• ঢাকা
  • শুক্রবার, ২৭ মে, ২০২২, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
প্রকাশিত: অক্টোবর ২৭, ২০২১, ১১:৪৬ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : অক্টোবর ২৭, ২০২১, ১১:৪৮ পিএম

রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম কি অপরিহার্য?

রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম কি অপরিহার্য?
জাগরণ গ্রাফিক্স ডেস্ক।

আমি ইতিহাসের একজন নগণ্য ছাত্র হিসেবে যতটুকু জানি তা থেকে এতটুকু বলতে পারি যে, পৃথিবীর প্রথম লিখিত আইন হচ্ছে হাম্মুরাবির আইন সংকলন (২৮২ ধারা বিশিষ্ট)। আর প্রথম লিখিত সংবিধান হচ্ছে মদিনা সনদ। যিনি এ সনদ প্রণয়ন করেছিলেন, তিনি হলেন আল্লাহর নবি হযরত মুহাম্মদ সঃ। মদিনা সনদ ছিল রাষ্ট্র পরিচালনার বিধান। এ মদিনা সনদে ৪৭টি (মতান্তরে ৫৩ টি) ধারা আছে। মদিনা সনদের কোনো ধারায় ইসলাম ধর্মকে রাষ্ট্র ধর্ম করা হয়নি বা রাসুল সঃ তা করেননি। এমনকি রাসুল সঃ মক্কা বিজয়ের পরও ইসলামকে রাষ্ট্র ধর্ম করেননি, বিদায়ী হজের ভাষণেও তা বলেননি। পবিত্র কুরআনের কোথাও উল্লেখ নেই যে, ইসলামকে রাষ্ট্র ধর্ম করতে হবে। কুরআনকে বলা হয় ‘কমপ্লিট কোড অব লাইফ’- মানে পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। বিষয়টি যদি এতই গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে তা কুরআনে থাকবে না কেন? যা কুরআনে নেই, নবিজি সঃ রাষ্ট্রের কর্ণধার হয়েও যা করেননি, তা নিয়ে যারা মহা ইসলামিস্ট সাজতে চান তাতে তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলই বড় উদ্দেশ্য। তারা ধর্মকে আত্মিক উন্নতিতে নয়, রাজনৈতিক উদ্দেশে ব্যবহার করছেন। ধর্মকে যখন রাজনৈতিক উদ্দেশে ব্যবহার করা হয়, তখন ধর্ম আর ধর্ম থাকে না, তা হয়ে পড়ে সংঘাতের বিষয়। ধর্মকে যারাই নিজ স্বার্থ হাসিলের জন্য রাজনীতিতে নিয়ে এসেছেন, তারই ধর্মকে কলুষিত করেছেন। তার ফল দেখতে পাচ্ছি পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, নাইজেরিয়া, সিয়েরালিওনে। সে জায়গাগুলোতে প্রতিযোগিতা চলছে বোমাবাজি, মরা আর মারার। হিন্দুরা চলে যাওয়ার পর বাংলাদেশেও এই মহান কাজটি শুরু হবে! কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘ধর্মের বেশে মোহ’ কবিতায় বলেছেন,

‘ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে

অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে।’

পৃথিবীতে ৫৬টি মুসলিম দেশ আছে। তন্মধ্যে ২৬টি দেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। তাহলে বাকি ৩০টি দেশ কি অমুসলিম হয়ে গেছে? উমাইয়া, আব্বাসীয়, অটোমান, সুলতানি, মুঘল, ব্রিটিশ আমলে রাষ্ট্র ধর্ম ছিল না। ভারতে ইসলাম প্রচার করেছে সুফি সাধকরা। সুফিরা হিন্দু মুসলমান উভয়কে মুরিদ করেছে। যার যা ধর্ম, সে সেই ধর্মই পালন করেছে। গান বাজনা করেছে। তাই বলে তারা কি মুসলমান ছিলেন না? ইসলামের কোনও গুণ কি এরশাদের ছিল? অথচ তিনি করলেন ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম। তার কাছে কি দেশের জনগণ দাবি করেছিল ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করার জন্যে? আইয়ুব খান ব্যতীত জবর দখলকারী স্বৈর শাসকেরা ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছেন। তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হোসেন ১৯৭২ সালের সংবিধানে ফিরে যাওয়ার কথা বলে মনে হয় মহা পাপ করে ফেলেছেন। তাকে মহান ধার্মিক মোল্লা ভাইয়েরা ওয়াজে, জনসমাবেশে, ইউটিউবে, ফেসবুকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করছেন; নাস্তিক, হিন্দু, ইসলামের শত্রু হিসেবে ঘোষণা করছেন; তাকে জানাযা না দেয়ার কথা বলেছেন! তাহলে ১৯৭২ সালের সংবিধান যারা প্রণয়ন করেছেন, তাঁরা কি নাস্তিক আর হিন্দু ছিলেন? তাহলে বোঝা যায়, নাস্তিক আর হিন্দু বাংলাদেশ স্বাধীন করেছে। সে দিন আপনারা কোথায় ছিলেন? ১৯৭১ সালে আপনারা যদি আজকের মতো শক্তিশালী থাকতেন, তাহলে বাংলাদেশ কি স্বাধীন হতো? কেউ স্বাধীনতার কথা উচ্চারণ করলে তাকে আপনারা কী করতেন- তা সহজেই অনুমেয়। ভাগ্যিস দেশটা ১৯৭১ সালে স্বাধীন হয়ে গিয়েছিল।

