• ঢাকা
  • শুক্রবার, ২৭ মে, ২০২২, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৫, ২০২১, ০৪:১৪ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : জানুয়ারি ২৫, ২০২১, ১০:১৪ এএম

নপুংসক

নপুংসক

কেউ গভীর করে আমার দিকে তাকালে, চোখ নামিয়ে নিই। কেমন যেন অস্বস্তি হয়। মনে হয়, একটা শীতল দৃষ্টির সাপ আমার চোখ দিয়ে ঢুকে কণ্ঠনালি হয়ে এঁকেবেঁকে এগিয়ে চলেছে পেটের কাছে। সাপটা আমার পাকস্থলীতে গিয়ে বাসা বাঁধতে চায়। কারো গভীর বা জিজ্ঞাসু দৃষ্টির অদ্ভুত সে অনুভূতিকে আমি ভয় পাই। এই যেমন এখন বাসায় কেউ নেই, আমার স্ত্রী ছোট মেয়েটিকে কলসির মতো কাঁখে নিয়ে বড় মেয়েটির হাত ধরে বেরিয়েছে পড়শিকালীন শিক্ষাসফরে। সেখান থেকে মেয়েকে নিয়ে যাওয়া হবে স্কুলে। যাওয়ার সময় ও আমাকে বলে গেছে, নয়টার দিকে ময়লাওয়ালা আসবে। আমি যেন গত রাতে দুর্গন্ধ ছড়ানো আপদগুলো বিশ্বস্তভাবে ময়লাওয়ালার হাতে তুলে দিই। কথাটা আমি শুনেছি, কিন্তু কতটুকু শুনেছি জানি না। এ রকম মাঝে মাঝেই আমি আনমনা থাকি। ধরা যাক, ভাত খেতে খেতে এক লোকমা মুখে নিলাম, কিংবা বাথরুমে বসে কিছু ভাবছি অথবা হাঁটতে হাঁটতে অফিস যাওয়া। কখনো আরো সমস্ত মুহূর্ত কেমন একটা দোনামনা আনমনা, পোষা কুকুরের মতো আমার পায়ে পায়ে ঘোরে। ওকে প্রশ্রয় দিলে আনমনাটা আদুরে স্বভাবে গায়ে নিজের শরীর ঘষে। কেন যে এসব হয় আমি জানি না। তবে এতটুকু জানি, আজ আনমনাটাকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। ঘড়ির রক্ত আরো চাপ বাড়ালে এগিয়ে আসবে সময়। আর ঠিক ১২টায় আমাকে যেতে হবে মেয়েকে স্কুল থেকে নিয়ে আসতে। তার আগে এই হীরণ্ময় একলা সময়টুকুই আমার কাছে ছিল আজকের দিনের সেরা উপহার। কিন্তু যতক্ষণ না দেখলাম, দেয়ালের ওই টিকটিকিটা এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আচ্ছা টিকটিকির রক্ত তো সাদা, তাই না? মানে ও শীতল রক্তের প্রাণী। তাই তো ওর দৃষ্টিটা এই একলা ঘরে বরফের বর্শা হয়ে আমার হৃৎপিণ্ডে এসে ঠেকছে। হুশ, হুশ, এই যা, যা ওমা, টিকটিকিটা গেল না! ও আমাকে এমনভাবে অবজ্ঞা করছে যা খুবই অপমানকর। ঠিক যেমন অফিসে সামান্য কুকুরটা আমাকে অবজ্ঞা করে। আমাকে দেখলেই কুকুরটা এমনভাবে ঘেউ ঘেউ করে, মনে হয় আমি যেন চোর। আমি যেন অনধিকার প্রবেশ করছি। এমনকি পিয়নটাও আমাকে অবজ্ঞা করে তুচ্ছ জিনিসের মতো। আমাকে দেখলে পিয়নটার চোখ মুখ এমন বিকৃত হয়ে ওঠে যে মনে হয় আমি একটা কুৎসিত প্রাণী। আমার সারা শরীর থেকে যেন নোংরা গন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। অবশ্য পিয়নটারই বা দোষ কী। একটু চুপচাপ আর নিজের মতো থাকা মানুষকে লোকে বোকা-হাবা ভাবে। আমার সহকর্মী মতিন তো যেচে পড়ে ফাজলামি করতেও ছাড়ে না। বলে বউ নাকি আমাকে বাসায় এত যন্ত্রণা দেয় যে, অফিসে এসেও মুড খারাপ থাকে। পাশের টেবিলের রেহানা বলে,  আমার হাসির ওপর নাকি সরকার আলাদা করে ট্যাক্স বসিয়েছে। তাই কারো কোনো প্রশ্ন বা আলাপে আমি মেপে মেপে হাসি। তা-ও আবার হাসির সে দৈর্ঘ্য-প্রস্থ পুঙ্খানুপুঙ্খ ইঞ্চি টেপে মাপা। কেউ বলে, আমার চোখগুলো নাকি সব সময় কেমন ঘুমঘুম। আমাকে দেখলে মনে হয় অপুষ্ট ঘুমের কারণে আমি ক্লান্ত। সব সময় আমার চোখে কেমন ঘুম লেগে থাকে। সত্যিই কি আমি এমন কিনা জানি না। তবে এসবে এখন আমার সয়ে গেছে। কেউ বললেও গায়ে লাগে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঘরের টিকটিকিটাও আমাকে যে অবজ্ঞা দেখাচ্ছে, সেটা সহ্য করা মুশকিল! একে নিয়ে বেশিক্ষণ ব্যস্ত থাকলে হবে না। কারণ খুব শিগগির আলমারির মাথায় ও চলে আসবে। তখন আমাকে অন্য কাজে ব্যস্ত হতে হবে। তার আগে টিকটিকিটাকে একটা শিক্ষা দেওয়া দরকার। আচ্ছা টিকটিকিটার দিকে যদি এই স্যান্ডেলটা ছুড়ে মারি, তাহলে নিশ্চয়ই বেটা মাটিতে পড়ে যাবে। তখন ঝাড়ু দিয়ে মেরে ওর দফারফা করে দেব। আমি স্যান্ডেলটা তুলে টিকটিকির দিকে তাক করলাম। প্রাণীটা বুঝতে পারল কি না কে জানে, শুধু মনে হলো দৃষ্টিটা আমার দিক থেকে সরিয়ে নিল অভিমানে। কেন, সামান্য একটা সরীসৃপের এত অভিমান হবে কেন। আমি মানুষ আমার কি অভিমান নেই? আমার দিকে কেন ও এমন অবজ্ঞাভরা চোখে তাকাবে। এত কিছু ভাবার সময় নেই, আমি ওর দিকে স্যান্ডেলটা ছুড়ে দিলাম, কিন্তু জায়গামতো লাগেনি। তার আগেই টিকটিকিটা চলে গেছে আলমারির আড়ালে। ছোট্ট ওই ফাঁক গলে টিকটিকিটাকে দেখতে যাব, তখনই ওর হাসির শব্দটা শুনলাম। মৃদু আর কেমন কাঁপা। ঘরে কেউ না থাকলে মাঝে মাঝেই ও আমার কাছে আসে। ও কে তা আমি জানি না, কখনো নামও জিজ্ঞেস করিনি। তবে ও এলে আমার কেমন যেন অস্বস্তি হয়, মনে হয় বাড়ির লোকজনকে লুকিয়ে খুব গোপন কোনো প্রেমিকাকে আমি বাসায় নিয়ে এসে দরজা বন্ধ করে দিয়েছি। ও এলে গোটা ঘরে একটা হালকা গন্ধ ছড়িয়ে যায়। গন্ধটা অনেকটা কর্পূরের মতো। ওর কথা আমি আমার বউকে বলেছিলাম। কিন্তু সে বিশ্বাস করে না। বলে, সবই আমার কল্পনা। ঘরে কেউ না থাকলে একটা ভূত আলমারির ওপর এসে পা ঝুলিয়ে বসে থাকে, এ কথা আমি যেন বাইরের কাউকে না বলি, তাহলে সবাই পাগল বলবে। বিশেষ করে দুই মেয়েকে যেন ভুলেও না বলি, কারণ ওরা ভয় পাবে। আমি আর বউ বা বাচ্চা কাউকেই কখনো ওর সম্পর্কে কিছু বলিনি। বলিনি যে আলমারির ওপর পা ঝুলিয়ে যে বসে থাকে, সে দেখতে হুবহু আমারই মতো। আমারই মতো কপালের কোনে তারও একটা কাটা দাগ আছে, পার্থক্য শুধু ওই কর্পূরের ঘ্রাণ। আজ ও আবার এসেছে। আমি টিকটিকিকে রেখে ভয়ে ভয়ে ওপরের দিকে তাকাই। ওই তো আলমারির ওপর কেমন আরামদায়ক ভঙ্গিমাতে বসে আছে ও। এমনভাবে মিটিমিটি হাসছে যেন, আমার কাণ্ডকারখানা দেখে খুব মজা পাচ্ছে। একসময় ওর ফিসফিসানি কণ্ঠ শোনা যায়, কী, শেষ পর্যন্ত টিকটিকিটাও মারতে পারলে না? কী হবে তোমাকে দিয়ে!
‘আমাকে দিয়ে কী হবে জানি না, তবে তুমি যা বলো তা আমার পক্ষে করা সম্ভব নয়।’
আমি জানি, তোমাকে দিয়ে সেসব হবে না। কারণ টেবিলের ওপর যে পত্রিকাটা এতক্ষণ মনোযোগ দিয়ে পড়ছিলে, তাতে থাকা অখাদ্য খবরগুলো তোমার মেজাজ খারাপ করলেও সত্যি কিছু করার নেই। রাস্তায় হাঁটার সময় কেউ ইচ্ছে করে তোমাকে ধাক্কা মেরে নর্দমায় ফেলে দিলেও তাকে তুমি কিছু করতে পারবে না। বাসে কন্ডাক্টর দশ টাকার ভাড়া ১৫ টাকা নিয়ে আবার দুটো বাড়তি কথা শুনিয়ে দিলেও তুমি মনে মনে বলবে, থাক গরিব মানুষ। অফিসের কলিগ তোমার বউকে নিয়ে অশ্লীল ইঙ্গিত করলে ভাববে এদের আর শিক্ষা হলো না। তোমার চেয়ে শতগুণে খারাপ কাজ করা ফাঁকিবাজ লোকটা যখন মুখের ওপর বলবে, কী কাজ করো কিচ্ছু হচ্ছে না, তখন তোমার হতাশ হওয়া ছাড়া কিছুই করার নেই। কাজ করেও ন্যায্য পাওনা চাইতে না পারার লজ্জাবনত বিশ্রী ভদ্রতা শুধু তোমার কাছেই মানায়। আবার সেই একই ব্যক্তি যখন পাওনাদার তখন তোমার মিনমিনে কাকুতি-মিনতি সত্যিই দেখার মতো।
দেখ, তুমি যা বলছ, এর কিছুই সত্য নয়। এসব নিয়ে আমারও শরীরের রক্ত গরম হয়। কখনো কখনো গোটা জন্মের ওপর প্রচণ্ড রাগ হয়। ইচ্ছে করে কাউকে ধরে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করি। বেদম কিল-ঘুষি লাথিতে শরীরের হাড় ভাঙার শব্দ শুনি। পাথর দিয়ে মনে হয় কারো মাথাটা থেঁতলে দিই। ছুরি দিয়ে চিরে দিই কারো পেট, যতক্ষণ না পর্যন্ত মৃত্যু আসে। মনে হয় পিটিয়ে ভেঙে ফেলি পৃথিবীর সমস্ত আয়না, ভঙ্গুর সবকিছু। প্রতিটা খুনের বদলা নিই খুনে, চোখের বদলা নিই চোখ উপড়ে। যে বা যারা আমাকে প্রতি মুহূর্তে ঠকাচ্ছে অন্ন বস্ত্র বাসস্থানে জীবনে, ইচ্ছে করে কাঠঠোকরা হয়ে ওদের মগজ ঠুকরে দিই। একটা বন্দুক নিয়ে বেরিয়ে পড়ি রাস্তায়, ঠাস ঠাস গুলি করে ফেলে দিই প্রত্যেকটা নিস্পৃহ শয়তানকে। ওদের জমাট রক্তের ওপর পিছলে যাক গাড়ির চাকা। 
অথচ তোমার কিছুই করা হয় না। তুমি কেবল বোধশক্তিহীন একটা রোবট হয়ে জীবনটাকে যাপন করে চলেছ। এই যে আমি যে তোমাকে এত কথা বলছি, তোমার রাগ হচ্ছে না, ঘৃণা হচ্ছে না? তোমার কি মনে হচ্ছে না, আমাকে এই আলমারির মাথা থেকে টেনেহিঁচড়ে মাটিতে নামানো উচিত। নাকি ভয় পাচ্ছ?    
না, ভয় পাচ্ছি না। একবার মনে হচ্ছে সত্যিই তোমাকে নামিয়ে এনে নৃশংসভাবে গলা টিপে ধরি। পরক্ষণেই আবার মনে হচ্ছে, কী দরকার থাক না। এতটা অমানবিক আমি কখনোই হতে পারব না। কিন্তু জানো, আমি চুপ করে থাকলে মাথার ওপর ফ্যানটা ক্যাচ ক্যাচ শব্দে কী যেন বলতে চেষ্টা করে। মনে হয় বিশাল এক ষড়যন্ত্র। আমি বাথরুম থেকে ব্লেড নিয়ে এসে দেখেছি, নখ কাটতে গিয়ে আমার আঙুলে ব্লেড গেঁথে যায়। গভীর থেকে গভীরে ব্লেডের ধারটা বসে গেলে রক্ত আসে। আমি অন্যের রক্ত দেখতে পারি না, তবে নিজের রক্ত দেখি। এই রক্ত আর তার মধ্যে লাল ছায়া আমি কাউকে বোঝাতে পারব না, যা বিষম অন্তরঙ্গ কোনো মৃত্যুর মতো সমান অবিশ্বাস্য।

কে যেন এসেছে দরজায়, বেল পড়ছে। আচ্ছা যে এসেছে, সে কি আলমারির মাথায় পা ঝুলিয়ে বসে থাকা ওই লোকটাকে দেখতে পাবে? আমি দরজা খুলি দেখি, সেই ময়লাওয়ালা। যার কাছে গত রাতে দুর্গন্ধ ছড়ানো আপদগুলো আমার বিশ্বস্তভাবে তুলে দিতে হবে। আমি ময়লার পাত্রটা তুলতেই চমকে উঠলাম, একটা তেলাপোকা। আমার দিকে তেলাপোকাটা যেন শান্ত চোখে তাকিয়ে আছে। আমি দ্রুত ময়লাওয়ালাকে পাত্রটা দিয়ে এলাম। আমার তাড়াহুড়ো আর বিক্ষিপ্ততা দেখে ছেলেটা হয়তো অবাক হয়েছে। কিন্তু তাতে কিছুই যায় আসে না। দরজা বন্ধ করতেই আলমারির মাথা থেকে হাসিটা শোনা যায়। আমার মতো দেখতে ও আলমারিটার মাথায় বসে পা দোলাচ্ছে। তুমি চাইলে নিচে নামতে পারো। এসো আমরা বারান্দাটায় বসে কথা বলি।

আমি তো মাটিতে নামি না। তোমার ঘর যখন সুনসান হয়ে যায়, কিংবা তোমার স্ত্রী-কন্যারা যখন ঘুমিয়ে পড়ে, তখন আমি এই আলমারির মাথায় বসে পা দোলাতে দোলাতে তোমাকে দেখি। তোমার জন্মভীরুতা, কাপুরুষতা দেখতে আমার মজা লাগে। তোমাকে চিড়িয়াখানার একটা নিরীহ বাঁদরের মতো মনে হয়।  
না তুমি আমাকে যা ভাবছ, আমি তা নই। আমি আমার মতো নিজের মনে, নিজের মধ্যে থাকি, এটাকে ভীরুতা কাপুরুষতা বলে না। 
ও তাই বুঝি সবখানে গুটিয়ে থাকো। কারো সাতেপাঁচে রা করো না। ঠিক যেমন এই হৃদয় কাঁপে না, দোলে না, আহা নাচে শুধু রাই বেশে! একটু আগে যে তেলাপোকাটাকে দেখলে, সে-ও তোমার দিকে এ জন্যই তাকিয়ে ছিল। ছোট্ট পোকাটাও তোমাকে দেখে ভাবছে, কী অদ্ভুত! যে টিকটিকিটাকে মারতে চাইলে সে-ও একই কথা ভেবেছে। তা বীরপুরুষ, তোমার নিশ্চয়ই রাগ হচ্ছে? যাও তেলাপোকাটাকে জন্মের শিক্ষা দিয়ে এসো। আমি অপেক্ষা করছি।

আমি ঝাড়ু নিয়ে তেলাপোকাটাকে যেখানে দেখেছিলাম সেখানে যাই। ছোট্ট প্রাণীটা ওর দুই শুড় নেড়ে আমাকে যেন কেমন ব্যঙ্গ করল। তবে আমি ছাড় দিচ্ছি না, ঝাড়ু দিয়ে পিটিয়ে তেলাপোকাটার দফারফা করে দিলাম। একটু আগে জীবিত পোকাটা এখন নিথর হয়ে আকাশের দিকে পা তুলে আছে। এটাই ওর উপযুক্ত শিক্ষা। নিথর পোকাটাকে পেয়ে দেখি দুটো পিঁপড়েও এগিয়ে আসছে। আমি আঙুল দিয়ে টিপে সেগুলোরও প্রাণবায়ু বের করে দিয়েছি। শক্তিশালী আঙুলের চাপে পিঁপড়েগুলোর শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। যেন আমার গোটা পৃথিবীর রাগ ছোট্ট প্রাণীগুলোর ওপর ভর করেছে। ওরা একজন একজন করে প্রাণ দিচ্ছে আমার প্রাণ জুড়াবে বলে। কিন্তু আলমারির ওপর এখনো সেই লোকটা হাসছে কেন! তুমি দেখতে পাচ্ছ, কী নির্দয়ভাবে আমি তেলাপোকা আর পিঁপড়েগুলোকে মেরেছি। টিকিটিকিটাকে খুঁজছি, ওটাকেও মারব। দেখতে পাচ্ছ তুমি, দেখতে পাচ্ছ?

আলমারির ওপরে পা দোলাতে থাকা লোকটার হাসিমুখে কোনো ভাবান্তর হয় না। শুধু বলে, দেখলাম। তবে এর বেশি করার ক্ষমতা তোমার নেই। আচ্ছা তুমি তোমার নিজের এই অক্ষমতা টের পাও তো? নাকি মনে করো এটাই স্বাভাবিক। ছোটে নাকো হাঁটে না, কাউকে যে কাটে না, করে নাকো ফোঁসফাস, মারে নাকো ঢুশঢাশ টাইপের একটা নিছক সামান্য পানসে জীবন। আর কত, সামান্য একটু উত্তেজনা তো আনো। মেরুদণ্ডটা সোজা করে একটু দাঁড়াও তো দেখি।

তুমি যাও, তুমি এক্ষুনি এখান থেকে যাও। আমাকে বের হতে হবে। আমি আর ঘরে থাকতে পারছি না। আমি যেমন পিঁপড়েগুলোকে আঙুলের চাপে পিষে দিয়েছি, এখন এই ঘরটাও যেন আমার অবস্থা ঠিক একই করতে চাইছে। মনে হচ্ছে মাথার ওপর কেউ বিষম ভার চাপিয়ে দিচ্ছে, আমি চ্যাপ্টা হয়ে যাচ্ছি। 
হ্যাঁ আমিও চাই তুমি বের হও। আর এ জন্যই তোমাকে এত কথা বলা। দেখ, তুমি আর আমি দেখতে একই রকম তাই না? যাও বাইরে যাও। তবে জেনে রেখ, আজ তোমাকে খানিকটা হলেও নিস্তেজ স্বভাব ঝেড়ে ফেলতে হবে। একদিন শুধু সমস্ত অন্যায়, অবজ্ঞা, অপমানের জবাব দিয়ে বাঁচো, দেখো কেমন লাগে। তোমার জন্য বাইরে অপেক্ষা করছে চোখে লাল কাপড় বাঁধা এক ষাঁড়। যাও দৌড়াও।

