• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০৭ অক্টোবর, ২০২২, ২১ আশ্বিন ১৪২৯
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২৮, ২০২০, ০১:২৯ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২১, ১১:৪৬ এএম

চিকিৎসক ও নাপিতের বিয়ে নিয়ে মাথাব্যথা কেন?

চিকিৎসক ও নাপিতের বিয়ে নিয়ে মাথাব্যথা কেন?

নওয়াজ উদ্দিন সিদ্দিক আর সানিয়া মালহোত্রা অভিনীত ভারতীয় ছবি “ফটোগ্রাফ”। ভিন্ন আর্থসামাজিক অবস্থান থেকে আসা দুটো মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠা সম্পর্ক নিয়ে সুন্দর গল্পের একটি চলচ্চিত্র। সেখানে সানিয়া একজন শিক্ষার্থী আর নাওয়াজ একজন ফটোগ্রাফার। শিক্ষার্থী চরিত্রে সানিয়ার তেমন কোন উচ্চাশা নেই, সে খুব সাধারণ জীবন চায়, যেমন জমিতে চাষ করা, চাষ করে ক্ষেতের পাশেই কোন একটা গাছের নিচে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়া। সেই জীবনে, তেমন কোন জটিলতা নেই। সে পড়ালেখা করছে, কিন্তু তার সেই “লেখা পড়া করে যে, গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে” টাইপ কোন আকাঙ্ক্ষা নেই, সে সাধারণ জীবন চায়, খুব খুব সাধারণ। ভোর বেলা উঠে ঘাসের উপর হাঁটবে, গায়ে রোদ মাখবে, গাছের ছায়ায় ঘুমোবে, ফুলের গন্ধ নেবে, সেই আকাঙ্ক্ষায় গাড়ি-বাড়ি-যশ-খ্যাতি এমন কিছু নেই। কারণ একেক মানুষ জীবনকে দেখে একেকভাবে। সেই জীবনদর্শনে মানুষ যখন ভালোবাসে তখন চলমান আর্থসামাজিক অবস্থা হিসেবনিকেশ করে কেউ প্রেমে পড়ে না, ভালোও বাসে না।

এমনিতে আমাদের দেশের বাংলা সিনেমায় বাড়ির মালিকের মেয়ে ড্রাইভারের প্রেমে পড়লেও বাস্তবে সেই ব্যপার দেখলে ভড়কে যায় অনেকে। সেই ভড়কে যাওয়া লোকজনের একজন রংপুরের পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের পুলিশ সুপার মিলু মিয়া বিশ্বাস। রংপুরে একজন নারী চিকিৎসক বিয়ে করেছেন একজন নাপিতকে (তথ্যসূত্র: বিভিন্ন গণমাধ্যম), এক্ষেত্রে সেই নারী চিকিৎসকের বাবা অপহরণের মামলা দায়ের করেন। নারী চিকিৎসকের বয়স ৩৪ বছর। মামলার ভিত্তিতে পুলিশ সেই নারী, তার স্বামী এবং নারীর শিশু সন্তান সহ ঢাকা থেকে উদ্ধার করেন, এবং এরপর তাদের নিয়ে রংপুরে সংবাদ সম্মেলন করেন। সেই সংবাদ সম্মেলনে, মিলু মিয়া বিশ্বাসের “মোরাল পুলিশিং(!)” স্পষ্ট হয়। তিনি বলেন, চিকিৎসক হয়ে একজন নাপিতকে বিয়ে করাতে সেই নারী চিকিৎসক গোটা চিকিৎসক-সমাজকে নাকি লজ্জায় ফেলেছেন। এটা সেই নারী চিকিৎসকের “স্বেচ্ছাচারিতা” ইত্যাদি। নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদের (সিডও) ১৬ অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা আছে: বিয়ে ও সঙ্গী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে, নারীর স্বাধীনতার কথা। মানবাধিকারের সর্বজনীন দলিলের অনুচ্ছেদ ১৬-তেও উল্লেখ আছে “বিয়ের অধিকারের” কথা। অর্থাৎ একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ, তার সম্মতিতে তার পছন্দ অনুযায়ী সঙ্গী বাছাইয়ের এবং তাকে বিয়ে করার সম্পূর্ণ অধিকার রাখেন। আইন অনুযায়ী নারীর ক্ষেত্রে বয়স ১৮ এবং পুরুষের ক্ষেত্রে ২১ বছর বয়স হওয়া আবশ্যক। এমন কোন আইন নেই যে, একজন চিকিৎসক একজন নাপিতকে বিয়ে করতে পারবে না, বা একজন নারী তার প্রথম স্বামীকে তালাক দিয়ে, দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবে না।

পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারী ৩৪ বছর বয়স হোক বা ১৪, নারীর সিদ্ধান্ত সব সময়ই শিশুসুলভ। অর্থাৎ, “তাকে ফাসানো হয়েছে”, “তাকে ফুসলানো হয়েছে”, “সে ভুল করেছে” ইত্যাদি কথা বলে তার সিদ্ধান্তকে অসম্মান করে বাতিল করে দেয়ার প্রবণতা রয়েছে। প্রবণতা রয়েছে নারীর সিদ্ধান্তকে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে তুলে ধরার এবং সেই সিদ্ধান্ত সঠিক নয় বলে বিচারমূলক মন্তব্য করার। যদি চিত্র উল্টো হতো, দেখা যেতো যে একজন চিকিৎসক কোন কারণে বিয়ে করেছেন বাড়ির গৃহকর্মীকে, তাহলে সংবাদ সম্মেলন করে, মিলু মিয়া বিশ্বাস কোন সময় নষ্ট করতেন কিনা, এবং তখন উনার বিচারে পুরুষ সমাজ লজ্জায় পড়তেন কিনা, সেটা নিয়ে সন্দেহ জাগে!

মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত এবং জীবনযাপনে নাক গলানো তো পুলিশের কাজ নয়। তদন্তে যখন জানা যাবে যে আনিত অভিযোগ সঠিক নয়, তখন পুলিশ সে অনুযায়ী কাজ করবে। সেক্ষেত্রে, এই সংবাদ সম্মেলন করে, মিলু মিয়া বিশ্বাস শুধু সেই দম্পতির মানবাধিকারই লঙ্ঘন করেন নি, পুলিশ প্রশাসনকেও বিব্রত করেছেন।  

 

লেখক: আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী।