• ঢাকা
  • বুধবার, ০১ ডিসেম্বর, ২০২১, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
প্রকাশিত: অক্টোবর ১৬, ২০২১, ১১:২৫ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : অক্টোবর ১৬, ২০২১, ১১:৩১ পিএম

লালন: সাম্যবাদের রূপকার

লালন: সাম্যবাদের রূপকার
জাগরণ গ্রাফিক্স ডেস্ক।

লালনের শিক্ষা ও দর্শন হচ্ছে- বিনয়, ভক্তি, ত্যাগ। তাই বলে তিনি অন্যায়, অবিচার, অত্যাচার ও অযৌক্তিকতার  কাছে মাথা নত করেছেন এমন নয়। কথা ও সঙ্গীতের মাধ্যমে যেমন তিনি প্রতিবাদ করেছেন, তেমনি সশরীরে লাঠি হাতেও প্রতিবাদ করেছেন। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনা উল্লেখ করলে সহজে তা উপলদ্ধি করা যাবে। যেমন- কাঙাল হরিনাথ মজুমদার (১৮৩৩-১৮৯৬) ছিলেন একজন সাংবাদিক, সাহিত্যিক, কৃষক দরদী, লালন সুহৃদ, লালন ভক্ত। তিনি ঈশ্বরচন্দ্রের ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকায় লেখালেখি করতেন। ১৮৬৩ সালে রাজশাহীর রানী স্বর্ণকুমারী দেবীর অর্থানুকূল্যে তিনি অবিভক্ত বাংলার নদীয়া (বর্তমানে বাংলাদেশের কুষ্টিয়া) জেলার কুমারখালি মহকুমা থেকে ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা বের করেন। পরে এটি পাক্ষিক এবং সাপ্তাহিক পত্রিকায় রূপান্তরিত হয়। সাপ্তাহিকের মূল্য ছিল এক পয়সা। তবে মাসিক সংখ্যার মূল্য ছিল পাঁচ আনা। এর পৃষ্ঠাও ছিল অনেক, চার ফরমা। দীর্ঘ ১৮ বছর চলার পর আর্থিক অনটন ও সরকারের মুদ্রণ শাসনব্যবস্থার কারণে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। কাঙাল হরিনাথের জন্ম ও কুঠির কুমারখালি। লালনের ছেঁউড়িয়া আখড়াবাড়িও কুমারখালি। কাঙাল ও লালন উভয়ে বাস করতেন কোলকাতা জোড়াসাঁকো ঠাকুর জমিদারদের জমিদারি এলাকায়। তখন ওই এলাকা ছিল বিরাহিমপুর (শিলাইদহ) পরগনার অন্তর্ভুক্ত। কাঙাল মাঝে মধ্যে ছেঁউড়িয়ায় সাধক গুরু লালনের কাছে যেতেন। আবার লালনও কখনো কখনো কুমারখালিতে হরিনাথের ‘কাঙাল কুঠির’ এ আসতেন। লালনের আখড়া ছেঁউড়িয়া থেকে কাঙাল কুঠিরের দূরত্ব ১৩/১৪ কিলোমিটার। কাঙাল হরিনাথ অসহায়, অত্যাচারিত, নিপীড়িত, শোষিত কৃষক সম্প্রদায়কে রক্ষার হাতিয়ারস্বরূপ সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। তিনি তাঁর ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকায় সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞানবিষয়ক প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। পাশাপাশি তিনি বৃটিশ শাসকগোষ্ঠীর আর্শীবাদপুষ্ট জমিদার, আমলা, নায়েব, গোমেস্তা, নীলকর, কুসীদজীবী ও মহাজন কর্তৃক কৃষকদের ওপর শোষণ, নির্যাতনের কীর্তিকলাপ বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরতেন। ফলে বৃটিশ সরকার ও জমিদারদের পক্ষ থেকেও হুমকির সম্মুখীন হন। কিন্তু তিনি নীতি ও আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। এতে তাঁর পত্রিকাটি তখন বেশ খ্যাতি অর্জন করে।