আমি কখন ঘর থেকে বেরিয়ে গেছি জানি না। শুধু যখন খেয়াল হয়েছে তখন দেখি রাস্তা ধরে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াচ্ছি কেবল। সত্যিই আমার পিছে দানবের মতো রাগে ফোঁস ফোঁস করতে শিং বাগিয়ে এগিয়ে আসছে ষাঁড়। আমাকে ও উপড়ে ফেলতে চায়, ও উড়িয়ে দিতে চায়, ছিন্নভিন্ন করে দিতে চায় পুরোটুকু। অথচ এখন আমার তেমন আতঙ্ক বোধ হচ্ছে না। বরং মনে পড়ছে ১২টার সময় আমার মেয়েকে আনতে স্কুলে যাওয়ার কথা। একটা রিকশা নিয়ে চুপচাপ তাতে উঠে বসলেই হয়। রিকশা আমাকে নামিয়ে দেবে স্কুলের সামনে, তারপর মেয়ে বের হয়ে আসার অপেক্ষা। অবশ্য আমি এর আগে কখনো মেয়েকে আনতে যাইনি। দারোয়ান আমাকে চিনতে পারবে তো? কিন্তু সে তো পরে, আগে এই ষাঁড়ের হাত থেকে দৌড়ে পালাই। নাকি ঘুরে দাঁড়াব, যা হওয়ার হবে। এসব আকাশপাতাল ভাবতে ভাবতে আমি কিসের সঙ্গে যেন হোঁচট খেয়ে পড়ি রাস্তায়। আঘাতের চোটে আমার পা ফেটে রক্ত বেরিয়ে এসেছে। অকস্মাৎ কারা যেন ঘিরে ধরেছে আমায়। কেউ চুল টানছে, কেউ ঘুষি মারছে, একজন লাথি দিল পাঁজরে, লাঠি দিয়ে কেউ সজোরে বাড়ি দিল মাথায়। টের পাচ্ছি আমার কপাল বেয়ে নামছে গরম রক্ত। ঠিক যেন গনগনে দুপুরে কপাল বেয়ে ঘাম নামে, কিংবা ঠান্ডা গ্লাসের গা বেয়ে নামে জলের ফোঁটা। কারা ওরা, আর আমাকে এভাবে মারছেই বা কেন? আমি কি রুখে দাঁড়াব, প্রতিহত প্রতিবাদ করব। কিন্তু না, মনে হলো তার চেয়ে অপেক্ষাই ভালো হবে। হাতের সুখ মিটিয়ে মানুষগুলো একসময় ক্লান্ত হয়ে চলে যাবে, কী দরকার ওদের সঙ্গে ঝামেলায় যাওয়ার। আমি আমাকে ঘিরে থাকা অদ্ভুত মানুষগুলোর দিকে তাকাই। হঠাৎ দেখি ভিড়ের মধ্যে সেই মুখ। যে ঘর খালি পেলেই সব সময় আমার আলমারির মাথায় পা ঝুলিয়ে বসে থাকে। মার খেতে খেতে আমার অবাক দৃষ্টি ওর চোখ এড়ায় না। দেখি ও এর মধ্যেও হাসছে, তার চোখ কেমন নিস্পৃহ মৃত মাছের মতো, সেখানে আমার জন্য বিন্দুমাত্র সহানুভূতি নেই।

রাস্তায় ধুলোবালি উড়লে লোকে নাক-মুখ ঢাকে, তবে বাতাসের তাতে কিছু যায় আসে না। সে মাঝে মাঝেই আপন খেয়ালে এদিকেরটা সেদিক, সেদিকেরটা এদিক উড়িয়ে নিয়ে যায়। একটা চায়ের দোকানে লোকজন চা খেতে খেতে হা করে টিভিতে খবর শোনে, রাজধানীতে স্কুলের সামনে ছেলেধরা সন্দেহে যুবককে পিটিয়ে হত্যা।