• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০৭ অক্টোবর, ২০২২, ২১ আশ্বিন ১৪২৯
প্রকাশিত: এপ্রিল ২৫, ২০২১, ০৭:৫০ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : এপ্রিল ২৫, ২০২১, ০১:৫০ পিএম

টিকা নিয়ে হাহাকার!

টিকা নিয়ে হাহাকার!

অদৃশ্য করোনা ভাইরাসের কাছে অসহায় গোটা বিশ্ব। করোনার সুনির্দিষ্ট কোনো ঔষধ নেই। তাই দ্রুতগতিতে বেশ কিছুর অনুমোদন দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা দেশে দেশে। শুরুর দিকে টিকা নিয়ে অনেকের দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল। তবে দুই ডোজ টিকা নেয়ার পর সংক্রমণের ঝুঁকি থাকলেও মৃত্যু ঝুঁকি অনেক কমে যায়। এই সুরক্ষার পাওয়ার পর দেশে দেশে এখন টিকা নিয়ে হাহাকার তৈরি হয়েছে। টিকা এখন বিশ্ব রাজনীতির মূল হাতিয়ার। কে টিকা পাবে কে পাবে না, তা নির্ভর করে কূটনৈতিক দক্ষতার ওপর। বাংলাদেশ দারুণ দক্ষতা দেখিয়ে আগাম অর্থ দিয়ে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে টিকা কিনলেও এখন তা পাওয়া নিয়ে শুরু হয়েছে অনিশ্চয়তা। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ সুনামি হয়ে ভারতকে ভাসিয়ে নেয়ায় তারা নিজেদের চাহিদা না মিটিয়ে টিকা রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। অবশ্য শেষ পর্যন্ত আগামী সপ্তাহে আরো ২০ লাখ টিকা আসার নিশ্চয়তা মিলেছে। আসছে কোভ্যাক্সের এক লাখ টিকাও। টিকা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে সরকার ভারতের পাশাপাশি রাশিয়া এবং চীনের সাথেও যোগাযোগ করছে।

টিকা নিয়ে আমাদের মানসিকতা অদ্ভুত। প্রথম যখন টিকার অনুমোদন মিললো, তখন কেন বাংলাদেশ টিকা পাচ্ছে না বা দেরি হচ্ছে, তা নিয়ে হাহাকার। এরপর যখন সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে টিকা এলো, তখন সবাই টিকাকে রাজনীতি বানিয়ে ফেললেন। ভারত থেকে টিকা কিনে সরকার যেন মহা অন্যায় করে ফেলেছে, এমন ভাব সবার। টিকা এলেও তা নেয়ার ব্যাপারে মানুষের মধ্যে কোনো আগ্রহ ছিল না। সরকার প্রথম সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা প্রবীণদের টিকা দেয়ার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু আগ্রহ কম থাকায় সরকার বয়সসীমা কমিয়ে ৪০ করে। আস্তে আস্তে টিকার ব্যাপারে আগ্রহ বাড়তে থাকে। পাশাপাশি কমতে থাকে টিকার স্টক। বাধ্য হয়ে সরকার ২৬ এপ্রিল থেকে টিকার প্রথম ডোজ বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কারণ প্রথম ডোজ দিতে থাকলে দ্বিতীয় ডোজ ঝুঁকিতে পড়বে। নতুন করে টিকার সরবরাহ শুরু হলে নিশ্চয়ই আবার প্রথম ডোজ দেয়া শুরু হবে। তবে করোনা এমন এক ভাইরাস এখানে ব্যক্তিগতভাবে ভালো থাকার কোনো সুযোগ নেই। সবাইকে নিয়ে সবাই মিলে ভালো থাকতে হবে। তাই দেশের আশি ভাগ জনগণকে টিকা দিতে পারলেই কেবল সম্পুর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিত করা যাবে। তার মানে বাংলাদেশের ১৩ কোটি মানুষকে টিকা দিতে হবে। সে জন্য চাই ২৬ কোটি টিকা। কিন্তু টিকা নিয়ে এখন যে হাহাকার, তাতে ২৬ কোটি টিকা কবে পাওয়া যাবে তা নিশ্চিত নয়।

