• ঢাকা
  • বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ৮ আশ্বিন ১৪২৭
প্রকাশিত: আগস্ট ৩০, ২০২০, ১২:৪৮ এএম
সর্বশেষ আপডেট : আগস্ট ৩০, ২০২০, ১২:৫৪ এএম

‘ত্যাগ চাই, মর্সিয়া-ক্রন্দন চাহি না’

জাগরণ প্রতিবেদক
‘ত্যাগ চাই, মর্সিয়া-ক্রন্দন চাহি না’
তাজিয়া মিছিল ● ফাইল ছবি

পবিত্র আশুরা আজ রোববার (৩০ আগস্ট)। 

মহররম মাসের ১০ তারিখটি মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে গভীর শোকের দিন। এই দিনে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) অন্যায় ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে চক্রান্তকারী ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে কারবালা প্রান্তরে মর্মান্তিকভাবে শাহাদতবরণ করেন।

দিনটি একদিকে শোকের ও বেদনার, অন্যদিকে হত্যা ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণের উজ্জ্বল উদাহরণ।

হাদিস অনুযায়ী, মহররমের ১০ তারিখ ইসলামের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারবালা প্রান্তরে পরিবার-পরিজন, সঙ্গী-সাথিসহ হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শাহাদতবরণের মর্মান্তিক ঘটনার আগেও এই তারিখে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে।

আদি মানব হজরত আদম (আ.) এই দিনে পৃথিবীতে আগমন করেন, তার তওবা কবুল হয় এই দিনেই। এই দিনে হজরত নূহ (আ.)-এর নৌকা মহাপ্লাবন থেকে রক্ষা পায়।

তবে মুসলমানরা এই দিবসটি পালন করেন মূলত কারবালার প্রান্তরের সেই মর্মান্তিক ঘটনার স্মরণে।

মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর তার ছেলে ইয়াজিদ অবৈধভাবে ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেন এবং এ জন্য ষড়যন্ত্র ও বলপ্রয়োগের পথ বেছে নেন। মহানবী (সা.)-এর আরেক দৌহিত্র হজরত ইমাম হাসান (রা.)-কে বিষপানে হত্যা করা হয়। ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে অবরুদ্ধ হয়ে পরিবার-পরিজন ও ৭২ জন সঙ্গীসহ শাহাদতবরণ করেন হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)। এই হত্যাকাণ্ড ছিল অত্যন্ত নির্মম। অসহায় নারী ও শিশুদের পানি পর্যন্ত পান করতে দেয়নি ইয়াজিদ বাহিনী।

যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশে অত্যন্ত সম্প্রীতির পরিবেশে আশুরা পালিত হলেও এ বছর করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) এর কারণে ইমামবাড়ার বাইরে তাজিয়া মিছিলসহ সব আয়োজন বন্ধ থাকছে।

হোসনি দালান কর্তৃপক্ষ জানান, করোনার স্বাস্থ্যবিধি মেনে দেশের সব ইমামবাড়ার ভেতরে পালিত হবে পবিত্র আশুরা।  পুলিশ জানিয়েছে, আশুরা উপলক্ষে কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি না থাকলেও নেয়া হয়েছে তিন স্তরের নিরাপত্তা।

রাজধানীর নাজিমুদ্দিন রোডের হোসনি দালান ইমামবাড়ায় এবার আশুরা উপলক্ষে অন্যান্য বছরের চেয়ে কালো-সবুজ পোশাক পরে ইমামভক্তদের উচ্ছ্বাস কম। অন্যবারের মতো ইমামবাড়ার সামনে বসেনি মেলাও।

করোনার কারণে ইমামবাড়ার বাইরে নিষিদ্ধ করা হয়েছে সব আনুষ্ঠান। তাই ইমামবাড়া কেন্দ্রীক ভক্তদের আনাগোনাও কম।

হোসনি দালানের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মির্জা মোহাম্মদ নকীব জানান, সরকারি নির্দেশনা মেনেই সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে। ইমামবাড়া চত্বরেই সকাল ১০টা, সন্ধ্যা ৭টা এবং রাত ১০টায় অনুষ্ঠিত হবে তিনটি মিছিল।

