• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ১৫ অক্টোবর, ২০১৯, ৩০ আশ্বিন ১৪২৬
প্রকাশিত: জুলাই ১১, ২০১৯, ১১:১৪ এএম
সর্বশেষ আপডেট : জুলাই ১১, ২০১৯, ১১:২৮ এএম

নামেই বহিষ্কার

জবিতে ক্লাস করেন, পরীক্ষাও দেন বহিষ্কৃতরা

জবি সংবাদদাতা
জবিতে ক্লাস করেন, পরীক্ষাও দেন বহিষ্কৃতরা
জগন্নাথ বিশ্ববদ্যালয় -ফাইল ছবি

জগন্নাথ বিশ্ববদ্যালয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে গত দেড় বছরে (২০১৭ অক্টোবর থেকে ২০১৯ মে পর্যন্ত) ২৮ জন শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাদের সবাই বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী। সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরে বহিষ্কারাদেশের চিঠি  না পৌঁছানোয় আজও আদেশগুলো পরিপূর্ণভাবে কার্যকর হয়নি। এই সুযোগে বহিষ্কৃতদের অনেকেই ক্লাস-পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন এবং ফলও পেয়েছেন। আবার কেউ কেউ সাময়িক বহিষ্কারাদেশ তুলে নিয়েছেন। প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমন তথ্য।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার প্রকৌশলী মো. ওহিদুজ্জামান বলেন, আমরা সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরে আদেশের অনুলিপি পাঠাই। তারা হয়তো এসব অনুলিপি সংগ্রহ করে রাখে না। বহিষ্কৃত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ব্যাপারটি প্রক্টর দপ্তর বলতে পারবে। আর পরীক্ষায় অংশগ্রহণের বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখছি।

পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এ কে এম আক্তারুজ্জামান বলেন, বহিষ্কৃতদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ নেই। অনেক সময় শৃঙ্খলা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বহিষ্কৃতদের ক্লাস-পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া হয়। তবে সবার ক্ষেত্রে এমনটা হয় না। তারপরেও যদি এমন কেউ থেকে থাকে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

প্রক্টরিয়াল আইন অনুযায়ী, বহিষ্কৃত থাকা কালে শিক্ষার্থী কোনো ক্লাস-পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে না। সাময়িক বহিষ্কৃতদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম। তবে বহিষ্কৃতদের অনেকে ক্লাস-পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন, ফলও পেয়েছেন এমন অভিযোগ রয়েছে। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. নুর মোহাম্মদ বলেন, অপরাধের মাত্রা দেখে শৃঙ্খলা কমিটি, ডিনস, প্রক্টরিয়াল বডি মিলে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। মানবিক দিক চিন্তা করে অনেক সময় ক্লাস পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার কার্যালয় থেকে জানা যায়, ভর্তি জালিয়াতি, যৌন হয়রানি, সাংবাদিক নির্যাতন, সংঘর্ষসহ বিভিন্ন অভিযোগে গত ২০১৭ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের মে পর্যন্ত বিভিন্ন বিভাগের ২৮ জন শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩ জনকে আজীবন বহিষ্কারসহ ২৫ জনকে জনকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়।
 
২০১৭ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫ জন বহিষ্কার হয়েছে। ২৪ অক্টোবর অগ্রণী ব্যাংকের সামনে এক শিক্ষার্থীকে ক্ষুর দিয়ে আঘাত করার অপরাধে ৩০ অক্টোবর উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তৌহিদুল ইসলাম শান্তকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। একই বছরে ২৮ অক্টোবর এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে চাঁদা চাওয়া, তাকে মারধর করা এবং উক্ত ঘটনা নিয়ে শিক্ষক লাউনঞ্জের পাশে অবস্থিত টয়লেটের দরজা ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং ৫ শিক্ষার্থীকে আহত করার অভিযোগে ১২ই নভেম্বর ৪ শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। তারা হলেন- রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের হোসনে মোবারক, ফিন্যান্স বিভাগের ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের সুজন দাস অর্ক, ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের এস কে মিরাজ, সামাজবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের রাজীব বিশ্বাস।

২০১৮ সালে বহিষ্কার করা হয়েছে ১৫ জনকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাংবাদিক কে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে আঘাত করার অপরাধে ৭ জানুয়ারি মার্কেটিং বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের তানভীর চৌধুরী শাকিল কে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ২২ মার্চ সমাজকর্ম বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের আব্দুল্লাহ আল নোমানকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়।

