• ঢাকা
  • বুধবার, ০১ ডিসেম্বর, ২০২১, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
প্রকাশিত: অক্টোবর ১৭, ২০২১, ০৬:২১ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : নভেম্বর ৭, ২০২১, ০১:১০ এএম

পরমাণু অস্ত্রের মতো মজুদ হচ্ছে বিশাল জনগোষ্ঠী

পরমাণু অস্ত্রের মতো মজুদ হচ্ছে বিশাল জনগোষ্ঠী

ওমর ফারুক শামীম
ধর্ম অধর্মের কাছে প্রতিদিন পরাজিত হয়। আবার অধর্ম ধর্মের কাছে যুগান্তরে গিয়ে বিনাশ হয়। বুঝাতে চেয়েছি অধর্মের ঠুনকো ঠুনকো জিতে যাওয়া জমতে জমতে পাহাড়সম হয় এবং যুগান্তরে গিয়ে অতিদৃশ্যমান হয়ে ধর্মের কাছে হেরে যায়।

ধর্ম আর বিজ্ঞানের বৈপরীত্য চিরকালীন। বিজ্ঞান বলে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিথ্যা হলো ধর্ম। কারণ ধর্মের কোনো চাক্ষুষ ফলাফল দেখা যায় না। বিজ্ঞান পরকাল বিশ্বাস করে না। কিন্ত ধর্ম ইহকাল- পরকাল দুটোকেই মানবমনে জড়িয়ে দিয়েছে সৃষ্টির শুরু থেকে। তবে তা ছিলো নানানভাবে। কালে কালে, যুগে যুগে, ধর্মেরও সংস্কার হয়েছে, পরিবর্তন হয়েছে মানুষের জন্য। জীবনের বার্ধক্যে মানুষ ক্ষীণ হতে থাকে আর মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নেয়। বার্ধক্যের যন্ত্রণা আর মৃত্যুচিন্তাতেই ধর্ম তখন অধিকাংশ মানুষের পরলৌকিক ভরসা হয়ে ওঠে। এজন্যই ধর্ম আগেও ছিলো এখনো আছে এবং চিরকালীন থাকবে। ধর্ম আর বিজ্ঞানের দ্বন্দ্বও থাকবে। তবে ধর্মের নামে অধর্মের সংঘাত ধর্ম কখনোই সমর্থন করে না। ধর্ম চিরকালীন বলে মানুষদের একটি স্বার্থান্বেষি শ্রেণি খুব বুঝেশুনে ধর্মকে শাসন শোষণের হাতিয়ার বানিয়ে নিয়েছে। ধর্মের গায়ে নিজস্ব স্বার্থ মেখে বিপণনে সদা ব্যস্ত থাকে তারা। অথচ কেউই কারো পরলৌকিক সঙ্গী হবে না। কিন্তু ধর্মের নামে অপব্যবসা যেন তাদের নিত্যসঙ্গী। এদের শ্রদ্ধা ভক্তি বা বিশ্বাসের জায়গায় ধর্ম নেই। কিন্তু তারা আপাদমস্তক পোষাকি আর আচারি ধার্মিক। ধর্মের আচারি কাজ যেমন ভালো কথা বলা, অজু-নামাজ পোশাক আর নিজেকে প্রদর্শন করাই এদের প্রধান কাজ। এরা কখনোই কোনো বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ায় না। উল্টো সেই মানুষটি সম্পর্কে মনগড়া মন্তব্য করে বলে থাকেন- আল্লাহ তাকে পাপের শাস্তি দিচ্ছে। আমাদের বর্তমান ধার্মিক সমাজের একটি বিশাল অংশকে দখলে নিয়েছে এই প্রতারক শ্রেণির ধার্মিকেরা।

ছোটবেলা থেকে জেনে এসেছি ইসলাম সবচেয়ে উদার এবং শান্তির ধর্ম। কিন্তু পরিণত বয়সে এসে দেখছি শান্তির ধর্ম ইসলামকে বকধার্মিকরা কঠোর এবং কট্টর ধর্মে পরিণত করতে প্রায় সফল হয়ে গেছে। আমার প্রশ্নÑ তাহলে কি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই ধর্মবণিকরাই ধর্মের আসল চেহারা বদলে ফেলেছে? মনে হচ্ছে এ অনুমাণ মিথ্যে নয়; কারণ কোরআন হাদিসের একই আয়াতের তর্জমা করছে তারা ভিন্ন ভিন্ন। হাফেজ মুফতি মাওলানাদের মধ্যে এসব নিয়ে চলছে নানারকমের বিতর্ক। দল, উপদলে বিভক্ত হয়ে চলছে পাল্টাপাল্টি বিষোদাগার।

বিশ থেকে ত্রিশ বছর বয়সের দিকে আমিও নামাজ রোজা নিয়মিত করার চেষ্টা করতাম। কিন্তু এখন কোনটাই করি না। তার মানে আমি অধার্মিক বা ঈমান হারিয়ে ফেলিনি। এটুকু বলা যায় যে, আমার আচারি ধর্ম (লোক দেখানো ইবাদত) পালন বন্ধ আছে। তবে বিপদে-আপদে মানুষের সাহায্য করার চেষ্টা করি। সৎপথে উপার্জন করি। ন্যায়নিষ্ঠ পথে থাকার চেষ্টা করি। শয়নে স্বপনে আমি আমার সৃষ্টিকর্তাকে ভালোবাসি অন্তরে, হাতের আগুলে, ঠোঁটে, জিহবায়, নিশ্বাসের বিশ্বাসে আর নির্জন অন্ধকারে। প্রিয় কাবাশরীফ, আর প্রিয় রাসুলের সবুজ গিলাপের রওজা মোবারক স্বপ্নে দেখি-চোখে ভাসে। আমিই আমাকে বেহেশতে নিতে চাই না। হয়তো ধর্মের পুর্ণ পালন প্রতিপালন আমার মধ্যে নেই। আমি পারি না, বা করি না। কিন্তু তাই বলে আপনি আমাকে অধার্মিক বা কাফের, মোনাফেক বলবেন কেন! আপনাদের বেহেশত প্রত্যাশার ভিড়ে আমি দোজখেই যেতে চাই। আমার প্রতিপালকই আমার প্রাপ্য নির্ধারণ করবেন। আমার পরকালের জন্য আপনি বা আপনারা এত ব্যতিব্যস্ত কেন? আমাকে ধার্মিক বানাতে পারলে যে আপনার বেহেশত নিশ্চিত হবে তাওতো সঠিক নই।
কারণ আমার ধর্ম, পাপ-পুণ্য, আমার মনে, আমার কর্মেই। তাহলে কোন প্রণোদনার স্বাদে আপনি আমাকে ভুলশুদ্ধের মিশ্রিত পথে প্ররোচিত করছেন? আমরা সরল বিশ্বাসী, আল্লাহকে বিশ্বাস করি, আপনাদেরকেও বিশ্বাস করি- কারণ আপনারা আল্লাহর কথাই বলেন। আল্লাহর কথা বলতে গিয়ে যে নিজস্ব স্বার্থও রচনা করেন তাতেই আজ আমরা বিভ্রান্ত। যে কারণেই আপনাদের ওপর থেকে সচেতন মুসলমানদের বিশ্বাস উঠে যাচ্ছে এবং গেছে। আপনারা নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে করতে আমাদের মত বিশ্বাসীদের আজো অন্ধকারে বন্দি রেখেছেন। আল্লাহর পুর্ণ সৃষ্টিকে জ্ঞানের আলোতে দেখতে দিন আমাদের। আপনারা আগে ভিডিও দ‚রে থাক ছবি তুলতেও বারণ করতেন। আর এখন নিজেদের প্রয়োজনে ভিডিও বানান। টিকটকও তৈরি করেন। আপনাদের মোবাইলে পর্ণ ছবিও পাওয়া যায়। আপনারা কেবল আপনাদের স্বার্থ থাকলেই তা জায়েজ বলে থাকেন। বিধর্মী মারা গেলে বলেন, ফিনারে জাহান্নামা খালেদিনা ফিহা (মৃত ব্যক্তিকে দোজখে নিক্ষেপ করো)। হিন্দুর জমি দখল করলে হয়তো পাপ হবে, কিন্তু দোজখে যেতে হবে না। গ্রাম-গঞ্জে অন্যের তালাক দেয়া বউকে আবার ফিরিয়ে নিতে চাইলে আপনার ধর্মের নামে হিল্লা বিয়ে করে মজা নেন। আসামে মুসলিম নির্যাতন হয়েছে বলে বাংলাদেশের হিন্দুদের নির্যাতন করতে হবে, প্রতিমা-মন্দির ভাঙতে হবে!

ভারতবর্ষের সবচেয়ে সুন্দর এবং শ্রেষ্ঠ মন্দির সোমনাথ মন্দির কারা ভেঙেছে, কারা মন্দিরের মূল্যবান সব সম্পদ লুট করে নিয়ে গেছে আপনারা তা জানেন না। পুরো ভারতবর্ষটাই তো মুসলমানরা একসময় যুদ্ধ বাধিয়ে দখলে নিয়েছিলো। অপানার কখনোই চান না পুরোনো ক্ষত শুকিয়ে যাক। আমরা যেন শান্তিতে সম্প্রীতিতে বসবাস করতে পারি। এজন্য ওয়াজ-মাহফিলে বাবরি মসজিদের কথা মনে করিয়ে দেন অবুঝ মুসলমানদের। এর মূল কারণ সাধারণ মুসলমানরা জানেন না। জানেন ক্ষমতাসীন নেতা আর আপনাদের মতো কুচক্রী দোষরেরা। এ দেশে থেকে যাওয়া অর্পিত সম্পত্তি আর বাকি আড়াই তিন শতাংশের ঘরবাড়ি আর ভুমিই আপনাদের টার্গেট। ১০ টাকারটা ২ টাকায় কিনবেন। না পারলে ধর্মের নামে ষড়যন্ত্র করে আগুন জ্বালাবেন। হত্যা করবেন, ধর্ষণ করবেন। আর নামমাত্র বিচার হবে, আপনারা আপনাদের মতোই থেকে যাবেন। এরপর সংবিধানে বিসমিল্লাহ সংযোজনও সার্থক হবে, আর শতভাগ মুসলমানের দেশ হিসেবে আপনারাই থাকবেন এক বাগানের এক ফুল হয়ে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মুসলমানরাই লক্ষ লক্ষ মুসলমানকে হত্যা করছে। আমাদের দেশেও হয়তো অচিরেই দেখবো ওহাবী সুন্নী এই তরিকা আর সেই তরিকা পন্থীদের বোমা মারামারি। 

সত্য ইসলাম কখনোই এসব আজবগজবকে সমর্থন করেনি, আর কখনো করবেও না। মাঝখানে আপনারা হয়তো কিছুদিন রাজত্ব করবেন। এরপর আপনাদের ধ্বংস অনিবার্য। ধর্মের বেড়াজালে অধর্মের বীজ রোপন করেছেন আপনারাই। জ্ঞান- বিজ্ঞান থেকে আমাদের দ‚রে রেখে ধর্মের দোহাই দিয়ে শোষণ করাই আপনাদের উদ্দেশ্য। আপনাদের জন্যই পৃথিবীজুড়ে নাস্তিকের সংখ্যা বেড়েছে। ধর্মের নামে ব্যবসা বন্ধ করুন তাহলেই ধর্মের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা ভক্তি বিশ্বাস সবই বাড়বে। আপনারাও বেশি বেশি সম্মানীত হবেন। আপনারা সঠিক পথে আসলেই শান্তির ধর্ম ইসলামের আলো ছড়াবে।

এবার আসি অবিভক্ত ভারতবর্ষের এক সমাজ সংস্কারকের আলোচনায়। ১৮৫৭ সালে ভারতবর্ষে ব্রিটিশবিরোধী সিপাহী বিদ্রোহে জড়িত অধিকাংশরাই ছিলেন মুসলমান। হিন্দুরা সেই বিদ্রোহে তেমন উল্লেখযোগ্য ভুমিকায় ছিলেন না বলে দাবি করা হয়। বেশিরভাগ বিদ্রোহীকে মুসলিম মনে করে ব্রিটিশরা পরবর্তী শাসনকালে মুসলমানদের ওপর বঞ্চনার নীতি গ্রহণ করেন।

