• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০৭ অক্টোবর, ২০২২, ২১ আশ্বিন ১৪২৯
প্রকাশিত: মার্চ ২২, ২০২১, ০১:৪৩ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : মার্চ ২২, ২০২১, ০৭:৫৭ এএম

প্রতিষ্ঠার রজতজয়ন্তী

জয়তু মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর

জয়তু মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর

একজন বাঙালি হিসেবে গর্ব করার মতো আমাদের যতসব অর্জন আছে, তার মধ্যে সেরা ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, যার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আজকের বাংলাদেশ। বাংলার মাটিতে পতপত করে উড়তে থাকা লাল-সবুজের পতাকার সামনে দাঁড়িয়ে বুকের ওপর হাত রেখে বিনম্র শ্রদ্ধায় যখন আমরা গেয়ে উঠি— ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’, তখন সহসায় চোখের জল আটকে রাখা যায় না। এই যে স্বাধীনতার অপার আনন্দ, দেশপ্রেম, এর সবকিছু আবর্তিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করেই। আজকে আমরা প্রিয় মাতৃভূমির ৫০ বছর উদযাপন করছি। ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এর নানা আনুষ্ঠানিকতা। বাঙালির সবচেয়ে সেরা অর্জন এই মহান মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস লালন, গবেষণা ও নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে ১৯৯৬ সালের ২২ মার্চ যাত্রা শুরু করেছিল ‘মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর’। প্রতিষ্ঠানটি আজ তার রজতজয়ন্তী উদযাপন করছে। রাজধানী ঢাকার সেগুন বাগিচায় একটি ভাড়া বাড়িতে অনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। কেমন ছিল যাত্রা শুরুর সেই দিনটি? 

২২ মার্চ ১৯৯৬। সেগুনবাগিচার অস্থায়ী কার্যলয়ের সামনের রাস্তায় মঞ্চ করে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেদিন সারাদেশে হরতাল পালিত হচ্ছিল। নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট এই হরতাল আহ্বান করেছিল। সেদিন খুব জোড়ালো কর্মসূচি পালন করছিল দলটি। তা সত্ত্বেও আয়োজকদের আমন্ত্রণে শতাধিক বিশিষ্টজন অনুষ্ঠানে যোগ দেন। পতাকাবাহী গাড়ি নিয়ে অনুষ্ঠানে আসেন যুক্তরাজ্যের হাই কমিশনার। শুরু হয় অনুষ্ঠানিকতা।ট্রাস্টিদের পক্ষ থেকে স্বাগত ভাষণ দেন ডা. সারওয়ার আলী। এসময় হঠাৎ শুরু হয় তুমুল ঝড়-বৃষ্টি। সেদিন অধিকাংশ আমন্ত্রিত অতিথি বৃষ্টিতে ভিজেছেন। তবু অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেননি। নির্ধারিত আলোচনা পর্ব শেষে অতিথিদেরকে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টিরা রুমের মধ্যে ঢুকে অর্চি শিখা চিরন্তন প্রজ্বালন করেন। এসময় দেশের বরেণ্য রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা ও সহশিল্পীরা বাড়িটির দোতলার বারান্দা থেকে গাইতে শুরু করেন— ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে, কত প্রাণ হলো বলিদান...। 

কাজটি সহজ ছিল না। কেমন ছিল সেই যাত্রা শুরুর দিনগুলো? জানতে কথা বলেছিলাম মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি সারওয়ার আলীর সঙ্গে। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে প্রতিষ্ঠিত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নিজস্ব ভবনের একটি কক্ষে বসে তিনি আমাকে বলছিলেন সেই দিনের কথা, “জাদুঘর প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতি পর্বে আমরা একটা ট্রাস্ট গঠনের সিদ্ধান্ত নিই। তারপর আমরা প্রত্যেকে ২৫ হাজার করে টাকা দিই। সেই দুই লাখ টাকা দিয়ে ট্রাস্ট গঠন শুরু হয়। ১৯৯৫ সালে ‘মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি ট্রাস্ট’ নামে দলিলটি তৈরি করেন সারা হোসেন। সিদ্ধান্ত হলো ট্রাস্টে কোনো সভাপতি থাকবেন না, সব ট্রাস্টি সমান ক্ষমতার অধিকারী হবে। তবে একজন ট্রাস্টি সচিব হিসেবে যাবতীয় কর্মকাণ্ড সমন্বয় করবেন। পরবর্তীকালে সিদ্ধান্ত হয় ট্রাস্টিদের মধ্যে একজন পাঁচ বছর মেয়াদের জন্য সদস্য সচিব নির্বাচিত হবেন। ‘মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি ট্রাস্টের প্রথম সদস্য সচিব আক্কু চৌধুরী। তারপর সেগুনবাগিচায় একটি ভাড়া বাড়িতে জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করি। ২২ মার্চ ১৯৯৬ সালে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।”

প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরু নিয়ে সারওয়ার আলী বলেন, “১৯৯৫ সালে বাড়ি ভাড়া নেয়ার পর আমরা সবাই মিলে স্মারক সংগ্রহে নামলাম। প্রথমে আমরা সিদ্ধান্ত নিই চারটি বিভাগীয় শহরের বধ্যভূমি থেকে শহীদদের রক্তস্নাত মাটি সংগ্রহ করবো। সে লক্ষ্যে সিটি করপোরেশনের মেয়রদের সাথে যোগাযোগ করে আমরা সফরে যাই। প্রথমে খুলনা শহরের উপকণ্ঠে গল্লামারী বধ্যভূমি থেকে মাটি সংগ্রহ করি। তারপর রাজশাহী ও চট্টগ্রাম সফরে যাই। রাজশাহীর মেয়র মিজানুর রহমান মিনু পদ্মা নদীর পাড়ে এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুজ্জোহা হলের বধ্যভূমিতে নিয়ে যান। আর চট্টগ্রামের মেয়র প্রয়াত মহিউদ্দিন চৌধুরী পাহাড়তলী বধ্যভূমির মাটি সংগ্রহের উদ্যোগ নেন এবং একটি সভার আয়োজন করেন। তারপর ঢাকায় ফিরে বিশিষ্টজনদের সঙ্গে নিয়ে একটি সাংবাদিক সম্মেলন করে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক সংগ্রহের জন্য দেশবাসীর নিকট আবেদন জানাই। আমরা বিপুল সাড়া পেলাম। বুঝলাম মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারেরা দীর্ঘ ২৫ বছর এমনই একটি প্রতিষ্ঠানের অপেক্ষায় ছিল। অনেকে পাকিস্তান আমলের গণআন্দোলনের সময়কার সংবাদপত্র, এমনকি মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রকাশিত বিভিন্ন বিদেশি পত্রিকার কাটিং এনে দিলেন। মুক্তিযোদ্ধারা তাঁদের ব্যবহৃত নান সামগ্রী নিয়ে আসেন, এবং একটি বিশেষ সূত্রে মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত কিছু অস্ত্রও পাই।”

এভাবেই অসংখ্য মানুষের যুক্ততায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আমাদের প্রাণের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। বাংলাদেশের আট বিশিষ্টজন— সারওয়ার আলী, আলী যাকের, সারা যাকের, আসাদুজ্জামান নূর, মফিদুল হক, রবিউল হুসাইন, জিয়াউদ্দিন তারিক আলী ও আক্কু চৌধুরী প্রতিষ্ঠিত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আজ বাঙালির আবেগের, ভালোবাসার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই দেশের মুক্তিযুদ্ধের চেনতায় বিশ্বাসী দেশপ্রেমিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এই উদ্যোগের সাথে ছিল, আজও আছে।

ধারাবাহিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলা প্রতিষ্ঠানটি তাদের ২৫ বছর উদযাপন উপলক্ষে বেশকিছু কর্মসূচিও হাতে নিয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে স্বাধীনতার ৫০ বছর উদযাপন। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের ৫০তম বার্ষিকী উদযাপনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও জাদুঘরের রজতজয়ন্তী অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। বিভিন্ন আয়োজনের মধ্যে আরও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির রজতজয়ন্তীর আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, জাদুঘরের চারপাশের সড়কে আল্পনা অঙ্কন,   গণহত্যাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন, কালরাত্রি স্মরণে প্রদীপ প্রজ্বালন, জল্লাদখানা স্মৃতিপীঠে স্বাধীনতা উৎসব ও শোক থেকে শক্তি অদম্য পদযাত্রা। পুরো মার্চ মাস জুড়েই চলবে এসব অনুষ্ঠান আয়োজন।

গত পঞ্চাশ বছরে দেশের ভেতরে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে সময়ে সময়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত হতে আমরা দেখেছি। এর বিপরীতে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর হয়ে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধের সত্য ইতিহাস চর্চার প্রধান ও অন্যতম কেন্দ্র। নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি জাগরুক করতে মুক্তিযুদ্ধের ভ্রাম্যমাণ জাদুঘর কাজ করে যাচ্ছে। জাদুঘরের নিজস্ব ব্যবস্থ্যাপনায় সারাদেশে এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

২২ মার্চ ২০২১ রজতজয়ন্তীর প্রক্কালে দাঁড়িয়ে প্রতিষ্ঠানটির সকল ট্রাস্টি ও সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞচিত্তে অভিবাদন জানাচ্ছি। জয়তু মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর।

লেখক : গবেষক, প্রাবন্ধিক।