• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২১, ৮ মাঘ ১৪২৭
প্রকাশিত: নভেম্বর ২৬, ২০২০, ১২:৫৪ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : নভেম্বর ২৬, ২০২০, ১২:৫৪ পিএম

‘নিকৃষ্ট’ বস্তি থেকেই ফুটবল ঈশ্বরের মহা উত্থান   

ক্রীড়া ডেস্ক
‘নিকৃষ্ট’ বস্তি থেকেই ফুটবল ঈশ্বরের মহা উত্থান   
বুয়েন্স আয়ার্সের ভিলা ফুয়েরিতো বারিহো বস্তিতে সত্তরের দশকে ডিয়েগো ম্যারাডোনা যেখানে বাস করতেন, সেটি ২০১৬ সালের ২০ অক্টোবর একটি জাদুঘরে পরিণত করা হয়। ফটো: চায়না ডেইলি।

আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েন্স আয়ার্সের ‘নিকৃষ্ট’ ভিলা ফুয়েরিতো বারিহো বস্তিটাই শৈশবে ডিয়েগো ম্যারাডোনার ভাগ্যে জুটেছিল। ওই বস্তিতে ছিল না কোনো পাকা রাস্তা, ছিল না বিশুদ্ধ পানির সরবারহ। চোখ কপালে ওঠার মতো ব্যাপার, ওই বস্তিতে শৌচাগার পর্যন্ত ছিল না। বসবাসের প্রায় অযোগ্য সেই বস্তিতে ডন ডিয়েগো সিনিয়রের ঘরে চার মেয়ের পর পঞ্চম সন্তানের জন্ম হয়। তার নাম রাখা হয় ডিয়েগো আরমান্ডো ম্যারাডোনা।

অভাবের সংসারে ম্যারাডোনার বাবা প্রতিদিন সূর্য ওঠারও আগে বাড়ি ছেড়ে জীবিকার সন্ধানে বের হতেন, ফিরতেন রাত করে। ক্লান্ত শরীরে বাড়ি শুধুমাত্র ঘুমানোর জন্যই বাড়ির কর্তা ফিরতেন। তাই কখনোই বাবার সঙ্গে ম্যারাডোনার সখ্যতা গড়ে ওঠেনি। মায়ের ছেলে বলতে যা বোঝায়, ম্যারাডোনা প্রকৃতপক্ষে ঠিক তাই ছিলেন।  

বস্তির জীবনেই দারিদ্রতার সঙ্গে বিদ্রোহ ঘোষণা করে বসেছিলেন কিংবদন্তি এই মানুষটি। কিন্তু মানবেতর জীবন থেকে বেরিয়ে আসার একটা পথ তো দরকার। ম্যারাডোনাকে সেই পথ দেখিয়েছিল এক চর্মগোলক, নাম তার ফুটবল। ম্যারাডোনা বল নিয়েই থাকতেন, একা একাই খেলতেন। বস্তির বাকি ছেলেরাও ফুটবল খেলতো বটে, কিন্তু তাদের খেলার ধরণ তখনও ফুটবল ঈশ্বর হয়ে না ওঠা বালকের মনে ধরতো না। 

বস্তির জীবন থেকে যেকোনো উপায়ে মুক্তির পথ খুঁজছিলেন ম্যারাডোনা। ফুটবলকে পেশা হিসেবে নিলেই মিলবে মুক্তি, সেটি হয়তো তিনি ভালোভাবেই টের পেয়েছিলেন। ঈশ্বর প্রদত্ত প্রতিভা দেখিয়ে মাত্র ১৫ বছর বয়সে আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্সের সঙ্গে প্রথম পেশাদার চুক্তির পর তিনি হয়ে যান একটি ফ্ল্যাটের মালিক। ৭ ভাইবোন আর বাবা-মাকে মাথার উপরে ছাঁদ পাওয়া ম্যারাডোনা তখনই পেয়ে যান বস্তির জীবন থেকে মুক্তি। এরপর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। 

