• ঢাকা
  • শনিবার, ১০ এপ্রিল, ২০২১, ২৭ চৈত্র ১৪২৭
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২১, ০১:৩৬ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২১, ০২:০৮ পিএম

পিয়ন ফিরেছে বই হাতে

পিয়ন ফিরেছে বই হাতে

পিয়ন! শব্দটা শুনলে বা দেখলে আমাদের ডাকপিয়নের কথা মনে পড়ে। যারা চিঠি হাতে ফেরে এ ঘর থেকে ও-ঘরে। পৌঁছে দেয় কাঙ্ক্ষিত পত্র। যা পাঠে সুখ আসে। প্রযুক্তির এ যুগে সেসবই স্মৃতির খোরাক। ফেসবুক, টুইটার, ইমেইল, হোয়াটস্অ্যাপের যুগে চিঠির অপেক্ষায় কেউ থাকে না। তাই পিয়নেরও নেই কাজ। তবু যেন পিয়ন ফিরল। পাঠসুখ দিতে পিয়ন এবার বই হাতে ফিরেছে। হ্যাঁ! ঠিক ধরেছেন আজকে কথা বলবো একদল স্বপ্নবাজ তরুণ-তরুণীর হাত ধরে শুরু হওয়া পিয়ন অনলাইন বুকশপ।

সময়টা ২০১৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর। চার বন্ধুর হাত ধরে যাত্রা শুরু হয় পিয়ন অনলাইন বুকশপের। শুরুতে তাদের মূলধন ছিল মাত্র আট হাজার টাকা। তারা মাত্র ৬৭টা বই নিয়ে তাদের বুকশপের যাত্রা শুরু করে। পরিকল্পনা ছিল, যদি তাদের বই বিক্রি না হয় তাহলে ৬৭টা বই তারা ভাগ করে নেবে। কিন্তু প্রথম মাসে আসে তাদের অভাবনীয় সাফল্য! তারা প্রথম মাসে প্রায় ১২-১৪ হাজার টাকার বইয়ের অর্ডার পায়। বর্তমানে পিয়ন অনলাইন বুকশপের ৩ জন কো-ফাউন্ডার হচ্ছেন আসাদুজ্জামান জয়, নাফিজ সাদেকীন আর আবদুর রহমান জীবন।

‘এই পৃথিবী বইয়ের হোক’ স্লোগানের সঙ্গে তারা কাজ করে যাচ্ছে। আসাদুজ্জামান জয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ছাত্র। তিনি জানান, ‘একদিন ঢাকার নীলক্ষেতের পাশে হাঁটছিলেন। তখন তিনি চিন্তা করলেন, নীলক্ষেতে যেসব গুরুত্বপূর্ণ ও দুষ্প্রাপ্য বই পাওয়া যায়, তা দেশের অন্য কোথাও পাওয়া খুব কষ্টকর। নীলক্ষেত থেকে এই বই গুলো সংগ্রহ করে ঢাকাসহ সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে দিতে চান। পিয়ন-এর কো-ফাউন্ডাররা হচ্ছেন কলেজ বন্ধু। কলেজ বাসে বসে বসে তারা পরিকল্পনা করছিলো চট্টগ্রাম শহরে তারা অনেক বড় একটা লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করবে। কারণ চট্টগ্রামে বাতিঘর ছাড়া আর অন্য কোথায় বসে বই পড়ার জায়গা নেই।

আসাদুজ্জামান জয় বলেন, ‘আমার এলাকায় প্রায় ১০ লাখ মানুষ বাস করে, কিন্তু এই এলাকায় কোনো লাইব্রেরি নেই। আমরা চিন্তা করলাম, এই এলাকার মানুষগুলোর মানসিকতা পরিবর্তন করতে হলে আমাদের লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা লাগবে।’

তিনি আরো বলেন, “চট্টগ্রাম শহরে অনেক বড় বড় মার্কেট আছে, শপিং মল আছে। যেগুলাতে এসিসহ আরো অত্যাধুনিক সুযোগ সুবিধা রয়েছে। কিন্তু লাইব্রেবি নেই। এভাবে তাদের চিন্তা আসে তাদের বুকশপ প্রতিষ্ঠা করার।”

যেই ভাবনা সেই কাজ। প্রথমে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক প্রতিনিধি নেওয়া শুরু করে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালের অধীনের কলেজসহ চট্টগ্রাম শহরের আরও কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিনিধি নিয়েছেন। নিয়েছেন বললে ভুল হবে। প্রতিনিধিরা স্বেচ্ছায় কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। শুরুতে ক্যাম্পাস এবং চট্টগ্রাম শহরের নির্দিষ্ট পয়েন্টে ফ্রি বই ডেলিভারি দিয়ে থাকতেন তাদের প্রতিনিধিরা। অন্য বুকশপ থেকে পিয়ন অনলাইন বুকশপ আলাদা হওয়ার কারণ হলো, তাদের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তাদের প্রতিনিধিরা অর্ডার নিতেন, তারাই বই কিনতেন, তারাই বই প্যাকিং করতেন এবং তারাই বই ডেলিভারি করতেন। এবং প্রথম ৬ মাস তারা কুরিয়ার ছাড়া বাকি স্থানগুলোতে ফ্রি ডেলিভারি দিয়েছেন। এরপর থেকে তারা ২০ টাকা ডেলিভারি চার্জ নিয়ে বই ডেলিভারি করেছিলেন।বর্তমানে তারা পুরো চট্টগ্রাম শহরে হোম ডেলিভারি দিয়ে থাকেন, এবং রেডেক্স কুরিয়ারের মাধ্যমে পুরো বাংলাদেশে হোম ডেলিভারি দিয়ে থাকেন। বা কাষ্টমার রা চাইলে হোম ডেলিভারি না নিয়ে বিভিন্ন কুরিয়ার থেকে বই গুলো সংগ্রহ করতে পারেন। তারা সব ধরনের সুযোগ সুবিধা রেখেছেন। বই কে ভালোবাসেন বলে নিঃস্বার্থভাবে এই স্বপ্নবাজ তরুণ-তরুণীরা কাজ করে যাচ্ছে।

দীর্ঘ দুই বছরের পথ চলায় পিয়ন অনলাইন বুকশপের অনেক ভালো সময় এসেছে, আবার এসেছে অনেক খারাপ সময়। বই ডেলিভারি দিতে গিয়ে কেউ কেউ হারিয়েছেন দামি মোবাইল, কেউ কেউ হারিয়েছেন মানিব্যাগসহ জরুরি কাগজপত্র। কিন্তু কেউ একবারের জন্য ও বলে তারা পিয়ন ছেড়ে দিবে, কিংবা কাজ করবে না। ভালো সময়ে তারা একসঙ্গে একজন একজনের পাশে ছিলেন, খারাপ সময়েও একজন একজনের পাশে ছিলেন। একদল স্বপনবাজ তরুণ-তরুণীর হাড়ভাঙা পরিশ্রমের ফল আজকের এই পিয়ন।