সেই বিদ্রোহের সময় অনেক ব্রিটিশ অফিসারদের কাছে প্রাণকর্তা হয়ে আবির্ভাব হন ভারতবর্ষের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের সন্তান। যাঁর নাম স্যার সৈয়দ আহমেদ খাঁন। যিনি অবিভক্ত ভারতবর্ষের মুসলমান সমাজের সংস্কারক ও পরবর্তীতে দ্বিজাতি তত্বের প্রবক্তা। যাঁর পরিকল্পিত প্রচেষ্টায় কুসংস্কারের অন্ধকারে ডুবে থাকা শিক্ষাহীন মুসলিমসমাজ অনেকটা আলোর পথে ফিরেছিলেন। তিনি ১৮৫৯ সাল থেকে ১৮৮৬ সাল পর্যন্ত মাত্র ২৭ বছরে  ভারতবর্ষের মুসলমানদেরকে জ্ঞানজাগরণের চেতনায় উদ্ভুদ্ধ করতে সক্ষম হন। মাত্র ২১ বছর বয়সে পিতা মুত্তাকী খানকে হারিয়ে অভিজাত সংসারের দায়িত্ব নেন লন্ডনফেরত উচ্চ শিক্ষিত স্যার সৈয়দ আহমেদ খাঁন। ১৮৪০ সালে ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানীতে কেরানী পদে চাকরি হয় তাঁর। চাকরির সুবাদে তিনি ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে যাওয়ার সুযোগ পান। সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের এই সৈয়দ আহমেদ ছিলেন দিল্লির মুঘল বাদশা আকবরশাহ-দুই এর ঘনিষ্ঠজন মুত্তাকী খানের মেধাবী সন্তান। ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করতে গিয়ে মুসলমান জনগোষ্ঠীর কুসংস্কারাচ্ছন্ন জীবনাচরণ তাকে ব্যথিত করে। মেধা আর যোগ্যতায় তিনি কেরানী থেকে পদোন্নতি পেয়ে একসময় উত্তর প্রদেশে আমিনের দায়িত্ব পান। মুসলমান জনগোষ্ঠীর প্রতি তাঁর আন্তরিক প্রীতি ক্রমশ বাড়তে থাকে এ কারণে যে, মোল্লা মুন্সিদের ভুল পরিচালনা আর চাপিয়ে দেয়া কুসংস্কার এ জনগোষ্ঠীকে অশিক্ষা-কুশিক্ষার অন্ধকারে তলিয়ে নিচ্ছে। অথচ ভারতবর্ষের হিন্দুরা তখন ব্রিটিশদের তোয়াজ করে শিক্ষা চাকরি ও জীবনযাপনের নানান ক্ষেত্রে তরতর করে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। অন্যদিকে শুধুমাত্র  কোরআনশিক্ষিত মুসলমানরা হিন্দুদের গোলামিই করে যাচ্ছেন। শিক্ষাজীবনের শুরুতেই মায়ের অনুপ্রেরণায় কোরআন শিক্ষায় শিক্ষিত হন স্যার সৈয়দ আহমেদ খাঁন। শিক্ষানুরাগী মা আজিজুননিজার ইচ্ছায় আরবী, ফারসী, উর্দু, ইংরেজি,  অংক ও বিজ্ঞানেও তিনি পারদর্শিতা লাভ করেন। 