৭ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের ২০১৪-১৫ বর্ষের শিক্ষার্থী মো. মাকসুদর রহমান শিহাবকে ছুরিকাঘাত করা, বিশ্ববিদ্যালয় বাসে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের মারধর, শিক্ষকদের সঙ্গে খারাপ আচরণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেকটি মারামারির ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগে ফার্মেসি বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের মো. আল ইকরাম অর্ণব কে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০০৫-এর ১১(১০) ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সিন্ডিকেটের অনুমোদন সাপেক্ষে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

১২ এপ্রিল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের রেভেনাস ক্যান্টিনের সম্মুখে লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম কে মারধর করার অভিযোগে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের মো. সিয়াম আহমেদ কে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। এছাড়া ১৭ই এপ্রিল এক সেকশন অফিসারকে মারধর করার অভিযোগে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের রাজীব বিশ্বাস এবং ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকায় ফার্মেসি বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের আকিব বিন বারী কে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০০৫-এর(১০) ধারায় পদত্ত ক্ষমতাবলে সিন্ডিকেটের অনুমোদন সাপেক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়।
 
১০ জুলাই ক্যাম্পাসের শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে গণিত বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের মো. হাবুল হোসেন, ইতিহাস বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের নূরে আলম সিদ্দিকি কে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। ১৩ সেপ্টেম্বর মাসে দুর্জয় বাসে গ্রুপ স্টাডিরত ৬ শিক্ষার্থীকে অকথ্যভাষায় গালিগালাজ এবং মারধর করার অধিযোগে ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের কম্পিউটার সাযেন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মাসফিক খান আদর, দর্শন বিভাগের মেহেদী হাসান, ম্যানেজমেন্ট বিভাগের মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম শান্ত কে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়।

২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের ইউনিট-২ এর পরীক্ষা শেষে বের হবার সময় এক ছাত্রীকে স্পর্শকাতর জায়গা দেখিয়ে অশালীন ও হয়রানিমূলক কথাবার্তা বলা এবং প্রতিবাদ করলে তাকে জোর পূর্বক বিল্ডিং এর এক সাইডে নিয়ে যেতে চেষ্টা করায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের মার্কেটিং বিভাগের মোবারক ঠাকুর প্রিন্স এবং জয়নুল আবেদীন কে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়।

২২ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে আয়োজিত কনসার্টে এবং ৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় ক্যাম্পাসের গেইটে ঘোড়ার গাড়ির চালক রাব্বি মিয়ার উপর হামলার অভিযোগে ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের আল সাদিক, উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের তৌহিদুল ইসলাম শান্ত, ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের নৃবিজ্ঞান বিভাগের আশিকুর রহমান আশিক কে সাময়িক বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৮ জন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িক বহিষ্কৃত হয়েছেন। গত ৩ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অনাকাঙ্খিত ঘটনায় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০১৭-২০১৮ শিক্ষাবর্ষের গণিত বিভাগের মো. শাহরিয়ার রহমান শান্ত, তৌহিদুল ইসলাম তুহিন, ২০১৬-২০১৭ শিক্ষাবর্ষের মেহেদী এবং সিএসই বিভাগের আশরাফুল আল রিফাত সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়।

চলতি বছরের ২৭ মার্চ ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী লিজা কবির কে ইভটিজিং এবং বন্ধুরা এর প্রতিবাদ করলে তাদের উপর হামলা চালানোর ‍অভিযোগে ৩১মার্চ ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের হাসানুজ্জামান কে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়।

২৮ মার্চ নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ফারহানা আফরিন ক্যাম্পাসে তার বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে আসলে তাদেরকে বাহাদুর শাহ (ভিক্টোরিয়া) পার্কে ডেকে তাদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করে এবং মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেয়া হয়। এই অভিযোগে ১৮ এপ্রিল ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী ফাহিম আহমেদ খান ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষার্থী মো. মারুফ আহমেদ কে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়। পরে একই ঘটনায় ৮ মে একই শিক্ষাবর্ষের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের মিরাজুল ইসলাম কে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়।

সার্বিক বিষয় সম্পর্কে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান বলেন, যারা নকল করে পরীক্ষা দেয় তাদের ক্লাস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার সুযোগ নেই। আর যারা মারামারি, ইভটিজিং এসব কারণে বহিষ্কার হয় দেখা যায় তারা নিজেরাই পরে আপোষ করে ফেলে। তবে তারা শৃঙ্খলা কমিটির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার আগ পর্যন্ত ক্লাস-পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবে কিন্তু ফলাফল প্রকাশ হবে না।

একেএস

আরও পড়ুন

Islami Bank