চট্টগ্রামে বাবুর্চির হাতে খুন হলো চুয়াডাঙ্গার তন্ময়

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২, ২০২২, ১১:৩৫ পিএম চট্টগ্রামে বাবুর্চির হাতে খুন হলো চুয়াডাঙ্গার তন্ময়
ফাইল ফটো।

পূর্ব বিরোধের জের ধরে চুয়াডাঙ্গার এসএম মঈন উদ্দিন তন্ময় হোসেন (৩০) নামের এক যুবককে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করেছে নিহার রিচিল (৫১) নামের এক বাবুর্চি।  সোমবার বিকেলের দিকে চট্টগ্রাম নগরীর খুলশী থানার লালখান বাজারের চাঁনমারি এলাকার একটি ভবনে এ হত্যার ঘটনা ঘটায় নিহার। এ হত্যার ঘটনায় বাবুর্চি নিহার রিচিলকে আটক করেছে পুলিশ।

তন্ময় চট্টগ্রাম নগরীর একটি টাইলস্ কোম্পানীর হিসাব রক্ষক হিসেবে চাকরী করতেন। তন্ময় চুয়াডাঙ্গা জেলার পৌর এলাকার বড়বাজার পাড়ার এস.এম কামাল উদ্দীন তাঁরার ছেলে। পুলিশ জানায়, হাইপেরিয়ান ভবনের তৃতীয় তলায় একটি বাসা ভাড়া নিয়ে ছয় কর্মকর্তার থাকার ব্যবস্থা করেছিল তিলোত্তমা টাইলস কোম্পানী। নিহার রিচিল ওই প্রতিষ্ঠানের নিযুক্ত বাবুর্চি। তিনিও ওই বাসায় একসাথে থাকতেন।

গতকাল সোমবার বিকেলে ওই বাসায় চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে ভবনের লোকজন সেখানে জড়ো হন। সেখানে তন্ময়কে রক্তাক্ত অবস্থায় পাওয়া দেখতে পায় পার্শবর্তীরা। তাকে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সে সময় লোকজন বাসায় ঢুকে দেখেন, নিহার হাতে একটি ছোরার বাট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

তখন নিহার তাদের জানায় যে, তিনি তন্ময়কে ছুরিকাঘাত করে খুন করেছেন। ছোরা কোথায় জানতে চাইলে নিহারের জবাব- ছোরা পেটের ভেতর রয়ে গেছে। পরে পুলিশ গিয়ে রক্তমাখা ছোরার বাটটি উদ্ধার করে। খুনের কারণ সম্পর্কে নিহারকে জিজ্ঞাসাবাদের তথ্যের বরাত দিয়ে খুলশী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সন্তোষ কুমার চাকমা বলেন, বছরখানেক আগে নিহারের সঙ্গে তার স্ত্রীর বিচ্ছেদ হয়। সেই ঘটনা নিয়ে নিহারকে বিদ্রুপ করত তন্ময়। সম্প্রতি বান্দরবানের এক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীর সঙ্গে নিহারের সম্পর্ক হয়। সেটা নিয়েও তন্ময় তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা শুরু করে। নিহারের বয়স, বিয়ে ইত্যাদি বিষয় নিয়ে অশ্লীল কথা বলত তন্ময়। তাকে শিক্ষা দেয়ার জন্য নিহার খুনের পরিকল্পনা করে। এছাড়া রান্না ভালো না হওয়া নিয়েও বিভিন্ন সময় তন্ময় ওই বাবুর্চিকে বকাঝকা করতো। 

পুলিশ আরও জানায়, গত সোমবার দুপুরে তন্ময়সহ তিন কর্মকর্তা ভাত খাওয়ার জন্য বাসায় যান। দু’জন ভাত খেয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর পরিকল্পনা অনুযায়ী নিহার রান্নাঘর থেকে ছোরা এনে তার বুকের বাম পাশে ও পেটে আঘাত করে। তন্ময় বাধা দেয়ার চেষ্টা করলেও নিহারের শক্তির কাছে হার মানে। আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

এদিকে, তন্ময়ের লাশ ফিরিয়ে আনতে চুয়াডাঙ্গা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন তার পরিবারের সদস্যরা। গতকাল রাতে নিহত তন্ময়ের সেজ চাচা অ্যাড. শরীফ উদ্দীন হাসু বলেন, তন্ময়ের লাশ ফিরিয়ে আনতে আমরা রাতেই চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছি। সকালে পৌঁছানোর পর খুলশী থানায় মামলা দায়ের করা করবো। এরপর আইনি প্রক্রিয়া শেষে তার মরদেহ নিজ বাড়িতে নেয়া হয়।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, চুয়াডাঙ্গার প্রদীপন বিদ্যাপীঠ থেকে স্কুল জীবন শুরু হয় এসএম মঈন উদ্দিন তন্ময়ের। এরপর ভি.জে উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ২০০৯ সালে এসএসসি পাশ করেন তিনি। ২০১১ সালে চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশের পর ঢাকার ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন তন্ময়। সেখান থেকে বিবিএ শেষ করে তিলোত্তমা টাইলসে চাকরী শুরু করেন। ঢাকাতে ৪ বছর চাকরীর পর তাকে চট্টগ্রামে বদলি করা হয়। বদলির পর সে চট্টগ্রামে ২বছর চাকরি করছিল। বিবাহিত জীবনে তন্ময়ের দুই বছরের একটি সন্তান রয়েছে।

এদিকে, তন্ময়ের মৃত্যুর সংবাদে এলাকায় পৌছালে কান্নার মাতম পড়ে যায় পরিবারে। আর এ কান্নার শব্দে তন্মময়ের বাড়িতে ভিড় জমাতে থাকে বন্ধু, এলাকার ছোট বড়সহ বৃদ্ধরাও। সেসময় শোকাক্রন্ত হয়ে পড়ে সবাই। এত অল্প বয়সে তন্ময়ের অকাল মৃত্যুতে চোখের পানি শুকিয়ে বাকরুদ্ধ প্রায় তার পুরো পরিবার। অপরদিকে, স্ত্রী এখনও বিশ্বাস করতে পারছেননা স্বামী তন্ময়ের মৃত্যুর বিষয়টি। আবেগ আপ্লুত হয়ে বার বার বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন তিনি। শুধু বলছিলেন গত রোববারও তার সঙ্গে রাত একটা পর্যন্ত মোবাইলফোনে কথা বলেছেন। এমনটা বলেই বারবার বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ছিলেন স্ত্রী।

তন্ময় গত ৫ বছর আগে বিয়ে করে কুমিল্লা জেলায়। তাদের সংসারে ২ বছরের একটি শিশুকন্যা রয়েছে। পুরো এলাকা জুড়ে অনেক সুনাম ছিল তন্ময়ের।

গত মঙ্গলবার চুয়াডাঙ্গার বড় বাজারপাড়ার নিজ বাড়িতে লাশ পৌঁছালে তন্ময়কে একনজর দেখতে আবারও নতুন বাড়িতে ভিড় জমাতে থাকে প্রিয় এলাকাবাসীরা।

আজ বুধবার (০২ ফেব্রুয়ারি) চুয়াডাঙ্গা পুরাতন কবরস্থানে তাঁর লাশের দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে।

 

এসকেএইচ//