• ঢাকা
  • বুধবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২১, ১২ কার্তিক ১৪২৮
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১২, ২০২১, ১২:১৬ এএম
সর্বশেষ আপডেট : সেপ্টেম্বর ১১, ২০২১, ০৬:১৬ পিএম

আফগানিস্তানে পাকিস্তানপন্থী সরকারঃ শেষ পর্যন্ত কী হবে?

আফগানিস্তানে পাকিস্তানপন্থী সরকারঃ শেষ পর্যন্ত কী হবে?
ছবি- জাগরণ গ্রাফিক্স ডেস্ক।

অনেক জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে তিন সপ্তাহ পর আফগানিস্তানে তালেবানি সরকার গঠিত হয় ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১ তারিখে। এই সরকারের ধরন দেখে মনে হচ্ছে এটা ইরানের খোমেনি স্টাইলের সরকার। ইরানের খোমেনির ন্যায় হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা হচ্ছেন ধর্মীয় নেতা। তার হাতে থাকবে রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সামরিক বিষয়ের সর্বময় কর্তৃত্ব। সরকার পরিচালনা করবে মন্ত্রিসভা। মোল্লা মোহাম্মদ হাসান আখুন্দের নেতৃত্বে যে তালেবান সরকার ঘটিত হলো- তা মূলত পাকিস্তানের ছায়া সরকার বা পাকিস্তানপন্থি সরকারও বলা যায়। বর্তমানে তালেবানের পৃষ্ঠপোষক, নিয়ন্ত্রক ও অভিভাবক পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই।  সরকার গঠনে তালেবানদের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দেয় এবং সময় ক্ষেপণ হতে থাকে। তখন পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই প্রধান জেনারেল ফায়েজ হামিদ কাবুল সফর করে সরকার গঠনের নির্দেশনা বাতলে দেন। কে, কোন পদে অধিষ্ঠিত হবে তা-ও বলে দেন। তালেবানের মধ্যে যারা পাকিস্তানের প্রতি বেশি অনুগত তারাই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছে। আন্তর্জাতিক মহল ধারণা করেছিলেন মোল্লা আবদুল গনি বারাদারই হবেন তালেবান সরকার প্রধান। তিনিই দোহায় তালেবানের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দরকষাকষি করেছেন। তাকে বাদ দিয়ে হাসান আখুন্দকে সরকার প্রধান করা হলো। অবাক বিষয় হচ্ছে তালেবান সরকারে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে হাক্কানি নেটওয়ার্ক। তাদের ১০ জন মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন। হাক্কানি নেটওয়ার্ক প্রধান সিরাজউদ্দিন হাক্কানিকে দেয়া হয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তিনি ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ ক্রিমিনাল। ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্র তাকে  ধরিয়ে দেয়ার জন্য ৫ মিলিয়ন ডলার পুরষ্কার ঘোষণা করে। পাকিস্তানের আইএসআই তাকে আশ্রয় দিয়ে রাখে। যুক্তরাষ্ট্র তাকে পাবে কোথায়? সিরাজউদ্দিনের চাচা খলিলুর রহমান হাক্কানি পেয়েছে উদ্বাস্তু মন্ত্রির দায়িত্ব। তিনিও জাতিসংঘের কালো তালিকাভুক্ত। সম্প্রচার মন্ত্রী হয়েছে নাজবুল্লাহ হাক্কানি, উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী শেখ আবিদুল বাকি হাক্কানি, তিনিও রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞায়।

ছবি- পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই প্রধান জেনারেল ফায়েজ হামিদ- এর সাম্প্রতিক কাবুল সফর।  

হাক্কানি নেটওয়ার্ক হলো তালেবানের সবচেয়ে ভয়ংকর বাহিনী। তারা হামলা-আক্রমণে খুবই দক্ষ। বেসামরিক লোক, সরকারি কর্মকর্তা, বিদেশী সৈন্যদের হত্যা, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় ইত্যাদি ছিল তাদের নিত্যকর্ম। তারা প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইকে হত্যা চেষ্টাও করেছিল। তাদের ঘাঁটিগুলো হচ্ছে পাকিস্তানের ওয়াজিরিস্তান ও আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চল। ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্র হাক্কানি নেটওয়ার্ককে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে কালো তালিকাভুক্ত করে। যদিও এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা জালালউদ্দিন ছিলেন মার্কিন সিআই-এর মহান বন্ধু! তাকে অর্থ, অস্ত্র দিয়ে সহযোগিতা করেছিল আমেরিকা। আমেরিকা তাকে ব্যবহার করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে। পরে আমেরিকার বিরুদ্ধেও লড়েছেন তিনি। তার মৃত্যুর পর তার পুত্র সিরাজউদ্দিন হাক্কানি নেটওয়ার্কের প্রধান। আল-কায়েদা, আইএস সহ অনেক গোষ্ঠীর সঙ্গে হাক্কানি নেটওয়ার্কের রয়েছে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। এই হাক্কানি নেটওয়ার্ক তালেবান সরকারের বড় অংশীদার হওয়ায় আন্তর্জাতিক মহলকে তা ভাবিয়ে তুলছে, বিশেষ করে ভারতকে।

হাক্কানি নেটওয়ার্কের প্রধান সিরাজউদ্দিন হাক্কানি। ছবি: এফবিআই

২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবানি শাসন ফিরিয়ে আনতে পাকিস্তানের ভূমিকা অনস্বীকার্য। পাকিস্তান ২০ বছর ধরে তালেবানদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে। যেই ২০ বছর মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনী আফগানিস্তানে ছিল, সেই ২০ বছর তালেবান জিহাদিরা কোথায় ছিল? কে তাদের আশ্রয় দিয়েছিল? বলা বাহুল্য, এই ২০ বছর তারা পাকিস্তানেই ছিল, পাকিস্তানের আশ্রয়েই ছিল। পাকিস্তান ব্যতীত আফগানিস্তানের কোনও প্রতিবেশি রাষ্ট্রের সাথে তালেবানের সুসম্পর্ক নেই। পাকিস্তানই তালেবানের একমাত্র ভরসা। তালেবানের দ্রুত কাবুল দখলের কারণও পাকিস্তান। বর্তমান তালেবান বাহিনীতে রয়েছে অঘোষিতভাবেই পাকিস্তানি সৈন্য। তালেবানরা তো পাঞ্জশির দখল করতে পারছিল না। পাকিস্তান পাঞ্জশিরে ড্রোন বিমান ব্যবহার করে তালেবানের সাথে পাকিস্তানি সৈন্য ঢুকিয়ে পাঞ্জশিরের মাসুদ বাহিনীকে পরাজিত করে। পাকিস্তানি সৈন্য প্রবেশ করায় আফগানিস্তানের অনেক জায়গায় বিক্ষোভও হয়েছে।

তালেবানের সাথে কে ব্যবসা বাণিজ্য করবে? কে বিনিয়োগ করবে? ইতোমধ্যেই আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক আগানিস্তানে তাদের ঋণদান ও আর্থিক সহায়তা কার্যক্রম স্থগিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানের রিজার্ভ তহবিল আটক করেছে।

আফগানিস্তানে অঘোষিতভাবে পাকিস্তানি সৈন্য প্রবেশ করেছে। রাশিয়া আর চীন তালেবানকে সমর্থন দিয়েছে মার্কিন বিরোধিতার কারণে। গেল শতকের আশির দশকে আফগানিস্তানে যখন রুশ বাহিনী ছিল তখন তার বিরুদ্ধে ছিল আমেরিকা। আমেরিকা ও তার মিত্ররা কমিউনিজম প্রতিহত করার নামে ও আফগানিস্তান থেকে রুশ বাহিনীকে বিতাড়নের নামে তালেবানের পূর্বসূরিরা মুজাহিদীন বাহিনী গড়ে তোলে। একদিকে মার্কিন ও তার মিত্রদের চাপ; অন্যদিকে মার্কিনসৃষ্ট মুজাহিদীনের গেরিলা আক্রমণে রুশ বাহিনী আফগানিস্তান ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। আজ মার্কিনিদের বিরুদ্ধে তালেবানদের সহযোগিতা করে রাশিয়া পূর্বের প্রতিশোধ নিল। এদিকে চীনের মূল স্বার্থ অর্থনৈতিক, ভূ-রাজনৈতিক, সাথে মার্কিন বিরোধিতা ও ভারত বিরোধিতাও রয়েছে। আফগানিস্তানের খনিজ সম্পদের ওপর চীনের দীর্ঘদিনের নজর রয়েছে। এই জন্য চীন দেন-দরবারও করে আসছিল। চীনের সে ইচ্ছা এবার পূরণ হওয়ার পথে। চীন ও পাকিস্তানের কমন শত্রু ভারত। আফগান সরকারের সাথে ভারতের সুসম্পর্ক ছিল এবং ভারত সেখানে বিশাল অর্থও বিনিয়োগ করেছে। তালেবানকে সমর্থন দিয়ে যদি ভারতকে বিদায় করা যায়- তাতে চীন ও পাকিস্তান উভয়ের লাভ। পাকিস্তান চীনের পুরাতন বশংবদ আর ইরানকে হালে চীন তার প্রভাব বলয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। এখন যদি আফগানিস্তানকে চীনের বলয়ে ঢুকানো যায় তাতে দোষ কী? চীন এখানে সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছে। তারা এখন তাদের সিল্ক রোডের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবে।

এখন প্রশ্ন হলো তালেবান সরকার দেশ পরিচালনা করবে কিভাবে? আখুন্দ সরকার টেকসই হবে কি না? তালেবানের মধ্যে অন্তর্কলহ দেখা দেবে কি না? ইত্যাদি। নিকোলো মেকিয়াভেলি তাঁর প্রিন্স গ্রন্থে বলেছেন, ‘’ক্ষমতা দখল করা যত সহজ, যশ অর্জন ততই কঠিন।‘’ আমি মনে করি, আফগানিস্তানে তালেবানের ক্ষেত্রে এই কথা আরও প্রযোজ্য। ধর্মের নামে রাজনীতি করা সহজ, কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটানো সহজ নয়। তালেবানের কাছে ধর্ম আর রাজনীতি এক। তাদের রাজনীতি ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠা করা, শরিয়া আইন বাস্তবায়ন করা। তাদের অর্থনৈতিক কোনও কর্মসূচি নেই। দেশ চালাতে, দেশের উন্নয়ন ঘটাতে, পেটে আহার দিতে অর্থ দরকার। অর্থ কিভাবে আসবে সে পরিকল্পনা নেই। বিশ্বায়নের যুগে কোনও রাষ্ট্র এককভাবে চলতে পারে না। তাকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য, নানা ধরনের লেনদেন করতে হয়। বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। তালেবানের সাথে কে ব্যবসা বাণিজ্য করবে? কে বিনিয়োগ করবে? ইতোমধ্যেই আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক আগানিস্তানে তাদের ঋণদান ও আর্থিক সহায়তা কার্যক্রম স্থগিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানের রিজার্ভ তহবিল আটক করেছে। পাকিস্তান তালেবানের পৃষ্ঠপোষক হলেও পাকিস্তান তাকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করতে পারবে না। কারণ, পাকিস্তানের নিজেরই অর্থ নেই। পাকিস্তান অস্ত্র ও সৈন্য দিয়ে সাহায্য করতে পারবে এবং তা করেছেও। একমাত্র ভরসা চীন। তবে চীন নিজের স্বার্থকে এত বড় করে দেখে যে, তাতে রস আর থাকে না। শুধু ছোবরাই পড়ে থাকে।

তার ৮০%-৯০% লোক দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করে। এই রকম একটি দরিদ্র দেশকে তালেবান তার মধ্যযুগীয় পশ্চাৎপদ নীতি দ্বারা কিভাবে উন্নয়ন ঘটাবে- তা বোধগম্য নয়।

আধুনিক যুগে দেশকে এগিয়ে নিতে হলে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সহযোগিতা নিতে হবে। হোক তা কৃষিক্ষেত্র বা শিল্পক্ষেত্র। এই জন্য দক্ষ মানব সম্পদ লাগবে। দক্ষ মানব সম্পদ গড়তে হলে দেশের মানুষকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। কিন্তু তালেবান আধুনিক শিক্ষায় বিশ্বাসী নয়। তারা ধর্মীয় তথা হাদিস-কুরআন শিক্ষায় বিশ্বাসী। তাদের কাছে আধুনিক শিক্ষা মানে নাস্তিকতার শিক্ষা। মৌলভী শেখ নুরুদ্দিন মুনির তালেবান সরকারের শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েই ঘোষণা করেন, আফগানিস্তানে পিএইচডি ও মাস্টার্স ডিগ্রির কোনও মূল্য নেই। এই কথার অর্থ আফগানিস্তানে আধুনিক শিক্ষা চলবে না। দেশের উন্নয়নের জন্য গবেষণা দরকার, প্রাকৃতিক সম্পদ, খনিজ সম্পদ উত্তোলন ও ব্যবহারের জন্য বিজ্ঞান-প্রযুক্তির জ্ঞান দরকার। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করতেও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি দরকার। সুতরাং, আধুনিক শিক্ষা ব্যতীত দেশের উন্নয়ন অসম্ভব।

দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা নারী। দেশের উন্নয়ন অগ্রগতির জন্য নারী-পুরুষের সম্মিলিত কর্ম ও প্রচেষ্টা দরকার। তালেবান প্রথম ঘোষণাতেই নারীকে ঘরে থাকার নির্দেশ দিয়েছে। শরিয়া নীতিতে নারীর ঘরের বাইরে যাওয়ার অনুমোদন নেই। একান্তই কোনও জরুরি প্রয়োজন হলে কোনও পুরুষ অভিভাবককে সঙ্গে নিয়ে নারী বাইরে বেরুতে পারবে। তালেবাননীতিতে নারীর কাজ স্বামীসেবা, সন্তান উৎপাদন, লালন-পালন ও গৃহস্থালি কর্ম করা। আফগানিস্তান একটি দরিদ্রতম দেশ। তার ৮০%-৯০% লোক দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করে। এই রকম একটি দরিদ্র দেশকে তালেবান তার মধ্যযুগীয় পশ্চাৎপদ নীতি দ্বারা কিভাবে উন্নয়ন ঘটাবে- তা বোধগম্য নয়।

অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী না হলে কোনও দিক দিয়েই শক্তিশালী হওয়া যায় না; নিজের ভিত শক্ত হয় না; নিজের পায়ে দাঁড়ানো যায় না। নিজের পায়ে দাঁড়াতে না পারলে অপরের সাহায্য নিয়ে দাঁড়াতে হয়। অপরের সাহায্য নিয়ে দাঁড়াতে গেলে অপরের কথা শুনতে হয়। অপরের কথামতো উঠতে বসতে গেলে নিজের স্বাধীনতা, অস্তিত্ব বলে কিছু থাকে না। তাই তালেবানকে অর্থের জন্য চীনের কাছে আর শক্তির জন্য পাকিস্তানের কাছে হাত পাততে হবে এবং তাদের কথা শুনতে হবে। পাকিস্তান তালেবান নিয়ে খেলবে, তাকে ব্যবহার করবে, সন্ত্রাসবাদকে ছড়িয়ে দেবে বিশেষ করে ভারতের দিকে। তালেবান না চাইলেও পাকিস্তানের চাপে তারা উগ্র-বিশ্বাসীদের আফগানিস্তানে আশ্রয় দিতে বাধ্য হবে। পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে বিশেষ করে কাশ্মীরে এই উগ্র-বিশ্বাসীদের ব্যবহার করবে। আর ভারতের বিরুদ্ধে হলে চীনের তাতে সায় থাকবে। ইতোমধ্যে (০৭/০৯/২০২১ তাং) পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বলেই ফেলেছেন, কাশ্মীরিদের আত্মরক্ষার সুযোগ দিতে হবে।