মুসলমানদের প্রাত্যাহিক জীবনে ধর্মের নামে মোল্লাদের চাপিয়ে দেয়া নানান কুসংস্কার আর অসঙ্গতি স্যার সৈয়দ আহমেদকে বিচলিত করতো। কারণ তিনি নিজেও কোরআনশিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন, ঠিক বেঠিক বুঝতে পারতেন। এমন অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবন থেকে মুসলমানদের উদ্ধার করতে বিচ্ছিন্ন উপায় না খুঁজে তিনি সুদূরপ্রসারি এক মহাপরিকল্পনা আঁকতে থাকেন তাঁর হৃদয়ে। কোরআন শিক্ষার পাশাপাশি পাশ্চাত্য শিক্ষায় ( ইংরেজি, অংক, যুক্তিশাস্ত্র ও বিজ্ঞান) শিক্ষিত করে তুলতে পারলেই ভারতবর্ষের মুসলমানরা হিন্দুদের গোলামি থেকে মুক্তি পাবেন। এমন আত্মবিশ্বাসই গেঁড়ে বসেছিলো তাঁর মনে। আজকের আলোকে অনুমিত হয় তাঁর ওই বদ্ধমূল ধারণাই ঠিক ছিলো। তিনি মুসলমানদের আলোর পথে আনতে গিয়ে বহুবার মোল্লাদের একটি অংশের রোষানলেও পরেছিলেন। মোল্লারা তাঁকে কাফের মোনাফেক আখ্যা দিয়ে হত্যা করতে চেয়েছিলো কয়েকবার। তাঁর সৌভাগ্য ছিলো যে তিনি ইংরেজদের সুদৃষ্টিতে ছিলেন। যে কারণে মোল্লারা সফল হতে পারেনি। ইংরেজদের সুদৃষ্টিতে থাকার কারণ ছিলো ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের সময় তিনি অনেক ব্রিটিশ অফিসারকে নানাভাবে আশ্রয় দিয়ে বিদ্রোহীদের হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন। এছাড়া ভারতবর্ষে ব্রিটিশদের শাসনতান্ত্রিক কাঠামোতে হিন্দু কর্তাদের তোয়াজ না করে তিনি শাসক ব্রিটিশদেরই আনুকুল্য লাভ করার কৌশল নিয়েছিলেন। মুসলমানদের উন্নতির পরিকল্পনা মাথায় রেখেই তিনি ব্রিটিশদের আনুকুল্যে বেশি ঝুঁকে পরেন। সিপাহী বিদ্রোহের পর থেকে ব্রিটিশরা মুসলমানদের শত্রু ভাবলেও তিনিই অশিক্ষা-কুশিক্ষার কথা বুঝিয়ে মুসলমানদের প্রতি ব্রিটিশদের আনুকুল্য তৈরি করে শিক্ষাসহায়তা নেয়া শুরু করেন। সেই ধারাবাহিকতায় ভারতবর্ষের মৌড়াবাদে ১৮৫৯ সালে তিনিই প্রথম মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। সেই মাদ্রাসায় কোরআন শিক্ষার পাশাপাশি ইংরেজি, অংক, যুক্তিশাস্ত্র ও বিজ্ঞান  পড়ানো বাধ্যতামূলক করা হয়। মাদ্রাসা শিক্ষায় এমন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মোল্লারা ফের তাঁর বিরোধিতা করেন। কিন্তু তিনি সাধারণ মুসলমানদের মাঝে ধীরে ধীরে পাশ্চাত্য শিক্ষালাভের গুরুত্ব বোঝাতে সক্ষম হন। এরপর শিক্ষা, চাকরি ও সমাজের বিভিন্ন অঙ্গনে মুসলমানরা এগুতে থাকে। তিনি বলতেন- ‘আল্লাহ বলে এক মোল্লা বলেন আরেক’ অর্থাৎ আল্লাহ বলেছেন একটা আর মোল্লারা বলছেন আরেকটা।

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর ব্রিটিশরা ভারতবর্ষের শাসনকাঠামোতে ‘হিন্দু মুসলিম ভাগ কর আর শাসন কর’ এমন গোপন কৌশল অবলম্বন করে।

স্যার সৈয়দ আহমেদ খাঁন পিছিয়ে থাকা মুসলমানদের এগিয়ে নিতে পৃথক কিছুর চিন্তা হয়তো মনে মনেই রেখেছিলেন। যা প্রকাশ পেয়েছে ১৮৮৬ সালে অল ইন্ডিয়া মোহামেডান কনফারেন্স আহবান করার মধ্য দিয়ে। এর মাত্র এক বছর আগে ১৮৮৫ সালে অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস গঠিত হয়। অল ইন্ডিয়া মোহামেডানের সেই কনফারেন্সে তিনি ভারতবর্ষের উচ্চবিত্ত মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তসহ সকল শ্রেণির মুসলমানদের একটি অংশকে উপস্থিত করতে পেরেছিলেন। সেই কনফারেন্সে মুসলমানদের রাজনীতিতে আসা, চাকরিতে আসা, শিক্ষায় বেশি বেশি অংশগ্রহণ করার আহবানসহ দ্বিজাতি তত্বের প্রয়োজনীয়তা উপস্থাপন করেছিলেন। 

