• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২২, ১১ আশ্বিন ১৪২৯
প্রকাশিত: জুন ২, ২০২২, ০৮:৩২ এএম
সর্বশেষ আপডেট : জুন ২, ২০২২, ০৮:৫৭ এএম

আমেরিকার বর্বর ইতিহাস

আমেরিকার বর্বর ইতিহাস

আমেরিকান সভ্যতার ভিত্তি পুঁজিবাদ। আর আমেরিকান পুঁজিবাদের ভিত্তি লুন্ঠন, বর্বরতা, নিষ্ঠুরতা ও অমানবিকতা। তাদের নীতি পুঁজি গঠন, উদ্দেশ্য মুনাফা। এ লক্ষ্যে ১৪৯২ সালে কলম্বাস যাত্রা করেন ইন্ডিয়ার উদ্দেশ্যে। পৌঁছে যান এক নতুন দেশে। তিনি মনে করেছিলেন এটাই ইন্ডিয়া। পরে ১৫০৩ সালে আমেরিগো ভেসপুসি (Amerigo Vespucci, in Spanish language Americo Vespucio) নামক এক ইতালীয় বনিক মনে করেন এটা ইন্ডিয়া নয়। এটি একটি নতুন বিশ্ব। তাই তার নামানুসারে এ অঞ্চলের নামকরণ হয়ে যায় আমেরিকা। যাহোক কলম্বাস থেকে শুরু করে পরবর্তীকালে ইউরোপ থেকে আমেরিকায় যারা গেছেন তারাই লুন্ঠন ও বর্বরতার আশ্রয় নিয়েছেন। ইউরোপীয়রা চরম নিষ্ঠুরভাবে আমেরিকার আদিবাসীদের হত্যা করেছেন, দমন করেছেন, দাস বানিয়েছেন, তাদের সম্পদ লুন্ঠন করেছেন।

১৫১৯ থেকে ১৫২১ খ্রি পর্যন্ত হারানদো কর্তেজ নামে এক স্পেনীয় অভিযানকারী ৬০০ যোদ্ধা, ৭টি কামান এবং ১৩টি ঘোড়া নিয়ে আজেতেক সাম্রাজ্য তথা মেক্সিকো আক্রমণ করেন। আজতেকরা কামান বা ঘোড়া কখনো দেখেননি। তারা ঘোড়া দেখে ভয় পেয়ে যায়। ঘোড়ার পিঠে মানুষ দেখে তারা একে অদ্ভুত জন্তু মনে করেন। আজতেকরা সহজেই পরাজিত হন। কস্তেজ তাদের জমানো সোনা রূপাসহ সমস্ত সম্পদ লুন্ঠন করেন। ১৫৩৩ সালে ফ্রান্সিসকো পিজারো নামক আরেক অভিযানকারী ১৮০ জন যোদ্ধা নিয়ে ইনকাদের সাম্রাজ্য পেরু আক্রমণ করে অধিকার করে নেন। বন্দি ইনকা রাজা স্পেনীয়দের চাহিদামতো স্বর্ণ দিতে রাজি হয়। আরো স্বর্ণের লোভে তারা ইনকা রাজাকে হত্যা করেন এবং ইনকাদের দাস বানাতে শুরু করেন। ইউরোপীয়দের অত্যাচারে আমেরিকার আদিবাসীরা নিশ্চিহ্ন হতে শুরু করে। ১৪৯২ সালে হিস্পানিওয়ালা দ্বীপে স্থানীয় জনগণের আনুমানিক সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৫০ হাজার। ১৫৩৮ সালে তা কমে হয় মাত্র ৫০০ জন। ইউরোপীয়রা স্থানীয় আদিবাসীদের দমন করতে শুধু আধুনিক অস্ত্র ও ঘোড়া নিয়েই যাননি। তারা সেখানে হাম ও গুটি বসন্তের জীবানু নিয়ে যান এবং তা স্থানীয়দের মাঝে ছড়িয়ে দেন। তাদের পক্ষে এ রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়নি। এভাবে নানা উপায়ে ইউরোপীয়রা আমেরিকার আদিবাসীদের দমন নির্যাতন ও হত্যা করে তাদের প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দেন। যারা বেঁচে যান তাদেরকে দাস বানান। তারা তাদের দেশটাও দখল করেন। তাদের সম্পদ লুন্ঠন করে পুঁজি গঠন করেন, পুঁজি বিকাশের জন্য দাস ব্যবসা চালু করেন।

