• ঢাকা
  • শনিবার, ১০ এপ্রিল, ২০২১, ২৭ চৈত্র ১৪২৭
প্রকাশিত: মার্চ ৭, ২০২১, ১২:২২ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : মার্চ ৭, ২০২১, ১২:২২ পিএম

৭ই মার্চের ভাষণ যে কারণে চিরায়ত

৭ই মার্চের ভাষণ যে কারণে চিরায়ত

একাত্তরে ৭ই মার্চে ভাষণ দিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ব জয় করে গেছেন।২০১৭ সালের ৩১ অক্টোবর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড’-এর স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো। এর আগে পৃথিবীর অন্যতম একটি ভাষণ হিসেবেও এটি স্বীকৃতি পেয়েছে। Jakob F. Field  সম্পাদিত We Shall Fight on the Beaches: The Speeches that Inspired History গ্রন্থে ৭ই মার্চের ভাষণ ইতিহাসের অন্যতম ভাষণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। কেবল এই ধরনের স্বীকৃতি নয় ভাষণটির বিষয়বস্তুর কারণে এটি আজও জনপ্রিয় একটি কবিতা। যে কবিতা শোষিত মানুষের পক্ষে কথা বলে চলেছে গত পঞ্চাশ বছর যাবৎ।

একাত্তরের ৭ই মার্চের ভাষণ ‘সমুদ্রের অর্কেস্ট্রা’, ঝড়ো বাতাসের প্লাবন। ৭ই মার্চের ভাষণই মানুষকে নতুন এক স্বপ্নে আন্দোলিত করে। জাগরণ ও শিহরণে উদ্দীপিত মানুষ মুক্তির স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে উৎসাহী হয়। জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানান বঙ্গবন্ধু। নির্মলেন্দু গুণের ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’কবিতার একটি অংশ-

‘শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে

রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে

অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।

তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল,

হৃদয়ে লাগিল দোলা, জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার

সকল দুয়ার খোলা। কে রোধে তাঁহার বজ্রকণ্ঠ বাণী?

গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর-কবিতাখানি;

‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,

এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের।’

কবির বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে ৭ই মার্চের ভাষণই স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। আল মাহমুদের কবিতার অংশ বিশেষ-

‘তাঁর আহ্বান ছিল নিশিডাকের শিস্ তোলা তীব্র বাঁশীর মত।

প্রতিটি মানুষের রক্তবাহী শিরায় কাঁপন ধরিয়ে দিয়ে তা বাজত

...সে যখন বলল, ‘ভাইসব’।

অমনি অরণ্যের এলোমেলো গাছেরাও সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে গেল

সে যখন ডাকলো, ‘ভাইয়েরা আমার’...

অসীম সাহার কবিতায় এভাবে প্রকাশিত ৭ই মার্চ-

‘তুমি হাত উত্তোলিত করলেই

হিমালয় মাথা নিচু করে তোমার পায়ের কাছে এসে

আনত প্রজার মতো জানায় কুর্নিশ।’

বঙ্গবন্ধুর আত্মদানকে অর্থবহ করা এবং তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় জাগ্রত রাখার জন্য এভাবেই অনেকগুলো কবিতা রচিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর মতো ‘রাজনীতির কবি’র ৭ই মার্চের ভাষণই একটি মহাকবিতা। পাকিস্তানের অপশাসনের বিরুদ্ধে জনগণকে যেমন, তেমনি তাঁর জ্বালাময়ী ভাষণ এখনকার প্রজন্মকেও উদ্বুদ্ধ করে চলেছে অপশক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে। আসলে বাঙালির নিজের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে চিনতে শেখা তাঁর মাধ্যমেই।

মুক্তিযুদ্ধের সময় লিখিত জসীমউদদীনের ‘বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক কবিতায় এই ঐতিহাসিক ভাষণের কথা বলা হয়েছে।বিশেষত বঙ্গবন্ধুর একাত্তরের মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকে শুরু হওয়া অসহযোগ আন্দোলনের বিষয়টিকে কবি তুলে ধরেছেন দীর্ঘ কবিতাটির একটি অংশে-

‘তোমার হুকুমে রেল-জাহাজের চাকা যে চলেনি আর

হাইকোর্টের বন্ধ দরজা খুলিবে সাধ্য কার!... 

তোমার হুকুমে তুচ্ছ করিয়া শাসন-ত্রাসন ভয়,

আমরা বাঙালি মৃত্যুর পথে চলেছি আনিতে জয়।’

কবি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের গুণাবলির প্রশংসা করেছেন।তাঁর আপসহীন অবস্থান ও মানুষের আস্থা-ভরসার নেতা হিসেবে মুক্তিসংগ্রামে বিজয়ের চিত্রও তুলে ধরেছেন তিনি।

৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে উচ্চারিত- ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ ছিল তাঁর অসামান্য নেতৃত্বের উত্থান-পর্বের শেষ শীর্ষবিন্দু। এই ভাষণেই তিনি সমস্ত বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধভাবে সশস্ত্র লড়াইয়ে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছিলেন। প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলা এবং যার যা কিছু আছে তা নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলার মধ্যে স্বাধীনতা অর্জনের সেই সশস্ত্র প্রত্যয়ই ঘোষিত হয়েছিল। এমনকি ‘আমি যদি না-ও থাকি’ কিংবা ‘আমি যদি হুকুম দেবার না পারি’ উচ্চারণের মধ্যে ছিল জাতির মুক্তি আন্দোলনে নিবেদিত অন্যান্য নেতাকর্মী ও আপামর জনতার ওপর নির্ভর করার আত্মবিশ্বাস। একারণেই ১২ মার্চ কর্নেল এমএজি ওসমানীর নেতৃত্বে অবসরপ্রাপ্ত কয়েক হাজার সৈনিক ও সেনা কর্মকর্তাদের স্বাধীনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার শপথ গ্রহণ এবং ২০ মার্চ ছাত্র ইউনিয়নের ৫শ ছাত্রছাত্রী নিয়ে গঠিত গণবাহিনীর ১০ দিনের ট্রেনিং শেষে কুচকাওয়াজ প্রদর্শন করা ছিল বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের প্রতিক্রিয়ারই অংশ। অর্থাৎ সেদিন মুক্তির চূড়ান্ত লক্ষ্যে জনগণ যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত হয়ে উঠেছিল।

বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনের লক্ষ্যই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা। সেই স্বাধীনতা অর্জনের জন্য একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বাঙালিদের যে করতে হবে তাও তাঁর দূরদৃষ্টিতে ধরা পড়েছিল। মূলত উত্তাল মার্চের বাংলাদেশের প্রথম শাসক ছিলেন বঙ্গবন্ধু। পাকিস্তানি জান্তাদের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে যে দ্রোহের আগুনে বাঙালি জাতি সেদিন জেগে উঠেছিল তার কেন্দ্র ভূমির নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। তাঁর নির্দেশ ছিল আদেশের মতো, আপামর জনগোষ্ঠী তা নির্দ্বিধায় মেনে নিয়েছিল; বিশ্ববাসীর সামনে তাঁর প্রতি বাঙালির স্বতঃস্ফূর্ত আস্থা ছিল বিস্ময়কর। কারণ তারা স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হতে তখন দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ। আর ঘটনার বিচিত্র আবর্তে ষড়যন্ত্রকারীদের কাছে বঙ্গবন্ধু ছিলেন আপসহীন নেতা। কারণ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ও রাজনীতির দর্শন ছিল মানবপ্রেম। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র শুরুতে আছে সেই প্রত্যয়- ‘একজন মানুষ হিসাবে সমগ্র মানবজাতি নিয়েই আমি ভাবি। একজন বাঙালি হিসাবে যা কিছু বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্কিত তাই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। এই নিরন্তর সম্পৃক্তির উৎস ভালোবাসা, অক্ষয় ভালোবাসা, যে ভালোবাসা আমার রাজনীতি এবং অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে।’ বঙ্গবন্ধু ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের ২১-দফা থেকে শুরু করে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পূর্বদিন পর্যন্ত দেশের গণমানুষের উন্নয়নের কথা বলেছেন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের পক্ষে ছিল তাঁর রাষ্ট্রনীতি। তিনি সবসময় শোষিতের মুক্তি কামনা করেছেন। আজীবন সংগ্রামে যেমন তিনি অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেন নি; তেমনি স্বাধীন দেশের সমাজকে সকল অপশক্তির কবল থেকে মুক্ত করার জন্য অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছিল তাঁর বলিষ্ঠ ভূমিকা।

১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের ২১-দফা এবং ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগের ৬-দফা কর্মসূচিতেও শোষণের বিরুদ্ধে অবস্থান ঘোষণা করা হয়। ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এক ভাষণে বঙ্গবন্ধু সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির কথা বলেন। তিনি দীপ্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করেন, ‘আওয়ামী লীগের মাথা কেনার মতো ক্ষমতা পুঁজিপতিদের নেই।’ সদ্য স্বাধীন দেশে তিনি শোষণহীন সমাজ গড়ার জন্য ধৈর্য ধরে কাজ করার কথাও বারবার উল্লেখ করেন। আত্মজীবনীর বিবরণ থেকে আমরা জানতে পেরেছি, সাতচল্লিশের দেশভাগের আগেই শেখ মুজিবুর রহমান অসাম্প্রদায়িক চেতনায় স্নাত হন। তিনি বলেছেন, দেশভাগের পর রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলন ও ছয়দফা পর্যন্ত যদি বাংলার রাজনীতির গতিধারা বিশ্লেষণ করো, তাহলে দেখবে অসাম্প্রদায়িক স্বাধীন বাংলার সুপ্ত চেতনার জন্ম সাতচল্লিশের বাংলাভাগের আগেই এবং সেই চেতনারই প্রথম বহিঃপ্রকাশ আটচল্লিশ সালেই অসাম্প্রদায়িক ভাষা-আন্দোলনের মধ্যদিয়ে। আর রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন বঙ্গবন্ধু।কেবল আন্দোলন নয় বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার কৃতিত্বও তাঁর। রাজনীতি করতে গিয়ে ব্যক্তিগত জীবনে নানা সমস্যা ও সংকটময় পথ পরিক্রমা করতে হয়েছে শেখ মুজিবুর রহমানকে। তবে জনগণের পক্ষে কথা বলেছেন তিনি সাহসের সঙ্গে; পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছেন দৃঢ় চিত্তে। তিনি বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছেন এবং একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু ছিলেন রাজনীতির কবি-‘রাজনীতির প্রকৌশলী নন মুজিব, মুজিব হচ্ছেন রাজনীতির কবি, বাঙালির স্বাভাবিক প্রবণতা প্রায়োগিক নয়, শৈল্পিক। তাই মনে হয়, বাংলাদেশের সকল মানুষ, শ্রেণি ও মতাদর্শকে এক সূত্রে গাঁথা হয়ত কেবল মুজিবের মতো রাজনৈতিক কবির পক্ষেই সম্ভব।’

জনৈক খ্যাতিমান গবেষকের মন্তব্য, ‘বাঙালির মুক্তির সনদ ছিল এই ভাষণটি। এই দিনই রাষ্ট্রের ভিত্তি তৈরি হয়ে যায়। পাকিস্তানকে বাঙালিরা প্রত্যাখ্যান করে।’ পহেলা মার্চে ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চের জাতীয় সংসদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করলে সারা দেশের মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। বঙ্গবন্ধু সেদিন বলেছিলেন-‘লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চলবে।’ তিনি ২ মার্চ ঢাকায় এবং ৩ মার্চ দেশব্যাপী হরতাল পালনের আহ্বান জানান। একইদিন পল্টন ময়দানে বঙ্গবন্ধু ঘোষিত কর্মসূচি সমর্থন করে ছাত্রলীগের নেতারা বলেন- ‘আর ৬ দফা ও ১১ দফা নয়, এবার বাংলার মানুষ ১ দফার সংগ্রাম শুরু করবে। আর এই ১ দফা হচ্ছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা।’ ২ মার্চ হরতাল পালনের সময় সেনাবাহিনীর গুলিতে ৬ জন নিহত ও অর্ধশত আহত হলে বঙ্গবন্ধু পুনরায় সে রাতেই ৭ই মার্চ পর্যন্ত কর্মসূচি ঘোষণা করেন এবং জনগণকে কয়েকটি নির্দেশ দেন।

৫টি নির্দেশের মধ্যে ৬ মার্চ পর্যন্ত সর্বত্রই হরতাল এবং রেডিও-টেলিভিশন বা সংবাদপত্রসমূহ বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য বা বিবৃতি পেশ না করলে সেই সব প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত সকল বাঙালিকে সরকারি প্রশাসনকে অসহযোগিতা করতে বলেন তিনি। ৭ই মার্চ বিকালে তাঁর ভাষণ দেয়ার কথাও জানান তিনি। ৩ মার্চ স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠের জনসভায় বঙ্গবন্ধু ৪ মার্চ থেকে অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেন। একইসঙ্গে পল্টনে সেদিন ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ সংগীতকে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ঘোষণা এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পূর্ণ আস্থা রেখে স্বাধীনতা সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বঙ্গবন্ধু সামরিক জান্তাকে সকল প্রকার খাজনা-কর না দেয়ার আহ্বান জানান এবং বলেন- ‘আমার হুকুম ছাড়া কেউ কিছু করতে পারবে না।’ তিনি কোর্ট-কাচারি, অফিস-আদালত, রেল, স্টিমার ও পিআইএ বিমানে কর্মরতদের কাজে না যাওয়ার জন্য নির্দেশ দেন।

প্রকৃতপক্ষে শেখ মুজিব সেসময়ের পূর্ব পাকিস্তানের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। ৫ মার্চ ঢাকা থেকে ‘দি টাইমস’-এর সংবাদদাতা পল মার্টিন কর্তৃক এক সংবাদে শেখ মুজিবকে কার্যত বিদ্রোহী পূর্ব বাংলার শাসক বলে উল্লেখ করা হয়। তবে সেদিনই বঙ্গবন্ধু জানান সেনাবাহিনীর গুলিতে অন্তত ৩শ নিহত এবং ২ হাজার লোক আহত হয়েছেন। এ পরিস্থিতির মধ্যে তাঁর শান্তি বজায় রাখার আহ্বান কাজে দিয়েছিল; মানুষ শান্ত হয়েছিল। মানুষের ওপর পুরো মাত্রায় বঙ্গবন্ধুর কর্তৃত্ব ছিল। তাঁর নির্দেশ পালনে মানুষও সদাপ্রস্তুত থাকত। এজন্যই ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদ অধিবেশন বসাবে বলে ৬ মার্চ ইয়াহিয়া বঙ্গবন্ধুকে সকাতর মিনতি জানিয়ে ঘোষণা দেয়। কিন্তু পরদিন ৭ই মার্চের ভাষণে বাঙালি জাতির জন্য বঙ্গবন্ধুর স্পষ্ট ঘোষণা ও নির্দেশনা তাঁকে মুকুটহীন সম্র্রাটের উচ্চ শিখরে অধিষ্ঠিত করে। কারণ ৭ই মার্চের ভাষণের পর সারাদেশে স্বাধীনতা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।

 ১৯৬৯ সালের ৭ নভেম্বর পাকিস্তানে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল- ‘মুজিব প্রকৃতপক্ষেই পূর্ব পাকিস্তানের মুকুটহীন সম্র্রাট।’ ১৯৭১-এর মার্চ মাসে এসে সেই মুকুটহীন সম্র্রাট জনগণের প্রিয় শাসকে পরিণত হলেন এবং দেশ চলতে আরম্ভ করল তাঁরই নির্দেশে। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. রেহমান সোবহান এজন্যই লিখেছিলেন- ‘আমার ধারণায়, ১৯৭১ সালের পহেলা থেকে ছাব্বিশ মার্চ- এই ছাব্বিশ দিনেই বাংলাদেশ প্রকৃতপক্ষে এক স্বাধীন জাতিতে পরিণত হয়েছিলো...।’ কারণ এসময় দেশ পরিচালিত হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে। আপসহীনতা নেতা বঙ্গবন্ধু শোষিত মানুষকে জাগ্রত করেছিলেন আর এখনকার নিপীড়িত মানুষের জন্যও ৭ই মার্চের ভাষণের গুরুত্ব অনস্বীকার্য।তাই ভাষণটি চিরায়ত ও মহিমান্বিত।

 

লেখক: অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়