বোকা জুনিয়র্স হয়ে তখনকার বিশ্বরেকর্ড ফিতে বার্সেলোনায় পাড়ি জমিয়েছিলেন। বিশ্বের সবচেয়ে দামি ফুটবলারের ট্যাগ তার গায়ে লেগে যায়। বার্সেলোনায় ক্যারিয়ারের দুই বছর ম্যারাডোনার মোটেও শান্তিতে কাটেনি। ইনজুরি সমস্যার পর কোচ মেনোত্তি এবং ক্লাব কর্তাদের সঙ্গে মতবিরোধ দেখা দেয়ায় কাতালান ক্লাবটিতে তার আর থাকা হয়নি। তখন ইতালি মানেই নামকরা ফুটবলারদের আখড়া। ম্যারাডোনা সেখানেই গেলেও কিন্তু দুই মিলান ও জুভেন্টাসে না গিয়ে গেলেন অখ্যাত নেপলসে, যে শহরের ক্লাব নাপোলির অর্জন মোটে দুইবার দুইটি কাপ শিরোপা জয়। ম্যারাডোনার নামের সঙ্গে বড্ড বেমানান ছিল। নাপোলি তার জন্য আরেকবার বিশ্বরেকর্ড গড়েছিল। কিন্তু ম্যারাডোনা আসলে নেপলসে গিয়েছিলেন শান্তি খুঁজতে। নাপোলিতে কী চান আপনি? সাংবাদিকের প্রথম প্রশ্নের পর ম্যারাডোনার জবাব ছিল, আমি চাই একটু শান্তি। বার্সেলোনায় আমি সুখ খুঁজে পাইনি। একটু শান্তি দরকার।

ম্যারাডোনা নাপোলির কাছে চেয়েছিলেন একটি বাড়ি, পেয়েছিলেন বাসা। চেয়েছিলেন ফেরারি, পেয়েছিলেন ফিয়াট। এরপরও নাপোলিতে সুখে ছিলেন ম্যারাডোনা। কারণ নিচের সারির কোনো ক্লাবকে চ্যাম্পিয়ন করার মাহাত্ম্য এবং তৃপ্তি বড় ক্লাবের শিরোপা জয়ে বোধ হয় ততোখানি মানসিকভাবে জোটে না। নাপোলিতে ম্যারাডোনা বোধ হয় সে কারণেই সুখ খুঁজে পেয়েছিলেন।

ম্যারাডোনা অখ্যাত নাপোলিকে লীগ জিতিয়েছিলেন দুইবার। ইউয়েফা কাপও জিতিয়েছিলেন। ক্যারিয়ারে একটানা সবচেয়ে বেশি খেলেছেন নাপোলিতে। ওই শহরে যিশুর চেয়েও ম্যারাডোনার ছবি বেশি আছে বলে একটা কথা চালু আছে। অথচ ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, ট্যাক্স ফাঁকির মামলার হাত থেকে বাঁচতে ম্যারাডোনা রাতের অন্ধকারে
নাপোলি ছেড়ে পালিয়েছিলেন। ম্যারাডোনা ওই শহরে সুখ খুঁজে পেলেও তা হারিয়েও ফেলেন। এখনও নাপোলির রাস্তায় প্রতিদিন নতুন করে ম্যারাডোনার ম্যুরাল আঁকা হয়। শুধু মানুষ ম্যারাডোনাটাই ফিরতে পারেন না। আর কোনোদিন পারবেনও না। এখন তো তিনি পৃথিবী নামক গ্রহটি থেকেই চিরবিদায় নিয়ে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছেন। বুয়েন্স আয়ার্সেই জন্মেছিলেন, সেখানেই হয়েছে তার মৃত্যু। যেন জীবনচক্রটি পূরণ করেই সবাইকে কাঁদিয়ে ঈশ্বরের হাতে পৌঁছে গেলেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা।   


এসইউ