• ঢাকা
  • শনিবার, ১৫ মে, ২০২১, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
প্রকাশিত: এপ্রিল ১৩, ২০২১, ০১:৩০ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : এপ্রিল ১৩, ২০২১, ০১:৩০ পিএম

অবরুদ্ধ সময়ে বৈশাখ

অবরুদ্ধ সময়ে বৈশাখ

একধরনের অবরুদ্ধ সময় পার করছি আমরা। যদিও এ ধরনের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য নতুন কিছু নয়, এক বছর ধরেই এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি আমরা। এই অবরুদ্ধ সময়ে বৈশাখ এসেছে যত সব অশুভ, অন্যায়, অকল্যাণ আর পুরাতনকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার নতুন বার্তা নিয়ে। আমরা ঠিক নিশ্চিত নই যত সব অশুভ, অন্যায় আর অকল্যাণ এই বৈশাখে দূর হবে কি না, তবে আশা করতে পারি। যে আশায় আমরা বেঁচে থাকি, বেঁচে আছি। মনের গহিনে জমানো একটা একটা স্বপ্ন আমাদের বেঁচে থাকতে অনুপ্রেরণা জোগায়। আজ নয় কাল সেসব স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবেই। গত বছরে যে স্বপ্নগুলো বাস্তবায়নে অসম্পূর্ণ থেকে গেল, নতুন বছরে সব বাধাবিপত্তি কাটিয়ে নিশ্চয়ই সেগুলো পূর্ণ হবে। নতুন বছরে দেশ-পৃথিবী হয়ে উঠবে আমার, আমাদের প্রত্যাশিত ও আকাঙ্ক্ষিত। এই শুভ আশা নিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি সামনের দিকে। এর মধ্যে অসংখ্য সংবাদ আবার আমাদের মন খারাপ করে দেয়, ক্ষতবিক্ষত করে, আমরা কেঁদে উঠি।

এই তো সেদিন কথা হচ্ছিল এক অনুজ সংবাদকর্মীর সঙ্গে। একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের জেলা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে সে। করোনায় সাধারণ মানুষের অবস্থা কেমন কাটছে, প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রার বিষয়-আশয় জানতে চাইলে, ও সেদিনকার ঘটে যাওয়া নিজের অভিজ্ঞতাই শেয়ার করল আমার সঙ্গে। সেদিন সকাল থেকে সারা দিন সে ছিল কিশোরগঞ্জ জেলার হাওর উপজেলা নিকলীর কুমারপল্লির মানুষদের সঙ্গে। তাদের জীবন-জীবিকার কথাই বলছিল ও। কেমন আছে ওরা? জানতে চাইলে ও বলছিল, ভালো নেই তারা। কারণ, তাদের উৎপাদিত পণ্য এখন আর বিক্রির সুযোগ পায় না তারা। তাদের তৈরি মাটির হাঁড়ি-পাতিল, সরা, পুতুল, গরু, হাতি, ঘোড়া, ফুলদানিসহ বিভিন্ন জিনিসের একসময় খুব কদর থাকলেও এখন আর সে অবস্থা নেই। বিভিন্ন দিবস ও মাজারকে কেন্দ্র করে বছরব্যাপী গ্রামবাংলায় যত সব মেলা অনুষ্ঠিত হতো, তার অনেকটাই এখন আর হয় না। ফলে তাদের বেচাবিক্রিও কমে গিয়েছে। সংগত কারণেই তাদের জীবন-জীবিকায় টান পড়েছে। তাদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষা, প্রয়োজনীয় পোশাক, চিকিৎসা তো দূরের কথা নিত্যদিনের খাবারের ব্যবস্থা করার জন্যই যেখানে নিরন্তর সংগ্রাম করতে হচ্ছে তাদের। এই অবস্থায় এক বছর ধরে যোগ হয়েছে করোনার ভয়াবহতা। করোনা তাদের জীবনে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে দেখা দিয়েছে। তাদের সংকটাপন্ন জীবনে কোনো আশার আলো নেই। নতুন বছর তাদের জন্য কী আশাবাদ বয়ে আনবে, তা তারা জানে না। অনুজ এই সংবাদকর্মী আরও জানাল, শুধু নিকলী উপজেলা নয়, পুরো জেলায় প্রায় হাজারের ওপরে মৃৎশিল্পী আছে। তাদের কিছুদিন আগেও সরকার থেকে সহযোগিতা করা হয়েছে। তবে এই স্বল্প সহযোগিতায় তাদের টিকে থাকা, মৃৎশিল্পকে টিকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। তারা নিজেরাও চায়, অতি দ্রুত সর্বগ্রাসী করোনার বিদায় ঘটুক, একই সঙ্গে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী বান্নি-মেলাগুলো নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হোক। বাঙালির ঐতিহ্য-সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ এই মৃৎশিল্পকে বাঁচাতে যথাযথ রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি উদ্যোগ নেওয়া হোক।

মৃৎশিল্পের এই মাটির মানুষগুলোর কথা ভাবতে ভাবতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল আমাদের অসহায় কৃষকদের অশ্রুভেজা চোখ-মুখ। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন জেলার বিশেষত কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, শেরপুর ও সিরাজগঞ্জে বয়ে যাওয়া হঠাৎ এক দমকা বাতাসে তাদের স্বপ্নের সোনালি ফসল পুড়ে ছাই হয়ে যায়। মনে আশা আর বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে ধানচাষ করেছিলেন কৃষক। আর মাত্র সপ্তাহখানেক পরেই জমি থেকে পাকা ধান কেটে ঘরে তোলার কথা। অথচ বৈরী গরম বাতাসে সেই ধান শুকিয়ে চিটা হয়ে গেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, গরম বাতাসের কারণে এই ধান নষ্ট হয়েছে। সারা দেশে প্রায় কয়েক লাখ হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়েছে। আমাদের দেশের কৃষকদের জন্য এ ধরনের অভিজ্ঞতা এই প্রথম। গণমাধ্যমের সুবাধে দেশজুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের কান্না যারা দেখেছেন, তাদের মধ্যে নিজের চোখের পানি আটকে রাখতে পেরেছেন, এমন মানুষের সংখ্যা হয়তো খুব কমই পাওয়া যাবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অনেকে আছেন, যারা ব্যাংক, এনজিও কিংবা মহাজনের কাছ থেকে ছড়া সুদে টাকা নিয়ে ধান চাষ করেছিলেন, কেউবা নিজের সারা বছরের খাবারের জন্য অল্প কিছু জমি চাষ করেছিলেন। একবার ভাবুন তাদের অবস্থা! বৈশাখ মাসের এই ফসলটা সারা দেশের জন্যও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এই যে অপ্রত্যাশিত এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষক হাড়ভাঙা পরিশ্রমের ফসল ঘরে নিতে পারল না, এর প্রভাব কিন্তু দেশের অর্থনীতিতে পড়বে। ফলে ধানের দাম বাড়বে, চালের দাম বাড়বে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে ফসল তুলতে না পারা কৃষকই। তাকেই বেশি দাম দিয়ে ধান-চাল কিনতে হবে। এই অবস্থায় সরকারকে সঠিক জরিপের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আর্থিক সহায়তা প্রদানের আহ্বান জানাই। নাহলে যে এই নববর্ষ তাদের কাছে অশুভ বর্ষ হিসেবেই পরিগণিত হবে।
বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হচ্ছে নতুন বছরকে বরণ, বৈশাখ উদযাপন। নানা সাজে সজ্জিত মানুষের বর্ণিল শোভাযাত্রা, মেলা, গান, নাটক ও বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলা আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলা নতুন বছরকে বরণ করা হয়। শত শত বছর ধরে তা-ই হয়ে আসছে। অথচ মহামারি করোনার কারণে এবার মিলে দুই বছর ধরে আমরা কোনো উৎসব আয়োজন করতে পারছি না, উল্টো মৃত্যু আতঙ্কে গৃহবন্দি হয়ে দিন পার করছি। নিত্যদিন প্রিয়জনদের হারিয়ে যাওয়ার সংবাদ আমাদের ব্যথিত করছে। অসহায় আমরা আরও গুটিয়ে নিচ্ছি নিজেদের। নতুন বছরের দারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে প্রত্যাশা করি অতি শিগগিরই আঁধার কেটে গিয়ে আলোতে ঝলমল করে উঠবে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি, প্রিয় পৃথিবী। এই আমাদের শুভ আশাবাদ। শুভ নববর্ষ-১৪২৮।

লেখক : গবেষক, প্রাবন্ধিক।