• ঢাকা
  • শনিবার, ২৮ মে, ২০২২, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১৬, ২০২১, ০৩:৫৬ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : ডিসেম্বর ১৬, ২০২১, ০৯:৫৬ এএম

নীতি ছাপিয়ে আবেগ

নীতি ছাপিয়ে আবেগ
ছবি-সংগৃহীত । আনন্দ বাজার।

বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রদূত ও হাই কমিশনারের দায়িত্ব পালন করা বিদেশ মন্ত্রকের এক প্রবীণ কর্তা বুঝিয়েছিলেন, কূটনীতিতে ‘স্থায়ী বন্ধু’ হয় না, দু’টি দেশকে ‘স্থায়ী শত্রু দেশ’ হিসাবে চিহ্নিত করাও মুর্খামি। দু’দেশের মধ্যে ‘দেনা-পাওনা’র বোঝাপড়া যতক্ষণ ঠিক থাকবে, এগিয়ে চলবে সম্পর্ক।

কূটনীতির এই সংজ্ঞাকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে ধাক্কাই খেতে হয়। যে দেশের জন্যে যুদ্ধে ১৯ হাজার ভারতীয় সৈন্য প্রাণ দিয়েছেন, দেড় কোটি শরণার্থীর ঢেউ সামলাতে হয়েছে বুক পেতে, তার সঙ্গে সম্পর্ক শুধু কেঠো দেনা-পাওনার? ‘সৌহার্দ্য’, ‘মৈত্রী’, ‘বন্ধন’  শব্দগুলোর ঠাই শুধু  দু’দেশের মধ্যে ছোটা ট্রেন-বাসের নামে?

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছে বাংলাদেশ। দু’দেশের সম্পর্ক স্থাপনেরও ৫০ বছর এটা। ইতিহাস বলছে, ’৭১-এর পর আওয়ামী লীগ যখনই বাংলাদেশের ক্ষমতায় থেকেছে, বন্ধুত্ব বেড়েছে ভারতের সঙ্গে। ভারতে তখন কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকলে মধুরতর হয়েছে রসায়ন। এর কূটনীতিক ব্যাখ্যা বাংলাদেশর স্বাধীনতাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের বন্ধন, ইন্দিরা গাঁধী ও শেখ মুজিব যা অচ্ছেদ্য করে গিয়েছেন। এই ৫০ বছরে নরেন্দ্র মোদী সরকারের বাংলাদেশ নীতিই একমাত্র ব্যতিক্রম। অন্য সব অ-কংগ্রেসি সরকারই বাংলাদেশ নীতিতে নতুনত্ব আনার নামে এমন কিছু পদক্ষেপ করেছে, যা পরিস্থিতি ঘোরালো করে তুলেছিল।

বাংলাদেশের উদ্ভবকে আজও অনেকে ব্যাখ্যা করেন পাকিস্তানকে দ্বিখন্ড করার মাপকাঠিতে। দেশভাগ পূর্ব-পাকিস্তানের মানুষকে ধর্ম-পরিচিতিতে বাঁধতে চেয়েছিল, তাকে নস্যাৎ করার লক্ষ্যে বাংলা ভাষা অ সংস্কৃতিকে অস্ত্র করে ’৫২-তে বাঙালি জাতীয়তাবাদের শুরুকে আমল দেন না তারা। আর বাংলাদেশে স্বাধীনতার যে বিরোধী শক্তি শপথ নিয়েছে দেশকে ফের পাকিস্তানমুখী করে তোলার, তাঁদের মতও যে একই, প্রমাণ বঙ্গবন্ধু-হত্যা পরিকল্পনার দিন হিসাবে ১৫ আগস্টকে বেছে নেওয়া। দেশের অসাম্প্রদায়িকতা ভূলুণ্ঠিত হবে, আর তা হবে ভারতের  স্বাধীনতার দিনে। এ যে কাকতালীয় ছিল না, মুজিব হত্যাকারীরা বলেছে সংবাদ মাধ্যমে। বার্তাটি ‘পাঁক-ই-স্তান’ (পবিত্র ভূখণ্ড)-কে বিচ্ছিন্ন করার জন্য ভারতকে উচিৎ শিক্ষা।

