• ঢাকা
  • শনিবার, ১৬ নভেম্বর, ২০১৯, ২ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬
প্রকাশিত: অক্টোবর ১১, ২০১৯, ০৭:২৭ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : অক্টোবর ১১, ২০১৯, ০৭:২৭ পিএম

ছাত্ররাজনীতি বন্ধ নয়, লেজুড়মুক্ত হোক

গোলাম মোস্তফা
ছাত্ররাজনীতি বন্ধ নয়, লেজুড়মুক্ত হোক

আবরার ফাহাদের নির্মম হত্যাকাণ্ড নিয়ে বুয়েটসহ সারাদেশ আজ উত্তাল। আবরার ফাহাদ অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। যারা তাকে হত্যা করল, তারাও অত্যন্ত মেধাবী। তারা মেধাবী বলেই দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠে অধ্যয়নের সুযোগ পেয়েছে। দেশের সেরা ছাত্র হয়েও এরা কেন সহপাঠীকে নির্মমভাবে হত্যা করল। কেন এরা পরমতসহিষ্ণুতার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হলো। আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের সূত্র ধরে আজ বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের যে দাবি উঠেছে, তা নতুন করে এক পুরনো বিতর্ককে উসকে দিয়েছে। কেবল একটি নির্দিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নয়, পুরো দেশে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবিও এর আগে বিভিন্ন সময়ে শোনা গেছে। দেশের স্বার্থেই ব্যাপারটি গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার। 

প্রায় তিন দশক ধরে দেখা যাচ্ছে, যে দল ক্ষমতায় আসে- সেই দলেরই ছাত্রসংগঠনের নেতারা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ২০০২ সালের ৮ জুন টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ছাত্রদলের দুই গ্রুপের সন্ত্রাসীদের গোলাগুলিতে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী সনি মারা যান। ২০১৩ সালের ৯ এপ্রিল স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে লেখালেখি করায় বুয়েটে নিজ ক্যাম্পাসের কাজী নজরুল ইসলাম হলের সামনে মৌলবাদী শক্তি প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে ছাত্রলীগকর্মী আরিফ রায়হান দ্বীপকে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বেশকিছু নৃশংস ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে যায় ছাত্রলীগের নাম। আমাদের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বহুদিন যাবৎ সহিংসতানির্ভর। যারা এখন ছাত্রলীগের চরিত্র হনন করছে, তারাই আবার সুযোগ পেলে এমনটা করবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। দেশের সাধারণ মানুষ যখন তিলে তিলে উন্নতি আর ভালো থাকার সংগ্রাম করছে, তখন ছাত্ররাজনীতির নামে লুটপাট, লোভ-লালসা আর নিয়মনীতি না মানার কারণেই আজকে দেশের এ অবস্থা। নারকীয় এ বাস্তবতা।

দেশের এ অবস্থার জন্য আজ যেমন লেজুড়বৃত্তিসম্পন্ন ছাত্ররাজনীতি দায়ী, তেমনি দায়ী লেজুড়বৃত্তিসম্পন্ন শিক্ষকরাজনীতিও। বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য কেবল শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের পাঠ দেওয়া নয়; বরং জ্ঞানচর্চা করা, নতুন জ্ঞানের সৃষ্টি করা। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিবিড় আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে সেই জ্ঞানের চর্চা হয় এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গবেষণার মধ্য দিয়ে নতুন জ্ঞান বিকাশের পথ তৈরি হয়। এটা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রশাসনিক কাঠামোয় থাকা শিক্ষকরা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের পক্ষাবলম্বনকারী বা অনুগত, অনেক ক্ষেত্রে তারা যথাযথভাবে নির্বাচিতও নন। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের এক উল্লেখযোগ্য অংশই এখন শিক্ষা-গবেষণার প্রসারে নিজেদের দায়িত্ব-কর্তব্য ভুলে কেবল দলীয় সমর্থক প্রশাসকে পরিণত হয়েছেন। অন্যদিকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দশকের পর দশক ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ থাকায় গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিরা অনুপস্থিত। ছাত্ররাজনীতির নামে কোনো একটি ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের হাতে একচেটিয়া ক্ষমতা তুলে দেওয়া হলে যা হওয়ার কথা, আজ হয়েছেও তাই। ফলে জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা ছাত্ররাজনীতির এই প্রত্যক্ষ যোগসূত্রের সুরাহা না করে ছাত্ররাজনীতির আজকের সংকটকে মোকাবিলা করার কোনো সুযোগ নেই। শুধু ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা হলে তা পরিস্থিতিকে আরও অগণতান্ত্রিক করে তুলবে বলেই মনে হয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এ দেশের ছাত্ররাজনীতি। ছাত্ররাজনীতির গর্ব বা অহংকার নামের যা যা ছিল তা আজ কাহিনী। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ’৭১-এর স্বাধীনতা আন্দোলন; এমনকি স্বৈরাচারকে হটাতে ছাত্রদের অকুতোভয় আন্দোলন-সংগ্রাম ভুলবার নয়। যে কোনো তমসা”ছন্ন সময়ে তারাই সাধারণ মানুষকে আলোর দিশা দেখিয়েছে। ছাত্রদের অগ্রণী ভূমিকা পালনের জন্যই আমরা আজ স্বাধীন দেশে বুকভরে নিঃশ্বাস নিতে পারছি। হাঁটি হাঁটি পা পা করে আমরা এগিয়ে চলেছি। আলোকিত মানুষ হিসেবে যে কোনো সমস্যা ছাত্ররাই আগে বুঝতে সক্ষম হয় এবং বয়সে তরুণ হওয়ায় সেসব সমস্যা সমাধানে মশাল হাতে তারাই অগ্রণীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। ইতিহাস এটাই বলে। আজ যারা দেশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারা সবাই কম-বেশি ছাত্ররাজনীতি করেই এ জায়গায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন। তাই দেশকে নেতৃত্ব দেয়ার স্বার্থে এবং দেশের পশ্চাৎপদ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ে দিকনির্দেশনা দেয়ার জন্যই ছাত্ররাজনীতি জারি থাকা দরকার। তবে এখন যে ছাত্ররাজনীতির নামে দেশে চাঁদাবাজি, কমিশনবাণিজ্য, হত্যা-ধর্ষণ চলছে, এ রাজনীতি নয়। এ ধরনের রাজনীতি থেকে অবশ্যই ছাত্রদের বেরিয়ে আসতে হবে। বেরিয়ে আসতে হবে ছাত্ররাজনীতির নামে সমাজে যে অবক্ষয়ের রক্তক্ষরণ চলছে, তা থেকেও। এ অবক্ষয় থেকে মুক্তি পেতে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ছাত্রদের দিকেই তাকিয়ে আছে।

যে কারণে গ্রামের সাধারণ ঘরের একজন নিরীহ মেধাবী ছাত্র তারই সহপাঠীকে নির্দয়-নির্মমভাবে হত্যা করছে, চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি করে কয়েকদিনের মধ্যে আঙুল ফুলে বটগাছে পরিণত হচ্ছে- তার কারণ তাদেরকেই উদ্ঘাটন করতে হবে। একটি সুস্থ-স্বাভাবিক এবং স্বস্তিময় সমাজ গঠনে ছাত্রদেরকেই আবার নায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। আলোকিত ও জ্ঞানপ্রাপ্ত মানুষ হিসেবে এ দায়িত্ব তাদেরই। ‘ওরে সবুজ ওরে অবুঝ- আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা’র ভূমিকা তাদেরকেই পালন করতে হবে। ঐতিহাসিকভাবে এ দায়িত্ব আজ তাদেরই ঘাড়ে।

ছাত্ররাজনীতি বন্ধের মাধ্যমে এ দেশকে পিছিয়ে দিতে বিশ্ব মোড়লরা নতুন করে কোন্ ফাঁদের জাল বিস্তার করে চলেছে- সে ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক হতে হবে। এ দেশে যাতে সঠিক কোনো আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে উঠতে না পারে, সেজন্য বিশ্ব মোড়ল এবং এদেশীয় কিছু চাটুকার বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন ভেঙে টুকরো টুকরো করেছে। এতে কতিপয়ের পাতে উচ্ছিষ্টের ছিটেফোঁটা জুটলেও দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের হাপিত্যেশ করেই দিন কাটছে। এসব পেশাজীবী সংগঠন লেজুড়বৃত্তি করায় কার্যকর কোনো আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে তুলতে পারছে না। এতে সংগঠনের সদস্যদের যেমন কোনো স্বার্থ উদ্ধার করতে পারছেন না; পারছেন না অগ্রণ বাহিনী হিসেবে অন্যদের স্বার্থ উদ্ধারে ভূমিকা রাখতে।

এক্ষেত্রে বিশ্ব নীতিনির্ধারকরা সাময়িক সফল হলেও ইদানীং বিক্ষিপ্তভাবে নতুন করে লেজুড়মুক্ত ছাত্র আন্দোলন আবার দানা বাঁধার সমূহ সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে কোমলমতি ছাত্র এবং কোটাবিরোধী ও ঢাকসু নির্বাচনে ছাত্রদের ভূমিকা এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ভয় তাদের এখানেই। তাই ঘোলা জলে মাছ শিকারের মতো আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ডে কৌশলে সারাদেশের ছাত্ররাজনীতিই বন্ধের পাঁয়তারা করছে তারা।

দেশ যখন সর্বক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন ছাত্ররাজনীতি বন্ধের এ পাঁয়তারা বিশ্ব মোড়লদের নতুন অভিসন্ধি বলেই প্রতীয়মান। মাথাব্যথা হয়েছে বলে মাথা কেটে ফেলা কোনো সুস্থ্ সমাধান নয়। ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার মধ্যে এই সংকটের সমাধান নেই, সমাধান কোনটি ছাত্ররাজনীতি আর কোনটি সন্ত্রাস সে পার্থক্য করতে পারার মধ্যে। এ জন্য ছাত্রসংগঠনকে লেজুড়বৃত্তি মুক্ত রাজনীতি করার অধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষা ও ছাত্র অধিকারমুখী কর্মকাণ্ডে মনোনিবেশ করার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। একই সঙ্গে ক্যাম্পাসগুলোতে সব ছাত্র ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সহাবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত সব ধরনের দুর্নীতি-অনিয়ম, বলপ্রয়োগ, দমনপীড়ন ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের আইনানুগ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। 

লেখক : সাংবাদিক