র, ২ ভাগ পাবে বৈশ্য স্ত্রীর পুত্র এবং ১ ভাগ পাবে শুদ্র স্ত্রীর পুত্র। (মনুসংহিতা ৯/১৫০-১৫১)। পিতা এক অথচ মাতা ভিন্ন হওয়ার কারণে এই বিভাজন। মনুসংহিতা মতে, শুদ্র ও নারী সম্পত্তির মালিক হতে পারবে না। এ সব বাতিল করে ১৯৭৫ সালে ব্রিটিশরা আইন করে সম্পত্তিতে শুদ্রদের মালিকানা দেন।

২. ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে কন্যা সন্তান জন্ম নিলে তাকে হত্যা করার প্রথা ছিল। কন্যা সন্তান হলে মায়ের স্তনে আফিম, ধুতরা লাগিয়ে দেয়া হতো। ওই আফিম, ধুতরা মিশ্রিত দুধ পান করে শিশু নিস্তেজ হয়ে পড়ত। তখন গর্ত করে দুধ ঢেলে শিশুকে পুঁতে ফেলা হতো। ব্রিটিশরা ১৮০৪ সালে অধিনিয়ম ৩ দ্বারা কন্যা সন্তান হত্যা রহিত করে। মনুসংহিতার বিধান অনুয়ায়ী শুদ্রের শিক্ষলাভের অধিকার নেই। এমনকি তারা বেদ পাঠ তো দূরের কথা, বেদ শুনলেও লোহার শিক গরম করে এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে আরেক কান দিয়ে বের করে তাকে হত্যা করত। ১৮১৩ সালে ব্রিটিশরা আইন করে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে শিক্ষার সমান অধিকার দেন।

ভারতের হিন্দু সমাজে প্রথা ছিল যে, শুদ্রদের বিবাহ হলে নববধুকে স্বামীর ঘরে যাওয়ার পূর্বে কমপক্ষে তিনরাত ব্রাহ্মণকে শারীরিক সেবা প্রদান করে শুদ্ধি হতে হবে।

৩. ১৮১৩ সালে ব্রিটিশরা আরেকটি মহান কাজ করে। তারা আইন করে ভারতে দাস প্রথা নিষিদ্ধ করে। এক মানুষ কেন আর এক মানুষের দাস হবে? এই ঘৃন্য দাস প্রথা নিষিদ্ধের দাবি করার কথা ধার্মিকদের। কিন্তু কোনও ধর্ম এবং কোনও ধার্মিকেরা দাস প্রথার বিরুদ্ধে কথা বলেননি।

৪. আগে ব্রাহ্মণ মহা অপরাধ করলেও তার শাস্তি হতো না। কিন্তু শুদ্রের সামান্য অপরাধেও হতো মহাদণ্ড। ১৮১৭ সালে ব্রিটিশরা আইন করল যে, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য একই অপরাধে একই শাস্তি। ব্রাহ্মণ বলে রেহাই নেই।

৫. ভারতের হিন্দু সমাজে প্রথা ছিল যে, শুদ্রদের বিবাহ হলে নববধুকে স্বামীর ঘরে যাওয়ার পূর্বে কমপক্ষে তিনরাত ব্রাহ্মণকে শারীরিক সেবা প্রদান করে শুদ্ধি হতে হবে। ব্রিটিশরা ১৮১৯ সালে অধিনিয়ম ৭ প্রণয়ন করে ব্রাহ্মণ কর্তৃক শুদ্র রমনীদের শুদ্ধিকরণ প্রথা নিষিদ্ধ করেন।

৬. হিন্দু সমাজে হাজার হাজার বছর ধরে সতীদাহ প্রথা চলে আসছিল- তা বন্ধ করার জন্য ধার্মিকেরা দাবি করেনি। বরং তারা সে প্রথা নিরোধের বিরোধিতা করেছিল। ১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর লর্ড উইলিয়াম বেঙ্কটিক সতীদাহ প্রথা নিরোধ আইন করেন। এ আইন পাসের পরেও গোঁড়া হিন্দুরা বসে থাকেনি। তারা কলকাতার বিশিষ্ট পণ্ডিতসহ ৮০০জন ব্যক্তির স্বাক্ষরসহ গভর্নর জেনারেলের কাছে আবেদন করেন সে আইন বাতিল করার জন্য। সেই দলের নেতা ছিলেন রাজা রাধাকান্তদেব, হরিমোহন ঠাকুর, গোকুলনাথ মল্লিক প্রমুখ। অন্যদিকে এ আইন বহাল রাখার জন্য রামমোহন রায় ব্রাহ্মসমাজের ৩০০ জন ও ৮০০ জন খ্রিস্টানের স্বাক্ষরযুক্ত অভিনন্দন পত্র দেন গভর্নর জেনারেলকে। গভর্নর জেনারেল গোঁড়াদের আবেদন প্রত্যাখ্যান করলে তারা ১১০০ জনের স্বাক্ষর নিয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে আবেদন করে সতীদাহ নিরোধ আইন বাতিলের জন্য। কিন্তু পার্লামেন্ট তা খারিজ করে দেন। 

