• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০৭ অক্টোবর, ২০২২, ২১ আশ্বিন ১৪২৯
প্রকাশিত: মার্চ ২২, ২০২১, ০২:১১ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : মার্চ ২২, ২০২১, ০৮:১১ এএম

সাম্প্রদায়িক সহিংসতা

বিচারের বাণী কি নিভৃতেই কাঁদবে?

বিচারের বাণী কি নিভৃতেই কাঁদবে?

সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলার ঘটনায় প্রশাসন নড়েচড়ে উঠেছে বলে মনে হচ্ছে। এরইমধ্যে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে দুটি মামলা হয়েছে। সেসব মামলায় হামলার মূল হোতা বলে অভিযুক্ত স্বাধীন মেম্বারসহ অন্তত ২৩ জন গ্রেপ্তার হয়েছে।

শুক্রবার আক্রান্তদের কাছে দেওয়া সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি সাহেবের প্রতিশ্রুতি যদি আন্তরিক হয়ে থাকে তাহলে আশা করা যায় যে, যাদেরকে মামলার এফআইআর-এ হামলাকারী বলে চিহ্নিত করা হয়েছে তারা সবাই অচিরেই গেপ্তার হবে। দ্রুত বিচারের মাধ্যমে আক্রান্তদের মনে এ বিশ্বাস জন্মানো হবে যে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বর্তমান সরকারের ঘোষিত অবস্থান কথার কথা নয়। সত্যি সত্যিই তারা সাম্প্রদায়িক অপশক্তি দমনে আন্তরিক।

তবে এটাও বলা দরকার যে প্রশাসনের এ নড়াচড়া শুরু হয়েছে র‌্যাপিড একশন ব্যাটালিয়ন, বা র‌্যাব, মহাপরিচালকের হামলাস্থল পরিদর্শনের পর। হামলা ঘটেছে বুধবার সকালে, বৃহস্পতিবার সকালেই তিনি নোয়াগাঁও ছুটে যান। আক্রান্তদের এ বলে আশ্বস্ত করেন যে, “নোয়াগাঁওয়ে হিন্দুদের ঘরবাড়িতে হামলার ঘটনায় জড়িতদের ছাড় দেওয়া হবে না। যারা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির চেষ্টা করছে, তাদের অতিদ্রুত আইনের আওয়তায় এনে বিচার নিশ্চিত করা হবে, যাতে আগামীতে এ ধরনের আর কোনো ঘটনা না ঘটে।”

তিনি আরও বলেন, “এই দেশ হিন্দুদের, এই দেশ মুসলমানদের, এই দেশ সবার। সবাই আমরা মিলেমিশে থাকব। বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িক দেশ। এখানে সবার সমান অধিকার রয়েছে। কেউ যদি সংখালঘুদের ওপর নির্যাতন করে তা সহ্য করা হবে না।”

তাঁর ওই বক্তব্যের পরপরই স্থানীয় পুলিশ নিজে বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ১৫০০ জনকে আসামী করে একটি মামলা করে। পরে আরও একটি মামলা হয়, সেটি করেন এক ইউপি চেযারম্যান বিবেকানন্দ মজুমদার, যেখানে সুনির্দিষ্টভাবে ৮০ জনকে আসামী করা হয়েছে। এর পর শুরু হয় গ্রেপ্তার অভিযান।

র‌্যাব প্রধানের হামলাস্থল পরিদর্শনের পর সুনামগঞ্জের স্থানীয় প্রশাসন নড়াচড়া শুরু করে, এ কথাটা বলার কারণ হল, র‌্যাব প্রধান ছুটে আসার আগ পর্যন্ত স্থানীয় প্রশাসন হামলাটাকে খুব গুরুত্ব দিয়েছে বলে আমাদের মনে হয়নি। অন্তত সংবাদমাধ্যমে হামলার আগে-পরে শাল্লা বা সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের তৎপরতা সম্পর্কে যেসব প্রতিবেদন এসেছে তা ভিন্ন কিছু বলে না।

 খেয়াল করুন, হেফাজত নেতা মামুনুল হক দিরাই-এর সমাবেশে মোদীবিরোধী বক্তব্য দেন ১৫ মার্চ, এর সমালোচনা কওে নোয়াগাঁওয়ের এক হিন্দু যুবক ফেইসবুক পোস্ট দেন ১৬ মার্চ। এর প্রতিবাদে ওই দিনই কিছু লোক এলাকায় বিক্ষোভ দেখায়। হিন্দুঅধ্যুষিত নোযাগাও গ্রামবাসী বলছেন, হামলা এড়াতে তাঁরাই ওই যুবকটিকে পুলিশের হাতে তুলে দেন, যদিও মামুনুলের রাজনৈতিক বক্তব্যের যে সমালোচনা যুবকটি করেছে তার সাথে ইসলাম অবমাননার দূরতমও কোনো সম্পর্ক ছিল না এবং, সে হিসেবে, তার ওপর ‘তৌহিদী জনতার’ ক্ষুব্ধ হওয়ার কোনো কারণ ছিল না।

কিন্তু তাতে তাঁদের শেষ রক্ষা হয়নি। পরদিন অর্থাৎ ১৭ মার্চ সকালেই কয়েক হাজার হার্মাদ এসে মামুনুলের নামে জিন্দাবাদ দিতে দিতে পুলিশের ভাষায় ৮০/৯০ টা, আক্রান্তদের ভাষায় কয়েকশ’, বাড়িঘর ভেঙে দিয়ে গেল, মন্দির ভাঙল, নারী, শিশু এমনকি বৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধাদেরও আহত করল।

২০১৬ সালের অক্টোবর নাসিরনগরে ঠিক এ পদ্ধতিতেই একটা ভুয়া ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে দাঙ্গাবাজরা হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর ঝাপিয়ে পড়েছিল। কিন্তু, বহুল চর্চিত হলেও, শাল্লার পুলিশ ওই ঘটনা থেকে কোনো শিক্ষা নেয়নি। তারা দাঙ্গাবাজদেও কথায় আশ্বস্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। অসহায় আক্রান্তদের চিৎকারে যখন ঘুম ভাঙল তখন তারা দেখল আপাতত তাদের কিছুই করার নেই।

স্থানীয় পুলিশ অবশ্য দাবি করছে, হামলার খবর পাওয়া মাত্রই তারা স্পটে গিয়ে হামলাকবারীদেরকে তাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু, রহস্যজনকভাবে, তারা কোনো হামলাকারীকে গেপ্তার করতে পারেনি! তখন একটা মামলা পর্যন্ত করেনি তারা।

মামলা যেটা পুলিশ করেছে, আগেই বলা হয়েছে, তা হয়েছে র‌্যাব প্রধান এলাকা পরিদর্শনের পর। এমনকি, র‌্যাব প্রধান আসার আগ পর্যন্ত, মিডিয়ায় যেসব কথা স্থানীয় প্রশাসনের লোকেরা বলেছেন সেগুলোও ছিল গতানুগতিক, যা আমরা এর আগে রামু, নাসিরনগর. পাবনাসহ বিভিন্ন জায়গায় সংঘটিত সাম্প্রদায়িক হামলার পর সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে বলতে দেখেছি।

 কেউ কেউ বলতে পারেন, র‌্যাব প্রধানের বাড়ি শাল্লায় বলে উনি সেখানে ছুটে গিয়েছেন। তা হয়তো সত্য। কিন্তু এর চেয়েও বড় সত্য হল, সংবিধানমতে রাষ্ট্র ধর্মনিরপেক্ষ হলেও, এ দেশে বহু বছর ধরে একদিকে মুসলিম সংখ্যাগুরুবাদের তোষণ চলছে আরেকদিকে সংখ্যালঘু নির্যাতনকে লঘু ঘটনা হিসেবে দেখানোর সংস্কৃতির চর্চা চলছে।

 কি রাষ্ট্রে, কি সমাজে, সর্বত্র এর চাষবাস চলছে। এ কারণে সংখ্যালঘু নির্যাতন এখানে প্রশাসনের কাছে যেমন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নয়, বিচারালয়েও তা খুব একটা গুরুত্ব পায় না। এ সংক্রান্ত মামলাগুলো বছরের পর বছর চলতে থাকে। আসামীরা খুব সহজে জামিন পেয়ে যায়। জামিন পেয়ে তারা বাদীদেরকে দেখ নেওয়ার হুমকি দেয়। কোথাও কোনো আশ্রয় না পেয়ে বাদীরা একদিন নিরবে-নিভৃতে দেশান্তরী হয়ে যায়। এর মধ্যে একদিন নতুন আরেক ঘটনার জন্ম হয়। পুরনোগুলো ভুলে সচেতন মানুষ, যাদেও সংখ্যা কমতে কমতে এখন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে, তা নিয়ে কিছুদিন হৈচৈ করে।

এক সময় এদেশে কিছু রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ছিল যারা অন্তত শহরাঞ্চলে হলেও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বেশ সরব থাকত। কোথাও এ ধরনের হামলা হলে সেসব সংগঠনের লোকেরা সেখানে ছুটে যেত, দুর্গত মানুষদেরকে অন্তত সান্ত্বনা দিত। এখন তারা নিজেরাই অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে, কি দাঁড়াবে আক্রান্তদের পাশে!

সাম্প্রদায়িকতার এই যে বাড়বাড়ন্ত অবস্থা তার বিষময় প্রভাব থেকে আমাদের আইন শৃঙ্খলাবাহিনী মুক্ত এমনটা নিশ্চয়ই দাবি করা যায় না। আর তা যায় না বলেই আমরা দেখছি, গত কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটার পরও আইন শৃঙ্খলা বাহিনী বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের রুটিন কাজের বাইরে আসতে রাজী নয়।

আমাদের মনে হয়েছে, র‌্যাব প্রধান নোয়াগাঁওয়ের ঘটনাটাকে গুরুত্ব দিয়ে খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে যেভাবে হামলাস্থলে ছুটে গিয়েছেন, তা তাঁর দায়িত্বশীলতার প্রকাশ শুধু নয়, তিনি যে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনাকে ছোট করে দেখেন না তারই সাক্ষ্য বহন করে।

এটাই হল আশার দিক। আমাদেও প্রত্যাশা র‌্যাব প্রধানের প্রতিশ্রুতিমত যেভাবে দ্রুত নোয়াগাঁও হামলার মূল হোতা গ্রেপ্তার হয়েছে ঠিক সেভাবে তার সহযোগীরাও ধরা পড়বে। আমাদেরকে বিভিন্ন সময় জানানো হয়েছে যে, স্বাক্ষীর অভাবে ইতিপূর্বেও সাম্প্রদায়িক সহিংসতার মামলাগুলো ঝুলে আছে, বিচারপ্রার্থীরা বিচার পাচ্ছেন না। আমরা দেখতে চাই, নোয়াগাঁওয়ের নির্যাতিত হিন্দুরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন না। বিচারের বাণী এখানে আর নিভৃতে কাঁদে না। যথাসময়ে উপযুক্ত স্বাক্ষী হাজির করে পুলিশ মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তিতে সহয়তা করছে।

আরেকটা কথা। জাতির পিতার ১০১তম জন্মবার্ষিকী উদযাপনের দিনে এ ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়ে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি এ উদযাপনকে ম্লান করার চেষ্টা চালিয়েছে। আমরা চাই মুজিব বর্ষ শেষ হওয়ার আগেই এরা উপযুক্ত শাস্তি পাক।

 

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক