• ঢাকা
  • সোমবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১৯, ৪ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬
প্রকাশিত: আগস্ট ১১, ২০১৯, ০৮:৫১ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : আগস্ট ১১, ২০১৯, ০৮:৫৬ পিএম

ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর ঈদুল আজহা

এসএম মুন্না
ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর ঈদুল আজহা

রাত পোহালেই ঈদ। আল্লাহর রাহে কোরবানির তাগিদ নিয়ে বছর ঘুরে এসেছে ঈদুল আজহা। ত্যাগের আনন্দে মহিমান্বিত ঈদ। ঈদুল আজহা মানে— লোক দেখিয়ে বহুদামে কেনা পশু জবাই নয়। রুটি-গোশত খাওয়ার দিনও নয়। নয় দানের নামে লোক দেখিয়ে গোশত বিলানো। আল্লাহভীতি থেকে আত্মত্যাগের শিক্ষায় উজ্জীবিত হয়ে আল্লাহর পথে কোরবানি করাই হলো ঈদের শিক্ষা। 

কবি নজরুলের ভাষায়—

চাহি নাকো গাভী দুম্বা উট, কতটুকু দান? ও দান ঝুট। চাই কোরবানি, চাই না দান।’

ঈদুল আজহাতে চাঁদ দেখার আনন্দময় অনিশ্চয়তা নেই। ১০ দিন আগেই ২ আগস্ট (শুক্রবার) নিশ্চিত হয়ে গেছে পবিত্র ঈদুল আজহার দিনক্ষণ। সে অনুযায়ী পছন্দের কোরবানির পশু কিনেছেন সামার্থ্যবানরা।

নাড়ির টানে শহরবাসী পথের ক্লান্তি ভুলে মায়ের স্নেহভরা কোলে ফিরে গেছেন। ঈদগাহও প্রস্তুত। দিনের শুরুতেই মুসল্লিরা ঈদগাহে যাবেন ঈদুল আজহার দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায়ে। ফিরে এসে আল্লাহর পথে পশু কোরবানি করবেন।

৪ হাজার বছর আগে মুসলমানদের আদি পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.) স্বপ্নে আদিষ্ট হন সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কোরবানি করার। পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.) ছিলেন তার সবচেয়ে আদরের ধন। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে নিজ পুত্রকেই কোরবানি করার উদ্যোগ নেন তিনি। কিন্তু পরম করুণাময়ের অপার কুদরতে হজরত ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি দুম্বা কোরবানি হয়।

হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সেই ত্যাগের মহিমা স্মরণ করে মুসলমানরা প্রতি বছর জিলহজ মাসের ১০ তারিখে আল্লাহ পাকের অনুগ্রহ লাভের আশায় তার পথে পশু কোরবানি করেন।

ঈদের পরের দুই দিনও পশু কোরবানির বিধান রয়েছে। ১৪ আগস্ট আসরের ওয়াক্ত পর্যন্ত কোরবানি করা যাবে। সামর্থ্যবানদের জন্য কোরবানি ফরজ হলেও ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হবে না দরিদ্ররাও। কোরবানির পশুর গোশতের তিন ভাগের এক ভাগ তাদের মধ্যে বিলিয়ে দেয়ার বিধান আছে।

ঈদ মুসলমানদের সার্বজনীন অনুষ্ঠান হলেও, অন্যান্য দেশের তুলনায় বাঙালি মুসলমানরা জৌলুসপূর্ণ ঈদ উদযাপন করেন। বাংলাদেশে ইসলামের প্রথম যুগে ঈদ সাদামাটাভাবে উদযাপন করা হলেও মোগল ও নবাব আমলে তা উৎসবের রূপ পায়। ১৭ শতকে পরিব্রাজক মীর্জা নাথানের ‘বাহরিস্তানে গায়েবি’ বইয়ে বাঙালির বর্ণিল ঈদের বর্ণনা পাওয়া যায়। তার বর্ণনা অনুযায়ী, ‘‘ঈদে বাঙালি মুসলমানরা একে অন্যের বাড়িতে যেতেন। সেখানে আহারের ব্যবস্থা থাকত। ঈদের দিন মুসলমান নারী-পুরুষ ও ছেলেমেয়েরা সুন্দর কাপড় পরত। সুন্দর পোশাক-পরিচ্ছদে সজ্জিত হয়ে শোভাযাত্রা সহকারে ঈদগাহে যেত। অবস্থাসম্পন্ন ব্যক্তিরা মুক্ত হস্তে অর্থ ও উপহারাদি ছড়িয়ে দিতেন। আর সাধারণ মুসলমানরা গরিবদেরকে দান-খয়রাত করতেন।’’

সেই ধারায় আজও বাংলাদেশের ঈদ অনেক বর্ণিল। ঈদ মানেই আনন্দের মিলনমেলা। প্রাচীনকালের মতো এবারও সারাদেশে ঈদ উপলক্ষে মেলা বসবে। এরই মধ্যে রাজধানীর সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণগুলোকে সাজিয়ে তোলা হয়েছে।

নাগরিক বিনোদন কেন্দ্র চিড়িয়াখানা, শিশুপার্কসহ বিভিন্ন পার্কে থাকবে উপচেপড়া ভিড় ঈদের দিন সকাল থেকে। গণমাধ্যমেও থাকে ঈদের বিশেষ আয়োজন। সংবাদপত্রগুলো প্রকাশ করেছে বিশেষ ঈদ সংখ্যা। টিভি চ্যানেলগুলোতে থাকছে তিন থেকে সাত দিনের বিশেষ ঈদ অনুষ্ঠানমালা।

ঈদ উপলক্ষে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ দেশের শীর্ষ রাজনীতিকরা।

রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেন, ‘‘কোরবানি আমাদের মাঝে আত্মদান ও আত্মত্যাগের মানসিকতা সঞ্চারিত করে, আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীর সঙ্গে সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নেয়ার মনোভাব ও সহিষ্ণুতার শিক্ষা দেয়। কোরবানির মর্ম অনুধাবন করে সমাজে শান্তি ও কল্যাণের পথ রচনা করতে আমাদের সংযম ও ত্যাগের মানসিকতায় উজ্জীবিত হতে হবে।’’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বাণীতে পবিত্র ঈদুল আজহার মর্মবাণী অন্তরে ধারণ করে নিজ-নিজ অবস্থান থেকে কাজের মাধ্যমে বৈষম্যহীন, সুখী ও সমৃদ্ধ, বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘‘শান্তি, সহমর্মিতা, ত্যাগ ও ভ্রাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় ঈদুল আজহা। তাই আসুন, আমরা সকলে পবিত্র ঈদুল আজহার মর্মবাণী অন্তরে ধারণ করে নিজ-নিজ অবস্থান থেকে জনকল্যাণমুখী কাজে অংশ নিয়ে বৈষম্যহীন,সুখী, সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তুলি।’’

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে সোমবার (১২ আগস্ট)  বঙ্গভবনে সর্বস্তরের জনগণের সঙ্গে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন সকাল সাড়ে ১০টা থেকে।

ঈদুল আজহা উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখবেন শুভেচ্চা বিনিময় কালে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার সরকারি বাসভবন গণভবনে দলীয় নেতা ও কর্মী, বিচারক এবং বিদেশী কূটনীতিকসহ সর্বস্তরের জনগণের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন সকাল থেকেই।

রাজধানীর সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গণে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে সকাল ৮টায় ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে। তবে আবহাওয়া প্রতিকূলে থাকলে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে সকাল সাড়ে ৮টায় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে। জাতীয় ঈদগাহে নামাজে ইমামতি করবেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের সিনিয়র পেশ ইমাম হাফেজ মুফতি মাওলানা মিজানুর রহমান। 

জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে পর্যায়ক্রমে ৫টি ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম জামাত সকাল ৭টা, দ্বিতীয় জামাত সকাল ৮টা, তৃতীয় জামাত সকাল ৯টা, চতুর্থ জামাত সকাল ১০টা এবং পঞ্চম ও সর্বশেষ জামাত সকাল ১০ টা ৪৫ মিনিটে অনুষ্ঠিত হবে।

কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় দেশের সর্ববৃহৎ ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে সকাল সাড়ে ৮টায়। জামাতে ইমামতি করবেন প্যানেল ইমাম শহরের মারকায মসজিদের ইমাম মাওলানা হাফিজুর রহমান খান।

পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে সরকারি এবং বেসরকারি ভবন ও বিদেশে বাংলাদেশ মিশনসমূহে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। ‘ঈদ মোবারক’ লিখিত ব্যানার ঢাকা মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ ট্রাফিক আইল্যান্ড ও লাইট পোস্টে প্রদর্শন করা হচ্ছে। নির্দিষ্ট সরকারি ভবনসমূহ ও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাসমূহে আলোকসজ্জা করা হয়েছে।

ঈদ উপলক্ষে রোববার (১১ আগস্ট) থেকে শুরু হয়ে গেছে তিনদিনের সরকারি ছুটি। প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে বরাবরের মতো এবারও রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বড় শহর থেকে অগণিত মানুষ নাড়ির টানে গেছেন গ্রামের বাড়িতে।

সারাদেশে বিভাগ বা জেলা বা উপজেলা বা সিটি করপোরেশন বা পৌরসভা বা সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ বা সরকারি সংস্থাসমূহের প্রধানগণ জাতীয় কর্মসূচির আলোকে নিজ নিজ কর্মসূচি অনুযায়ী ঈদ উদযাপন করবে। 

বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ও মিশনসমূহে যথাযথভাবে পবিত্র ঈদুল আযহা উদযাপন করবে।

বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার ও বেসরকারি গণমাধ্যমসমূহ যথাযোগ্য গুরুত্ব সহকারে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করবে।

ঈদ উপলক্ষে দেশের সকল সরকারি হাসপাতাল, কারাগার, সরকারি শিশু সদন, বৃদ্ধ নিবাস ও মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হবে।

ঈদের দিন সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বিনা টিকেটে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন সকল শিশু পার্কে প্রবেশ এবং বিনোদনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

কোরবানিকৃত পশুর বর্জ্য দ্বারা যাতে দুর্গন্ধ না ছড়ায় সে বিষয়ে সকল প্রকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ঈদুল আজহার পূর্ববর্তী জুমার খুৎবায় এ বিষয়ে মুসল্লিদের সচেতন করা হয়েছে।

ঈদ মানেই তো ভেদাভেদ ভুলে যাওয়ার দিন।

নজরুলের কবিতার মতো সবার প্রাণ বলে উঠবে—

ঈদ মোবারক, ঈদ মোবারক।/ দোস্ত দুশমন পর ও আপন/ সবার মহল আজি হউক রওনক / যে আছ দূরে যে আছ কাছে/ সবারে আজ মোর সালাম পৌঁছে’।

এসএমএম

আরও পড়ুন