যে সকল ধার্মিক ভাইয়েরা দেশের কবি, লেখক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, বিচারপতি, নেতা- যারা একটু ভিন্ন মত পোষণ করেন, তাদেরকেই কটুক্তি, গীবত করেন ও নাস্তিক, মুরতাদ ঘোষণা করেন। আবার তারাই কুরআন অবমাননার অজুহাত তুলে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মন্দির, বাড়িঘর ভাঙচুর, অগ্নি সংযোগ করবেন, খুন, ধর্ষণ করবেন-  এগুলো কি আল্লাহ, রসুল সঃ করতে বলেছেন? যাকে পছন্দ হবে না তাকেই ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ধার্মিক ভাইয়েরা শাস্তি দেন! ২৯/১০/২০২০ তারিখে আবু ইউসুফ মোঃ সাহিদুন্নবি জুয়েল নামে রংপুরের এক লোক  লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারির এক মসজিদে নামাজ পড়তে যান। তার বিরুদ্ধে কুরআন অবমাননার অভিযোগ তুলে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। শুধু তাই নয়, আগুন দিয়ে লাশটি পুড়িয়ে ভস্ম করে ফেলা হয়। ধর্মের নামে ধার্মিকরা যা খুশি তাই করে বেড়ান। ধার্মিক ভাইয়েরা কি কুরআনের নিচের আয়াতগুলো একটু পড়ে দেখবেন, আপনারা যা করেন তা কুরআনের সঙ্গে কতটুকু সঙ্গতিপূর্ণ? যেমন-

