• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৯, ৩০ কার্তিক ১৪২৬
প্রকাশিত: অক্টোবর ৬, ২০১৯, ১০:৩৩ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : অক্টোবর ৬, ২০১৯, ১০:৪৯ পিএম

আতঙ্কে সম্রাটের গডফাদাররা

এসএম মুন্না
আতঙ্কে সম্রাটের গডফাদাররা
কার্যালয় থেকে ইসমাইল চৌধুরী ওরফে সম্রাটকে বের করে আনছে র‌্যাব-ছবি : কাশেম হারুণ

সম্রাট গ্রেফতার হয়েছে। কারাগারেও পাঠানো হয়েছে। এখন পালা সম্রাটের গডফাদারদের ধরা। তার আগে যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী ওরফে সম্রাটকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চায় র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। 

র‌্যাবের মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লে. ক. সারোয়ার বিন কাশেম বলেন, সম্রাটকে রিমান্ডে নিলেই কে কে তার সঙ্গে জড়িত তাদের সবার  নাম জানা যাবে। 

তিনি বলেন, গত ১৮ সেপ্টেম্বর ক্যাসিনো-বিরোধী অভিযান শুরু করি। প্রত্যেকটি অভিযানে বার বার সম্রাটের নাম উঠে আসছিল। তাকে ধরার জন্য কয়েকটি টিম নজরদারি করেছিল। এই নজরদারির ধারাবাহিকতায় রোববার (৬ অক্টোবর) ভোরে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে সম্রাট ও তার প্রধান সহযোগী আরমানকে গ্রেফতার করা হয়। 

জানা গেছে,  সম্রাটের গ্রেফতারের পর আতঙ্কে রয়েছেন সম্রাটের গডফাদাররা। যারা সম্রাটকে অপরাধ তৈরি ‘কারিগর’ হতে সহযোগিতা করেছেন।

সূত্র জানায়, সম্রাটের মদদদাতাদের খোঁজে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে সম্রাটের সঙ্গে উঠা-বসা করা বড় বড় নেতাদেরও নজরদারিতে রাখা হয়েছে। এরই মধ্যে ব্যাংক হিসাব তলবের পর যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীর বিদেশ যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। 

সম্রাটের হাতে হাতকড়া, নেয়া হলো কারাগারে

ক্যাসিনো বাণিজ্যে র‌্যাবের হাতে আটক ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিষ্কৃত সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটকে কেরাণীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগারে নেয়া হয় রাত সোয়া ৮টায়। তাকে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেয় র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। পরে সম্রাটকে র‌্যাবের বিশেষ গাড়িবহরে কেরাণীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে নেয়া হয়।

সম্রাটের অফিসে ছয় ঘণ্টা অভিযান

গ্রেফতারের পর সম্রাটের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে কাকরাইলের কার্যালয়ে অভিযান চালায় র‌্যাব। রোববার (৬ অক্টোবর) দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলমের নেতৃত্বে র‌্যাবের একটি দল কাকরাইলে ভূঁইয়া ট্রেড সেন্টারে তালা ভেঙে সম্রাটের কার্যালয়ে ঢুকে অভিযান শুরু করে। অভিযান চালিয়ে সেখান থেকে একটি বিদেশি অস্ত্র, পাঁচ রাউন্ড গুলিসহ একটি ম্যাগাজিন, ১১৬০ পিস ইয়াবা, ১৯ বোতল বিদেশি মদ, দু’টি বন্যপ্রাণীর চামড়া, দুটি বৈদ্যুতিক শক দেয়ার মেশিন ও দুটি লাঠি  জব্দ করা হয়। 

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে সম্রাটকে ৬ মাসের সাজা দিয়েছে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। ভ্রাম্যমাণ আদালতটি পরিচালনা করে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম।

মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন আরমান

সম্রাটের সহযোগী ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিষ্কৃত সহ-সভাপতি এনামুল হক আরমানকে আটক করা সময় মদ্যপ অবস্থায় পাওয়া যায়। তার কাছে বিদেশি মদ পাওয়া যায়। ম্যাজিস্ট্রেট তাকে তাৎক্ষণিক ছয়মাসের কারাদণ্ড দেয়।

প্রধানমন্ত্রীকে সম্রাটপত্নীর ধন্যবাদ

সম্রাট শুরু থেকেই ‘সম্রাট’। ও শুধু নামে সম্রাট- এমন না, কাজেও সম্রাট। আর যে সহ-সভাপতি বা অন্য কেউ আছে, ওদের মতো না ও। আগে থেকেই ও চলাফেরা খুব ভালো ভালভাবে করতো। এসব কথা বলেছেন র‍্যাবের হাতে আটক হওয়া আলোচিত যুবলীগ নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের স্ত্রী শারমিন চৌধুরী। রোববার (৬ অক্টোবর) দুপুরে সম্রাটের মহাখালীর বাসায় অভিযান চালায় র‍্যাব। সেখানেই এসব কথা বলেন সম্রাটের দ্বিতীয় স্ত্রী শারমিন।

এ ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরুর জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন সম্রাটপত্নী। তিনি বলেন, আমাদের দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে এই অভিযানের জন্য ব্যক্তিগতভাবে অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাবো। তিনি যদি আরও আগে উদ্যোগ নিতো তাহলে আরও ভাল হতো।

সম্রাট নিয়মিত সিঙ্গাপুর কেন যেতেন- এমন প্রশ্নের জবাবে শারমিন চৌধুরী বলেন, ও সিঙ্গাপুরে জুয়া খেলতেই যেত। জুয়া খেলা ওর নেশা, কিন্তু সম্পদ জমানো তার নেশা না। দোকান, গাড়ি এগুলো তার নেশা না।

শারমিনের দাবি, সম্রাট চাইতো না অবৈধ টাকা সংসারের খরচ করতে। সে চাইতো না তার পরিবারের লোকজন অবৈধ টাকায় চলুক। সেজন্য সেসব টাকা দলের পেছনেই খরচ করতো। যুগ পাল্টেছে। টাকা না দিলে ছেলেপুলে আসে না। তাই সে সেখানেই খরচ করতো।

সিঙ্গাপুরে সম্রাটের বান্ধবীর তথ্য জানালেন স্ত্রী শারমিন

ক্যাসিনো কাণ্ডে গ্রেফতার যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট সিঙ্গাপুরে যে বান্ধবীর সঙ্গে সময় কাটাতেন তার সম্পর্কে তথ্য দিলেন স্ত্রী শারমিন চৌধুরী।

তিনি বলেন, আমাকে দুই বছর ধরে সিঙ্গাপুরে নেয় না। ওখানে বোধ হয় চায়না প্লাস মালয়েশিয়া ব্রোনমিক্সড মেয়ের সঙ্গে ওর সম্পর্ক হয়েছে। সিঙ্গাপুর গেলে ওর সঙ্গে সময় কাটায়।

আটক সম্রাটকে ঘিরে ‘জয়বাংলা’ স্লোগান 

সম্রাটের কাকরাইলের কার্যালয়ে অভিযান শেষ করে বের করলে তাকে ঘিরে মিছিল করে অনুসারীরা। পরে র‌্যাব পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ সময় তারা ‘জয়বাংলা’ স্লোগান দিচ্ছিলেন।

সম্রাট সমর্থক যুবলীগের শতাধিক নেতা-কর্মীকে সরিয়ে দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পরে র‌্যাব তাকে নিয়ে র‌্যাবের গাড়ির বহর কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারের দিকে যায়।

আরমানের বাসায় অভিযানে ১২টি দলিল ও চেক বই উদ্ধার

সম্রাটের সহযোগী ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিষ্কৃত সহ-সভাপতি এনামুল হক আরমানের বাসায় অভিযান চালায় র‌্যাব।

র‌্যাবের মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লে. ক. সারোয়ার বিন কাশেম জানান,  গ্রেফতারের সময় আরমানকে মদ্যপ অবস্থায় পাওয়া যায় এবং তার কাছ থেকে বিদেশি মদ উদ্ধার করা হয়। এ জন্য তাকে ৬ মাসের কারাদণ্ড দেন ভ্রাম্যমান আদালত। তাকে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে।

আরমানের বাসায় টানা ৫ ঘণ্টা তল্লাশি করে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মালিকানা দলিল ও বেশ কয়েকটি ব্যাংকের চেক বই উদ্ধার করা হয়েছে। তার মধ্যে ১০টি দলিল আরমানের দ্বিতীয় স্ত্রী বীথি বেগমের নামে এবং দুইটি দলিল আরমানের নামে।

মিরপুরের সি ব্লকের এই বাড়িতে আরমানের দ্বিতীয় স্ত্রী ও চার সন্তান থাকতেন। এ বাড়িতে তারা ভাড়া থাকতেন। আরমান মাঝে-মধ্যে এখানে যাতায়াত করতেন। তার প্রথম স্ত্রীও এই বাড়িতে মাঝে-মধ্যে আসা যাওয়া করতেন।

আরমানের স্ত্রীকে খুঁজছে র‌্যাব। র‌্যাব আশা করছে, তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে আরমানের অনেক তথ্য পাওয়া যাবে।  

গ্রেফতার অভিযান

রোববার (৬ অক্টোবর) ভোরের দিকে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের এক জামাত নেতা মুনির চৌধুরী ওরফে চক্কার বাড়ি থেকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি সম্রাট ও তার সহযোগী আরমানকে আটক করা হয়।

র‌্যাব জানায়, ভারতে পালিয়ে যাওয়ার উদ্দেশেই কুমিল্লা গিয়েছিলেন সম্রাট। 

ফেনী পৌরসভার মেয়র আলাউদ্দিনের বোনজামাই মনির চৌধুরী চক্কার বাড়িতে সম্রাটকে গ্রেফতার করার জন্য রাত ১২টার পর থেকে ভোর পর্যন্ত অভিযান চালানো হয়। 

মনির চৌধুরী চক্কার বাড়ি থেকে ভারতের দূরত্ব খুবই সামান্য। ভোরে তাকে আটকের পর র‌্যাব-১ এর কার্যালয়ে আনা হয়। চক্কার বাড়ি থেকে অস্ত্রও উদ্ধার করেছে র‌্যাব। এই অস্ত্র সম্রাটের বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যুবলীগ থেকে সম্রাট ও আরমান বহিষ্কার

যুবলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটকে। রোববার (৬ অক্টোবর) ভোরে র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর সংগঠন থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়। কেন্দ্রীয় যুবলীগের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও পাঠাগার বিষয়ক সম্পাদক মিজানুল ইসলাম মিজু বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

তিনি বলেন, অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িত থাকা ও দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ার অভিযোগে সম্রাটকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

সম্রাটের পাশাপাশি তার সহযোগী ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সহ-সভাপতি এনামুল হক আরমানকেও দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। 

নজরদারিতে যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক

যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীর বিদেশ যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। সূত্র জানায়, সম্রাটসহ যুবলীগের একাধিক নেতা গ্রেফতার হওয়ার পর যুবলীগ চেয়ারম্যানের বিদেশ যাওয়ার ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে।

সাম্প্রতিক শুদ্ধি অভিযানে যেসব রাজনৈতিক নেতাদের দুর্নীতি, অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয় উঠে আসছে সেগুলো নিয়ে সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে যুবলীগ চেয়ারম্যানকে আপাতত দেশ না ছাড়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার (ত অক্টোবর) যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীর সব ধরনের ব্যাংক হিসাব ও লেনদেনের বিবরণী তলব করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা বিভাগ বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিট। ওই সময় ওমর ফারুকের ব্যাংক হিসাবের সকল তথ্য তিন কার্যদিবসের মধ্যে পাঠাতে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে চিঠিও দেয়া হয়। এরপর রোববার বিদেশ যাওয়ার ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয় যুবলীগ চেয়ারম্যানের।

দুর্নীতিবাজ প্রভাবশালী হলেও ছাড় নয় : কাদের

দুর্নীতিবাজরা যত প্রভাবশালীই হোক তাদের ছাড় দেয়া হবে না বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

রোববার (৬ অক্টোবর) সন্ধ্যায় রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন (আইইবি) মিলনায়তনে এক কর্মশালায় এ কথা বলেন তিনি।

কাদের বলেন, এটা কোনও দল বা গোষ্ঠীর নয়, যেই অপরাধী তাদের গ্রেফতার করা হবে। যেই অপরাধী তাকেই আইনের আওতায় আনা হবে। এটা সরকারের ইচ্ছা এবং এ ব্যাপারে সরকার সংকল্পবদ্ধ এবং এ লক্ষ্যকে সামনে রেখেই শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে। টার্গেট অ্যাচিভ না হওয়া পর্যন্ত এ অভিযান চলবে। যতদিন না দুর্নীতি দুর্বৃত্তায়নের চক্র আমরা ভেঙে দিতে না পারি ততদিন পর্যন্ত এ অভিযান চলবে।

শুদ্ধি অভিযানের শুরু যেভাবে...

১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় সম্রাটসহ কয়েকজন যুবলীগ নেতার কর্মকাণ্ড নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এর পর ১৮ সেপ্টেম্বর (বুধবার) থেকে রাজধানীতে ক্যাসিনো-বিরোধী অভিযান শুরু করে র‌্যাব। ওই অভিযানের সময় যুবলীগের কয়েকজন নেতা গ্রেফতার হলে ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের বিরুদ্ধেও অবৈধভাবে ক্যাসিনো পরিচালনা করে বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জনের অভিযোগ ওঠে।

অভিযানের প্রথম দিন থেকেই সম্রাট কয়েকশ’ নেতা-কর্মী নিয়ে কাকরাইলে তার নিজ কার্যালয়ে অবস্থান নেন। পরে তার অবস্থান ও আটক নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়। ২৩ সেপ্টেম্বর (সোমবার) তার ব্যাংক হিসাব স্থগিত ও তলব করা হয়। ২৪ সেপ্টেম্বর (মঙ্গলবার) তার বিদেশ গমনে জারি করা হয় নিষেধাজ্ঞা। 

এসএমএম

আরও পড়ুন