পুঁজিবাদে কোনো মনুষ্যত্ব নেই। চরম পুঁজিবাদ হলে তো কথাই নেই। আমেরিকা চরম পুঁজিবাদী দেশ। আর অল্প পুঁজিতে বেশি মুনাফা অস্ত্র ব্যবসায়। তাই আমেরিকার অস্ত্র উৎপাদক আর স্বভাবতই অস্ত্র ব্যবসায়ীরা যুদ্ধই প্রত্যাশা করেন। যুদ্ধ না থাকলে তাদের ব্যবসা চলে না। তারা সর্বদা যুদ্ধের উসকানি দিতে থাকে। বিশ্ব যতো যুদ্ধে জড়াবে তাদের ততো লাভ হবে। আমেরিকার অস্ত্র ব্যবসায়ীরা শুধু বাইরে অস্ত্র বিক্রি করেন না, নিজ দেশে সাধারণ নাগরিকের কাছে দেদারসে অস্ত্র বিক্রি করেন। ফলে প্রত্যেক মার্কিন নাগরিকের এক বা একাধিক অস্ত্র আছে। যেমন হ্যান্ডগান, শটগান, রাইফেল, বন্দুক। এমনকি আমেরিকার ৩২ কোটি মানুষের রয়েছে ৩৯ কোটি অস্ত্র। আমেরিকায় মানুষের চেয়ে আগ্নেয়াস্ত্রের সংখ্যা বেশি। আগ্নেয়াস্ত্রের যথেচ্ছ ব্যবহারও বেশি। ফলে ঘরে বাইরে, স্কুলে, ক্লাবে, বারে, খেলার মাঠে, উপাসনালয়ে প্রায় বন্দুক হামলায় প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়। যেমন -২৪/০৫/২০২২ তারিখে টেক্সাসের উভালদে শহরের রব এলিমেন্টারি স্কুলে সালভাদর রামোস নামক ১৮ বছর বয়সী এক তরুণের বন্দুক হামলায় প্রাণ হারান ১৯ শিশু ও ২ শিক্ষক। ১০দিন আগে ১৪/০৫/২০২২ তারিখে নিউইয়র্ক রাজ্যের বাফেলো শহরের এক শপিং মলে এক বন্দুকধারীর এলোপাতারি গুলিতে ১০ জন প্রাণ হারান এবং আহত হন অনেকে। অলাভজনক সংস্থা গান ভায়োলেন্স আর্কাইভের তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রে চলতি বছরের প্রথম ৫মাসে নির্বিচার গুলির ঘটনা ঘটেছে ২১২টি।

১৬/০৩/২০২১ তারিখে জর্জিয়া রাজ্যের আটলান্টার ৩টি ডে স্পা সেন্টারে বন্দুকধারীর গুলিতে ৮ জন নারী নিহত হন। ২২/০৩/২০২১ খ্রি কলরাডো রাজ্যের বোল্ডারের একটি সুপারমার্কেটে এক বন্দুকধারীর নির্বিচার গুলিতে এক পুলিশ কর্মকর্তাসহ ১০ জন নিহত হন। ৩১/০৩/২০২১ খ্রি ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসের শহরতলির একটি ভবনে বন্দুক হামলায় ৪ জন নিহত হন। ১৬/০৪/২০২১ খ্রি রাতে ইন্ডিয়ানা রাজ্যের ইন্ডিয়ানাপোলিস শহরে ১৯ বছর বয়সী ব্র্যান্ডন হোল নামক এক বন্দুকধারীর গুলিতে ৮ জন নিরীহ মানুষ নিহত হন। ৩০/১১/২০২১ মিশিগান রাজ্যের অক্সফোর্ডের একটি উচ্চ বিদ্যালয়ে এক তরুণ এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়লে ৪ শিক্ষার্থী নিহত ও ৭ জন আহত হন। এডউইক নামক শিক্ষা গবেষণার তথ্যানুযায়ী, গত বছর (২০২১ সাল) যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে এমন হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ২৬টি।