মহাত্মা লালন ফকিরের স্কেচ। সংগৃহীত। 

জোড়াসাঁকো ঠাকুর জমিদারি শাহজাদপুর ও বিরাহিমপুর পরগনায় বেশ কয়েকবার কৃষকপ্রজা বিদ্রোহ করে। জমিদার বাবুরা এর জন্য কাঙাল হরিনাথকে দায়ী করেন। তারা মনে করেন যে, হরিনাথ তাঁর প্রত্রিকায় লেখালেখি করে কৃষক-প্রজাদেরকে বিদ্রোহ করতে প্ররোচিত করেছেন। তাঁর লেখালেখি জমিদার-আমলাদের সুনাম ও স্বার্থ ক্ষুণ্ন করেছে। তারা হরিনাথকে বাগে আনতে চেষ্টা করেন, কিন্তু ব্যর্থ হন এবং ক্রুদ্ধ হন। অবশেষে হরিনাথকে শায়েস্তা করতে তাঁর বিরুদ্ধে লাঠিয়াল বাহিনী প্রেরণ করা হয়। তিতু মিয়া, ঋতু মিয়া, আব্বাস মিয়া প্রমুখ ছিলেন এ লাঠিয়াল বাহিনীর সর্দার। এদের সাথে কতিপয় পাঞ্জাবি গুণ্ডাও যোগ দিয়েছিল। এ লাঠিয়াল বাহিনীকে প্রতিরোধ করতে এবং কাঙাল হরিনাথকে রক্ষা করতে লালন ফকির তাঁর কয়েক হাজার অনুসারী নিয়ে এগিয়ে আসেন। লালনের অনুসারী ও কৃষক-প্রজাদের সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে জমিদারদের লাঠিয়াল বাহিনী লেজ গুটিয়ে পিছিয়ে যায়। এসব ঘটনার অবতারণা হয় ১৮৭২-৭৩ সালের দিকে। তখনো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জমিদারি দেখভাল করতে পূর্ববঙ্গে আসেননি। তিনি এসেছিলেন ১৮৯১ সালে, লালনের মৃত্যুর এক বছর পরে। যাহোক, এ ঘটনা প্রমাণ করে যে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাধক লালন হাতে লাঠি তুলে নিতেও দ্বিধাবোধ করতেন না। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট গণসঙ্গীত শিল্পি ও সুরকার হেমাঙ্গ বিশ্বাস (১৯১২-১৯৮৭) লিখেছেন, “কাঙাল হরিনাথের অপ্রকাশিত ডায়েরিতে দেখি সত্যি সত্যি লালন চরিত্র-ভোলা বাউল আবার প্রয়োজন হলে হতে পারেন জাঁদরেল লাঠিয়াল। হাতের একতারাটি রেখে জমিদারের অত্যাচারের বিরুদ্ধে লাঠিও ধরতে পারেন।” (সূত্র : ম. মনিরুজ্জামান, সাধক কবি লালন কালে উত্তরকালে, বাংলা একাডেমি, এপ্রিল, ২০১০, পৃ ১৯)।

১৭৫৭ সালের পলাশি যুদ্ধে ও ১৭৬৪ সালের বক্সারের যুদ্ধে জয়লাভের ফলে বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ছলে-বলে-কৌশলে বাংলা তথা ভারতের সিংহাসনে আরোহণ করে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে বৃটিশের বশংবদ, অনুগত এক জমিদার সৃষ্টি করা হয়। উনিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে নীলকর নামে এক মহাজনী ব্যবস্থার সৃষ্টি হয়। ব্রিটেনে শিল্প বিপ্লবের ফলে প্রচুর বস্ত্র উৎপাদিত হয়। বস্ত্রের রঙের জন্য প্রাকৃতিক নীলের খুব দরকার ছিল। এ নীল চাষ করা হতো বাংলায়। নীলকররা বাংলার কৃষকদের নীলচাষে বাধ্য করত। কৃষক নীল চাষ করতে না চাইলে তাদের ওপর নির্মম নির্যাতন করা হতো। একদিকে জমিদার, অন্যদিকে নীলকরদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে কৃষক বিদ্রোহ করে। জমিদার, সীলকর, মহাজন, আমলা, নায়েব-গোমেস্তা, টাউট-বাটপারদের শোষণে সাধারণ মানুষ, কৃষক সমাজ ছিল অতিষ্ঠ, শোষণে জর্জড়িত, অত্যাচারিত। শোষক ও সুবিধাভোগী শ্রেণি বসবাস করত শহরে। তারা উচ্চাভিলাষী জীবনযাপন করত। তারা কোনও উৎপাদন করত না। উৎপাদন করত কৃষক। তারা নানা অজুহাতে কৃষকের ওপর খাজনা, কর, সেচ আরোপ করত; কৃষককে ফতুর করে ছাড়ত। খাজনা দিতে অপারগ হলে শোষকের দল কৃষকের ক্ষেতের ফসল, পালের গরু নিয়ে যেত। লালন এ শোষকদের বোম্বেটে (ডাকাত) হিসেবে অভিহিত করেছেন। লালন বলেন,

‘শহরে ষোলো জনা বোম্বেটে

করিয়ে পাগলপারা নিলো তারা সব লুটে ॥’

জমিদার, নীলকর, মহাজনদের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন স্বয়ং বৃটিশ সরকার, বৃটিশ রাজা-রানী, সম্রাট-সম্রাজ্ঞী। দেশের অভ্যন্তরে মাঠ লেভেলের আমলা বা প্রশাসকরা কোনও অপরাধ করলে সরকার বা রাজার কাছে জনগণ ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করে। কিন্তু জমিদার, নীলকর, আমলা, মহাজন, সরকার, রাজা-রানী সবই এক কাতারের লোক, সবই শোষক। কার কাছে কী ন্যায় বিচার চাইব? একজন আরেকজনের চেয়ে বড় চোর, বড় শোষক। লালন সবই জানতেন। তাইতো তিনি ক্ষোভ ও দুঃখে অভিব্যক্তি ব্যক্ত করেছেন এভাবে-

‘রাজ্যেশ্বর রাজা যিনি,

চোরেরও শিরোমনি,

নালিশ করবো আমি

কোনখানে কার নিকটে।’ 

লর্ড কর্নওয়ালিস ১৭৯৩ সালের ২২ মার্চ চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ঘোষণা করেন এবং ওই বছরের ১ মে শাসনকার্য পরিচালনার জন্য ৪৮টি রেগুলেশনবিশিষ্ট তাঁর বিখ্যাত কোড ঘোষণা করেন যা কর্নওয়ালিস কোড নামে পরিচিত। এ কোডের ১৪ নং রেগুলেশনের একটি ধারা ছিল সূর্যাস্ত আইন। চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে জমিদার তার জমিদারির এক বছরের খাজনা (রাজস্ব) পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে সরকার ওই জমিদারির অংশবিশেষ নিলামে বিক্রি করে বকেয়া খাজনা আদায় করতে পারতেন। কোন কোন জমিদার নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে সরকারকে খাজনা প্রদানে ব্যর্থ হতো এবং তাদের কাছ থেকে বকেয়া খাজনা আদায়ের লক্ষ্যে জমিদারির অংশবিশেষ নিলামে বিক্রির জন্য সরকার যে তালিকাভুক্তি প্রকাশ করত তাকে বলা হত জমিদারি ‘লাটে’ উঠেছে। এভাবে বৃটিশ সরকারের কারণে বাংলার অনেক জমিদার জমি হারিয়ে পথে বসেছে। তাইতো আমরা লালনের গানে পাই-

‘গেলো ধন মালনামায়

খালি ঘর দেখি জমায়

লালন বলে খাজনারই দায়

কখন যেন যায় লাটে।’

আবার সূর্যাস্ত আইনের ভয়ে জমিদার খাজনা আদায়ে ছিল কঠোর। কৃষক-প্রজা জমিদারকে খাজনা দিতে ব্যর্থ হলে তার অন্যান্য সম্পত্তি যেমন- হালের বলদ, গরু, ছাগল, বা অন্য অস্থাবর সম্পত্তি দায়মাল হয়ে যেত। দায়মাল মানে দাবিকৃত সম্পত্তি, চুরি করা বা লুট করা সম্পত্তি। জমিদারের নায়েব-গোমেস্তারা খাজনা বকেয়া পড়লে কৃষকের কাছ থেকে জোর করে খাজনাবাবদ অন্য সম্পত্তি নিয়ে নিত যাকে দায়মাল বলা হতো। খরা, বন্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কোনও অজুহাত থেকেই কৃষক রেহাই পেত না। অন্য সম্পত্তি না থাকলে কৃষকের আবাদী জমি নিলাম ডেকে জমিদার অন্য ধনী কৃষকের নিকট বিক্রি করে দিত। ফলে বহু কৃষক-প্রজা দায়মালের কারণে পথের ফকির হয়ে যেত। তাইতো লালন বলেছেন,

‘এনে মহাজনের ধন বিনাশ করলি ক্ষ্যাপা

সদ্য বাকির দায়ে যাবি যমালয়ে

হবে রে কপালে দায়মাল ছাপা।’

জমিদারদের জীবনযাত্রা ছিল ব্যয়বহুল। তারা অমিতব্যয়ী ও বিলাসবহুল জীবনযাপন করতেন। তাদের সভা ভরপুর থাকত গায়ক-গায়িকা, নর্তক-নর্তকী, বাইজি, কবি-সভাকবি দ্বারা। তাদের বাড়িতে আনন্দ-অনুষ্ঠান লেগেই থাকত। আজকে কন্যার বিয়ে, কালকে ছেলের বিয়ে, তারপরের দিন কারো অন্নপ্রাসন, জন্মদিন, বিভিন্ন পূজা-পার্বন ইত্যাদি। প্রতিটি অনুষ্ঠান বিহারে প্রজাদের চাঁদা দিতে হতো। জমিদার রায়তের এ সম্পর্ক বহুকাল ধরে চলে আসছে, কিন্তু কোনও পরিবর্তন হয় না। তাইতো লালন আক্ষেপ করে বলছেন-

‘রাজা প্রজা সাধু মহাজন

শব্দগুলো সর্বকাল,

কিন্তু এড়াবে কি বেড়াপাকে

জড়িয়ে পড়ে সবাই ম’লো।’

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর বৃটিশ সরকার অনুধাবন করল যে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে ভারতের মতো বিশাল দেশের শাসনভার রাখা সমীচিন নয়। ১৮৫৮ সালে ভারতের শাসনভার অর্পিত হয় বৃটিশ পার্লামেন্ট তথা রাজা বা রানীর ওপর। পার্লামেন্টের অনুমোদনক্রমে বৃটেনের রানী মহারানী ভিক্টোরিয়া হলেন ভারত সম্রাজ্ঞী। ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড ক্যানিং হলেন ভাইসরয় (রাজ প্রতিনিধি)। কোম্পানির প্রায় সকল কর্মচারী তাদের পূর্বপদে বহাল থাকেন। যেই লাউ সেই কদু। একই মদ শুধু পাত্রের বদল। ইংরেজ নিজেই হচ্ছেন বেনিয়া। তাই ইংরেজ বনিকের বিরুদ্ধে মহারানী ভিক্টোরিয়ার কাছে অভিযোগ করলেও কোনও প্রতিকার মিলে না। লালন বলেন-

‘সেই ঘাটে মহারানীর দোহাই মানে না

সে যে নিজ হয় খোদ কোম্পানি।’

কার্ল মার্কসের মতে, মানুষের ইতিহাস শ্রেণি বিভাজনের ইতিহাস, শ্রেণি সংগ্রামের ইতিহাস, শোষণের ইতিহাস। যেদিন থেকে কৃষিকাজের আবিষ্কার হলো, সম্পদ সংরক্ষণের ব্যবস্থা হলো, সম্পদে ব্যক্তি মালিকানার সৃষ্টি হলো সেদিন থেকেই মানুষে মানুষে বিভাজনের সৃষ্টি হলো। সমাজে সৃষ্টি হলো শোষক-শোষিত, ধনী-দরিদ্র, সবল-দুর্বল, সুবিধাভোগী-সুবিধাবঞ্চিত, প্রভু-দাস, মালিক-শ্রমিক, আশরাফ-আতরাফ, ব্রাহ্মণ-শুদ্র প্রভৃতি। শোষণকে অব্যাহত রাখার জন্য সৃষ্টি হয় লাঠিয়াল বাহিনী, সামন্তপ্রভু, জমিদার, রাজা, রাষ্ট্র, ধর্ম। রাষ্ট্র শোষণকে অব্যাহত রাখার জন্য ডাণ্ডার (লাঠি) ভয় দেখাত। ধর্ম ঠাণ্ডা মাথায় মগজ ধোলাই করে মানুষকে অবদমন করে রাখত এবং রাখে। যারা শাসন কার্য পরিচালনা করত তারা ছিল অভিজাত। যেমন- রাজা, সামন্তপ্রভু, জমিদার, আমলা। আর যারা ধর্মীয় কার্য পরিচালনা করত তারা পুরোহিত বা যাজক সম্প্রদায়।

যাজক এবং অভিজাত এরা কেউ-ই উৎপাদন করে না, উৎপাদনের সঙ্গে জড়িতও নয়। এরা পরগাছা। অথচ এরাই সব কিছুর মালিক, সকল বিষয়ের হর্তাকর্তা। এদের এক দল অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে শক্তি প্রয়োগ করে মানুষকে শোষণ করে। আরেক দল ঠাণ্ডা মাথায় পরকালের ভয় দেখিয়ে মানুষকে শোষণ করে। শোষকরাই তাদের শোষণ অব্যাহত রাখার জন্য সমাজে সৃষ্টি করে দিল সামাজিক ভেদাভেদ। এ থেকে মুক্তির পথ কী? সে মুক্তির পথ কার্ল মার্কসের পূর্বে লালনই বাতলে দিয়েছেন। আর তা হলো অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য। সমাজে কেউ হবে না আশরাফ-আতরাফ, ব্রাহ্মণ-চন্ড্রাল, আমির-ফকির। সবাই হবে সমান। সবাই পাবে যার যার ন্যায্য পাওনা। লালন বলেন,

‘শোনায়ে লোভের বুলি

নেবে না কাঁধের ঝুলি

ইতর আশরাফ বলি

দূরে ঠেলে নাহি দেবে ॥

আমির ফকির হয়ে এক ঠাঁই

সবার পাওনা পাবে সবাই

আশরাফ বলিয়া রেহাই

ভবে কেহ নাহি পাবে॥’

লালন ফকিরের আন্দোলন শুধু সামাজিক ও ধর্মীয় আন্দোলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তাঁর মধ্যে রাজনৈতিক আন্দোলনও ছিল। লালন বাস করতেন গ্রামে। তখনও ভারতে মুক্ত রাজনীতির সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি যে লালন সরাসরি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়বেন। তিনি রাজনীতি সচেতন ছিলেন। তিনি ছিলেন মূলত দার্শনিক। তিনি দর্শন দিয়ে গেছেন, পথ দেখিয়েছেন, শোষণ মুক্তির কথা বলেছেন, সমতার কথা বলেছেন, সামাজিক ভেদাভেদ রোহিত করার কথা বলেছেন। আর সেটা কার্ল মার্কসের আগেই বলেছেন। তাই লালন ছিলেন সাম্যবাদ মতবাদের স্রষ্টা।

 

লেখকসহযোগী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ, ফরিদপুর। ই-মেইল- [email protected]

 

দ্রষ্টব্যঃ প্রকাশিত লেখাটি লেখকের একান্ত নিজস্ব মতামত এবং এর দায়-​দায়িত্বও লেখকের একান্ত নিজস্ব।

 

জাগরণ/এসকেএইচ