• ঢাকা
  • শনিবার, ১০ এপ্রিল, ২০২১, ২৭ চৈত্র ১৪২৭
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২১, ০৫:৫০ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২১, ০৫:৫০ পিএম

সময়

সময়

জানালার পর্দা টানা হয়নি সময়কে ধরব বলে।
বাইরের ল্যাম্পপোস্টের আলো চলে এলো শোবার ঘরে। যেটুকু আলো আসে তাতে দেয়ালঘড়ি নজরে এলে দেখি, চারটা। ঘুম চোখে আধো আলোতে সময় ঠাহর করতে কেটে যায় কয়েক সেকেন্ড।
ড্রাইভারকে বলে রেখেছি, ভোর পাঁচটায় বেরোব। মোবাইলে অ্যালার্ম না বাজাতে কিছুটা অবাক হলেও পরে ভাবলাম, যেহেতু অ্যালার্ম সেট করেছে কাজের ছেলেটি; হয়তো এএম বা পিএমের বিভ্রান্তিতে এই ভুলটা করেছে। যা প্রায়ই করে থাকে। যদি ঘুম না ভাঙত? ওকে দিয়ে আর অ্যালার্ম সেট করা যাবে না। সিদ্ধান্ত ফাইনাল।
সান্তাহারের কাছাকাছি যাব, ফিরব দিনাদিন। এই হচ্ছে পরিকল্পনা। কাজেই সময় অপচয় করা যাবে না। সান্তাহার নামটা মনে পড়তেই শিল্পী ফকির আলমগীরের কথা মনে পড়ল। ছোটবেলায় এই শিল্পীর গানেই প্রথম এ জায়গার নাম শুনি। ফকির আলমগীরের কিছু গান আমাকে খুব আবেগতাড়িত করে। বিশেষ করে ওই গানটা- ‘মায়ের এক ফোঁটা দুধের দাম কাটিয়া গায়ের চাম...’ যতবার শুনি ততবারই চোখের কোল ভিজে আসে। ছোটবেলা থেকেই সান্তাহার রেলস্টেশন দেখার ইচ্ছে। আমি যাব বগুড়ার আদমদীঘি থানার ইন্দ্রইল গ্রামে। তাই সান্তাহার রেলস্টেশন দেখার ইচ্ছাটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলেছি!

তাড়াতাড়ি ওয়াশরুমে ঢুকে দাড়ি কামাই। গোসলও সেরে নিই। বেরিয়ে লাইট জ্বেলে দেয়ালঘড়িতে তাকাতেই দেখি, রাত বারোটা ত্রিশ! আমি নিজ ভুলটা যখন আবিষ্কার করলাম, হাসলাম মনে মনে। আসলে ঘুম চোখে আধো আলোতে যা দেখেছিলাম, তা সঠিক ছিল না। যা-ছিল তা হলো, ঘড়ির ঘণ্টার কাঁটা বারোর ওপর। চারের ওপর মিনিটের কাঁটা।
বারান্দায় এসে দাঁড়াই। রাত চলছে ভোরের খোঁজে। রাস্তায় চলছে মানুষ। সময় এদের বাধ্য করছে স্ব-স্ব গতিপথে চলতে। খানিক দূরে এক বৃদ্ধ পথিক। সামনে শরীর ভেঙে লাঠি ঠকঠক করে এগোচ্ছে। হাঁটার ধরন দেখে মনে হচ্ছে, গন্তব্য পৃথিবীর শেষ প্রান্ত। দেখে মন ভিজে উঠল। ভিজে ওঠাটাই সার, আমার আর কী-ই বা করার আছে? বৈচিত্র্য রক্ষার্থে প্রকৃতি এমন কত কিছুই তো করেছে, করছে, করবে! চোখ সরিয়ে নিই। এবার যেদিকে চোখ পড়ল, সেদিকে আধ-উলঙ্গ এক পাগলী। ডাস্টবিনে ময়লা ঘাঁটছে। পাশেই একটি কুকুর। কণ্ঠে বিরক্তির গড়গড় শব্দ। ওর খাবারের ভাগ ভাগিয়ে নিচ্ছে তাই বোধ হয়। কোথায় যেন একটি প্রবন্ধে পড়েছিলাম বহু আগে; পশু আর অতিমানব যে-দড়িতে বাঁধা, সেই দড়িটি হলো মানুষ। একবার জন্মে গেলে, মানুষ নিজেকে আর মানুষ বলেই মনে করে না। নিজেকে মনে করে একগুচ্ছ অভ্যাস। আহার, নিদ্রা, মৈথুন, জীবিকা, শত্রুতা, পরশ্রীকাতরতা। ইন্দ্রিয়ের টংকারের এমন ঝংকার, অন্য সুর শোনার উপায় নেই।
মানুষ এমন এক জীব, যাকে স্বজাতিকে পেরিয়ে যেতে হয়। মানুষকে অতিক্রম করতে না পারলে মানুষ হওয়া যায় না। এ দেশের এক সাঁই লন্ঠন হাতে মানুষ খুঁজতে বেরিয়েছিলেন। মানুষ হয়ে মানুষের সে কী জ্বালা!
উত্তর আকাশে পাঞ্জা মাপের একটা তারা ধকধক করছে। মোড়ের মাথায় একটা পান-বিড়ির দোকান রাতকে মাত করে রেখেছে। দোকানের সামনের বেঞ্চে গুন্ডা-গুন্ডা চেহারার দুজন লোক বসে। বাঁ পাশের অন্ধকার গলিতে, গোটা তিনেক সিগারেটের আগুন জ্বলছে আর নিভছে। এটি শুধু আজকের রাত নয়; সব রাতের খণ্ডাংশ।
ভোরে উঠতে হবে-এই খেয়ালে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিই। কিন্তু, বাকি রাত ঘুম এলো না। অতীতের ভাবনায় ডুবে গেলাম। কোনো দিন লঞ্চ, বাস, ট্রেন ও প্লেনের শিডিউল মিস করিনি। প্রায় তিন দশক হতে চলছে চাকরির জীবন। এই দীর্ঘ সময়ে কোনো দিন অফিসের হাজিরা খাতায় লেট মার্ক পড়েনি, একেবারে বিশেষ কারণ ছাড়া।
মিস করিনি প্রেমিকাকে দেওয়া শিডিউল, প্রেমিক জীবনে। আজকাল শুনি, ডেটিং শিডিউল মিস করা-প্রেমিককুলের জাতীয় রোগ। জাতীয় রূপ লাভ করেছে এ নিয়ে প্রেমিকাদের অসন্তুষ্টিও। তিন কাল গিয়ে এক কালে ঠেকেছে বলে, নইলে প্রেমিকা মহলে বেশ সমাদর পেতাম, তা হলফ করে বলতে পারি।
হারতে হয়নি, ত্রিশ বছর বিবাহিত জীবনেও। এই না হারা যতবার মনে পড়ে, ততবারই আমি বিজয়ের আনন্দ উপভোগ করি।

গভীর সমুদ্রের বিশালতায় জাহাজ যেমন তীর থেকে দৃষ্টির আড়াল হতে হতে একসময় তার মাস্তুলও হারিয়ে যায়, পড়ে থাকে শুধু বিশাল ঢেউ আর ফেনা-রাশি; তেমনই জীবন থেকে অনেক কিছুই হারিয়ে যায়। রয়ে যায় কেবল কিছু ধূসর স্মৃতি।
জীবনের এই দীর্ঘ ভ্রমণে হারিয়েছি অনেক কিছু। অর্জনের খাতায় তাকালে দেখি- অবশিষ্ট কটি স্মতিই কেবল। যার জীবনের অর্জনই স্মৃতি; স্মৃতি বৈ তার আর গর্ব করার মতো আছেই বা কী? আমার গর্বও আমার স্মৃতি।
যা বলছি, তা আজ থেকে বহু বছর আগের কথা। প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে এক খণ্ড সবুজ দ্বীপ হয়ে তা এখনো স্মৃতিতে উজ্জ্বল।
ষোলো-সতেরো বয়স তখন। আমার কলেজজীবনের প্রথম দিন। জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের স্বপ্ন ঘিরে আবেগ, উচ্ছ্বাস আর উত্তেজনায় ঘুমাইনি সারা রাত! সকালে উঠে গোসল সেরে নিজেকে তৈরি করে নিই। ব্যাক ব্রাশ করে আঁচড়ানো চুল। নীল জিন্সের সঙ্গে ঘিয়ে রঙের গরদের পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবির বুক বরাবর খানিকটা চেরা। চেরা অংশদ্বয়ের এক অংশ বাঁ পাশে অপর অংশ ডানে ঝোলা। ওই পাঞ্জাবির সাথে ফিনফিনে সাদা ধুতি পরে তার এক খুঁট পাঞ্জাবির বাঁ পকেটে পুরলে-আমাকে শরৎবাবুর গল্পের জমিদারপুত্র বলে ভ্রম করা যে কারো পক্ষেই সম্ভব। তা-জমিদারপুত্র না হলেও ওই পোশাকে সঙ সাজিনি এটুকু নিশ্চিত। রঙ কিছুটা কম ছিল বটে, কিন্তু ভঙ আমার কোনো কালেই ছিল না। নেই এখনো। বরং কিছুটা গর্ব আছে নিজেকে নিয়ে। কোনো মানুষই নিখুঁত নয়। যে নিখুঁত, সে মানবের ঊর্ধ্বে কিছু। আমি যেহেতু মানব, ছোট-বড় কিছু খুঁত আমারও আছে। ছোট খুঁতের বর্ণনা দিয়ে পাঠকের ধৈর্যর পরীক্ষা নেব না। বড় খুঁতের কথাই বলি। মানুষ হিসেবে আমার সবচেয়ে বড় খুঁত, আমি কিছুটা নীরব আত্মাহংকারী। আমার যা আছে-তা নিয়ে যেকোনো পরিস্থিতিতে আমি সন্তুষ্ট থাকি। এটা আমার বড় অহংকার। অনেকে অবশ্য খুঁত নয়, গুণ বলে একে। আমি বিব্রত হই।
যাকগে, চটি পায়ে দিতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম, চটির বয়স বেড়ে যাওয়ায় আঙ্গুলি ছিঁড়ে গেছে! কী আর করা! বাড়তি চটি না থাকায় পামসু পরে নিলাম! সেই সময় পাঞ্জাবির সঙ্গে পামসুর চল অতটা না থাকলেও –কোনো রকম চালিয়ে নিয়েছি!
