• ঢাকা
  • শনিবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২১, ৮ কার্তিক ১৪২৮
প্রকাশিত: অক্টোবর ১০, ২০২১, ০৭:৩৬ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : অক্টোবর ১০, ২০২১, ০৭:৪২ পিএম

আগমনীর তত্ত্বকথা

আগমনীর তত্ত্বকথা
ছবি-সংগৃহীত ।

আগমনী গানের মূল ভিত্তি আছে আগমনে। আগমনকে কেন্দ্র করে কথা ও সুরের বিস্তার এখানে। এই কথার উপস্থাপন হয়ে থাকে পুরাণের ওপর ভিত্তি করে। পুরাণকে ব্যবহার করে মানুষের কথা আসলে আগমনীর বড় বৈশিষ্ট্য। মানুষের এই কথা বলতে বাহ্যিক দৃষ্টিতে জাগতিক মানুষের হাসি, কান্না, দুঃখ বা আনন্দের পেশকশ বোঝায়। তবে আগমনী শুধু জাগতিক জীবনে আটকে থাকে না। জাগতিক দ্বন্দ্ব-অসঙ্গতির আলোকে জটিল দার্শনিক তত্ত্বই হাজির করে; সেই দার্শনিক তত্ত্ব মূলত উত্থাপিত সময়ের মানুষের যাপিত জীবনের আলোকেই উত্থাপিত। এক্ষেত্রে বলা যায় আগমনের ব্যাপারটা আসলে সজ্ঞানভাবে উত্থাপনের সাথে জড়িয়ে আছে। কিন্তু আগমন কিসের ঘটছে? একজন দেবীর কি? পুরাণমতে একজন দেবীরই আগমন ঘটছে। আবার সাধক ও ভাবুকদের দৃষ্টিতে এই আগমন কেবল একজন পুরাণকথিত দেবীর নয়, মানুষের পারমার্থিক ভাবের।

কারণ মন যেহেতু ইন্দ্রিয়ের রাজা বা জাগতিক ধুলা-ময়লার পরও তাতে যেহেতু পরমার্থের স্ফূরণ ঘটতে পারে তাই মন দিয়েই অনুভব করতে হয়। আর অনুভব থেকেই ভবে ভাবের উদয় হয়। এই ভাবের জোরেই মায়ের মৃত্যুলোকে উপস্তিতি টের পাওয়া যায়। তাই তো বাহ্য পূজা আসল নয়, মানস পূজাই আসল।

দেবী মৃত্যুলোকে বা মর্ত্যে ভক্তের ডাকে আসেন- এটাই তাঁর আগমন। সেই আগমনকে ঘিরেই তত্ত্বকথার বিস্তার। এই জগতে সবকিছুর চূড়ান্ত ফল শমনের কারাগারে বন্দী হওয়া। কিন্ত ভক্ত যখন মাকে বোধন করে বা জাগ্রত করে তখন মা এই লোকে এসে মনোবাঞ্ছা পূরণ করেন। এসব জানাশোনা কথা। তবে, এসব দেখল কে আর বুঝল কে? এটাই লাখ টাকার প্রশ্ন। কেননা, মা যে এসেছে- তা কেবল অনুভবের বিষয়। কারণ মন যেহেতু ইন্দ্রিয়ের রাজা বা জাগতিক ধুলা-ময়লার পরও তাতে যেহেতু পরমার্থের স্ফূরণ ঘটতে পারে তাই মন দিয়েই অনুভব করতে হয়। আর অনুভব থেকেই ভবে ভাবের উদয় হয়। এই ভাবের জোরেই মায়ের মৃত্যুলোকে উপস্তিতি টের পাওয়া যায়। তাই তো বাহ্য পূজা আসল নয়, মানস পূজাই আসল। দেবীকে অর্চনা করতে হয় (পূজা ও আরতি করতে হয়) একশ আটটা প্রদীপ ধরিয়ে। যুক্ত করা ভাল যে, দেবীকে কিন্ত একশ আটটা নীলপদ্মও দিতে হয়। বাহ্যিক দৃষ্টি দিয়ে এই একশ আটের মহিমা বোঝা যাবে না। কারণ একশ আটের যোগ আছে মানস পূজার সাথে। ষড়রিপু, একাদশ আসক্তি, সাতাশ ভাব (মনোভাব অর্থে) ও চৌষট্টি রস এই মিলে হয় একশ আট। এই একশ আটটা প্রদীপ জ্বালিয়ে দেবীর আরতি ও পূজা হয় এবং এই একশ আটটি নীলপদ্ম দেবীর পায়ে অর্পণ করতে হয়। (১০৮ তত্ত্ব পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা থেকে গ্রহণ করেছি।)  মোটকথা, ভাবের উদয় ছাড়া দেবীর অর্চনা অসম্ভব। কারণ ভাবের উদয়েই বোঝা যায় মাটির মূর্তিটি সাক্ষাৎ চৈতন্যময়ী। আর সামনের মূর্তিটি চিন্ময়ীরূপে দর্শন করতে পারলে নিজের দেহকেও সেই মূর্তির সাথে তুলনা করে উপলব্ধি করা যায়।

