• ঢাকা
  • রবিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২১, ২৭ চৈত্র ১৪২৭
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২১, ০৮:৪৭ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২১, ০৮:৪৭ পিএম

ছোটাপুর বিয়ে

ছোটাপুর বিয়ে

ছোটাপুর বিয়ে ঠিক হয়ে গেল! বাড়িভর্তি মানুষ, বাড়িভর্তি আনন্দ।
যেদিন আমার বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হবে, তার আগের দিন ছোটাপুর বিয়ের তারিখ ঠিক হয়। আমার মাথায় বাড়ি!

খুব কান্না পাচ্ছে আমার। ছোটাপুর বিয়ের আনন্দ-ফুর্তি করব, না পরীক্ষার পড়া পড়ব, নাকি দরজা বন্ধ করে কান্না শুরু করে দেব, কিছুই বুঝতে পারছি না।

না, কোনোটাই করতে ভালো লাগছে না আমার। একদিকে ছোটাপুর বিয়ের আনন্দ, আরেক দিকে আমার পরীক্ষার টেনশন।

বাড়িতে ছোট-বড় সবাই হাসি হাসি মুখে কথা বলছে—কাজ করছে, শিশুরা আনন্দে ছোটাছুটি করছে, আর আমি? টেবিলে একগাদা বই নিয়ে বসে আছি। কিছুই ঢুকছে না মাথায়। বসে ভাবছি আর মাথার চুল টানছি। কী করব আমি?

চট করে আমার মাথায় একটা চমৎকার বুদ্ধি এসে গেল! আমি আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম।
আমি তো হবু দুলা ভাইয়ের বরাবর একটা অ্যাপ্লিকেশন লিখতে পারি!

একটা কাগজ নিয়ে ঝট্পট বসে পড়লাম। অ্যাপ্লিকেশনটা লিখেই আমার এক ছোট ভাইকে দিয়ে হাতে হাতে পাঠিয়ে দিলাম। সে গিয়ে হবু দুলা ভাইয়ের হাতে অ্যাপ্লিকেশনটা দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

হবু দুলা ভাই মুচকি হাসি দিয়ে আমার অ্যাপ্লিকেশনটা খুলে পড়তে লাগলেন...

‘মাননীয় হবু দুলাভাই
বিষয়: বিয়ের তারিখ পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন।

জনাব,
আপনি জেনে অনেক খুশি হবেন যে আমি একটা নামকরা স্কুলে পড়ি। আমি এখন বার্ষিক পরীক্ষার পড়া নিয়ে খুবই ব্যস্ত আছি। এখন ডান-বাম তাকানোর সময় আমার নেই। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, আমার বার্ষিক পরীক্ষার আগের দিন আপনার সঙ্গে আমার ছোটাপুর বিয়ের তারিখ ঠিক করা হয়েছে।

বাড়িতে অনুষ্ঠানের বিরাট আয়োজন চলছে। আর এ জন্য বাড়িতে প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনদের আসা-যাওয়ার ধুম পড়ে গেছে। বিয়ের আনন্দে মানুষের আনাগোনায় বাড়িটা গমগম করছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে শিশুদের বাজি ফুটানোর অত্যাচার। এরা সারাক্ষণ হইচই করছে। এদের আনন্দে বাধা দেবে কে? যারা বাধা দেবেন, তাঁদের মুখের হাসিটা কান পর্যন্ত লম্বা হয়ে আছে। এখন আমার কানে তুলা গুঁজেও রেহাই পাওয়ার জো নেই। সব মিলিয়ে আমার লেখাপড়ার বারোটা বাজছে। আমি বই নিয়ে একবার এই ঘরে যাই তো আবার ওই ঘরে যাই। কোথাও শান্তি নেই। পড়ার কোনো পরিবেশ নেই বাড়িতে। অথচ এখন আমার দুচোখ বন্ধ করে লেখাপড়া করার কথা। আমি এখন না পারছি ওদের সঙ্গে মিলে আনন্দ করতে, না পারছি পড়ায় মন দিতে। একবার ভাবুন তো কেমন একটা সমস্যার মধ্যে ডুবে আছি আমি!

অথচ ছোটাপুর বিয়েতে আমারই সবচেয়ে বেশি আনন্দ-ফুর্তি করার কথা।

জানেন, আমি আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলাম, আপুর বিয়েতে আমি হব ভয়ংকর গেটম্যান। আমি বরযাত্রীদের আটকে দেব গেটে। আর গেটপাস? মাত্র ১০ হাজার টাকা। এ টাকা হাতে না পাওয়া পর্যন্ত একপায়ে দাঁড় করিয়ে রাখব বরযাত্রীদের। আমি কারও অনুরোধ শুনব না, গেটপাসও দেব না। এর জন্য দর-কষাকষি করতে হয় সবই করব আমি। আর এ জন্য আমার দারুণ একটা প্রিপারেশনও ছিল। এসব আমি বড়দের কাছ থেকে শিখে নিয়েছিলাম। গেটপাসের টাকার জন্য কীভাবে তর্ক করতে হয়, কীভাবে বরযাত্রীদের প্রশ্নের জবাব দিতে হয় এবং তাদের আটকিয়ে রেখে হাসিমুখে কীভাবে গেটপাসের টাকাটা আদায় করে নিতে হয়—এসবই মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলাম আমি।

আরও কী করতাম জানেন? খাওয়াদাওয়ার পর শুরু হতো দুলাভাইয়ের হাত ধোয়ানির পালা। হেভি উপহার না পাওয়া পর্যন্ত এক ফোঁটা পানি ঢালতাম না হাতে। এমনকি সাবান, পানি আর তোয়ালের ছোঁয়াও লাগাতাম না। শুধু কি তাই? আমি দুলাভাইয়ের এমনই সেবা-যত্ন করতাম যে তিনি আনন্দে বন্ধুদের কাছে বড় মুখে বলতেন, ‘আহা রে! শ্যালিকা একটা আমার। তার সেবার কোনো তুলনাই হয় না!’

প্রথম সেবাটা দিতাম টয়লেটওয়াটার দিয়ে। কখন দুলাভাইয়ের টয়লেট পায় আমি সেই অপেক্ষায় বদনা হাতে নিয়ে ওত পেতে বসে থাকতাম। টয়লেট পাওয়ামাত্র আমি ভালো মানুষটির মতো বদনা ভরে পানি দিতাম আর সে পানিতে গুলিয়ে দিতাম লালমরিচের গুঁড়ো। আহা! পানিটা খলখল করে খরচ করার পর শুরু হয়ে যেত অ্যাকশন। আহা হা! তখন মন ভরে দেখতাম দুলাভাইয়ের টয়লেট ড্যান্স। কী যে মজা হতো না তখন! অথচ পরীক্ষার আগে বিয়েটা হলে আমার সব পরিকল্পনা, সব আনন্দ মাটি হয়ে যাবে। দরজা-জানালা বন্ধ করে কান্নাকাটি করা ছাড়া আমার আর কিছুই করার থাকবে না। আপনি কি বুঝতে পারছেন, কত বড় কষ্ট আমার!
এখন আপনিই আমাকে এ কষ্ট থেকে রক্ষা করতে পারেন।

অতএব মহোদয়, আমার সমস্যা, আমার কষ্ট আর আনন্দ থেকে বঞ্চিত হওয়ার কথা বিবেচনা করে ছোটাপুর বিয়ের তারিখটা পিছিয়ে দেওয়ার জন্য আপনাকে সবিনয়ে অনুরোধ করছি।

আপনার একান্ত অনুগত
হবু শ্যা...লি...কা...
সুমাইয়া!’