প্রায় দেড় কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে যখন কলেজে পৌঁছলাম, তখন ঘড়ির কাঁটায় দশটা পাঁচ মিনিট। বুকটা ধক করে উঠল। ক্লাস রুটিন হাতে পেয়েছি ভর্তির দিন। গতকাল রুটিন দেখেছি, প্রথম ক্লাস ইংরেজি। শিক্ষকের নামও উল্লেখ ছিল সেখানে।
স্যার তাঁর লেকচার দিচ্ছেন। আমি মাথা নিচু করে ক্লাসে ঢোকার অনুমতি চাইতেই ধমক খেলাম, ‘কলেজের প্রথম ক্লাসেই লেট! বাইরে দাঁড়িয়ে থাকো!’
মুহূর্তেই ক্লাসে নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। পাক্কা চল্লিশ মিনিট মাথা নিচু করে সেই অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। ওই চল্লিশ মিনিট আমার দুই পা এক জায়গায় স্থির হয়ে ছিল। যেন পাথরের মতো ভারী। হাত নড়ছে না, পা নড়ছে না। মাথাটা মনে হচ্ছে আমার নয়, অন্য কারো। আমার মনে হচ্ছিল, অনন্তের সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আমি। নাকে দেবালয়ের গন্ধ। শক্তিশালী চুম্বকের সামনে লোহার টুকরো পড়লে যেমন কাঁপতে থাকে, আমার ভেতরটা সে রকম কাঁপতে লাগল।
কলেজে বাংলা ও ইংরেজি ক্লাস হতো সব গ্রুপের ছাত্র-ছাত্রী মিলে এক রুমে। ক্লাসভর্তি ছেলেমেয়েরা আমার দিকে তাকাচ্ছে কি না, তা-ও চোখ তুলে দেখতে পারিনি সংকোচে।
ক্লাস শেষে স্যার বেরিয়ে গেলেন। আমি তখনো মাথা নিচু করে। জানি আমাকে পেছনে ফেলে যিনি চলে গেলেন, তিনি কে।
তিনি আর কেউ নন, আমার জন্মলগ্ন থেকে যিনি আমাকে প্রতিটি পদক্ষেপে শিক্ষা দিয়ে যেতেন আদর্শ আর নৈতিকতার; আমি পারি কি না পারি, আমি গ্রহন করি কিংবা না করি, তিনি তার স্বপ্নকে আমার ভেতরে বপন করতে কখনো কৃপণ বা অলস ছিলেন না সময়ে কিংবা অসময়ে। চলে যাওয়ার পদধ্বনিই বলে দিচ্ছে আজ হয়তো তিনি তার স্বপ্নের কাছে হেরে গেছেন। তিনি আমার জন্মলগ্নের দেবালয়, আমার জন্মদাতা, আমার শিক্ষক। সেই শিক্ষক সেদিনও শিক্ষা দানে শাস্তি দিলেন- সময়ের কাছে হেরে যাওয়ায়।
সেই আমার সময়েরর কাছে শেষ হারা। হারতে হয়নি তারপর আর কোনো দিন সময়ের কাছে আমাকে। সেই দিন নতুন করে আমাকে শিখিয়েছিলেন বাবা; সময়ের কাছে না হারতে। সেই শিক্ষা ভেতরে ধারণ করেছি বলে আজ সময়ই বলছে সময়ের উজানে আমি কোথায় দাঁড়িয়ে।