এই যে বাংলাদেশে টিকা নিয়ে এত হৈচৈ, এখন পর্যন্ত কিন্তু বাংলাদেশের মাত্র ৪ ভাগ মানুষ টিকার আওতায় এসেছে। শুধু বাংলাদেশ নয় টিকা নিয়ে এই হাহাকার বিশ্বজুড়ে। বিশ্বের জনসংখ্যা এখন ৮০০ কোটি। হার্ড ইমিউনিটির ধারণার প্রয়োগ করতে হলেও অন্তত ৬০০ কোটি লোককে ভ্যাকসিন দিতে হবে। আর করোনা ভ্যাকসিনের ডোজ দুটি করে। প্রথমটি দেয়ার অন্তত ২৮দিন পর দ্বিতীয় ডোজ দিতে হবে। ৬০০ কোটি লোককে দুটি করে দিলে ১২০০ কোটি ভ্যকসিন লাগবে। ১২০০ কোটি ভ্যাকসিন উৎপাদন কঠিন নয় শুধু এই মূহুর্তে অসম্ভব। আর সেই অসম্ভবকে সম্ভব করতে হলেও দীর্ঘ সময় লাগবে। তাই স্রেফ ভ্যাকসিনের ওপর ভরসা করে করোনা জয় করা সম্ভব নয়। অনেকে ভেবেছেন, ভ্যাকসিন দিয়ে নিউ নরমাল ভুলে ওল্ড নরমাল জীবনে চলে যাবেন; অনেকে গেছেনও। তাতে বিপদ আরো বেড়েছে। তাই ভ্যাকসিনের পাশাপাশি সোশ্যাল ভ্যাকসিনের প্রয়োগের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। পরিচ্ছন্নতা, সামাজিক দূরত্ব, স্বাস্থ্যবিধি, প্রয়োজনে আইসোলেশন, কোয়ারেন্টিনের ধারণা চালিয়ে যেতে হবে। একটা বিষয় মাথায় স্পষ্ট করে গেঁথে নিন, আপনি আর কখনো করোনা পূর্ব বিশ্বে ফিরে যেতে পারবেন না। স্বাস্থ্যবিধিই হলো আপনার আসল ভ্যাকসিন। এটা চালিয়ে যেতে হবে।

আসল সমস্যাটা এখানেই। স্বাস্থ্যবিধি মানাটাই আমাদের আসল সমস্যা। মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে গেলে আমরা সবাই হইহই করে উঠি, সরকার কেন সব খুলে রেখেছে। কেন লকডাউন বা কারফিউ দিচ্ছে না। আবার লকডাউন দিলে সেটা মানতেও আমাদের আপত্তি। নানান অজুহাতে লকডাউন ভেঙ্গে বাইরে বেরিয়ে পড়ি। পুলিশ আইডি কার্ড চাইলে আমাদের জাত যায়। আমরা আবার সমস্বরে চিৎকার করি, জীবনের সাথে জীবিকাও বাঁচাতে হবে। নইলে মানুষ না খেয়ে মরবে। এটা ঠিক লকডাউন দিলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ থাকলে গরীব মানুষের কষ্ট হয়। সরকার বড়লোকদের প্রণোদনা না দিয়ে গরীব মানুষকে খাবার দিলে অনেক ভালো করতো। বাঁচতে হবে সবাই মিলে। আর বেঁচে থাকলে আবার অর্থনীতি নিয়ে ভাবা যাবে। দেশে এখন ‘লকডাউন’ চলছে। পাশাপাশি চলছে আসলে সবই। রোববার থেকে খুলে দেয়া হয়েছে শপিং মল। বৃহস্পতিবার থেকে খুলে যাচ্ছে গণপরিবহণ। এটা ঠিক শপিং মল বন্ধ থাকলে ব্যবসায়ী এবং দোকান কর্মচারীদের পেটে টান পড়ে। কিন্তু দেশে যখন প্রতিদিন গড়ে ১০০ জন মানুষ মারা যাচ্ছে, তখনও যখন মানুষকে দেখি শপিং মলে যাচ্ছেন, বিলাসী দ্রব্য কিনছেন; তখন বিস্ময়ও হার মানে। আপনাকে বাজারে যেতে হবে, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে হবে। কিন্তু এক-দুই বছর অপ্রয়োজনীয় বিলাসী সামগ্রী না কিনলে তো আপনি শেষ হয়ে যাবেন না। করোনার এই সময়টা আসলে কোনোরকমে নাক উচিয়ে বেঁচে থাকার। বেঁচে থাকার চেয়ে বড় কোনো বিনিয়োগ  নেই এখন। তাই জীবিকা রক্ষা করেই চেষ্টা করতে হবে জীবন বাঁচানোর।

যারা টিকার প্রথম ডোজ পেয়েছেন, তারা অবহেলা না করে সময়মত দ্বিতীয় ডোজ টিকা নিয়ে ফেলুন। যারা প্রথম ডোজও পাননি, তারা অপেক্ষা করুন। টিকা এলেই দ্রুত রেজিস্ট্রেশন করে টিকা নিন। তবে টিকা পাবেন কি পাবেন না, রাষ্ট্র লকডাউন দেবে কি দেবে না; তার অপেক্ষায় না থেকে নিজের সুরক্ষা নিজেই নিশ্চিত করুন। সবচেয়ে সস্তা এবং সবচেয়ে জরুরি টিকা হলো মাস্ক। মাস্কের চেয়ে বড় কোনো সুরক্ষা নেই। অপ্রয়োজনে ঘর ধেকে বেরুবেন না। বেরুতে হলেও জনসমাগম এড়িয়ে চলুন। কোনোভাবেই যেন আপনার তিন ফুটের মধ্যে কেউ আসতে না পারে, তা নিশ্চিত করুন। মুখে মাস্ক নেই, এমন কাউকে কাছে ঘেসতে দেবেন না। সরকার আপনাকে বাঁচাতে পারবেন না। আপনার জীবনের জন্য আপনার মায়াটাই যেন সবচেয়ে বেশি হয়।

 

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।