“(হে রাসুল!) তোমার প্রতিপালক ইচ্ছা করলে পৃথিবীতে যারা আছে সকলেই বিশ্বাস করত; (কিন্তু তিনি তা চাননি) তাহলে কি তুমি বিশ্বাসী হওয়ার জন্য মানুষের উপর জবরদস্তি করবে?- ১০ সুরা ইউনুস : ৯৯ আয়াত। বিশ্বাসের ব্যাপারে আল্লাহ নিজেই যেখানে জোর জবরদস্তি করতে নিষেধ করেছেন; অথচ সেই কাজটিই অহরহ ঘটছে। আবার দেখা যায়, ওমুক আল্লাহকে অবমাননা করেছে। সুতরাং ধর ওকে, পেটাও, পোড়াও। এসব কথা কোথায় আছে? আল্লাহ পরম পরাক্রমশালী। তিনিই তো পাপীকে শাস্তি দিবেন। তিনিই বিচার করবেন। তাহলে মানুষের এত অধৈর্য হওয়ার মানে কী? মানুষই যদি পাপীর বিচার করে, তাহলে আল্লাহ কী করবেন? আল্লাহ তো কাউকে তাঁর পক্ষভুক্ত হয়ে শাস্তি দিতে বলেনি। কেউ যদি আল্লাহকে ছেড়ে অন্যকে বিশ্বাস করে বা অজ্ঞানতাবশত আল্লাহকে গালি দেয়, তাহলেও তাকে আঘাত তো দূরের কথা, গালি দিতেও তিনি নিষেধ করেছেন। আল্লাহ বলেছেন, “আর তারা আল্লাহকে ছেড়ে যাদের ডাকে তাদেরকে তোমরা গাল দেবে না, কেননা, তারা (সীমালংঘন করে) অজ্ঞানতাবশত আল্লাহকেও গাল দেবে। এভাবে প্রত্যেক জাতির চোখে তাদের কার্যকলাপ শোভন করেছি। তারপর তারা তাদের প্রতিপালকের কাছে ফিরে যাবে। তারপর তিনি তাদেরকে তাদের কৃতকার্য সম্বন্ধে জানিয়ে দেবেন।” - ৬ সুরা আনআম : ১০৮ আয়াত। আল্লাহ একাধিক আয়াতে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার জন্য বলেছেন। যেমন- ‘হে কিতাবিগণ! তোমরা তোমাদের ধর্ম সম্বন্ধে বাড়াবাড়ি করো না ও আল্লাহ সম্বন্ধে সত্য বলো। -৪ সুরা নিসা: ১৭১ আয়াত। বলো, ‘হে কিতাবিগণ! তোমরা তোমাদের ধর্ম সম্বন্ধে অন্যায় বাড়াবাড়ি করো না।’- ৫ সুরা মায়িদা : ৭৭ আয়াত। ধর্মে কোনো জবরদস্তি নেই। সৎ পথ, ভ্রান্ত পথ থেকে সুস্পষ্ট হয়েছে। -সুরা বাকারা : ২৫৬ আয়াত। তোমাদের ধর্ম তোমাদের, আমার ধর্ম আমার। - ১০৯ সুরা কাফিরুন : ৬ আয়াত। বিশ্বাসীদের তুমি বলো তারা যেন ক্ষমা করে তাদেরকে যারা আল্লাহর শাস্তিতে বিশ্বাস করে না, আল্লাহ তো প্রত্যেক সম্প্রদায়কে তার কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিবেন। - ৪৫ সুরা জাসিয়া : ১৪। আর পরমতসহিষ্ণুতার বিষয়ে বহু আয়াত আছে। যেমন- ‘পূর্ব ও পশ্চিম দিকে তোমাদের মুখ ফেরানোতে কোনও পুণ্য নেই। কিন্তু পুণ্য আছে দুঃখ, কষ্ট ও যুদ্ধের সময় ধৈর্যধারণ করলে।’ -সুরা বাকারা : ১৭৭ আয়াত। ‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা ধৈর্য ধরো। ধৈর্য ধারণে প্রতিযোগিতা করো ও সর্বদা প্রস্তুত থাকো, আর আল্লাহকে ভয় করো যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।’ - ৩ সুরা আলে ইমরান : ২০০ আয়াত। যারা ধৈর্য ধরে আল্লাহ তো তাদেরকে ভালোবাসেন। ৩ সুরা আজ জুমার: ১০ আয়াত। আল্লাহর পৃথিবী প্রশস্ত। ধৈর্যশীলদের তো অশেষ পুরস্কার দেওয়া হবে। -৩৯ সুরা আলে ইমরান : ২০০ আয়াত। এ রকম ধৈর্য ও সহনশীলতার ব্যাপারে আরো অনেক আয়াত আছে। আমরা কথায় কথায় মানুষ হত্যায় মেতে উঠি। এ ব্যাপারেও আল্লাহ পবিত্র কুরআনে কী বলেছে দেখুন। (মানুষ খুন ও ধ্বংসাত্মক কাজের শাস্তি ব্যতীত) কেউ যদি কাউকে হত্যা করে, সে যেন গোটা মানব জাতিকেই হত্যা করলো; (আবার এমনিভাবে) যদি কেউ একজনের প্রাণ রক্ষা করে তবে সে যেন গোটা মানব জাতিকেই বাঁচিয়ে দিলো। -৫ সুরা মায়িদা : ৩২ আয়াত।

শরিয়া আইনেই হোক আর রাষ্ট্রীয় আইনেই হোক, কাউকে শাস্তি, মৃত্যুদণ্ড দিবেন, দেন, আপত্তি নেই। নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্য দিয়ে তো তা দিতে হয়। শরিয়া আইনে শাস্তি দিলেও তো শরিয়া বোর্ড লাগবে। কাজী, মুফতি, খতিব, খলিফা এ রকম কেউ রায় দিবেন। সেখানেও আপিলের বিধান থাকবে। আর রাষ্ট্রীয় আইনে বিচার হলে রাষ্ট্রের আইন, আদালত রায় দিবে। রায় ছাড়া শাস্তি হয় কিভাবে? রায় ছাড়া শাস্তি প্রয়োগ তো শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কোনও নিয়ম মানব না, কিছু তোয়াক্কা করব না, গায়ের জোরে সব করব- এটা কি ধার্মিকের লক্ষণ? কাজী নজরুল ইসলামের কথা দিয়ে শেষ করছি। নজরূল ইসলাম তাঁর ‘মানুষ’ কবিতায় বলেন,

‘ও’ কারা কোরান, বেদ, বাইবেল চুম্বিছে মরি’ মরি’

ও’ মুখ হইতে কেতাব-গ্রন্থ নাও জোর ক’রে কেড়ে,

যাহারা আনিল গ্রন্থ-কেতাব সেই মানুষেরে মেরে ?

পুজিছে গ্রন্থ ভণ্ডের দল! মূর্খরা সব শোনো,

মানুষ এনেছে গ্রন্থ; -গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো।’

 

লেখকসহযোগী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ, ফরিদপুর। ই-মেইল- [email protected]

 

দ্রষ্টব্যঃ প্রকাশিত লেখাটি লেখকের একান্ত নিজস্ব মতামত এবং এর দায়-​দায়িত্বও লেখকের একান্ত নিজস্ব।

 

জাগরণ/এসকেএইচ