মূর্তি হলো মূর্ত হয়ে ওঠা বস্তু। যে পরম চিন্তায় ছিল তা এতে বাস্তব হয়েছে। আমাদের চিন্তা যদি বাস্তব করার ক্ষমতা রাখে তাহলে বুঝতে হবে আমাদের চিন্তা বা চেতনা আসলে চৈতন্যময়ী মায়েরই পাকৃত লীলা বা বিবর্ত। এটা যখন আমাদের চেতনায় ধরা পড়ে তখনই দেবীর প্রকৃত আগমন এবং তখনই আগমনী গান পূর্ণতা পায়। আগমনীর সারকথা আসলে ভাবরূপী দেবীর আগমন। আর তাঁর প্রকাশ ঘটেছে বাৎসল্য রসে, তাঁকে ডাকছি ও পূজা করছি নিজের মেয়েরূপে।

শিব হলেন মৃত্যুঞ্জয়, মৃত্যুকে তিনি বুঝেছেন ও জয় করেছেন, তিনি আর মৃত্যুতে ভীত নন। মৃত্যু আর তাঁর মাঝে বাস করেনা বরং তিনিই মৃত্যুর মাঝে বাস করেন।    

এখন বোঝা দরকার মেয়েরূপে অর্থাৎ নিজের মেয়েরূপে কেন আমরা আহবান করছি। দেবী যেহেতু নারীরূপে আছেন তাই আত্মজ না হয়ে আত্মজা হবেন এটা স্বাভাবিক বুদ্ধিতে ধরে। কিন্ত আত্মজাই কেন হতে হবে তা সাধারণ বুদ্ধিতে ধরে না। এক্ষেত্রে বলে রাখা ভাল পুরাণের কাত্যায়ন মুনি দেবীকে কন্যারূপে পাবার সাধনা করেছিলেন বলে দেবী কন্যাকুমারী রূপে তাঁর কাছে হাজির ছিলেন এবং কাত্যায়নী নামে প্রসিদ্ধা হয়েছিলেন। এখন আত্মজার ব্যাপারটা বোঝা জরুরী। আত্মজা বা নিজের কন্যা পিতামাতার পরিচয়, জাতি, কুল ইত্যাদি পায়। পিতামাতার বীজ মেয়ের মধ্যে থাকে তাতে বংশধারার প্রমাণ হয়। অর্থাৎ দাবী করার উপায় থাকে “আমার মেয়ে”। দেবীকে ভজনা করার ক্ষেত্রে এই “আমার” ধারণাটা শুরুতে জরুরী। আমাদের প্রত্যেকের স্বধর্ম বা প্রবৃত্তি আছে। আমাদের পরম সংক্রান্ত ধারণা এই স্বধর্মের অনুসারে হয়, তাই তার ভজনার সময় এই স্বধর্মকে পরমের নিকট অর্পণ করতে হয়। তখনই সাধনা বা ভজনা সফল হতে পারে। এছাড়া হয় না। তাই তো বলে, “স্বধর্মে নিধনও শ্রেয়, পরধর্ম ভয়াবহ”। আরেক জনের মতো করে নয় নিজের মতো করেই ইষ্টের আরাধনা করতে হয়। সেই ব্যাপারটা বোঝাতে আমরা আগমনীতে নিজের মেয়েরূপে মাকে ডাকি। অমর্ত্যলোকের দেবী যদি আত্মজা না হতে পারে, তাঁর সাথে যদি বাৎসল্য লীলাই না হতে পারে তবে আর সাধনা কিসে!