২৬/০২/২০২০খ্রি উইসকনসিন রাজ্যের মিলওয়াকি শহরের মোলসন কুর্স বেভারেজ কো ব্রুইং কমপ্লেক্সে এক বন্দুকধারীর হামলায় তার পাঁচ সহকর্মী নিহত হন। ২০২০ সালের অক্টোবরে হিউস্টন শহরের একটি নাইটক্লাবে বন্দুকধারীদের হামলায় কমপক্ষে ৩ জনের মৃত্যু হয়। ১৫/০২/২০১৯ খ্রি ইলিয়নসের একটি কারখানায় এলোপাতাড়ি গুলিতে ৫ ব্যক্তি নিহত হন। ০৩/০৮/২০১৯ খ্রি টেক্সাস রাজ্যের এল পাসোতে ওয়ালমার্টের একটি স্টোরে এক বন্দুকধারীর হামলায় ২২ জন নিহত হন। ৩১/০৫/২০১৯ খ্রি ভার্জিনিয়ার পাবলিক ইউটিলিটির কর্মকর্তার গুলিতে ১২ সহকর্মী নিহত হন। মার্কিন রোগনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ২০২০ সালে আগ্নেয়াস্ত্রের শিকার হন ১৯ হাজার ৩৫০ মার্কিনি।

১৪/০২/২০১৮ খ্রি ফ্লোরিডার পার্কল্যান্ডের মার্জরি স্টোনম্যান ডগলাস হাই স্কুলের সাবেক এক শিক্ষার্থীর গুলিতে ১৭ শিক্ষার্থী-শিক্ষক নিহত হন। ১৮/০৫/২০১৮ খ্রি টেক্সাসের হিউস্টনে ১৭ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীর গুলিতে ৯ শিক্ষার্থী ও ১ শিক্ষক নিহত হন। ২৭/১০/২০১৮ খ্রি পেনসিলভানিয়ার পিটার্সবার্গে এক বন্দুকধারী ১১ জনকে গুলি করে হত্যা করেন। ০৭/১১/২০১৮ খ্রি ক্যালিফোর্নিয়ায় ১২ জনকে গুলি করে হত্যা করেন নৌবাহিনীর সাবেক এক কর্মকর্তা।

০১/১০/২০১৭ খ্রি নেভাদার লাস ভেগাসে বন্দুকধারীর এলোপাতাড়ি গুলিতে ৫৮ জন নিহত হয়। ০৫/১১/২০১৭ খ্রি টেক্সাসের সাদারল্যান্ড স্প্রিংয়ের একটি গির্জায় বন্দুক হামলায় ২৬ জন নিহত হন। ১২/০৬/২০১৬ খ্রি ফ্লোরিডায় বন্দুকধারীর হামলায় ৪৯ জন নিহত হন। ০২/১২/২০১৫ খ্রি ক্যালিফোর্নিয়ায় একটি অনুষ্ঠানে স্বামী ও স্ত্রী মিলে ১৪ ব্যক্তিকে হত্যা করেন। ১৭/০৬/২০১৫ খ্রি সাউথ ক্যারোলিনায় এক শ্বেতাঙ্গ গুলি করে ৯ জন কৃষ্ণাঙ্গকে হত্যা করেন। ০১/১০/২০১৫ খ্রি অরেগনে এক বন্দুকধারীর গুলিতে ৯ জন নিহত হন। পরে পুলিশ তাকে হত্যা করে। ১৬/০৯/২০১৩ খ্রি ওয়াশিংটনে নৌবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ১২ ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করেন। পরে পুলিশ তাকে হত্যা করে। ২০১২ সালে কানেকটিকাটের এক স্কুলে বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটে। তাতে ২০ শিশুসহ ২৬ জন নিহত হন।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান তার নাগরিককে অস্ত্র রাখার অধিকার দিয়েছে। ফলে সবার কাছে অস্ত্র আছে। তাই সেখানে বন্দুক যুদ্ধের ঘটনা ঘটে অহরহ। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে ২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রতি ৬৪ দিনে একবার করে বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানায়, ১৯৯৬ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটেছে ৯০টি। ২০১৫ সালে দেশটিতে বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটেছে ৩৬১টি, নিহত হন ৩২৬ জন, আহত হন ১৫০০ এর অধিক।  যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তা সংস্থার হিসাব বলছে, ২০১৮ সালে স্কুলে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে ৯৪টি। শুধু আগ্নেয়াস্ত্রের কারণেই আমেরিকায় বছরে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ নিহত হন। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন নিহত হন প্রায় ১০০ জন। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর গুম হয় লক্ষাধিক মানুষ, পুলিশের গুলিতে নিহত হয় হাজারের অধিক মানুষ।

এপ্রিল/ ২০২২ প্রকাশিত ইউএস সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) রিপোর্ট মতে, ২০২০ সালে করোনা মহামারীর শুরুর বছরে বন্দুক হামলায় যুক্তরাষ্ট্রে চার হাজার ৩০০ শিশুর মৃত্যু ঘটে। আর সব বয়সী মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা ছিল ৪৫ হাজার ২২২ জন। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে আত্মহত্যা করে গড়ে প্রায় ২২ হাজার লোক। আর বন্দুক হামলায় নিহত হয় গড়ে প্রায় ১২ হাজার জন।

একটি সভ্য দেশে কী করে সবার কাছে আগ্নেয়াস্ত্র থাকে? অস্ত্র থাকবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে। তা সাধারণ মানুষের হাতে কেন? সাধারণ মানুষের কাছে অস্ত্র থাকলে তার অপব্যবহার হবেই। সমস্যা হল আমেরিকায় দুটি সরকার বিদ্যমান। একটি দৃশ্যমান ও অন্যটি অদৃশ্যমান। দৃশ্যমান হল রাজনৈতিক সরকার। আর অদৃশ্যমান সরকার হলো কর্পোরেট ব্যবসায়ী, অস্ত্র ব্যবসায়ী– এরা। এরাই রাজনৈতিক সরকারকে পরিচালিত করে। এতো হত্যাকাণ্ডের পরেও মার্কিন অস্ত্র উৎপাদক ও অস্ত্র ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ ও সরকারের মনোভাবে কোনো পরিবর্তন নেই। কেননা তারা অনুভূতিশূন্য, বিবেকহীন। পুঁজিবাদে বিবেক বলে কিছু নেই। আর আমেরিকা হলো চরম পুঁজিবাদী দেশ। ফলে তাদের বিবেক না থাকারই কথা। পরিতাপের বিষয় যে, এ বিবেকহীন জাতি বিশ্বের নেতৃত্ব দেয়, মানবাধিকারের সবক দেয়, মানবাধিকারের প্রশ্ন তুলে যার তার উপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, যেকোনো উসিলায় যুদ্ধ বাঁধিয়ে দেয়! যাদের স্বজাতির রক্তে অশ্রু ঝরে না, তাদের কাছে পরজাতির রক্ত তুচ্ছ।

 

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ, ফরিদপুর। ই-মেইল [email protected]

 

দ্রষ্টব্যঃ প্রকাশিত লেখাটি লেখকের একান্ত নিজস্ব মতামত এবং এর দায়-​দায়িত্বও লেখকের একান্ত নিজস্ব।