স্যার সৈয়দ আহমেদ খাঁন ভারতবর্ষে অধর্মের অন্ধকারে নিমজ্জিত মুসলমানদের আলোর পথে আনতে কর্মময় জীবনের সঙ্গী করে নিয়েছিলেন এক দীর্ঘ পরিকল্পনাকে। সেই পরিকল্পনায় ছিলো সর্বাগ্রে মুসলমানদের শিক্ষার উন্নয়ন। সে পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ১৮৬৩ সালে উত্তর ভারতের গাজিপুরে একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৬৪ সালে আলীগড়ে সাইন্টিফিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৭১ সালে ‘কমিটি ফর অ্যাভান্সমেন্ট অব লার্নিং অ্যামং দ্য মোহামেডান ইন ইন্ডিয়া’ গঠন করেন। ১৮৭৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন অ্যাংলো ওরিয়েন্টাল  কলেজ। যেটি পরে আলীগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটিতে রূপান্তর হয়। এরপর ১৮৭৮ সালের শেষের দিকে প্রতিষ্ঠা করেন ‘মোহামেডান এসোসিয়েশন’ যেটি একসময় দ্বিজাতি তত্বের রাজনৈতিক ইস্যুর চর্চা শুরু করে।

স্যার সৈয়দ আহমেদ খাঁন ভারতবর্ষে মুসলিম সমাজের সংস্কারকের ভুমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। এজন্য তিনি ‘মুসলমানদের রামমোহন’ বলে বিজ্ঞজনদের কাছে প্রশংসিত হয়েছিলেন। তিনি অনেকের কাছে নিন্দিত যেমন ছিলেন, তেমনি নন্দিতও ছিলেন।

ভারতবর্ষের বিশাল হিন্দুজনগোষ্ঠীর কাছে মুসলমানরা ছিলো যেন বটবৃক্ষের নীচের তৃণলতার মতো। শাসন শোষণ আর সামাজিক বৈষম্যে অনেকটা গোলাম হয়ে ছিলেন মুসলমানরা। ১৮৭৫ সালে মুসলমানদের অধিকার আদায়ে আলীগড় আন্দোলনের নেতৃত্বও দিয়েছিলেন তিনি।

স্যার সৈয়দ আহমেদ খাঁন এর মুসলিম সমাজ সংস্কারের এই বিশাল কর্মযজ্ঞের ফলে আজ বিভক্ত ভারতের বিভিন্ন দেশে মুসলমানদের মধ্যে কবি, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, রাজনীতিক, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, সাংস্কৃতিকসহ অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব তৈরি হয়েছেন। দ্বিজাতি তত্বের পক্ষে বিপক্ষে আজো আলোচনা সমালোচনা হয়ে থাকে।  আজকের মুসলমান সমাজ তাঁকে কতটুকু মনে রেখেছেন তা মালুম করা কষ্টসাধ্য।  তবে এক অন্ধ বিশ্বাসের বিভাজন থেকে আমরা যে আজও মুক্তি পাইনি তার জ¦লন্ত উদাহারণ সাম্প্রতিক বাংলাদেশ।

