• ঢাকা
  • শনিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২১, ১৫ ফাল্গুন ১৪২৭
প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৬, ২০২১, ০৫:৩৭ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : জানুয়ারি ২৬, ২০২১, ০৫:৩৭ পিএম

নদীর কান্না থামান

নদীর কান্না থামান

২৩  জানুয়ারি দৈনিক জাগরণ পত্রিকার অনলাইন ভার্সনে প্রকাশিত একটি নিউজের শিরোনাম ‘অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, নদীভাঙনের শঙ্কা’। পত্রিকাটির বরিশাল প্রতিনিধির করা এই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সেখানকার প্রভাবশালীরা অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছেন। জেলার আড়িয়াল খাঁ, জয়ন্তী ও নয়াভাঙ্গনী নদীতে ড্রেজার বসিয়ে চলছে বালু উত্তোলনের কাজ। সংগত কারণেই নদীভাঙন আরো তীব্র হচ্ছে। একদিকে বালু ব্যবসায়ীরা অবৈধ উপায়ে নদী থেকে বালু উত্তোলন করে অর্থ কামাচ্ছেন, অন্যদিকে হুমকির মুখে পড়ছে সেসব নদীতীরের বাসিন্দাদের বাড়িঘর, বিদ্যালয়, হাটবাজারসহ বিভিন্ন স্থাপনা। ভাঙন আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন নদীপাড়ের বাসিন্দারা। কখন কার বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়, কেউ জানে না। এই চিত্র বরিশালের একটি স্থানের কিংবা একটি উপজেলার নয়, যেখানে নদী আছে, সেখানেই চলছে নদীর ওপর এ ধরনের অত্যাচার।
পরদিন ২৪  জানুয়ারি ময়ূর নদ নিয়ে দৈনিক দেশ রূপান্তরের খুলনা প্রতিনিধির করা প্রতিবেদন ‘প্রকাশ্যে  ভরাট হচ্ছে ময়ূর নদ’ প্রকাশিত হয়। রিপোর্ট থেকে জানতে পারি ময়ূর নদে আগের মতো পানি নেই। গল্লামারী সেতু এলাকায় নদের দুই পাশে যত্রতত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে পলিথিনসহ গৃহস্থালির ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। নদে শুকনা কচুরিপানা, কোথাও কোথাও জন্ম নিয়েছে সবুজ ঘাস। কোথাও মাটি উঁচু হয়ে রয়েছে। সেসব স্থান দিয়ে হেঁটে পারাপার হচ্ছে পথচারী। এর আগে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ময়ূর নদসহ মহানগরের অভ্যন্তরীণ ২২ খালের অবৈধ দখলদার উচ্ছেদে কার্যক্রম শুরু করে খুলনা জেলা প্রশাসন। সে সময় গল্লামারী সেতুর পশ্চিম পাশে ময়ূর নদের ওপর স্থাপিত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। অভিযানে নদের দুই পাড়ের অবৈধ কাঁচা, সেমিপাকা, পাকা স্থাপনা ক্রেন ও বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। নদপারের  বাসিন্দারা বলছেন, বছর ২৫ আগে ময়ূর নদে বড় বড় নৌকা চলাচল করত। অনেক জেলে পরিবার মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করত। ঘরবাড়ির কাজে এ নদের পানি ব্যবহার হতো। অথচ এখন দখল-দূষণের কারণে নদের পানি আর ব্যবহারের উপযোগী নেই। প্রায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদের সঙ্গে আগে রূপসা নদীর সরাসরি সংযোগ ছিল। আজ নদটি হারিয়েছে তার নিজস্বতা।
শুধু খুলনা বা বরিশালের এই নদ-নদীগুলোই নয়, সারা দেশের নদ-নদীগুলোর চিত্র প্রায় একই রকম। একদিকে উচ্ছেদ অভিযান চলছে, অন্যদিকে দখল হচ্ছে। একদিকে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলছে, অন্যদিকে দূষণ হচ্ছে। অসচেতন হয়ে নয়, একরকম সচেতন ও দায়িত্বহীনভাবেই আমরা নদীর ওপর অত্যাচার চালাচ্ছি। নদী কাঁদছে, আমরা তা শুনতে পাচ্ছি না। হাইকোর্ট বলেছেন নদী একটি জীবন্ত সত্তা। রায়ে আদালত বলেছেন, ‘মানুষের জীবন-জীবিকা নদীর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মানবজাতি টিকে থাকার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে নদী। নাব্যতা-সংকট ও বেদখলের হাত থেকে নদী রক্ষা করা না গেলে বাংলাদেশ তথা মানবজাতি সংকটে পড়তে বাধ্য। নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের সরকার আইন প্রণয়ন করে নদীকে বেদখলের হাত থেকে রক্ষার চেষ্টা করছে। নদী রক্ষায় আন্তর্জাতিকভাবে জাগরণ শুরু হয়েছে। এখন সবারই ভাবনা—পরিবেশের জন্য নদী রক্ষা করতে হবে।’ এ রায়ের মধ্য দিয়ে মানুষের মতোই নদীর মৌলিক অধিকার স্বীকৃতি পেয়েছে বলে বলছেন আইনজ্ঞরা। আদালতের রায় অনুযায়ী দেশের নদ-নদীগুলো এখন থেকে মানুষ বা প্রাণী যেমন কিছু আইনি অধিকার পায়, তেমনি অধিকার পাবে। এর ফলে নদী নিজেই তার ক্ষতির বা দখলের বিষয়ে আদালতের দ্বারস্থ হতে পারবে। যেহেতু নদী নিজে থেকে আদালতে যেতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে কেউ তার প্রতিনিধি হয়ে ক্ষয়ক্ষতিগুলো আদালতকে জানালে তার প্রতিকার পাবে।
দুই বছর হলো, আদালতের এই রায় হয়েছে অথচ এত দিনেও আমরা সাবধান হলাম না। আদালতের রায়, সরকারের নজরদারি, গণমাধ্যম, নদী ও পরিবশেকেন্দ্রিক সংগঠনগুলোর চাপ উপেক্ষা করেই চলছে নদীতে দখল-দূষণ। সম্প্রতি প্রকাশিত জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদন-২০১৯ এ দৃষ্টি দিলেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়। রিপোর্ট বলছে, দেশের ৬৪ জেলায় নদী দখলদারের সংখ্যা ৬৩ হাজার ২৪৯ জন। এর আগে এই তালিকায় ছিল ৫৭ হাজার ৩৯০ জন। সবচেয়ে বেশি নদী দখলদার খুলনা বিভাগে ১১ হাজার ২৪৫ জন। কম সিলেট বিভাগে ২ হাজার ৪৪ জন। অবাক করার বিষয় হলো, এর মধ্যে গত দুই বছরে ১৮ হাজার ৫৭৯ দখলদারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। তবু দখল আর দূষণ বন্ধ হয়নি। এই প্রতিবেদন থেকে আরো জানতে পারি, দেশে একসময় ২৪ হাজার কিলোমিটার নদীপথ ছিল। দখল, দূষণ ও ভরাটে হারিয়ে গেছে ১৯ হাজার কিলোমিটার, বর্তমানে আছে ৫ হাজার কিলোমিটারেরও কম। 
নদী রক্ষা কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে নদ-নদী দখলের এই সার্বিক চিত্র নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে আরো জানা যায়, ঢাকা বিভাগের জেলাগুলোতে নদীর অবৈধ দখলদারের সংখ্যা ৮ হাজার ৮৯০ জন। এর মধ্যে উচ্ছেদ করা হয়েছে ১ হাজার ৪৫২ জনকে। চট্টগ্রাম বিভাগের জেলাগুলোতে নদী দখলদার ৪ হাজার ৭০৪ জন। এর মধ্যে উচ্ছেদ করা হয়েছে ২৩০ জনকে। খুলনা বিভাগে ১১ হাজার ২৪৫ জন নদী দখলদার রয়েছেন। এর মধ্যে ৪ হাজার ৮৯০ জনকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। বরিশাল বিভাগের ৫ হাজার ৬১১ জন দখলদারের মধ্যে উচ্ছেদ করা হয়েছে ৭৯৩ জনকে। সিলেট বিভাগের ২ হাজার ৪৪ জন নদী দখলদার রয়েছেন। তাদের মধ্যে উচ্ছেদ হয়েছে ৫৭৬ জন। ময়মনসিংহ বিভাগের জেলাগুলোতে ৪ হাজার ৮৪৮ জন নদী দখলদারের মধ্যে ১ হাজার ৭০৭ জনকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। রংপুর বিভাগের নদীগুলোতে ২ হাজার ৭৬০ জন দখলদার রয়েছে। এর মধ্যে ৮১৩ জনকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। রাজশাহী বিভাগের ২ হাজার ৬৯৩ জন দখলদারের মধ্যে উচ্ছেদ করা হয়েছে ৪১ জনকে। 
কয়েক বছর ধরে আমরা লক্ষ করেছি, নদী সুরক্ষায় জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ), নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় তথাপি সরকারের প্রচেষ্টা ও নানা উদ্যোগ। তবু কেন অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা সম্ভব হচ্ছে না, বরং নতুন করে দখল হচ্ছে, তা আমাদের বোধগম্য নয়। ক্রমান্বয়ে নদী দখলের এই মাত্রা বাড়তে দেওয়া যাবে না, যে করেই হোক তা কমাতে হবে, থামাতে হবে।
আমরা অবশ্যই আশা করব, সরকার আরো জোরদারভাবে, আরো আন্তরিকতার সঙ্গে নদী দখলদার, দূষণকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তবেই থামবে নদীর কান্না।

লেখক : গবেষক ও গল্পকার