“কে বলে দরিদ্র হর, রতনে রচিত ঘর মা,

যিনি কত সুধাকর শত দিনমণি।

বিবাহ-অবধি আর কে দেখেছে অন্ধকার,

কে জানে কখন, দিবা কখন রজনী।

শুনেছ সতীনের ভয়, সে সকল কিছু নয় মা!

তোমার অধিক ভালবাসে সুরধুনী।

মোরে শিব হৃদে রাখে, জটাতে লুকায়ে দেখে,

কা'র কে এমন আছে সুখের সতিনী!”

(কমলাকান্ত ভট্টাচার্যের আগমনী গানের অংশ)

আগমনীর প্রধান চরিত্রগুলো হলো মেনকা, গিরিরাজ হিমালয়, পার্বতী, শিব ও গঙ্গা। আমরা অন্যসব আগমনী বাদ দিয়ে সাধক কমলাকান্তের এই আগমনী নিলাম কেন এটা বুঝে নেয়া দরকার। আসলে অন্যসব আগমনীতে আমরা আগমনীর চরিত্রগুলোকে ঘিরে যে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের আভাস পাই লৌকিক ও দার্শনিক উভয় দিক থেকে তা মোটামুটি এখানে মীমাংসিত। আমরা আগমনীর মূলতত্ত্ব খুব ভালভাবে বুঝতে এর সাহায্য নিতে পারি। চিন্তিত মেনকা ও গিরিরাজ হিমালয় আসলে সাধকের প্রতিচ্ছবি। কারণ আমরা আগেই বলে নিয়েছি যে কন্যাভাবে অর্চনা করতে হয়। পৌরাণিক গল্পে পাই শ্মশানবাসী শিবকে পতিরূপে বরণ করেন পার্বতী। মূলত সাধকের মনে দ্বিধা দেখা দিতে পারে যে, সামান্য শ্মশানবাসী ও দরিদ্র (+বাঘছাল পরিহিত) শিব কেন উমাপতি বা উমাধব হলো। কিংবা শিব কি যথাযথভাবেই মহামায়াকে ধারণ করার যোগ্য আদৌ! এর মীমাংসাও এখানেই দেয়া আছে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে শিব দরিদ্র বা শ্মশানবাসী হতে পারেন। তবে মনে রাখা দরকার সাদাচোখে সব সময় ঠিক দেখা যায় না। মৃত্যুকে বুঝলে মৃত্যুকে জয় করা যায়। শিব হলেন মৃত্যুঞ্জয়, মৃত্যুকে তিনি বুঝেছেন ও জয় করেছেন, তিনি আর মৃত্যুতে ভীত নন। মৃত্যু আর তাঁর মাঝে বাস করেনা বরং তিনিই মৃত্যুর মাঝে বাস করেন। এই কারণে শিব হলেন শ্মশানবাসী। তাই শিব ছাড়া কেউ মহামায়াকে বা পার্বতীকে ধারণ করতে সক্ষম নয়।

গঙ্গা হলো সেই নদী যাতে স্নান করলে সব পাপ ধুয়ে যায়। প্রকৃতপক্ষে সেই নদী হলো ভক্তি। একমাত্র ভক্তিই সকল পাপ ধুয়ে দিতে পারে। এই ভক্তি জ্ঞান থেকে জন্ম হয়। এই জ্ঞান হলো পরমার্থের জ্ঞান।

