• ঢাকা
  • সোমবার, ২০ মে, ২০২৪, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
প্রকাশিত: এপ্রিল ১৬, ২০২৪, ০১:১০ এএম
সর্বশেষ আপডেট : এপ্রিল ১৬, ২০২৪, ০১:২০ এএম

জন্মদিন

সাম্যের বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন আবেদ খান

সাম্যের বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন আবেদ খান

কিছু মানুষ আছেন যাঁরা স্বপ্ন দেখতে জানেন, স্বপ্ন দেখাতে জানেন। কিছু মানুষ নিজেদের স্বপ্ন সঞ্চারিত করতে পারেন অন্যের ভেতর। আবেদ খান সেই বিরল প্রতিভার স্বপ্নচারী মানুষ। কিছু কিছু মানুষ সমাজে থাকেন, যাঁরা সারা জীবন সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ। এই দায়বদ্ধতা তাদের জীবনাচারকে যেন এক ব্রত সাধনায় পরিণত করে। কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে না থেকেও তাঁরা প্রতিষ্ঠান। তাঁদের দৈহিক উচ্চতাকে ছাড়িয়ে যায় মানবিক উচ্চতা। সমাজের প্রতি, দেশের প্রতি ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই কল্যাণমন্ত্রে তাদের দীক্ষা। এসব মানুষের চিন্তা ও চেতনার জগৎজুড়ে শুধুই মানুষের কল্যাণভাবনা। মানবকল্যাণের বাইরে কোনো চিন্তা কখনো তাঁদের স্পর্শ করে না। সস্তা বাণিজ্যিক জনপ্রিয়তা নয়, সমষ্টির মঙ্গলচিন্তায় যিনি নিজেকে নিমজ্জিত রাখতে পারেন, তিনি আবেদ খান। আমার ও অনেকেরই প্রিয় আবেদ খান। তিনি একজন সাংবাদিক—এই পরিচয়টিই তাঁর জন্য যথেষ্ট। সৃষ্টিশীল মানুষটির আজ জন্মদিন।

সাতক্ষীরার খাঁ পরিবার শুধু বাংলাদেশেই নয়, এই উপমহাদেশের শিক্ষিত ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে সুপরিচিত। এই সাতক্ষীরা জেলার রসুলপুরেই আবেদ খানের জন্ম। অবিভক্ত ভারতের ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকার সম্পাদক মওলানা আকরম খাঁ সম্পর্কে তার নানা। মাত্র ১৭ বছর বয়সে ১৯৬২ সালে আবেদ খানেরও সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি ঘটে দৈনিক জেহাদ পত্রিকার মাধ্যমে। এই দৈনিকে সহ-সম্পাদক হিসেবে বছরখানেক কাজ করার পর ১৯৬৩ সালে তিনি যোগ দেন দৈনিক সংবাদে। ১৯৬৪ সালে যোগ দেন দৈনিক ইত্তেফাকে। এখানে তিনি পর্যায়ক্রমে শিফট ইনচার্জ, প্রধান প্রতিবেদক, সহকারী সম্পাদক হিসেবে সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সাল থেকে তিনি ‘দৈনিক কালের কণ্ঠ’-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১১ সালের ৩০ জুন কালের কণ্ঠ থেকে পদত্যাগের পর তিনি এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রধান সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। ২০১৩ সালের এপ্রিলে তিনি এটিএন নিউজ থেকে পদত্যাগ করেন।

আবেদ খান আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সক্রিয় মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ তিনি পুরান ঢাকার নারিন্দা-ওয়ারী অঞ্চলে স্বাধীন বাংলা সংগ্রাম পরিষদ কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্তুতি পর্বের দৃঢ় সূচনা করেন। ২৯ মার্চ তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন। জুন মাসে সংবাদ, ডেইলি পিপল, ইত্তেফাক ভবন এবং সারা ঢাকার ওপর বয়ে চলা বিশ্ব ইতিহাসের সেই অতিভয়াল ধ্বংসলীলার চাক্ষুষ সাক্ষী হিসেবে তিনি কলকাতার আকাশবাণী বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ৮ নম্বর সেক্টরে আবেদ খানের সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর আবু ওসমান চৌধুরী। পরবর্তী সময়ে মেজর মঞ্জুর এ সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আবেদ খানের সাব-সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন সফিকউল্লাহ। এ ছাড়া জুন মাসে ১২টি বাম দলের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় মুক্তি-সংগ্রাম সমন্বয় পরিষদের পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম আহ্বায়ক ছিলেন আবেদ খান।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের আগস্টে ইত্তেফাকে তার ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ‘ওপেন সিক্রেট’ প্রকাশিত হতে থাকে। ‘ওপেন সিক্রেট’কে বলা যেতে পারে বাংলাদেশের তদন্তমূলক বা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এ-সংক্রান্ত পড়াশোনায় ‘রেফারেন্স’ হিসেবে ‘ওপেন সিক্রেট’ এখনো অতুলনীয়। ইত্তেফাকের সম্পাদকীয় বিভাগে সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের সময় তিনি অভাজন ছদ্মনামে ‘নিবেদন ইতি’ শিরোনামে কলাম লেখায় হাত দেন। এই ‘নিবেদন ইতি’ও সে সময় অভাবিত পাঠকপ্রিয়তা পায়।

ইত্তেফাক থেকে অব্যাহতি নিয়ে কলামিস্ট হিসেবে সমসাময়িক সময়ে দেশের শীর্ষ সংবাদপত্রগুলোতে লিখতে থাকেন। ১৯৯৫ সাল থেকে জনকণ্ঠে সম্পাদকীয় পাতায় তার ‘অভাজনের নিবেদন’ প্রকাশের পাশাপাশি প্রথম পাতায় ‘লেট দেওয়ার বি লাইট’ শিরোনামের মন্তব্য প্রতিবেদন প্রকাশ হতে থাকে। এ সময় ভারতের জনপ্রিয় বাংলা দৈনিক ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র প্রবাসী সংস্করণ ‘প্রবাসী আনন্দবাজার’ পত্রিকায়ও নিয়মিতভাবে তার লেখা প্রকাশ হতে থাকে। প্রতিষ্ঠান ছেড়ে এ সময় আবেদ খান নিজেই যেন একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়ে উঠতে থাকেন।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ বেতারে একটি স্যাটায়ারধর্মী টকশোর পাণ্ডুলিপি লিখতেন তিনি। তাঁর সেই হিউমার-সমৃদ্ধ টকশো শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। প্রিন্ট মিডিয়ার পাশাপাশি আবেদ খান এ সময় থেকে ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে প্রবেশ করেন ১৯৭৮ সালে। আবেদ খান ও ড. সানজিদা আখতার দম্পতির গ্রন্থনা-উপস্থাপনায় দম্পতিবিষয়ক ধারাবাহিক ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘তুমি আর আমি’ প্রথম থেকেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। দম্পতি-শিল্পীদের নিয়ে সংগীতবিষয়ক ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘একই বৃন্তে’ সঞ্চালনার দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৮৪, ১৯৮৬ ও ১৯৯০ সালে আবেদ খান-সানজিদা দম্পতি ঈদের ‘আনন্দমেলা’ অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা ও গ্রন্থনা করেন। যেসব গুণী মানুষের সংস্পর্শে ‘আনন্দমেলা’ ঈদ অনুষ্ঠানটি জনপ্রিয়তার চূড়া স্পর্শ করেছে, তাদের মধ্যে এ দম্পতি অন্যতম।

১৯৯৯ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনি একুশে টেলিভিশনের সংবাদ ও চলতি তথ্য বিষয়ের প্রধান হিসেবে কাজ করেন। একুশে টেলিভিশনের জন্মলগ্ন থেকেই এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। এর আগে ১৯৯৬-৯৯ সালে তার অনুসন্ধানমূলক টেলিভিশন রিপোর্টিং সিরিজ ‘ঘটনার আড়ালে’ টেলিভিশন-সাংবাদিকতার আরেকটি জনপ্রিয় অনুষ্ঠান।   

অনেক গ্রন্থের প্রণেতা আবেদ খান। প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে ষড়যন্ত্রের জালে বিপন্ন রাজনীতি, (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড) অভাজনের নিবেদন, হারানো হিয়ার নিকুঞ্জপথে অন্যতম।

তার এই দীর্ঘ পথচলা একেবারেই মসৃণ ছিল না; বরং তার বেশিরভাগটাই ছিল কণ্টকাকীর্ণ। সত্য ও আদর্শের পথে চলতে গেলে একজন আদর্শবান দেশপ্রেমিককে বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয় এবং তা মোকাবিলা করতে হয়। তাকেও করতে হয়েছে ঢের। পরাভূত করতে হয়েছে অসংখ্য অশুভ শক্তিকে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক এই মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিকের ওপর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে নেমে এসেছে অত্যাচারীর খড়গ। ১৯৮৭ সালে স্বৈরশাসক এরশাদ তাকে বেতার টেলিভিশনে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন এবং নির্বাসিত করার চক্রান্ত করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনৈতিক চিন্তা-ভাবনা ধারণ ও লালন করার কারণে। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত আমলে বিভিন্নভাবে ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত করা হয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধের এই সৈনিকের বিরুদ্ধে। ময়মনসিংহে সিনেমা হলে বোমা হামলায় তাকে আসামি করাসহ বিভিন্ন সময় নানা রকমের হামলা-মামলায় তার সংগ্রামী জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। তাকে মিথ্যা মামলার শিকার করে হেনস্তা ও অপদস্ত করেছিল তৎকালীন জামায়াত-বিএনপি বা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীশক্তি। তবু থামানো যায়নি এই অকুতোভয় সৈনিককে; বরং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্দীপ্ত মানুষটি বীরদর্পে নিজের দেশের প্রতি, মানুষের প্রতি তার দায়িত্ব ও ব্রত পালনে থেকেছেন অবিচল। ধর্মীয় মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে সর্বদাই কঠোর অবস্থান নিয়েছেন রাজপথ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক, উভয় জায়গায়তেই। দেশের যেখানেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নিপীড়নের শিকার হয়েছে, সেখানেই সশরীরে চলে গেছেন এবং তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের সরকার ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর দেশের দক্ষিণাঞ্চলে নিজের জীবন বিপন্ন করে সন্ত্রাসীদের অস্ত্র সমর্পণ ও আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ার মূল উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি। সেসময় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রয়াত মোহাম্মদ নাসিম সহযোগিতা করায় দেশের দক্ষিণাঞ্চল রাষ্ট্রবিরোধী জঙ্গিদের কবল মুক্ত করা সম্ভব হয়।

আজ আশি বছরে পা রাখলেন আবেদ ভাই। এখনও তিনি দেখেন এক অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যের বাংলাদেশের স্বপ্ন। আবেদ খানের সেই স্বপ্নযাত্রার সহযাত্রী আমরাও। শুভ জন্মদিন আবেদ ভাই।

 

লেখক: সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি

e-mail: nazrul@gmx.at