• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ১৩ আশ্বিন ১৪২৮
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২১, ০৯:৪৩ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২১, ০৩:৪৩ পিএম

তৃতীয় পর্ব

পাঠ উপলব্ধি : আমার দেখা নয়াচীন

পাঠ উপলব্ধি : আমার দেখা নয়াচীন
জাগরণ গ্রাফিক্স ডেস্ক

মোহা. শাজাহান আলি ll

তাদের সাথে শুধু রাজনীতির সম্বন্ধ নয়
তাদের প্রাণের চেয়ে অধিক ভালোবাসি ও শ্রদ্ধা করি

১লা অক্টোবর নয়াচীনের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে কিভাবে পুরো পিকিং শহর সুন্দর সুন্দর লাল রঙ্গের পতাকায় সজ্জ্বিত হয়েছিল তা বঙ্গবন্ধুকে বিমোহিত করেছিল। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন- ‘সেই দিন যেন মানুষ পাগল হয়ে গিয়েছিল।... মাও কে দেখবে, তার বাণী শুনবে।... সমস্ত রাস্তায় রাস্তায় গাড়িতে গাড়িতে বাড়িতে বাড়িতে দোকানে দোকানে শুধু সুন্দর সুন্দর লাল পতাকা।’ প্যারেড গ্রাউন্ডে মাও এর জন্য মানুষের প্রাণঢালা ভালোবাসা ছিল। প্যারেড গ্রাউন্ডে ‘মহিলা ন্যাশনাল গার্ড’, ‘শান্তির জন্য শোভাযাত্রা’ ও ‘কৃষকদের শোভাযাত্রা’টি বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। প্রত্যেকটি শোভাযাত্রা ছিল সুশৃংখলিত ও মুখরিত। 

শোভাযাত্রায় মোট অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা নিজেদের মধ্যে অনুমান করতে গিয়ে ‘কেউ বলে ৫০ লক্ষ, কেউ বলে ৪০ লক্ষ, কেউ বলে এক কোটি। ৪০ লক্ষের কম কেউ বললো না।’ বঙ্গবন্ধু অনুমান করেছিলেন ১৫ লক্ষ। এতে বঙ্গবন্ধুর প্রতি অন্যরা বিরক্ত হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সবাই ২৫ লক্ষ মেনে নেয়। কিন্তু পরদিন সকালে খবরের কাগজে শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা হিসেবে লিখেছে ৫ লক্ষ। তথ্যের বস্তুনিষ্ঠ উপস্থাপনে বঙ্গবন্ধুর কাছে ভালো লেগেছিল যা তিনি বইয়ে উল্লেখ করেছিলেন। চীনের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান উপভোগের সময় বঙ্গবন্ধু ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান দিবসের কথা স্বরণ করেছিলেন। সেই বছর ঠিক একই রকম মানুষের মুখে হাসি ছিল। ‘আকাশ বাতাস মুখরিত করে ‘কায়েদে আজম জিন্দাবাদ’- ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ ধ্বনি অনুরণিত হয়েছিল। সেই স্বাধীন পাকিস্তানের আজ কি করুণ অবস্থা তা স্মরণ করে বঙ্গবন্ধু একইভাবে ব্যথিত হয়েছিলেন। সম্মেলনের শেষ দিন পিকিং করপোরেশন-এ নৈশভোজ ছিল। খাওয়া শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বেশ উৎসবমুখর ছিল পরিবেশ। সবাই সবাইকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছিলো। চীনের ছেলেমেয়েরা দলবদ্ধভাবে সবাইকে বিদায় জানালো। পরদিন প্লেনে আতাউর রহমান ও মানিক মিয়া দেশে ফিরে আসেন।

‘আমার দেখা নয়াচীন’ বইটির অন্যতম দিক বঙ্গবন্ধুর লেখায় রসবোধের পরিচয়। এর মাধ্যমে পাঠকের কাছে বইটি উপজীব্য করে তুলেছেন তিনি। মজার মজার ঘটনার অবতরণা করেছেন। বঙ্গবন্ধু হাস্যরসাত্মকভাবে স্বযত্নে এমন লেখনীর মাধ্যমে এগিয়ে গেছেন যে বইটি পড়তে আমার বিন্দুমাত্র একঘেয়ামি আমাকে ছুঁয়ে যেতে পারেনি। আতাউর রহমানের বাড়ি ফেরার কারণ হিসেবে বঙ্গবন্ধু উল্লেখ করেন- আতাউর রহমান সাহেবের ‘ভাবীর’ প্রতি ভালোবাসা ও টান। ‘যতদিন পিকিং ছিলেন সময় পেলেই শুধু ভাবী আর ভাবী’। মাঝে মাঝে বঙ্গবন্ধু ঠাট্টা করতেন কিন্তু রাগ করতেন না (পৃষ্ঠা ৫৯)। মহিলা ন্যাশনাল গার্ড এর সদস্যদের ক্ষিপ্রতা নিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘পুরুষের বাবা’ (পৃষ্ঠা ৫৫)। হংকং-এর রাস্তায় যখন একটি মেয়ে আতাউর রহমানের গলায় ফুল পরিয়ে প্রেম নিবেদন করেছিল তখন বঙ্গবন্ধু মজা করে আতাউর রহমানের কাছে মজা করে জানতে চেয়েছিলেন, ‘আমাদের মতো যুবকদের দিকে নজর না পড়ে আপনার ওপর পড়ার কারণ কী?’ এ ঘটনা নিয়ে সবাই ‘হাসাহাসি’ করেছিলেন। লেখায় এ ধরনের রসবোধ একজন অসামান্য লেখক হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে অনুভব করা যায়।

বঙ্গবন্ধু যাদের সাথে রাজনীতি করেছিলেন তাঁদের প্রতি ছিল অকৃত্রিম ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। আতাউর রহমান ও মানিক মিয়া যখন দেশে চলে আসেন তখন তিনি লিখেছিলেন, ‘তাদের সাথে শুধু রাজনীতির সম্বন্ধ নয়, তাদের প্রাণের চেয়ে অধিক ভালোবাসি ও শ্রদ্ধা করি’। আতাউর রহমান ও মানিক মিয়া চলে আসলেও বঙ্গবন্ধু আরো কিছুদিন থেকে গিয়েছিলেন চীনকে জানার প্রবল আগ্রহ থেকে। চীনে অবস্থানকালীন পরবর্তী সময়গুলোতে বঙ্গবন্ধু চীনের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, স্থান এবং বিভিন্ন শহর ঘুরে দেখেন।

হাসপাতাল পরিদর্শনে বঙ্গবন্ধুর উপলব্ধি: চিকিৎসার চেয়ে রোগ যাতে না হয় তার দিকেই নজর বেশি দিয়েছে। এতে অবস্থার যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। রোগ কমে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনে বঙ্গবন্ধুর নিকট চীনের স্বতন্ত্রতা পরিলক্ষিত হয়েছিল। এখানে কৃষি, শিক্ষা, শিল্প, ইঞ্জিনিয়ারিং, টেকনিক্যাল শিক্ষার জন্য গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। সেখানের প্রফেসর হালিমের সাথে ‘আলাপ’ হয়েছিল। প্রফেসর হালিমের ভাষায় শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে বঙ্গবন্ধু যা উল্লেখ করেন তার অংশ বিশেষ এর গুরুত্ব বিবেচনা করে এখানে তুলে ধরলাম: “বাধ্যতামূলক ফ্রি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছি। প্রত্যেক ছেলেমেয়েকে স্কুলে দিতে হয়। সরকার তাদের যাবতীয় খরচ বহন করে। কৃষকের জন্য কৃষি স্কুল করা হয়েছে। ...সেখানে যুবক কৃষকদের জন্য কিছুদিনের জন্য শিক্ষা দিয়ে খামার জমিতে পাঠাইয়া দেওয়া হয়। শ্রমিকদের জন্য স্কুল করা হয়েছে। প্রত্যেক শিল্পকেন্দ্রের কাছে স্কুল আছে। বড়দের শিক্ষা দেওয়া হয় কাজের ফাঁকে, আর তাদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষার জন্য আলাদা বন্দোবস্ত আছে। সকল দিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেল যে, মাত্র চার বৎসরে তারা শতকরা ৩০ জন লোককে লেখাপড়া শিখিয়ে ফেলেছে। গর্ব করে আমাকে আবার বললো, ১০ বৎসর পরে যদি চীনে আসেন তবে দেখবেন একটা অশিক্ষিত লোকও নাই।’’  (আমার দেখা নয়াচীন, পৃষ্ঠা ৬০)। 