৭. আগে হিন্দু মন্দিরে দেবদাসী প্রথা ছিল। ব্রাহ্মণদের প্ররোচনায়, চাপে এবং স্বর্গ প্রাপ্তির লোভে শুদ্ররা তাদের কন্যাদের মন্দিরের দেবতাদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করতেন। এই কন্যারা দেবদাসী নামে অভিহিত। তারা ব্রাহ্মণদের সেবা করত, যৌন সুখ দিত। তাদের গর্ভে সন্তান হলে তারা হরিজন বলে পরিচিতি পেত। অনেক সন্তানকে মেরে ফেলা হতো। দেবদাসীর সংখ্যা একেবারে কম ছিল না। ১৯২১ সালের আদম শুমারি অনুযায়ী মাদ্রাজের লোকসংখ্যা ছিল ৪ কোটি ২১ লাখ। তন্মধ্যে দেবদাসীর সংখা ছিল ২ লাখ। ১৮২৯ সালে উইলিয়াম বেন্টিক আইন করে দেবদাসী প্রথা রহিত করেন।

ব্রাহ্মণরা নিয়ম করেছিল যে, শুদ্রের প্রথম পুত্র সন্তানকে দেবতাদের খুশি করতে গঙ্গা জলে বিসর্জন দিতে হবে।

৮. হিন্দু মন্দিরে নরবলি প্রথা বিদ্যমান ছিল। দেবতাদের রোষ থেকে নিবৃত্তি পেতে মন্দিরে মন্দিরে নরবলি দেয়া হতো। তখন ভবন বা সেতু তৈরি করতে নরবলি প্রথাও বিদ্যমান ছিল। আর এ নরবলির শিকার হতো শুদ্র নর-নারীরা। ১৮৩০ সালে ব্রিটিশরা আইন করে নরবলি প্রথা নিষিদ্ধ করেন।

৯. ব্রাহ্মণরা নিয়ম করেছিল যে, শুদ্রের প্রথম পুত্র সন্তানকে দেবতাদের খুশি করতে গঙ্গা জলে বিসর্জন দিতে হবে। সাধারণত প্রথম সন্তান হৃষ্ট-পুষ্ট হয়। শুদ্রের সন্তানরা শক্তিশালী হলে ব্রাহ্মণ সন্তানদের প্রতিহত করতে পারে এ আশংকা থেকে তারা এ নিয়ম করে দেয়। ১৮৩৫ সালে ব্রিটিশরা আইন করে গঙ্গাজলে সন্তান বিসর্জন প্রথা নিষিদ্ধ করেন।

১০. এর পরে এলো বিধবা বিাহের পালা। কেননা সতীদাহ নিরোধ হওয়ার ফলে নারীরা বিধবা হতে থাকে। ধার্মিকরা ফতোয়া দিল, বিধবাদের বিয়ে দেয়া বা বিয়ে করা যাবে না। ব্রিটিশরা ভাবল- এটা তো আর এক সমস্যা। বিধবা বিবাহের দাবি তুলল মানবতার দেবতা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। বিদ্যাসাগর ৯৮৭ জনের স্বাক্ষর নিয়ে বিবধা বিবাহ আইন পাসের জন্য একটি আবেদন করেন। এর বিপক্ষে রাজা রাধাকান্ত দেব ৩৬৭৬৩ জনের স্বাক্ষর নিয়ে বিধবা বিবাহ আইন না করার জন্য আবেদন করেন। ব্রিটিশ সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠের অমানবিক দাবি অগ্রাহ্য করে ১৮৫৬ সালে পাস করেন বিধবা বিবাহ আইন। (চলবে)

 

লেখক ●সহযোগী অধ্যাপকইতিহাস বিভাগসরকারি রাজেন্দ্র কলেজফরিদপুর।।

 

দ্রষ্টব্যঃপ্রকাশিত লেখাটি লেখকের একান্ত নিজস্ব মতামত এবং এর দায়-দায়িত্বও লেখকের একান্ত নিজস্ব  

জাগরণ/এসকেএইচ 

আরও পড়ুন