আফগানিস্তানের আরেকটি সমস্যা জাতিগত সমস্যা। সেখানে রয়েছে নানা ধরনের জাতি, উপজাতি, গোত্র যেমন- পশতু, তাজিক, উজবেক, তুর্কি, আইমাক, বেলুচ, হাজারা প্রভৃতি। তাদের কেউ আফগানিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ নন। পশতুরা সংখ্যায় একটু বেশি হলেও সমগ্র দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়। ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব নিয়ে যে গোত্র বিভেদ শুরু হবে না- তা বলা যায় না। তালেবান একটি উগ্রপন্থি দল। উগ্রপন্থিদের সাথে উগ্রপন্থিদের যোগাযোগ ও সুসম্পর্ক থাকবে এটাই স্বাভাবিক। সেটাই হচ্ছে আশঙ্কার বিষয়। পাকিস্তান ও আফগানিস্তান উগ্রবাদিদের অভয়ারণ্য হয় কি না? তা যদি হয়, তাহলে তার অগ্নিবায়ু দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়বে। আবার তালেবান যদি পুরাতন উগ্রবাদি বন্ধুদের জায়গা না দেয়, তাহলে তারাও যে আফগানিস্তানের ওপর চড়াও হবে না, সে কথাও নিশ্চিত করে বলা যায় না।

২০০১ সালে খোদ গুরুর গায়ে ছোবল মারে। আজ পাকিস্তান তালেবান নিয়ে খেলছে। এক সময় দেখা যাবে, এই তালেবানই পাকিস্তানকে ছোবল মারবে। সময়মতো সতর্ক না হলে কেউ তাদের ছোবল থেকে রক্ষা পাবে না। মানব সভ্যতার জন্য এ এক অশনি সংকেত!  

আফগানিস্তানে তালেবানের পুনরুত্থানে ভারত উপমহাদেশ, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার উগ্র-মতাদর্শীরা উৎসাহিত হবে। তারা তাদের উগ্র মতবাদ ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরে বাংলাদেশে কী হবে তা নিয়ে অনেকেই শঙ্কিত। কারণ, তালেবান বরাবরই বাংলাদেশের উগ্রবাদিদের কাছে আদর্শ ও অনুপ্রেরণার উৎস। আশি নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের বহু যুবক আফগানিস্তানে গিয়েছিল মুজাহিদীন ও তালেবান বাহিনীতে যোগ দিতে। তারা বাংলাদেশে ফিরে তাদের মতাদর্শ প্রচার করে। নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশেও স্লোগান হতো, “আমরা সবাই তালেবান, বাংলা হবে আফগান।” এই স্লোগান দেশের বিভিন্ন দেয়ালে শোভা পেতো! রাজধানী ও জেলা শহরে তো যত্রতত্রই দেখা যেত। সে সময় ফরিদপুর জেলার সদরপুর উপজেলার গোডাউনের দেয়ালেও এই স্লোগান লেখা চোখে পড়েছিল। ২০০১ সালে আমেরিকা তালেবান উৎখাত করার পর বাংলায় তালেবানের সেই জোয়ারে ভাটা পড়ে।

পাকিস্তান হলো জঙ্গিবাদের প্রজনন কেন্দ্র। জঙ্গি উৎপাদন এবং তা ছড়িয়ে দেয়াই তার প্রধান ব্যবসা।  আবার সেই জঙ্গিদের দ্বারা পাকিস্তান নিজেও কম আক্রান্ত হয় না। তারপরেও জঙ্গি নিয়েই তার কারবার। তালেবান যদি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে তখন অনিবার্যভাবেই পাকিস্তানের সাথে তালেবানের দূরত্ব সৃষ্টি হবে। আমেরিকাও ছিল মুজাহিদীন, তালেবান, লাদেন, আলকায়দার গুরু, পৃষ্ঠপোষক। এই মহান শিষ্যরা গুরুকেও ছাড় দেয়নি! ২০০১ সালে খোদ গুরুর গায়ে ছোবল মারে। আজ পাকিস্তান তালেবান নিয়ে খেলছে। এক সময় দেখা যাবে, এই তালেবানই পাকিস্তানকে ছোবল মারবে। সময়মতো সতর্ক না হলে কেউ তাদের ছোবল থেকে রক্ষা পাবে না। মানব সভ্যতার জন্য এ এক অশনি সংকেত!  

 

লেখক ●সহযোগী অধ্যাপকইতিহাস বিভাগসরকারি রাজেন্দ্র কলেজফরিদপুর।।

 

দ্রষ্টব্যঃ- প্রকাশিত লেখাটি লেখকের একান্ত নিজস্ব মতামত এবং এর দায়-দায়িত্বও লেখকের একান্ত নিজস্ব।  

 

জাগরণ/এসকেএইচ