আর শিব তো দরিদ্র নন- শিব সবাইকে সবকিছু দিয়ে দরিদ্র সেজেছেন । সুধাকর বা চাঁদ তাঁর মাথায় বসে আছে। এই চাঁদ ধরার জন্য সাধকদের এত প্রচেষ্টা আর সেখানে কিনা শিব চাঁদ মাথায় রেখে দিয়েছে। দেখলে মনে হয় শিবের মাথায় আছে বলেই চাঁদ আরও সুন্দর হয়েছে। আর শিব দিবারাত্রির ঊর্ধ্বে। তাই উমা শিবের সঙ্গিনী হয়ে কিভাবে দিবারাত্রির হদিশ পাবেন! আর রতনের ঘরের কথা হচ্ছে, এটাও খুব বোঝার বিষয়। স্বয়ং মহামায়া যে ঘরে সে ঘর কি রতনের ঘর নয়?

পার্বতীর সতীন গঙ্গার ব্যাপারটা আরও মজার। কেউ গঙ্গা ধারণ করতে পারল না, শেষে ধারণ করল শিব। আর কেনইবা পারবে না শুনি, গঙ্গা হলো সেই নদী যাতে স্নান করলে সব পাপ ধুয়ে যায়। প্রকৃতপক্ষে সেই নদী হলো ভক্তি। একমাত্র ভক্তিই সকল পাপ ধুয়ে দিতে পারে। এই ভক্তি জ্ঞান থেকে জন্ম হয়। এই জ্ঞান হলো পরমার্থের জ্ঞান। বিষ্ণুর পা থেকে গঙ্গার জন্ম। মনে রাখতে হবে বিষ্ণু হলেন পালনকর্তা। এই জগতের পালনের কাজ করতে গেলে পরমার্থের জ্ঞানের ওপরই নির্ভর করতে হয়। তাই বিষ্ণুর পা হলো জ্ঞানের প্রতিচ্ছবি। পদরূপী জ্ঞানের ওপর দাঁড়িয়ে বিষ্ণু তাঁর কর্ম সম্পাদন করেন। করতে করতে সেই জ্ঞান সরলতা প্রাপ্ত হয় বা পরিপূর্ণতা লাভ করে। আমরা কথ্যভাষায় এভাবে বলতে পারি- গলে জল হয়ে যাবার মতো ব্যাপার। এটাই হলো গঙ্গার জন্ম। জ্ঞানরূপী বিষ্ণুপদ হতে ভক্তিরূপী গঙ্গাজলের আবির্ভাব। আর তা পড়ল গিয়ে মহাদেবের মাথায়। কারণ বহু আকাঙ্ক্ষিত চাঁদ যে মাথায় করে ঘুরতে পারে, সাধকের অভীষ্ট চাঁদ যার গুণে আরও বিশেষত্ব প্রাপ্ত হলো এই ভক্তিরূপী নদীর জল তাঁর মাথায়ই মানায়। সেই হলো পার্বতীর সপত্নী। আর ভক্তির নদী গঙ্গা কি মহামায়াকে অবহেলা করবে? সেতো যত্নই করবে এবং পার্বতীকে শিবের হৃদয়েই রাখবে। তাই গঙ্গা হলো সুখের সতিনী। আগমনীর কাহিনী দ্বারা এই তত্ত্বকেই বিভিন্নভাবে প্রকাশ করা হয়। কমলাকান্ত সার কথা বলেছেন বলে এটাই উল্লেখ করলাম। তবে অনেক জায়গায় গঙ্গা ও পার্বতীর দ্বন্দ্বের কথাও আছে। সেটা আসলে ভক্তির দ্বারা পরমের সাথে একাত্ম হতে পারা বা না পারার ব্যাপার। এই হলো আগমনীর মূলকথা।

 

  • লেখক ও গবেষক

 

দ্রষ্টব্যঃ প্রকাশিত লেখাটি লেখকের একান্ত নিজস্ব মতামত এবং এর দায়-​দায়িত্বও লেখকের একান্ত নিজস্ব।

 

জাগরণ/এসকেএইচ