• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৯, ৩০ কার্তিক ১৪২৬
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৯, ০৯:৩১ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৯, ০৯:৩৪ পিএম

ক্লাব হাউজি থেকে ক্যাসিনো

ঢাকায় ‘নিষিদ্ধ জুয়ার ক্লাব’ সিন্ডিকেটের নেপথ্যে

এস এম সাব্বির খান
ঢাকায় ‘নিষিদ্ধ জুয়ার ক্লাব’ সিন্ডিকেটের নেপথ্যে

বি শে ষ  প্র তি বে দ ন

..............

এক সময় রাজধানী ঢাকার বুকে পেশাদার ফুটবলের জমজমাট আয়োজন ছিল ঐতিহ্যবাহী একটি সংস্কৃতি। এই পেশাদার ফুটবল প্রতিযোগিতা নগরীর বিভিন্ন পাড়া বা মহল্লা বিশেষ করে পুরান ঢাকার এলাকাগুলোতে নানা উপলক্ষে আয়োজন করা হতো। প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ম্যাচ বা টুর্নামেন্ট আয়োজনের মধ্য দিয়ে ক্রমেই এর জনপ্রিয়তা বিস্তার লাভ করতে থাকে। এক পর্যায়ে এ সকল প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার বিষয়টি পাড়া বা মহল্লাগুলোর জন্য রীতিমত আত্ম-মর্যাদার ব্যাপার হয়ে ওঠে। যার ফলে স্থানীয় খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণ ও তত্বাবধানের বিশেষ ব্যবস্থা করতেই উত্থান ঘটে স্থানীয় ক্রীড়া সংঘ বা স্পোর্টিং ক্লাব সংস্কৃতির।

এক সময় ঢাকায় ফুটবল লীগের দাপুটে দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ও ওয়ান্ডারার্স ক্লাব। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের ফুটবলাঙ্গনে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরিণত হয় আবাহনী লিমিটেড ও মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের দ্বৈরথ। পরবর্তীতে বহুদিন ধরে ক্লাব ফুটবলের এই ঐতিহ্য উজ্জ্বল ছিল কলাবাগান ক্রীড়াচক্র, আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ, ফকিরাপুল ইয়াংমেন্স এবং ব্রাদার্স ইউনিয়নের মতো প্রতিষ্ঠিত ক্লাবগুলোর ক্রীড়াঙ্গণে সরব উপস্থিতির মাধ্যমে। সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ফুটবলের পাশাপাশি অনেকগুলো ক্লাবই তাদের ক্রিকেট এবং হকি দলও গড়ে তোলে, যেখানে বিশ্বের নামি-দামি অনেক খেলোয়াড়ও খেলে গেছেন।

ফুটবলের সেই জৌলুস এখন আর নেই, হকি তো জাতীয় পর্যায় থেকেই যেন ঝরে পড়ার উপক্রম হয়েছে। তবে ক্রিকেটের উদ্দীপনা থাকলেও ক্লাবগুলোই কেমন যেন নিরুৎসাহিত হয়ে পড়েছে ধীরে ধীরে। একটা সময় ধারণা করা হতো যথার্থ পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে অন্ধকারের বুকে হারিয়ে গেছে এই ক্লাবগুলোর অনেকগুলোই। কিন্তু সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট বলছে অবহেলা বা অযত্নের দায়ে নয় বরং ঐতিহ্যগত সংস্কৃতির হাত ছেড়ে অন্ধকার জগতের সারথি হতেই ধীরে ধীরে ক্লাবগুলো চলে এসেছে লোকচক্ষুর অন্তরালে। বিত্তশালি আর অভিজাত সমাজের বাসিন্দাদের আড্ডাখানার ছদ্মবেশে সাধারণ মানুষের চোখে যে সমিহ অর্জন করে নেয়া হয়েছে তার অন্তরালে গড়ে তোলা হয়েছে জুয়া, ক্যাসিনোর ব্যবসা আর নিষিদ্ধ মাদক সিন্ডিকেটের অন্ধকার সাম্রাজ্য। এমনকি যেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে তৈরি হয়েছিলো মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্র সেই প্রতিষ্ঠানের মূল কাজই হয়ে দাঁড়িয়েছে জুয়ার আয়োজন করা।

>> যেভাবে শুরু হয় নিষিদ্ধ ক্লাব-ক্যাসিনো
বুধবার (১৮ সেপ্টেম্বর) রাতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের যৌথ অভিযানে দেখা গেছে স্পোর্টস বাদ দিয়ে ক্লাবগুলো মজে আছে জুয়ার এমন আয়োজনে যার আধুনিক নাম ‘ক্যাসিনো’। ক্লাবগুলোর নিয়ন্ত্রণের ভূমিকাতেও আর খেলোয়াড় কিংবা সংগঠকরা নেই, আছেন সরকারদলীয় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা যাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কার্যকলাপের অভিযোগ রয়েছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মহল থেকেই।

কবে কীভাবে ঢাকার মতিঝিলের ক্লাবগুলো থেকে খেলাধুলা বিদায় নিয়ে নিষিদ্ধ ব্যবসা চালু হলো তা নিয়ে নানা মতভেদ রয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, এসব ক্লাবে দীর্ঘকাল ধরেই জুয়ার চর্চা ছিল, কিন্তু অনুমোদনহীন ক্যাসিনো কিভাবে হলো তার সুনির্দিষ্ট কোনও তথ্য পাওয়া যায় না তেমন একটা।

ক্লাবগুলোর সাথে জড়িত কয়েকজন কর্মকর্তা জানান,  আবাহনী মোহামেডানসহ অন্য প্রায় সব ক্লাবেই জুয়ার প্রচলন ছিলো আশির দশক থেকেই এবং সেটি করা হতো মূলত ক্লাবের পরিচালন ব্যয় নির্বাহের জন্য। তখন ক্লাবের সংগঠকরা রাজনীতিতে খুব একটা সক্রিয় ছিলেন না বরং ক্লাবগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা ছিল। ফলে খেলাধুলাতেও ক্লাবগুলো বেশ ভালো করেছিল।

বর্তমানে ফ্রান্স প্রবাসী নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুরান ঢাকার ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের একজন প্রাক্তন সদস্য জানান, তখন মূলত ওয়ান-টেন নামে একটি জুয়া হতো। যেটি হাউজি নামেও পরিচিত ছিল। সপ্তাহে কয়েকদিন হতো। ক্লাবের বার্ষিক দাতাদের বাইরের বড় আয় আসতো এই হাউজি থেকেই।

তিনি জানান, জুয়া হিসেবে তখন ক্লাবগুলোতে হাউজি, ওয়ান-টেন ও রামিসহ কিছু খেলা চালু ছিল আর বোর্ড বা জায়গা ভাড়া দিয়ে অর্থ আয় হতো ক্লাবের।

ঢাকার ক্যাসিনোগুলোতে এক সময় নিয়মিত আসা-যাওয়া ছিল ব্যবসায়ী জাহিদ বাবু। তার বরাত দিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বার্তা সংস্থা বিবিসি বাংলা জানায়, ঢাকায় ক্লাবে ক্যাসিনো সংস্কৃতির সূচনা হয়েছে কলাবাগান ক্লাবের হাত ধরে প্রায় ৭/৮ বছর আগে।

তিনি জানান, এরপরই স্লট মেশিন, জুয়ার আন্তর্জাতিক মানের বিশেষ বোর্ড এগুলো আসতে শুরু করে ক্লাবগুলোতে। প্রথমে সব ক্লাবই ‘বাকারা’ নামে একটি খেলা দিয়ে শুরু করে। পরে যোগ হয় ‘রুলেট’ নামে আরেকটি খেলা।

তবে এর ভিন্নমতও আছে। নিয়মিত ক্যাসিনোতে যান এমন একজন জানান মতিঝিলের ক্যাসিনোগুলোতে যাওয়ার আগে তিনি মালিবাগের সৈনিক ক্লাবের ক্যাসিনোতে গিয়ে খেলেছেন।

বিদেশের মতো বিশাল বড় ফ্লোরে হাজার রকমের জুয়া খেলার যন্ত্রপাতির সমাহার না হলেও স্লট মেশিন কমবেশি সব ক্লাবে পৌঁছে গেছে গত ৫/৬ বছরে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মুকুল চাকমার বরাত দিয়ে বার্তাসংস্থাটি জানায়, তিনি সেগুনবাগিচা এলাকায় অবৈধ মাদক সেবনের খবর পেয়ে একটি অভিযান চালান বছর দুয়েক আগে এবং অভিযানে সেখানেই ক্যাসিনোর অস্তিত্ব পান। পরে সেটি বন্ধও হয়ে যায় বলে জানান তিনি।

সেগুনবাগিচায় একটি ক্যাসিনো ক্লাব বন্ধ হলেও পরবর্তীতে মতিঝিল, কলাবাগান, তেজগাঁও এবং এলিফ্যান্ট রোডে জমজমাট হয়ে উঠে কয়েকটি ক্যাসিনো। তবে এর আগেই নগরীতে ক্যাসিনোর ধারণা কলাবাগান থেকে শুরু হলেও এর নির্ভরযোগ্য আরেকটি জায়গা হয়ে দাঁড়ায় তেজগাঁওয়ের ফুওয়াং ক্লাব।

সাম্প্রতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে ক্ষমতাসীন সরকারের দলীয় পর্যায়ে নিজেদের অবস্থান সৃষ্টি করার মাধ্যমে এবং সরকারের ইমেজকে কাজে লাগিয়ে মতিঝিলের ক্লাবগুলোর নিয়ন্ত্রণ যায় কথিত কয়েকজন যুবলীগ নেতার হাতে। তারাই মূলত ক্লাবগুলো থেকে খেলাধুলাকে গুরুত্বহীন করে দিয়ে সামনে নিয়ে আসেন ক্যাসিনোকে।

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গেছে, এক সময় চ্যাম্পিয়নশিপ লীগে চ্যাম্পিয়ন হওয়া ফকিরাপুল ইয়াংমেন্স ক্লাব এখন প্রিমিয়ার লিগে খেলার যোগ্যতা অর্জনেও ব্যর্থ। অর্থের অভাবে দল গঠন করতে পারে না। সে জন্য আগের স্তরেই রয়ে গেছে ক্লাবটির অবস্থান। অথচ সেই ক্লাবেই র‍্যাব অভিযান চালিয়ে সবচেয়ে বড় ক্যাসিনোর অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছে বুধবার রাতে।

আবার নেপাল থেকে প্রশিক্ষিত নারী ও নিরাপত্তাকর্মীও নিয়ে আসে কয়েকটি ক্যাসিনো। যদিও জুয়া খেলা বলতে স্লট মেশিন, বাকারা আর রুলেটই প্রধানত এখানে খেলা হয়।

এখন র‍্যাব কর্মকর্তারা বলছেন ঢাকায় অন্তত ৬০টি ক্যাসিনো আছে বলে তাদের কাছে তথ্য রয়েছে।

বিশিষ্টজনদের মন্তব্য, ক্যাসিনোগুলোর ধরন দেখেই বোঝা যাচ্ছে সমাজের সব স্তরের প্রভাবশালীরাই এসব ক্যাসিনো গড়ে তুলেছেন। তবে শুধু এই হানা দেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেই হবে না। খুঁজে বের করোতে হবে কারা এসব ক্যাসিনোর যন্ত্রপাতি আনার অনুমতি দিয়েছে, কারা বছরের পর বছর জেনেশুনেও এসব চলতে দিয়েছে। সুবিধা নিয়েছে নিয়মিত। সবাই মিলেই এসব তৈরি করেছে। আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিতে হবে তাদের সবার বিরুদ্ধেই। কারণ এটা কোনও একজনের কাজ নয়। একটা বিশাল সিন্ডিকেট এর পেছনে আছে, যার মূল খুঁজে বের করোতে হবে।

মতিঝিলের ক্যাসিনোগুলোতে নিয়মিত যান এমন একজন জানান, সেখানে কোটি কোটি টাকার জুয়া খেলা হয় এবং ২৪ ঘন্টাই এগুলোতে সচল থাকে জুয়ার বোর্ড।

তিনি বলেন, এক হাজার থেকে ১ লাখ টাকার কয়েন বা চিপস কিনে বসে। অনেকে সেখানেই অ্যালকোহল পান করেন। তবে এসব ক্যাসিনোতে কোনও নিরাপত্তা ঝুঁকি নেই। ভেতরে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখেন আয়োজকরা। আর এসব আয়োজনের মধ্যেই প্রতিদিন সর্বস্বান্ত হয় অসংখ্য মানুষ।

>> সামনে রাখা হয় বড় নেতাদের
ক্লাবগুলোর প্রায় সবগুলোতেই চেয়ারম্যান হিসেবে সামনে রাখে স্থানীয় সংসদ সদস্য বা বড় কোনও রাজনৈতিক নেতাকে। কিন্তু এসব নেতারা সেসব ক্লাবে যাওয়ারও সুযোগ পান না তেমন একটা। একটি ক্লাবের বরাতে জানা গেছে, মূলত মতিঝিল এলাকার একজন কাউন্সিলর ও র‍্যাবের অভিযানে আটক হওয়া যুবলীগ নেতাই সবগুলো ক্লাবের নিয়ন্ত্রক। কিন্তু তারা ক্লাবগুলো নিয়ন্ত্রণে নিয়ে মূলত ক্যাসিনো গড়ে তুললেও ক্লাব কর্মকর্তারা রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই এসব নিয়ে মুখ খুলতে পারেন নি।

আবার কোনও কোনও ক্লাবের কর্মকর্তারাও ব্যাপক অর্থের লোভে জড়িয়ে গেছেন এই অবৈধ ব্যবসায়। কারণ অবৈধ হলেও এসব ক্যাসিনো মালিকদের কাছ থেকে সুবিধা নিতো সব পেশার লোকজনই।

সার-তথ্যহচ্ছে, মূলত তাইওয়ানিজদের একটি দল ২০০০ সালের দিকে এখানে পানশালা-কাম-রেস্তোঁরা চালু করে। যার মাধ্যমে তাইওয়ানিজ ও থাইদের একদল কথিত ব্যবসায়ী এই নিষিদ্ধ জুয়ার নেশায় বুঁদ করে তুলতে থাকে ক্লাবপাড়ার প্রভাবশালীদের। এভাবেই প্রথমে জুয়াড়ি পরে নিজেরাই জুয়ার ক্যাসিনো ব্যবসায়ী হয়ে ওঠার প্রবণতা সংক্রামিত হয় নগরীর প্রভাবশালীদের মাঝে।

এসকে/এসএমএম

আরও পড়ুন