• ঢাকা
  • বুধবার, ০৩ মার্চ, ২০২১, ১৯ ফাল্গুন ১৪২৭
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২১, ০১:০৪ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২১, ০১:০৯ পিএম

ভাষা আন্দোলন ও সৈয়দ নজরুল ইসলাম

ভাষা আন্দোলন ও সৈয়দ নজরুল ইসলাম

সৈয়দ নজরুল ইসলাম। এই মহামানব নানা গুণে গুণান্বিত। তৎকালীন মহকুমা কিশোরগঞ্জের অজপাড়াগাঁ যশোদলে জন্ম নিয়েও নিজ কর্মগুণে রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে এসেছেন তিনি। বীরদামপাড়ার এই বীর যোদ্ধা মানুষের ডাকে সাড়া দিয়েছেন সব সময়। হয়ে উঠেছিলেন গণমানুষের নেতা। কখনো কখনো তাঁকে অস্থির মনে হয়েছে বারবার তাঁর পেশা বদলের কারণে, কিন্তু এ কথা চরমতম সত্য যে তাঁর প্রকৃত জায়গা রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু থেকে তিনি বিন্দুমাত্রও বিচ্যুত হননি। সরকারি চাকরি, শিক্ষকতা, আইনপেশা, যখন যেখানেই যান না কেন, স্থির থেকেছেন রাজনীতিতেই। তিনি যে আপাদমস্তক রাজনীতিরই মানুষ। এই রাজনীতিতে তিনি যেমন বাংলার মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন, তেমনি পেয়েছেন বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভালোবাসাও। বঙ্গবন্ধু তাঁকে বন্ধু বলে পরিচয় দিতেন। তাঁকে সম্মান করতেন। তিনি ছিলেন জাতির পিতার বিশ্বস্ত সহচর, সহযোদ্ধা। বঙ্গবন্ধু যেমনটা তাঁকে বিশ্বাস করতেন, সেই বিশ্বাসের মর্যাদা তিনি জীবন দিয়ে অক্ষুণ্ণ রেখেছেন। আর তা পেরেছেন এ জন্য যে তিনি ছিলেন নীতির প্রশ্নে আপসহীন। তিনিই বাংলার মানুষের প্রাণের বুলবুল—সৈয়দ নজরুল ইসলাম। বাংলার মানুষ তাঁকে ভালোবেসে স্লোগান তুলত—বাংলার বুলবুল, সৈয়দ নজরুল। নিকটজনদের কাছে তিনি ছিলেন প্রিয় গোলাপ ভাই। জন্মের সময় তাঁর বাবা নাম রেখেছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম গোলাপ। কাদা মাটির সোঁদা গন্ধ গায়ে মেখে জনগণের মাঝে থেকে তিনি নিজেকে তৈরি করেছিলেন। হয়তো তিনি জানতেনও বাংলার মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে তাঁকেই হয়ে উঠতে হবে অন্যতম কান্ডারি। তিনি শুধু বঙ্গবন্ধুর কাছেই প্রিয় ছিলেন না, তাঁর অপরাপর সহযোদ্ধা তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, কামারুজ্জামানসহ অন্যদের কাছেও গ্রহণযোগ্য ও সম্মানীয় ছিলেন।

সৈয়দ নজরুল ইসলাম ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ৫৪-র যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬-র ছয় দফা, ৬৯-র গণ-অভ্যুত্থান, ৭০-র সাধারণ নির্বাচন, ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধসহ বাঙালি জাতির প্রতিটি আন্দোলন, লড়াই সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। তাঁর বাঙালির মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম নায়ক হয়ে ওঠার মূল ভিত্তি স্থাপিত হয় ৫২’এর ভাষা আন্দোলনেই।

স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রভাষা কী হবে, সে সিদ্ধান্ত ভারতের রাজনৈতিক নেতারা আগেই গ্রহণ করে রেখেছিলেন, কিন্তু সমস্যা তৈরি হলো পাকিস্তানের বেলায়। কারণ, পাকিস্তান সরকার তার সিংহভাগ জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করে অন্য একটি ভাষা তাদের ওপর চাপিয়ে দিতে চাইল। চাইলেই কী হয়? মেনে নিল না পূর্ব বাংলার বীর-জনতা। তারা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিল উর্দু নয় বাংলা এবং শুধু বাংলাই হবে রাষ্ট্রভাষা। বেধে যায় তুমুল বিরোধ।

সে সময় আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড. জিয়াউদ্দীন আহম্মদ এক বিবৃতিতে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হওয়া উচিত বলে অভিমত প্রকাশ করলে বিশিষ্ট ভাষাবিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ এর তীব্র প্রতিবাদ জানান। ধীরে ধীরে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়তে থাকে সারা পূর্ব বাংলায়। সেই থেকে শুরু।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করে যখন পূর্ব বাংলার ওপর অযাচিতভাবে চাপিয়ে দিতে চাইল, তখনই ঘুরে দাঁড়ায় বাংলার ছাত্রসমাজ। অন্য অনেকের মতো সেদিনের তরুণ ছাত্রনেতা সৈয়দ নজরুল ইসলামও যোগ দেন রাষ্ট্রভাষার আন্দোলনে। মহান ভাষা আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা অনন্য। সেদিনের সেই আন্দোলনের অন্যতম সংগঠন রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের হয়ে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। ২ মার্চ ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে আয়োজিত এক সভায় পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিস, পাকিস্তান গণতান্ত্রিক যুবলীগ, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ, গণ আজাদী লীগসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠিত হয়। সেই কমিটিতেও ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্রসংসদের সহসভাপতি।

রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আন্দোলন চলছে, খাজা নাজিমুদ্দিন তখন পূর্ববঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। জানা গেল, ১৯ মার্চ, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় আসবেন। খাজা নাজিমুদ্দিন তখন রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের কাছে ৮ দফা শান্তি প্রস্তাব দেন। তাঁর ভয় ছিল, ওই সময় গভর্নর জেনারেল ছাত্রদের বিক্ষোভের মুখে পড়লে তাঁর রাজনৈতিক জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই সংগ্রাম পরিষদের কাছে তাঁর এই শান্তি প্রস্তাব। মুখ্যমন্ত্রীর শান্তি প্রস্তাব সাগ্রহে মেনে নেয় দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। ১৫ মার্চ থেকে আন্দোলন স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়। ১৯ মার্চ বিকালে ঢাকায় আসেন জিন্নাহ। হাজার হাজার লোক তাঁকে দেখার জন্য তেজগাঁও বিমানবন্দরে সমবেত হয়। তাঁর এই আগমনে ছাত্রদের ও রাজনৈতিক মহলে একধরনের আশঙ্কা তৈরি হয়, পরবর্তী সময়ে সে আশঙ্কাই সত্যে পরিণত হয়।

২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) নাগরিক সংবর্ধনা সভায় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। এরপর ২৪ মার্চ সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে অনুষ্ঠিত বিশেষ সমাবর্তনে দেওয়া দীর্ঘ বক্তব্যে তিনি আবারও ২১ মার্চ দেওয়া বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করলেন। কার্জন হলে উপস্থিত কিছুসংখ্যক ছাত্র তখনই ‘নো নো’ বলে প্রতিবাদ করে ওঠেন। জিন্নাহর এ বক্তৃতা ছাত্রসমাজে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

এদিন সন্ধ্যায় পূর্ব পাকিস্তানের চিফ সেক্রেটারি আজিজ আহমেদের সরকারি বাসভবনে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সঙ্গে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের যে বৈঠক হয়, সেখানেও উপস্থিত ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। সেদিনের বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন শামসুল হক, কামরুদ্দিন আহমদ, অধ্যাপক আবুল কাসেম, শামসুল আলম, মোহাম্মদ তোয়াহা, অলি আহাদ, তাজউদ্দীন আহমদ প্রমুখ। সেদিনের সেই সভা থেকে জিন্নাহকে একটি স্মারকলিপিও দেওয়া হয়।

কিন্তু সভাটি শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়নি। জিন্নাহর সঙ্গে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ নেতাদের তর্ক বাধে। জিন্নাহ ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন। তিনি বলেন, খাজা নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে যে চুক্তি হয়েছে, তা আমি মানি না। কারণ, চুক্তিতে তার সই জোর করে নেওয়া হয়েছে। একতরফা এই চুক্তি সম্পূর্ণ অবৈধ।

রাষ্ট্রভাষা বাংলার সমর্থনে গড়ে ওঠা সেই আন্দোলনে সৈয়দ নজরুল ইসলামের অসামান্য অবদান ছিল। ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ভিপি এবং পরে, ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ময়মনসিংহে গঠিত সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি।

লেখক : সাংবাদিক ও গবেষক