ব্রিটিশরা তাদের হীনস্বার্থ হাসিল করেছে ভারতবর্ষের হিন্দু-মুসলিমদের বিভাজনকে পুঁজি করে। আর হিন্দু মুসলিমরা মনে করলো তারা বিভাজিত হয়েছে নিজেদের প্রয়োজনে। আসলে কোনটি ঠিক? আমার ভাবনায় দুটির একটিও নই। আসল কথা হলো ভারতবর্ষের মুসলমান সমাজের অশিক্ষা-কুশিক্ষাই তাদের অন্ধ গলির বন্ধ দ্বারে আটকে রেখেছিলো। যার ফলে বিভাজনের কারণ সৃষ্টি হয়েছিলো। (এটি আমার ব্যক্তিগত অভিমত, অনেকে ভিন্নমতও পোষণ করতে পারেন) দেশবিভাগের পর হিন্দু-মুসলমানরা পৃথক রাষ্ট্র ও সামাজিক জীবনে উন্নতি লাভ করলেও মনোবৈকল্য রয়ে গেছে দেড়শ বছর আগের মতোই। 

স্যার সৈয়দ আহামেদ খাঁন কোরআন শিক্ষার সঙ্গে মুসলমানদের পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চেয়েছিলেন রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা আর অধিকার আদায়ের জন্যে। তিনি এ ক্ষেত্রে আংশিক সফলও হয়েছিলেন। কিন্তু দ্বিজাতি তত্বের বিভাজনে পৃথক রাষ্ট্র পেয়ে মুসলমানরা আবারো ফিরে গেছে ধর্মীয় গোঁড়ামির দিকে। আর রাজনৈতিক ফায়দা নিতে শাসকশ্রেণি এক্ষেত্রে ধারাবাহিক প্রশ্রয় দিয়ে গেছে। যারফলে মুসলমানদের এক বিশাল অংশ এখনো সেই তিমিরেই রয়ে গেছেন। শাসকদের একটি শ্রেণি ধর্মকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের আড়ালে রেখে ফুঁফিয়ে ফুলিয়ে ক্রমশ নিয়ে গেছেন পুরোনো দিনের অন্ধকারে।

হিন্দু-মুসলিমদের ধর্মীয় পার্থক্য, সাংস্কৃতিক পার্থক্য, অর্থনীতির পার্থক্য, শাসনসুবিধার পার্থক্য আর মনোজাগতিক পার্থক্যের কারণে দেশভাগের পরও এসব বৈপরীত্যকে সামনে বসিয়ে রেখেছি আমরা। শিক্ষিত মুর্খ, অশিক্ষিত মুর্খ আর ধর্মীয় মুর্খদের মিশেলে (সবাই নই) আমরা তৈরি হয়েছি এক ককটেল জাতিতে। একটু উনিশ-বিশ হলেই আমাদের মননে সাম্প্রদায়িক বিস্ফোরণ ঘটে। এর সুবিধা নেয় দেশের রাজনৈতিক দল, বিদেশী গোয়েন্দা আর সমাজের কুচক্রী মহল।

বঙ্গীয় তটের উন্নয়নশীল ডিজিটাল বাংলাদেশে সহজ সরল মুসলমানেরা একদল মুর্তিমান মোল্লাদের (সবাই নই) কাছে জড়বিশ্বাসীদের মত যেন জিম্মি হয়ে গেছেন। এরা কোনো যুক্তির ধার ধারে না। এসব মোল্লাদের কথাই যেন তাদের কাছে কোরআন-হাদিস। এসব মোল্লাদের কথায় দেশের অনেক মুসলমান আগুনেও ঝাঁপ দিতে প্রস্তুত। স্পর্শকাতর উছিলার নামে দেশের নাগরিকদের এক বিশাল অংশকে একবিংশ শতকেও অবচেতন রাখা হয়েছে চরম উদাসীনতায়।

আমাদের অর্থনীতি আর কাঠামোগত উন্নতি হলেও নৈতিক উন্নয়নে অনেক পিছিয়ে আছি আমরা। যেজন্য আজকের বাংলাদেশে আরেকজন মুসলিম সমাজ সংস্কারকের প্রয়োজন অনুভব করছি আমি ও আমার মতো অনেকে। ধর্মীয় অনুভুতি আর ধর্মীয় শিক্ষার নামে কোরআন হাদিসের ভুল ব্যখ্যা দিয়ে দেশের এক বিশাল জনগোষ্ঠীকে পরমাণু অস্ত্রের মত তৈরি ও মজুদ করা হচ্ছে, যা আমাদের জন্য ভয়াবহ দুঃসংবাদ। অন্তত এমন বিপজ্জনক ভবিষ্যত থেকে রেহাই পেতে আমাদের জন্য আরেকজন স্যার সৈয়দ আহমেদ প্রয়োজন। 