চীনে বঙ্গবন্ধু দেখেন শিশুরাই সেখানে ‘স্বার্থ সংশ্লিষ্ট শ্রেণি’ (প্রিভিলেজড ক্লাস)। নয়াচীন সরকার এদের শিক্ষা, খাদ্য, পোশাক কি হবে, কে দিবে ঠিক করে দিয়েছিল। প্রত্যেক শিশুকে স্কুলে দিতে হবে। শিশুরাই একদিন চীনকে গড়ে তুলবে এই ছিল নয়াচীনের ভাবনা। বঙ্গবন্ধু খুশি হয়েছিলেন সেখানে শিশুদের চোখেমুখে উজ্জ্বলতা দেখে। বঙ্গবন্ধু সবসময় শিশুদের জন্য কোমলপ্রাণ। শিশুদের জন্য ভালোবাসা ছিল অকৃত্রিম। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে যখন জনগনের তিনবেলা খাবারের ব্যবস্থা করাই দুরূহ ছিল, রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অবস্থাও নাজুক, সেই সময় প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক করেছিলেন রাষ্ট্রনায়ক বঙ্গবন্ধু। ১৯৭৩ সালে প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করে ৩৭ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারি করেন তিনি। স্বল্প সময়ের মধ্যে ১১ হাজারের বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের কাজও করেছিলেন।

চীন সরকার কোরিয়ার যুদ্ধে আমেরিকা যে জীবানু বোমা ব্যবহার করেছিল তার কিছু প্রমাণ হিসেবে সংগ্রহ রেখেছিল। সেই জায়গাটি বঙ্গবন্ধু পরিদর্শন করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর মনে হয়েছিল ‘এ রকম বোমা ছেড়ে থাকতেও পারে!’ বইটিতে বঙ্গবন্ধু আমেরিকার এটম বোমা, হাইড্রোজেন বোমা বা জীবানু বোমার প্রসঙ্গ অবতারণা করলেও বিষযটির সংবেদনশীলতা বিবেচনা করে নিজকে সংবরণ করেছেন। বঙ্গবন্ধু পিকিং এর পর তিয়ানজিং শহর ভ্রমণ করেন। পিকিং যাবার পূর্বে বন্ধু মাহবুবের কাছে বিদায় বঙ্গবন্ধুকে ভারাক্রান্ত করেছিল। বন্ধু মাহবুবের স্ত্রী আবেগ আপ্লুত হয়েছিলেন। মাহবুবের অনুরোধে দুইটা চিঠি বঙ্গবন্ধু লিখেছেল কিন্তু এ ধরনের যোগাযোগ পরবর্তীতে তার ক্ষতির কারণ হতে পারে চিন্তা করে চিঠি দেওয়া হতে বিরত থাকেন। চীন সরকার ও শান্তি কমিটি তাদের জন্য বিদায় সংবর্ধনার আয়োজন করেন। বিদায় সংবর্ধনায় উপস্থিত ছিলেন চীন জাতীয় সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রী মি. বোরহান শহীদ, প্রফেসর হালিম ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। প্রফেসর হালিম মুসলমানদের পক্ষ থেকে স্কুল, কলেজ ও মসজিদের ছবি সংবলিত একটি বই উপহার দেন। বিদায়টা বঙ্গবন্ধুকে বিচলিত করেছিল। বঙ্গবন্ধুর মনে হয়েছিল চীনাদের অহংকার নাই। তিনি মন্তব্য করেছেন: ‘সকলেই আপন করতে চায়, সকলেই মনে করে রাষ্ট্র আমাদের, একে গড়ে তুলতে হবে’। (আমার দেখা নয়াচীন, পৃষ্ঠা-৬৪)

বঙ্গবন্ধু তিয়ানজিং শহরে এসেছিলেন। এটা চীনে নামকরা শিল্পনগরী। পূর্বে জাপানিরা এ শহর দখল করেছিল। চিয়াংকাইশেক এ শহর দখল করেছিলেন। লক্ষ্যনীয় বিষয় তারা এ শহর ছেড়ে চলে গেলেও শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেউ ধ্বংস করে যায়নি। তিয়ানজিং কাপড়, সূতা, লোহা, ঔষধের জন্য বিখ্যাত ছিল। শ্রমিকদের জন্য পৃথক বাসস্থান। আলাদা হাসপাতাল। শান্তি কমিটি নৈশভোজের আয়োজন করেছিল। সেখানে মসজিদের ইমাম সাহেব উপস্থিত ছিলেন। তাদের মাধ্যমে জানতে পারেন, তারা সেখানে ধর্মীয় অনুশাসন যথারীতি পালন করেন। 

এরপর নানকিং শহর রওয়ানা হন। নানকিং চীনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শহর। শহরটা অনেক পুরাতন ও অনেক স্মৃতি এর সাথে জড়িত। চীনের অবিসংবাদিত নেতা সান ইয়াৎসেনের কবর আছে। চীনারা একে পুণ্যস্থান বলে মনে করে। পরদিন সকালে বঙ্গবন্ধু সান ইয়াৎসেনের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। জায়গাটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বঙ্গবন্ধু উপভোগ করেছিলেন। এরপর বঙ্গবন্ধু কৃষি ফার্ম দেখলেন। বিরাট জায়গা নিয়ে ফার্মটি করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করলেন, চীন সরকার কৃষির উন্নতি করেছে তাদের ‘সাধারন কর্মী’দের ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে। তারা নিজেরাই উন্নতমানের বীজ তৈরী করে। এ ধরনের স্বতন্ত্রতা দেখে বঙ্গবন্ধু দেশের সরকারি ফার্মগুলোর কথা স্মরণ করেছেন এবং দুঃখ করেছিলেন দেশের ফার্মগুলোতে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি। বঙ্গবন্ধু গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন, কৃষির উন্নতি ছাড়া এদেশের মানুষের মুক্তি আসতে পারে না। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে পাকিস্তান টেলিভিশন ও রেডিও পাকিস্তানে ‘রাজনৈতিক সমাচার’ শীর্ষক বক্তৃতামালায় আওয়ামীলীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান (২৮ অক্টোবর ১৯৭০ সালের ভাষণে) এদেশের কৃষক সমাজের অধিকার সংরক্ষণের কথা বলেছিলেন দ্ব্যর্থহীনভাবে। রাষ্ট্রনায়ক বঙ্গবন্ধু তার বিভিন্ন ভাষণে বা কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষির প্রতি ভালোবাসার পরিচয় পাওয়া যায়। (মৃত্যঞ্জয়ী মহানায়ক : সাজ্জাদুল হাসান কর্তৃক লিখিত প্রবন্ধ ‘বঙ্গবন্ধুর কৃষিভাবন’।)

বঙ্গবন্ধু নানকিং শহর এবং এর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করেছিলেন (পৃষ্টা ৬৭)। এরপর খাওয়া দাওয়া করে নানকিং বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করেন। সেখানে ভাইস-চ্যান্সেলর, কয়েকজন প্রফেসর ও কিছু ছ্ত্রা তাদের স্বাগত জানান। সেখানের ‘ক্লাসরুম, বিজ্ঞান শাখা ও বিদেশী এডুকেশন ডিপার্টমেন্ট দেখেন। নানকিং বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনের জন্য প্রতিনিধিদের ধন্যবাদ জানান। এবং পাকিস্তান প্রতিনিধিদলের পক্ষে পীর সাহেব তাদের কৃতজ্ঞতা জানান। বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করার সময় বড় ছোট ছেলেমেয়েরা বঙ্গবন্ধুকে ‘হোপিন ওয়ান শোয়ে’ বলে সংবর্ধনা জানান। বঙ্গবন্ধু এখানে শিশুদের সাথে কিছু দুষ্টুমি বা একটু ‘ভিঙচিয়ে’ আদর করেছিল। শিশুরাও বঙ্গবন্ধুকে পছন্দ করেছিল। শিশুদের প্রতি ভালোবাসা বঙ্গবন্ধুর সহজাত ব্যক্তিত্ব। রাতে নানকিং মেয়র ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের আয়োজনে নৈশভোজ ছিল। 

পরদিন ছিল বঙ্গবন্ধুর সাংহাই ভ্রমণ। ‘চীনের শ্রেষ্ঠ শহর’ আর ‘দুনিয়ার দ্বিতীয় শহর নামে পরিচিত’ ছিল। সে সময়ে লোকসংখ্যা ৬০ লাখ। সাংহাইতে অবস্থিত চীনের বড় একটি কাপড়ের মিল পরিদর্শন করেন। মিলটি দেখতে প্রায় তিন ঘন্টা সময় লেগেছিল। সে সময় প্রচারিত ছিল চীনে সমস্ত ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে তেমন মনে হয়নি।

বঙ্গবন্ধু সাংহাই-এর শ্রমিকদের কলোনী ও বাজার পরিদর্শন করেন। বাজারে গিয়ে তিনি দেখেন ছেলে-মেয়ে সবাই একসাথে কাজ করছে। পুরুষ ও মহিলা সমান, এই নীতিতে তারা কাজ করছে। শ্রমিকদের জন্য নতুন বাড়িগুলো দেখার সময় বঙ্গবন্ধু হঠাৎ একটি বাড়ির ভেতর দেখার অভিপ্রায় ব্যক্ত করলেন। দোভাষীর সহায়তায় বাড়ির ভেতর যান। সে বাড়ির পুরুষ তখন কাজে গিয়েছিল। তাদের ৩/৪ দিন আগে বিবাহ হয়েছিল। দুজনই শ্রমিক। শ্রমিকদের জন্য এ ধরনের আবাসন ব্যবস্থা বঙ্গবন্ধুর কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। সদ্য বিবাহিতা এই শ্রমিক মেয়েটি ভীষণ লাজুক ছিল। হঠাৎ করে অতিথি আসায় বাড়িতে কিছু না থাকায় দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি। তবে তিনি ‘চিং চা’ বানিয়ে অতিথিকে আপ্যায়ন করেছিলেন। এই চা প্রায় চীনা বাসাতেই থাকে। সামাজিকতার দায়িত্ব বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। নব্য বিবাহিতা দম্পতির বাড়িতে গিয়ে উপহার না দিয়ে ফিরে আসা মুশকিল। ইলিয়াস ও ফজলুল হকের কাছে কিছু না থাকায় বঙ্গবন্ধু তাঁর হাতের আংটি উপহার হিসেবে দিয়ে দেন। হৃদয়ের বিশালতার পর্দায় বঙ্গবন্ধু চিরঞ্জীব। আংটির ভালোবাসার আলিঙ্গণে সেই পরিবার ঋদ্ধ হয়েছিল। সাংহাই হতে চলে আসার আগের দিন সেই দম্পতি হোটেলে বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করতে এসেছিলেন কৃতজ্ঞতা জানাতে। তারা একটি উপহার হিসেবে ‘লিবারেশন পেন’ নিয়ে এসেছিলেন। এই দম্পতি কিছুক্ষণ বসেও ছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু হোটেলে না থাকায় বঙ্গবন্ধুর সাথে তাদের আর দেখা হয়নি। ক্ষমা চেয়ে তারা ফিরে গেছেন, কারণ এই দম্পতির সেদিন বিশেষ কাজ ছিল। এটা চীনদেশের নিয়ম। বঙ্গবন্ধু তাই লিখেছেন: ‘উপহার দিলে সেই মুহূর্তে যিনি উপহার দিলেন তাকে একটা উপহার দিতে হবে।’ শ্রমিকের এই উপহারটি অন্য সকল উপহারের চেয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে ছিল মহামূল্যবান ও সকলের চেয়ে সেরা। 

সাংহাই হতে ট্রেনে হ্যাংচো গমন করেন বঙ্গবন্ধু। উদ্দেশ্য ছিল ‘কো-অপারেটিভ ফার্মিং’ দেখা। বিশেষ করে কো-অপারেটিভ ফার্মে পাট চাষের বিভিন্ন দিক দেখার চেষ্টা করলেন। হ্যাংচো শহরটা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য আর সমস্ত চীনের মধ্যে বিখ্যাত স্বাস্থ্য নিবাস। রাতের হ্যাংচো ছিল আরো সুন্দর। বঙ্গবন্ধু সে সময় গিয়েছিলেন সে সময় জোৎস্না ছিল। লেকের মনোরম দৃশ্য, পাহাড় ও লেকের মাঝখানে বসে লেকের  সৌন্দর্য  উপভোগ করা, খাবারের পর নৌকা নিয়ে ঘুরতে যাওয়া, বঙ্গবন্ধুর নিজে নৌকা চালানোর মনমুগ্ধতা সব মিলিয়ে বঙ্গবন্ধুর চীনের সবচেয়ে সুন্দর লাগার অন্যতম মুহূর্ত। রাতে ছিল শান্তি কমিটির পক্ষে রাতের খাবার। পরদিন দেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা। চলবে...

লেখক জ্যেষ্ঠ সহ সচিব, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়।

দ্রষ্টব্যঃ প্রকাশিত লেখাটি লেখকের একান্ত নিজস্ব মতামত এবং এর দায়-​দায়িত্বও লেখকের একান্ত নিজস্ব।