মুজিব হত্যার পরে ক্রমে জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখল করে ১৫ আগস্টের গণহত্যার কুশীলবদের পুরস্কৃত করেন। সেই রাজাকার নেতাদের পুনর্বাসন দেওয়া হয়, যারা ’৭১-এ বাংলাদেশ গড়ার বিরোধিতা করেছিলেন। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক তখন কেমন ছিল? বস্তুত কোনও সম্পর্কই ছিল না। সে সময়ে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল আব্দুল কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে একদন তরুণ ক্ষমতা দখলকারীদের বিরুদ্ধে সংগঠিত হন। সেনারা মুখোমুখি লড়াইয়ে কচুকাটা করে তাঁদের। বহু তরুণ মারা যান, কিছু তরুণ তামাবিল সীমান্ত পেরিয়ে অসমে এলে ইন্দিরা গাঁধী সরকার তাঁদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দিল্লিতে। ছিলেন কাদের সিদ্ধিকীও। ’৭৭-এ জনতা পার্টি ক্ষমতায় এলে প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাইয়ের মন ভিজিয়ে জেনারেল জিয়া। অনেকে বলেন, মোরারজিও ’৭১-কে নিছক পাকিস্তান-ভাগের সাফল্যের চেয়ে বেশি কিছু ভাবতেন না।  কাদের সিদিকী প্রমুখদের ‘বাংলাদেশি জঙ্গি’ মনে করতেন, ঘনিষ্ঠদের বলতেন- এদের প্রশ্রয় দান মানে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। ইন্দিরার নির্দেশে এঁদের ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য যে হাতখরচ দেওয়া হত, মোরারজির আমলে তা বন্ধ হলে বিপাকে পড়েন তাঁরা। এর মধ্যেই ঢাকা থেকে খবর আসে, জেনারেল জিয়ার প্রস্তাব মেনে কাদের ও তাঁর দলবলকে গোপনে বাংলাদেশের হাতে তুলে দিতে সম্মত হয়েছেন মোরারজি। দিল্লিতে অবস্থানে বসেন তাঁরা। মোরারজির সঙ্গে কথা বলতে গেলে তিনি বলে দেন,’’তোমরা প্রতিবেশী নীতির কাঁটা।‘’ তরুণেরা হাজির হন কংগ্রেস শীর্ষনেতার কাছে, যিনি তাঁদের পাঠান জনতা পার্টির নেতা ও তৎকালীন মন্ত্রী রবি রায়ের কাছে। তিনি কাদেরের প্রতিনিধিকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে নিবৃত করতে পারেন একমাত্র জয়প্রকাশ নারায়ন। জয়প্রকাশ ক্রমে সব জেনে প্রধানমন্ত্রীকে মনে করান, বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আগের সরকারের গৃহীত নীতি মেনে চলার সিদ্ধান্তই নিয়েছে পার্টি। সরকার অন্য কিছু ভাবলে দল তাতে অনুমোদন দেবে না।  

২০০১-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে হারিয়ে ক্ষমতায় আসে খালেদা জিয়ার বিএনপি এবং জামাতে ইসলামি-র জোট। ভারতে তখন অটলবিহারী বাজপেয়ীর সরকার।  সেদিন পরাজিত শেখ হাসিনা এখনও দাবি করেন, ভারতের তৎকালীন সরকার আমেরিকার সঙ্গে মিলে খালেদা জিয়াকে ক্ষমতায় এনেছিল। কারণ, তাঁর দাবি, খালেদা তাঁদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, জয়ী হলে বাংলাদেশর তেল-গ্যাসের ভাণ্ডার ভারত ও আমেরিকার জন্যে খুলে দেওয়া হবে। তা যেমন হয়নি, ভারতও বুঝেছে জামাতের মতো দল সরকারে আসার ফল কী হতে পারে? এক ভারতীয় কূটনীতিকের কথায়,’’ তখন যেন ভারতের পশ্চিম সীমান্তে পাকিস্তান, পূর্ব-সীমান্তেও পাকিস্তান। বাংলাদেশ দিয়ে জঙ্গি, বিস্ফোরক রফতানি করে আইএসআই নাশকতা ঘটাচ্ছে ভারতে। চট্টগ্রামে ধরা পড়ল আলফার জন্য পাঠানো ১০ ট্রাক মারণাস্ত্রের চালান। অথচ তা স্বীকার করবে না খালেদা জিয়া প্রশাসন!’’

আওয়ামী লীগ ২০০৮-এ ক্ষমতায় ফিরে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নেয়। পাশাপাশি উত্তর-পূর্ব ভারতের জঙ্গিদের বাংলাদেশের মাটি থেকে উৎখাত করে। দিল্লিতে তখন ইউপিএ-র শাসন। ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় ওঠে। সিদ্ধান্ত হয়, দীর্ঘদিনের বকেয়া সীমান্ত সমস্যা মিটিয়ে ফেলা হবে, ছিটমহলের অবলুপ্তি ঘটানো হবে। ২০১৪-তে দিল্লিতে পালাবদলের পরে ক্ষমতায় এসেই প্রথমে বাংলাদেশ সফরে যান প্রধানমন্ত্রী মোদী। এই প্রথম বাংলাদেশ নীতিতে পূর্বসূরি ইউপিএ-র পথেই হাঁটে এক অ-কংগ্রেসি সরকার।  স্থল সীমান্ত চুক্তি সই হয়। জঙ্গি অ মাদক চালানকারীদের নজরদারি ও তথ্য আদানপ্রদানে দুই দেশের সহযোগিতা চুক্তিবদ্ধ হয়। বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ যাচ্ছে বাংলাদেশে।

তবুও ওঠাপড়া থেকেই যায়। প্রতিশ্রুত তিস্তার জলবণ্টন চুক্তি সই হয়নি আজও। করোনা প্রতিষেধক রফতানির চুক্তি করেও ভারত কার্যত পথে বসিয়েছে বাংলাদেশকে। তবু দু’দেশের সম্পর্কের রেখচিত্র বড় একটা মানেনি।

সেটা যে রক্তের বন্ধনের কারণেই, সন্দেহ নেই তাতে।

 

 

সূত্র- আনন্দ বাজারের সৌজন্যে। 

 

এসকেএইচ//