স্যার সৈয়দ আহমেদ ১৮৭৮ সালে লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য পদ লাভ করেছিলেন। যে কাউন্সিল দেশের আইন প্রণয়নের দায়িত্ব পালন করে থাকেন। ভারতবর্ষে ব্রিটিশ প্রশাসনের গভর্নর জেনারেল ভাইসরয় মুসলমান সমাজে স্যার সৈয়দ আহমেদ খাঁনের অভুতপুর্ব জনপ্রিয়তার কারণেই তাঁকে লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে যুক্ত করেছিলেন। ১৮৯৮ সালের ২৭ মার্চ ভারতবর্ষের মুসলিম সমাজ সংস্কারক ও আলীগড় আন্দোলনের প্রাণপুরুষ ইহলোক ত্যাগ করেন। দ্বিজাতি তত্বের প্রবক্তা ও মুসলিম সমাজ সংস্কারক স্যার সৈয়দ আহমেদ খাঁনের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি সাম্প্রদায়ীক বাংলাদেশের মাটি থেকে। আলোচনা শেষ করবো বন্ধু ও শুভাকাঙ্খী ব্রজকিশোর ত্রিপুরার একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়ে- বৈচিত্র্যময়, সুন্দর আর সুবাস ছড়ানো হরেক রকম ফুলের সমাহারে সমৃদ্ধ বাগান সুন্দর নাকি এক প্রজাতির ফুলের বাগান সুন্দর? কোনটি সুন্দর? সাতটি রং নিয়েই রংধনু সুন্দর নাকি এক রং এর রংধনু হলে সুন্দর হতো? এক পদের রান্না করা সবজি সবসময়ের জন্য ভাল নাকি নানান পদের মিক্সড সবজি তরকারি ভাল? কোনটি ভাল? বাংলাদেশে বহু জাতির, বহু ধর্মের, বহু ভাষার, বহু সংস্কৃতির বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশটা ভাল নাকি শুধু এক জাতির, এক ভাষার, এক ধর্মের, এক সংস্কৃতির দেশ ভাল?

আমাদের তৃষ্ণার্ত মনন সবসময় সুন্দরের খোঁজে থাকি, আর তা করি বলেই আমরা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ভ্রমণ করে করে মনের তৃষ্ণা মেটাই অন্য দেশ, অন্য এলাকা, ভিন্ন মানুষ, ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন বিশ্বাস, মূল্যবোধ, বৈচিত্র্যময়-রঙিন পোষাক আশাক আমাদের মনে সত্যিই বিস্ময় তৈরি করে মনকে আন্দোলিত করে। পৃথিবীতে এত এত বৈচিত্র্যতা আছে বলেই এ গ্রহ এত সুন্দর। তাহলে সে সৌন্দর্যকে, সে বৈচিত্র্যময়তাকে কে পায়ে দলতে পারে!!?? কারা অস্বীকার করতে পারে???

আজ কেবলই কবি নজরুলের বচন মনে পড়ছে, মনে পড়ছে রবি ঠাকুরের বিখ্যাত উক্তিগুলো। কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেন ‘বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে, আমরা তখনও বসে - বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজেছি ফিকাহ ও হাদিস চষে’। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন- ‘সাত কোটি বাঙালিরে হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালী করে মানুষ করনি’।

নোট : দূর্গাপূজার মণ্ডপে মণ্ডপে হামলায় দেব-দেবীর প্রতিমা ভাংচুর সত্বেও আমরা এবং আমাদের এ দুরাচারী মনন একদিন উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে।

লেখক II বার্তা সম্পাদক, দৈনিক জাগরণ।

দ্রষ্টব্য: এই প্রবন্ধ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে আহত করার উদ্দেশ্যে লেখা হয়নি। তবু দৃষ্ঠিভঙ্গির পার্থক্যের কারণে কারো সঙ্গে মিলে গেলে তার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী।