• ঢাকা
  • বুধবার, ০১ ডিসেম্বর, ২০২১, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
প্রকাশিত: অক্টোবর ১৪, ২০২১, ০৯:৫১ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : অক্টোবর ১৪, ২০২১, ০৩:৫১ পিএম

জাতির পতাকা খামচে ধরেছে আজ পুরোনো শকুন

জাতির পতাকা খামচে ধরেছে আজ পুরোনো শকুন
ছবি- জাগরণ গ্রাফিক্স ডেস্ক।

সম্প্রতি আমি সাতক্ষীরায় গিয়েছিলাম। সাতক্ষীরায় বিভিন্ন মন্দির ও সনাতন ধর্মের উপাসনালয়ে একটি সঙ্গবদ্ধ ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর হামলার বিবরণ স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছি। এসব উপাসনালয় পরিদর্শন করে অনুভব করেছিলাম যে, একটি অশুভ সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান ঘটতে চলেছে। দেশের সংখ্যালঘুদের উপাসনালয়ে যে আবারও আক্রমণ হতে পারে এমন একটি পরিস্থিতিও আঁচ করেছিলাম। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে এসব বিষয়ে আমার দায়িত্ব উপলব্ধি করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সজাগ ও সতর্ক থাকতেও অনুরোধ করেছি। কিন্ত উদ্ভূত পরিস্থিতিকে সামলে নেয়ার মতো সময় পেলেও সরকার ও রাষ্ট্রযন্ত্র ঠিক ততটুকু সতর্ক হতে পারেননি। আর পারেননি বলেই অতি সম্প্রতি সনাতন ধর্মের দুর্গা উৎসবে আমরা সেই অশুভ সাম্প্রদায়িক শক্তির অপতৎপরতা লক্ষ্য করছি।

তারা বিশেষ একটি এজেন্ডা নিয়ে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে বিনষ্ট করতে চায় এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে আঘাত করে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির উত্থানকে প্রতিষ্ঠিত করতে বদ্ধপরিকর। এদের উদ্দেশ্য একটাই-সংঘাতময় বাংলাদেশ।

গত কয়েক দিনে বেশ কিছু মন্দিরে হামলা হয়েছে। এসব হামলার পেছনে সাম্প্রদায়িক শক্তি যে যুক্ত তার নানাবিধ তথ্য আমাদের অজানা নয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে গুজবের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে তারা এই ন্যাক্কারজনক হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং সংখ্যালঘুদের ওপর অমানবিক নির্যাতনের ঘটনা সংঘটিত করেছে।

বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে বিনষ্ট করার লক্ষ্যে একটি চক্রের তৎপরতা নতুন কিছু নয়। বহুকাল থেকেই মৌলবাদী ও রাজনৈতিকভাবে সুবিধাবাদী চক্রটি হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিভেদ ছড়ানোর প্রক্রিয়ায় যুক্ত আছে। মৌলবাদী জামাত-শিবির, হেফাজত ও মামুন গং, বিএনপি’র সাম্প্রদায়িক অংশটি এইসব ঘটনার হোতা হলেও লক্ষ্য করছি ধর্মনিরপেক্ষ সংগঠন আওয়ামী লীগেও একটি সাম্প্রদায়িক অশুভ শক্তির অনুপ্রবেশ ঘটেছে। আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ বা নীতিনির্ধারক মহল এই অশুভ শক্তির অনুপ্রবেশকে রোধ করতে পারেননি। সুকৌশলে এরা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে প্রবেশ করে ধর্মীয় সম্প্রীতির বন্ধনকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করার অপকর্মে লিপ্ত আছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক উস্কানীমূলক বক্তব্য দিয়ে, গুজব ছড়িয়ে এরাও ঘোলা পানিতে মাছ শিকারে সিদ্ধহস্ত। পরিতাপের বিষয় আওয়ামী লীগ এসব চিহ্নিত চক্রকে দলীয় কর্মসূচি থেকে অব্যাহতি দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে।

দু’একজনকে গ্রেফতার ছাড়া এই গুজব রটনাকারী মাওলানাদের বিষয়েও সরকারি গোয়েন্দা ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তেমন তৎপর ভূমিকা আমরা দেখিনি। এর ফলে অব্যাহতভাবে এই সব মোল্লাদের উত্থান বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রযুক্তিগত সুবিধা নিয়ে আজকাল ছবিকে এডিট করে অনেক কিছুই করা সম্ভব। সুতরাং তা ব্যবহার করে কোরআনের অবমাননা, দেবদেবীর মূর্তিকে অবমাননা করা কোনো কঠিন কাজ নয়। একশ্রেণির ধর্মজীবী অসহিষ্ণু মোল্লারা এমন সব কাজের মধ্য দিয়েই আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্যকে বিনষ্ট করছে।

আমদের পর্যবেক্ষণ যদি ভুল না হয় তবে একথা বলা বাহুল্য যে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, রামু, পার্বত্য চট্টগ্রাম, খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোর, নাটোর, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, রংপুরসহ বাংলাদেশের অন্যান্য অনেক অঞ্চলেই ধর্মকে রক্ষার নামে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে গুজব ছড়ানো হয়েছে এবং একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করে হিন্দু বা সংখ্যালঘুদের ওপর অমানবিক নির্যাতন, তাদের ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলাকে তারা নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে অতি সাধারণ মানুষের সামনে কৌশলে উপস্থাপন করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু মাওলানার ওয়াজ-নসিহতে সাম্প্রদায়িক উস্কানীর বহু উপাদান দেখা যায়। তারা এতো কৌশলী যে, গুজব ও মিথ্যে তথ্য দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত ও উত্তেজিত করাতে অত্যন্ত মুন্সিয়ানার স্বাক্ষর রেখেছে। দু’একজনকে গ্রেফতার ছাড়া এই গুজব রটনাকারী মাওলানাদের বিষয়েও সরকারি গোয়েন্দা ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তেমন তৎপর ভূমিকা আমরা দেখিনি। এর ফলে অব্যাহতভাবে এই সব মোল্লাদের উত্থান বৃদ্ধি পেয়েছে।

দেশি-বিদেশি অপশক্তির ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা এবং বাংলাদেশকে একটি অস্থিতীশীল ধর্মান্ধ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করতে এই মিলিত অপশক্তিটি দীর্ঘ সময় ধরে গোপনে গোপনে সংগঠিত হচ্ছিল। এরই বহিপ্রকাশ ঘটছে এখন।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিশ্চিত করা সরকারের পবিত্র দায়িত্ব। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংবিধানে এই বিষয়ে সুস্পষ্ট বিধি আরোপিত আছে। কিন্ত সরকার এই পবিত্র কর্তব্যটি প্রতিপালনে কেন সচেষ্ট নন তা আমাদের বোধগম্য নয়। তবে অনুধাবন করি, সরকারি দলে যথেচ্ছা অন্যান্য রাজনৈতিক বিশেষ করে মৌলবাদী ও আদর্শিকভাবে ভিন্নমতের লোকবলকে প্রবেশের সুযোগ করে দিয়ে কৌশলগতভাবে আওয়ামী লীগ পরাজিত হয়েছে। সুবিধাবাদী মৌলবাদীদের প্রবেশের মাধ্যমে আওয়ামী লীগও আদর্শ ও মূল্যবোধের রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়েছে।

বর্তমানে এইসব মৌলবাদী চক্রের আওয়ামী লীগে দোর্দণ্ড প্রতাপ। এরাই নির্বাচনে প্রার্থী হবার সুযোগ লাভ করছে। আর এর ফলে মামুন গং ও হেফাজত, জামাত-শিবির এবং বিএনপি রাজনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। তারা বিশেষ একটি এজেন্ডা নিয়ে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে বিনষ্ট করতে চায় এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে আঘাত করে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির উত্থানকে প্রতিষ্ঠিত করতে বদ্ধপরিকর। এদের উদ্দেশ্য একটাই-সংঘাতময় বাংলাদেশ।  স্বাভাবিকভাবেই গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ, মূল্যবোধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে প্রতিহত করার ক্ষেত্রে এদের কোনো কমিটমেন্ট নেই। দেশি-বিদেশি অপশক্তির ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা এবং বাংলাদেশকে একটি অস্থিতীশীল ধর্মান্ধ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করতে এই মিলিত অপশক্তিটি দীর্ঘ সময় ধরে গোপনে গোপনে সংগঠিত হচ্ছিল। এরই বহিপ্রকাশ ঘটছে এখন।

পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি এরা এর-ই মধ্যে এতোটাই পরাক্রমী হয়েছে যে, সরকারের বিভিন্ন মহলে এদের একটি শক্ত রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ে উঠেছে। এই রাজনৈতিক অপসংস্কৃতির জয়-জয়াকার আমাদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং অসাম্প্রদায়িক ভাবনার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত মর্মান্তিক পরাজয়।

তাই আমাদের সমভাবনার মানুষদের মধ্যে এখন ঐক্যের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। দেশের তরুণ প্রগতিবাদী ছেলে-মেয়েদের মধ্যে এই বার্তাটি পৌঁছে দেয়া অতি জরুরি যেন  বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়  বিনির্মাণ করতে হলে একটি অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত প্রজন্মের একই প্লাটফর্মে থেকে মৌলবাদী ধর্মান্ধ ও গুজব রটনাকারীদের শক্তভাবে প্রতিহত করা সম্ভবপর হয়। আমরা জানি না সামনে কি ভয়ঙ্কর অনিশ্চিত বাংলাদেশের দিকে আমরা এগিয়ে চলেছি। আমরা জানি না আফগান তালেবানদের নতুন উত্থানে মধ্যযুগীয় মৌলবাদ আবার প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে কি না। আমরা এ-ও জানি না তালেবানদের এই উত্থান বাংলাদেশের সবুজ শ্যামল ভূমিকেও আগ্রাসন করবে কি না। তবে জাতির পতাকাকে খামচে ধরা এসব শকুনদের বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রাম ও সৃজনকে দীর্ঘজীবী করতে হবে এমন আশা নিয়েই আমি স্বপ্ন দেখতে আগ্রহী।

 

লেখক  সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক জাগরণ।।  

 

জাগরণ/এসকেএইচ