স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মেনেই হবে বয়ান ও মর্সিয়া।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) জানায়, দা, ছোরা, কাঁচি, বর্শা, বল্লম, তরবারি, লাঠি ইত্যাদি বহন এবং আতশবাজি ও পটকা ফোটানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। এই আদেশ পবিত্র আশুরা উপলক্ষে অনুষ্ঠান শুরু হতে শেষ পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।

দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকগুলো বিশেষ প্রবন্ধ, নিবন্ধ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বিভিন্ন বেসরকারি রেডিও-টিভি চ্যানেলও এই দিনের তাৎপর্য নিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার করবে।

ডিএমপির গণমাধ্যম বিভাগের উপকমিশনার ওয়ালিদ হোসেন জানান, আশুরা উপলক্ষে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। হোসনি দালানের পুরো এলাকা আনা হয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায়।

করোনার সংক্রমণ মাথায় রেখে নির্দেশনা মেনে সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে ইমামভক্তদের আহ্বান জানিয়েছেন এই কর্মকর্তা।

আশুরার মূল চেতনা অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের সংগ্রাম। সেই সংগ্রামে সাময়িক আঘাত এলেও চূড়ান্ত বিজয় অবধারিত। এটাই মহররমের শিক্ষা। কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়, ‘ত্যাগ চাই, মর্সিয়া-ক্রন্দন চাহি না’। অন্যায়-অবিচার ও ষড়যন্ত্র থেকে পৃথিবীকে মুক্ত রাখতে ত্যাগের মহিমা সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে হবে।

আশুরা উপলক্ষে রোববার (৩০ আগস্ট) সরকারি ছুটি।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী  

পবিত্র আশুরা উপলক্ষে আলাদা আলাদা বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ তার বাণীতে বলেছেন, ‘কারবালার শোকাবহ ঘটনা আমাদেরকে অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে উদ্বুদ্ধ করে এবং সত্য ও সুন্দরের পথে চলার প্রেরণা যোগায়।’

তিনি বলেন, আশুরা সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য এক তাৎপর্যময় ও শোকের দিন। সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে হিজরি ৬১ সনের ১০ মহররম হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসেন (রা.) তার পরিবারের সম্মানিত সদস্য ও ঘনিষ্ঠ সহচরবৃন্দ বিশ্বাসঘাতক ইয়াজিদের সৈন্যদের হাতে কারবালায় শহীদ হন।

রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, ইসলামের সুমহান আদর্শ ও ত্যাগের মহিমাকে সমুন্নত রাখার জন্য তাদের এই আত্মত্যাগ ইতিহাসে সমুজ্জ্বল হয়ে আছে। কারবালার শোকাবহ ঘটনা আমাদের অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে উদ্বুদ্ধ করে এবং সত্য ও সুন্দরের পথে চলার প্রেরণা যোগায়। ইসলাম শান্তি ও সম্প্রীতির ধর্ম। এখানে হানাহানি, হিংসা, দ্বেষ বা বিভেদের কোনও স্থান নেই।

সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সমাজে সত্য ও সুন্দরের আলো ছড়িয়ে দিতে পবিত্র আশুরার মহান শিক্ষা সবার প্রেরণার উৎস হয়ে ওঠবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বাণীতে  পবিত্র আশুরার মর্মবাণী অন্তরে ধারণ করে জাতীয় জীবনে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নিজ নিজ অবস্থান থেকে জনকল্যাণমুখী কাজে অংশ নিয়ে বৈষম্যহীন, সুখী, সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ দেশ গড়ে তুলতে সবার প্রতি আহবান জানিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এবার আমরা এক সংকটময় সময়ে আশুরা পালন করছি। করোনাভাইরাস সমগ্র বিশ্বকে স্থবির করে দিয়েছে। আমাদের সরকার এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে। আমরা জনগণকে সকল সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছি।

তিনি বলেন, মহান আল্লাহ বিপদে মানুষের ধৈর্য্য পরীক্ষা করেন। এ সময় সকলকে অসীম ধৈর্য্য নিয়ে সহনশীল ও সহানুভূতিশীল মনে একে অপরকে সাহায্য করে যেতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকলকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, আমরা সকলে মহান আল্লাহর দরবারে বিশেষ দোয়া করি যেন এই সংক্রমণ থেকে দ্রুত মুক্তি পাই।

জাগরণ/কেএপি

আরও পড়ুন