বঙ্গবন্ধুর দর্শনের চর্চা কোথায় হচ্ছে? : শাহরিয়ার কবির

শাহাদাত হোসেন তৌহিদ প্রকাশিত: মার্চ ১৭, ২০২১, ০১:৩৫ পিএম বঙ্গবন্ধুর দর্শনের চর্চা কোথায় হচ্ছে? : শাহরিয়ার কবির

লেখক, গবেষক, মুক্তিযোদ্ধা শাহরিয়ার কবির। সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির।’ ১৯৫০ সালে ২০ নভেম্বর ফেনীতে তাঁর জন্ম। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী, মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশের সংবিধান, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনসহ সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে দৈনিক জাগরণের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শাহাদাত হোসেন তৌহিদ। 


জাগরণ : চলছে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী। আপনি একজন গবেষক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

শাহরিয়ার কবির :  এ অঞ্চলে একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার জন্মদাতা হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এবং তিনি এ জাতিরাষ্ট্রের অনন্য সাধারণ সংবিধান রচনা করেছিলেন, যেটা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সংবিধান বলে বিবেচিত। সেখানে ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার কথা বলা হয়েছিল। এবং বঙ্গবন্ধুর জীবন দর্শন ছিল একটি দলনিরপেক্ষ, মানবিক রাষ্ট্র-সমাজ নির্মাণ করা। যার প্রতিফলটা সংবিধানে আমরা দেখেছি। আমি মনে করি, যুদ্ধবিধ্বস্ত, গৃহযুদ্ধ, জর্জরিত সমগ্র বিশ্বে বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতা মানবতা বিশ্ব শান্তির দর্শন। পৃথিবীর বহু সমস্যার সমাধানে বঙ্গবন্ধুর দর্শন কাজে লাগাতে পারে। এবং এ দর্শন যত দিন যাচ্ছে তত বেশি জরুরি হয়ে উঠছে আমাদের প্রজন্ম এবং সারা বিশ্বের জন্য।

জাগরণ : বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যে গবেষণা হয়েছে, আরও নিবিড়ভাবে গবেষণার প্রয়োজন আছে কি না? 
শাহরিয়ার :
না, না, কিছুই হয়নি। পৃথিবীর কেউই জানে না তাঁর রাজনৈতিক দর্শনটা কী ছিল। আমরা তাঁর জীবনী নিয়ে যত বেশি ব্যস্ত তাঁর দর্শনটাকে তুলে ধরার ব্যাপারে সরকারের কোনো আগ্রহ আমরা কোথাও দেখছি না। আওয়ামী লীগের কোনো আগ্রহ আমরা দেখছি না। ’৭২-এর সংবিধানে যেটা বলেছিলেন—ধর্মের নামে রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিলেন এবং তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে ধর্ম আর রাজনীতি একসঙ্গে মেশালে তার বিপদ সম্পর্কে তিনি ৫০ বছর আগে বলেছিলেন। বহু লেখা, বহু ভাষণে তিনি কথাগুলো বলেছেন। এ কথাগুলো এখন আওয়ামী লীগ বলে না। এখন ধর্ম নিয়ে আওয়ামী লীগও রাজনীতি করছে।

জাগরণ : বঙ্গবন্ধু যে আদর্শ নিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিলেন, স্বাধীনতার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, সেটা কতুটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

শাহরিয়ার : কিছুই হয়নি। আমরা কাগজে-কলমে সংবিধানে চার মূলনীতি ফিরিয়ে এনেছি কিন্তু বঙ্গবন্ধুর দর্শনের চর্চা কোথায় হচ্ছে? আমাদের কোনো শিক্ষানীতি নেই, রাষ্ট্রীয় নীতি নেই, পররাষ্ট্রনীতি নেই, সংস্কৃতি নীতি বলুন নারী নীতি বলুন, কোথায় বঙ্গবন্ধুর দর্শনের প্রতিফলন হচ্ছে? যে হারে মাদ্রাসা গজাচ্ছে, মুজিব বর্ষে তারা ৫৬০টি মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টার খুলছে, এটা বঙ্গবন্ধুর দর্শন নয়, বঙ্গবন্ধুর বিপরীত দর্শন, এটা পাকিস্তানি দর্শন। বঙ্গবন্ধুকে এখন পাকিস্তানীকরণ করছে তাঁর নিজের দল। এটাই হচ্ছে আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে বাংলাদেশকে পাকিস্তানীকরণের যে উদ্যোগ নিয়েছিল জিয়াউর রহমান। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর নিজের দলও তো আজকে তাই করছে। বঙ্গবন্ধুর শতবর্ষে আমাদের মডেল মসজিদ বানাতে হবে? তাঁর ধর্মনিরপেক্ষ মানবতার দর্শন কী এটা ছিল? বঙ্গবন্ধুর যে আদর্শ ছিল তাঁর আদর্শের প্রতিফলন আমি কোথাও দেখছি না।

জাগরণ : বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বাজারে যেসব বই পাওয়া যায়, তাঁর জন্মশতবার্ষিকীতে ১০০টি বই প্রকাশিত হচ্ছে। সেগুলো তো তাঁর ব্যক্তিত্ব ও তাঁর দর্শন কতখানি প্রকাশ করতে পারছে বলে আপনি মনে করেন?

শাহরিয়ার : এখন পর্যন্ত সরকার বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অনেক রকম অনেক বই লিখেছে। তার মান সম্পর্কে নানা রকম প্রশ্ন আছে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার এখনো একটা বঙ্গবন্ধুর অফিশিয়াল বায়োগ্রাফি প্রকাশ করেনি। সরকারিভাবে তাঁর কোনো জীবনী প্রকাশ করা হয়নি। এটা দুই বছর আগে যখন মুজিব জন্মশতবর্ষের প্রস্তুতি চলছিল তখনই আমরা বলেছিলাম। এ জীবনীটা শুধু জীবন কাহিনি নয়। তাঁর জীবন দর্শন যেটা, তাঁর যে রাজনৈতিক দর্শন, যার জন্য তাঁকে হত্যা করা হলো। বঙ্গবন্ধুর দর্শন তো এখানে পাকিস্তানের মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্বকে কবর দিয়েছিল। যে বাঙালির মুসলমানের ভোটে পাকিস্তান হয়েছিল, সেই বাঙালি মুসলামানরাই জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্বকে বাংলাদেশের মাটিকে কবর দিয়েছে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে। সেই দর্শন, সেই আদর্শ কোথায় আজকে? কেন বঙ্গবন্ধু ধর্মের নামে রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছেন, বঙ্গবন্ধু সেটা পরিষ্কার করে ব্যাখ্যা করে বলেছেন। ধর্মের পবিত্রতা রক্ষার জন্য ধর্মকে রাজনীতি এবং রাষ্ট্র থেকে পৃথক রাখতে হবে। সে জায়গায় রাষ্ট্র তো নেই। রাষ্ট্র এখানে ধর্মকে উৎসাহিত করছে। ধর্মকে রাজনৈতিভাবে ব্যবহার করছে। মৌলবাদী দুষ্কৃতকারীদের প্রশ্রয় দিচ্ছে।

জাগরণ : আওয়ামী লীগ একটি প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী দল। এই দলটিই পারে পরিবর্তন আনতে।
শাহরিয়ার :
আওয়ামী লীগ একটি প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী দল, তা ঠিক আছে। বঙ্গবন্ধুর কন্যা অনেক কিছুই করেছেন। আমাদের আর্থসামাজিক উন্নয়নে আমাদের বিস্ময়কর সাফল্য, এটা নিশ্চয়ই আমরা উল্লেখ করব। সংবিধানের চার মূলনীতিও তিনি ফিরিয়ে এনেছেন। কিন্তু এখনো তো রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম রয়ে গেছে। এখনো সংবিধানে সর্বোচ্চ সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদের কলঙ্কের ছাপ তো রয়ে গেছে। মাথার ওপর বিসমিল্লাহ রয়ে গেছে।

জাগরণ : বঙ্গবন্ধুর সময়ের আওয়ামী লীগ আর এখনকার আওয়ামী লীগকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

শাহরিয়ার : আকাশ-পাতাল তফাত। বঙ্গবন্ধুর সময়ের আওয়ামী লীগ আর এখনকার আওয়ামী লীগ এক না। এখনকার আওয়ামী লীগের অনেক দক্ষিণপন্থী বিচ্যুতি ঘটেছে। বিশ্বব্যাপী দক্ষিণপন্থার উত্থান হচ্ছে, এটা অস্বীকার করা যাবে না। এখন ভারতের কংগ্রেস কী আছে? সেই জওহরলাল নেহরু এবং গান্ধীর কংগ্রেস কি এখন ভারতে আছে বা কামাল আতাতুর্কের তুরস্কে কি সে ধর্মনিরপেক্ষতা আছে? বহু দেশ থেকেই ধর্মনিরপেক্ষতা মানবতার জমিন সংকুচিত, বাংলাদেশেও হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী দক্ষিণপন্থার প্রবল উত্থান হচ্ছে সবই মানলাম কিন্তু পৃথিবীর কোথাও স্বাধীনতার জন্য ত্রিশ লাখ মানুষ রক্ত দেয়নি। আমাদের স্বাধীনতা তো নিছক ভূখণ্ডপ্রাপ্তির স্বাধীনতা ছিল না। এ স্বাধীনতার একটা দর্শন ছিল, যেটাকে আমরা বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির আদর্শ যেটা ৭২-এর সংবিধানে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন যে ত্রিশ লাখ শহীদের রক্ত দিয়ে এ সংবিধান লেখা হচ্ছে। ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের মর্যাদা কোথায় রাষ্ট্র দিয়েছে?

জাগরণ : গ্রামের মানুষ, চা-দোকানি, মুচি, ঝালমুড়ি বিক্রেতা তিনি তো সংবিধান বিষয়ে জানেন না।

শাহরিয়ার :  জানে না। সে জন্য আমরা বলছি তো, সংবিধানের একটা সহজপাঠ কেন প্রাথমিক পর্যায় থেকে শুরু করে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত পড়ানো হবে না। কেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসটা প্রাথমিক পর্যায় থেকে শুরু করে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত কেন একশ নম্বরের একটা বিষয় থাকবে না। এবং সেটা কেন মাদ্রাসায় পড়ানো হবে না। এই কথাগুলো আমরা বলছি তো। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মানে বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস। তাঁর দর্শনের ইতিহাস, তাঁর রাজনীতির ইতিহাস। বঙ্গবন্ধু না হলে বাংলাদেশ হতো না। সেখানে সেই দর্শনের প্রতিফলন তো আমরা কোথাও দেখছি না। কুদরাত-এ-খুদাকে দিয়ে একটা শিক্ষা কমিশন করেছিলেন। তাঁর শিক্ষানীতি যদিও কবীর চৌধুরী বলেছেন, কুদরাত-এ-খুদার মতো একটা আধুনিক শিক্ষানীতি তিনি প্রণয়ন করতে পারেননি। কিন্তু যতটুকু তিনি করেছেন এই হেফাজতের মোল্লাদের তুষ্ট করতে গিয়ে সরকার সেটাও তো হিমঘরে পাঠিয়ে দিয়েছে।

জাগরণ : উপমহাদেশে ভারতের কংগ্রেস এবং বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের দর্শন নিয়ে আপনি বলছিলেন, ধর্মনিরপেক্ষতার জায়গা থেকে দুটি দল কিংবা সারা পৃথিবীতে ধর্মনিরপেক্ষতার বিচ্যুতি হচ্ছে। কেন হচ্ছে বলে আপনি মনে করেন?

শাহরিয়ার : হ্যাঁ, সারা পৃথিবীতেই বিচ্যুতি হচ্ছে। তফাতটা হচ্ছে এখানে বঙ্গবন্ধু তো পাকিস্তান আমলে বলেছেন যে আমি তো প্রধানমন্ত্রিত্ব-মন্ত্রিত্বের জন্য তো রাজনীতি করি না। আমার প্রধানমন্ত্রিত্বের প্রয়োজন নাই। ক্ষমতায় থাকার চেয়ে জনগণের স্বার্থটাই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সারা জীবন বঙ্গবন্ধু ক্ষমতায় কত দিন ছিলেন? সাড়ে তিন বছর ছিলেন। সারা জীবনই তো তাঁর জেলে আর ক্ষমতার বাইরে কেটেছে। রাজনীতিতে সেই ব্যালান্সগুলো তো এখন নেই।

জাগরণ : অসাম্প্রদায়িক দলগুলো ধর্মনিরপেক্ষতার জায়গাগুলো থেকে কেন সরে এলো বলে আপনি মনে করেন?

শাহরিয়ার : মৌলবাদের চাষ হয়েছে তো। পঁচাত্তরের পর থেকে এখানে যেভাবে মৌলবাদের চাষ হয়েছে, সাম্প্রদায়িকতার চাষ হয়েছে, বাংলাদেশকে পাকিস্তানীকরণের যে উদ্যোগ হয়েছে, এখনো তো প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে তারা তো বসে আছে। 

জাগরণ : সেটা যদি ভারতের ক্ষেত্রে হয়?

শাহরিয়ার : ভারতের তাই হয়েছে। সে জন্য কংগ্রেস তো আজকে ক্ষমতার বাইরে। সেটাই আমি বলছি যে বিশ্বব্যাপী দক্ষিণপন্থার উত্থান হচ্ছে। সেটা বাংলাদেশে, ভারত নয়।

জাগরণ : তাহলে আপনি কি আশঙ্কা করছেন একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র বিনির্মাণের বা ভবিষ্যৎ পৃথিবী?

শাহরিয়ার : না, আমি মনে করি না। সেটা আমি কেন বলব। বাংলাদেশের মানুষ একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ করে এটা দেখিয়ে দিয়েছেন যে তারা কী ধরনের রাষ্ট্র চায়, কী ধরনের সমাজ চায়। আপনি মানুষকে প্রতারণা করতে পারেন ধর্মের নামে বা অন্য কিছু দিয়ে, সেটা কিছু সময়ের জন্য পিছিয়ে দিতে পারেন সমাজকে, ইতিহাসের অগ্রযাত্রাকে। কিন্তু সভ্যতার ইতিহাস তো সামনের দিকে আগাবে। সভ্যতা কখনো পেছনে যায় না।

জাগরণ : সারা পৃথিবীতে আপনি সাম্প্রদায়িক দলগুলোর একটি উত্থান দেখছেন, অসাম্প্রদায়িকতার ক্রাইসিসের কথা বলছিলেন।

শাহরিয়ার : যেখানে আমেরিকার মতো দেশ যদি জামায়াতে ইসলামীকে প্রশ্রয় দেয় বা দেশে দেশে ধর্মের নামে রাজনীতিকে প্রশ্রয় দেয়, সেখানে তো তারা শক্তিশালী হবেই। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এটা করছে। আমেরিকা করছে আরও অন্যান্য দেশ করছে।

জাগরণ : অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির চর্চা তাহলে সারা পৃথিবীতে কমে যাচ্ছে?

শাহরিয়ার : হ্যাঁ, কমে তো যাচ্ছেই। বঙ্গবন্ধুকে যদি শ্রদ্ধার আসনে দেখতে চান এবং সারা পৃথিবীতে যদি তুলে ধরতে চান, তাহলে ওই জায়গায় যেতে হবে, যেখানে বঙ্গবন্ধুর অসাধারণত্ব দেখা দেয়। তার আগে এ সমস্ত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কারও ক্ষমতা হয়নি ধর্মের নামে রাজনীতি করা। বঙ্গবন্ধু যেটা দেখিয়ে দিয়েছেন তৃতীয় বিশ্বের একটা দেশ যেটা দেখিয়ে দিয়েছিলেন। ইচ্ছে থাকলে, সাহস থাকলে, সততা থাকলে পারা যায়। সেটা তিনি মুক্তিযুদ্ধ করে ’৭২-এর সংবিধানে দেখিয়ে দিয়েছেন আমরা কী পারি। উনিই বলেছেন যে ত্রিশ লাখ মানুষের রক্ত দিয়ে সংবিধান লিখেছি, সেটা রক্ষা করার দায়িত্ব তো আমাদের নয়, পরবর্তী প্রজন্মের, পরবর্তী প্রজন্ম ব্যর্থ হয়েছে। সেটার মাশুল দিচ্ছি আমরা।

জাগরণ : দীর্ঘ একটি সংকটের কথা আপনি বললেন, এ থেকে উত্তরণের উপায় কী?

শাহরিয়ার : সরকারের যারাই থাকুক না কেন, তাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে হবে। সেটা বঙ্গবন্ধুর দল হোক বা না হোক। বাংলাদেশ কী হবে, কোন দিকে যাবে, সেটা ’৭২-এর সংবিধানে পরিষ্কার বলে দেওয়া হয়েছে। ত্রিশ লাখ শহীদ হয়ে সে দায়িত্ব আমাদের দিয়ে গেছে। সেটা সরকার এবং নাগরিক সম্মিলিতভাবে করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বঙ্গবন্ধুর দর্শনে আলোকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে আলোকিত করতে হবে। শিক্ষানীতি, রাষ্ট্রনীতি নারীনীতি সর্বত্র বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন থাকতে হবে। তবেই আমরা যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি, সেখানে পৌঁছুতে পারব যে একটা সভ্য দেশ হিসেবে।

জাগরণ: এবছর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীও উদযাপিত হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর দলের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী?

শাহরিয়ার : আমি বললাম, এটা তো অনুষ্ঠানসর্বস্ব হয়ে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর দর্শন কোথায়? দর্শনটা তো হারিয়ে যাচ্ছে। ব্যক্তিকে নিয়ে আপনি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন বা তুলে ধরছেন বা তাঁর ভাষণ অনুবাদ হচ্ছে ঠিক আছে। কিন্তু আমরা বলেছি যে ছোট্ট কাজ—বঙ্গবন্ধুর একটা ছোট্ট জীবনী, যাঁর ভূমিকাটা তাঁর কন্যা লিখবেন এবং একশটা ভাষায় সেটা অনুবাদের ব্যবস্থা করা। সারা পৃথিবী জানুক, কী জন্য কোন আদর্শের জন্য তিনি রাজনীতি করেছেন এবং যার জন্য তিনি জীবনটা দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুকে যে হত্যা করা হয়েছে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য, তা তো না। তাঁর আদর্শকে হত্যা করার জন্যই তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল। যেটা আমরা দেখলাম যে, ’৭২-এর সংবিধান থেকে তাঁর আদর্শকে মুছে ফেলা হলো। বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানানোর উদ্যোগ নেওয়া হলো। যখন আমাদের কোনো সম্পদ ছিল না বঙ্গবন্ধুর সময় তখন তিনি ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধীর বিচার করেছেন আমরা এখন সম্পদের সমুদ্রে ভাসছি। আমাদের একটা ট্রাইব্যুনালে আমরা বিচারটা করতে পারছি না। তফাতটা হচ্ছে এখানে। যেটা দায়বদ্ধতা। ত্রিশ লাখ শহীদের প্রতি দায়বদ্ধতা, মুক্তিযুদ্ধের প্রতি দায়বদ্ধতা। সেখান থেকে বঙ্গবন্ধুর দল অনেক সরে গেছে।