• ঢাকা
  • সোমবার, ২১ জুন, ২০২১, ৮ আষাঢ় ১৪২৮
প্রকাশিত: মে ১০, ২০২১, ০১:২৪ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : মে ১০, ২০২১, ০১:২৪ পিএম

করোনায় ঈদ: মাতম না উৎসব?

করোনায় ঈদ: মাতম না উৎসব?

রোববার গুলশানে দেখলাম ব্যান্ডপার্টির দল বাদ্য বাজাচ্ছে বাড়ি বাড়ি গিয়ে। জানতে চাইলাম বাদ্য কেন, বলা হলো বাদ্য বাজিয়ে ধনীদের বাড়ি থেকে ঈদ উৎসবের বকশিস বা সাহায্য নেওয়া হচ্ছে। উৎসব শুরু হয়ে গেছে সর্বত্র। আমাদের নজর হয়তো অবয়বপত্র আর দৃশ্যমাধ্যমের জন্য ফেরিঘাট, আমিনবাজার , সায়দাবাদে আটকে আছে। যেখানে মূলত বিত্তহীন ও নিম্নবিত্তদের ঘরমুখী দিশেহারা ছুট দেখছি । তাদের কমান্ডো স্টাইলের ফেরিতে ওঠার ছবি ট্রল হচ্ছে। আমরা ঈদের আগেই বিনোদিত হচ্ছি। কিন্তু সার্কাসে শিশুকন্যা নিয়ে বাবার মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে খেলা দেখানোর আড়ালে যেমন ক্ষুধা, সমাজিক নিরাপত্তাহীনতা রয়েছে, কমান্ডো স্টাইলে ফেরিতে ওঠার বেলাতেও আছে তেমন গল্প। শুধু ঈদে বাড়ি ফেরার আবেগ বা হুজুগ এখানে নেই। আছে নি:স্ব হবার গল্পও।

কাজ হারানো মানুষদের ধরে রাখার সক্ষমতা হারিয়েছে এই শহর। উৎসবের আলোতে সেই অন্ধকার হয়তো আমাদের অনেকের চোখে ধরা পড়ছে না, কিন্তু করোনাকালে সংকুচিত হয়েছে অনেক ব্যবসা, আবার করোনার ছুঁতোয় বঞ্চিত করা হচ্ছে অনেক শ্রমিককে, এটাও বাস্তবতা। এই বাস্তবতাতেই ঘরমুখী মানুষের মিছিল আজ বেপরোয়া।শুধু কি নিচু তলার মানুষেরা বেপরোয়া? মধ্যম আর উচুঁতলার মানুষেরা বসে নেই । তাদের যাত্রার জন্য আকাশ উন্মুক্ত। মহাসড়কে ব্যক্তিগত ও ভাড়া করা গাড়ি নিয়ে যাত্রার অবাধ সুযোগ। দিনের আলোতে গণমানুষের বাস দেখা যায় না। শুধু গাড়ি আর গাড়ি। অন্ধকার নামলে ট্রাকে, বাসে মানুষ সড়ক পথে চলছে। নিম্নআয়ের মানুষকে দেখা যায় ট্রাকে এমনকি মাইক্রোবাস, অটো রিকশায় ঝুঁকি নিয়ে চলতে। কোথাও কোন বাধা নেই।

করোনা নিয়ন্ত্রণে রাখতে, সংক্রমণ কমাতে সরকার লকডাউন ঈদের পর টেনে নিয়ে গেল। ছুটি কমিয়ে তিন দিনে আনা হলো। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং আহ্বান জানালেন, ঢাকায় ঈদ করার। সরকারি, বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বলা হলো যারযার কর্ম এলাকায় থাকতে। কিন্তু এসব আহ্বান, নির্দেশনা বাস্তবায়নে মাঠ প্রশাসনকে সক্রিয় দেখা গেল না। সকল আগল খুলে দিয়ে লকডাউন দেওয়া যেমন শুরু থেকেই এবার প্রশ্নবিদ্ধ ছিল, ঈদের দুয়ারে এসে তার ষোলকলা পূর্ণ হলো। যদি আগেই ঘোষণা দেওয়া হতো, ফেরি, স্পিডবোট বন্ধ থাকবে, সেখানে আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর অবস্থান নিতো, তাহলে মানুষ এমন করে ছুটতো না। আমাদের মহাসড়ক আর কয়টি? সেখানেও কঠোর ব্যারিকেড দেবার সাধ্য ছিল দেইনি। লোকজন তিনদিনের ছুটিকে লংড্রাইভের কাজে লাগাতে পথে নামছে। বীর এই জাতির বুকে করোনার ভারতীয় ধরনও ভয়ের কাঁপন ধরাতে পারলো না ।

যাত্রাপথের যাত্রীদের মধ্যে কোন দূরত্ব রক্ষার কোন সুযোগই ছিলো না। বরং ছিল অতি ঘনিষ্ঠতা। চলাচল স্বাভাবিক করে দিলে, কিছুটা হয়তো দূরত্ব রাখা যেতো । এই অতিঘনিষ্ঠ উৎসব যাত্রায়, করোনার সংক্রমণ কতোটা বিস্তৃত হলো, এর পুরো পরিসংখ্যান আমাদের জানা সম্ভব হবে না । কারণ যাত্রীদের একটি বড় অংশ রয়ে যাবে কোভিড পরীক্ষার আওতার বাইরে। গ্রামের মানুষ এখনও বিশ্বাস রাখেন তাদের করোনা হবে না, কোভিড বড়দের রোগ। তারা নানা উপসর্গে ভুগবেন কিংবা ভুগবেন না। এরা বাহক হয়ে সংক্রমণ যেমন বাড়াতে পারে, তেমনি মারাও যেতে পারে। কিন্তু তাদের মৃত্যুর ভিন্ন কারণ হয়তো বলা হবে পরিবার থেকে। ছোট একটি অংশ কোভিড পরীক্ষার আওতায় আসবে, তখন আমরা দেখতে পাবো দুই হাজারের নিচে নেমে আসা শনাক্তের হার কতোটা উর্ধ্বমুখী হয়। করোনার চরিত্রের অদলবদল চোখে পড়তে পারে। বাড়তে পারে হাসপাতালে রোগীর ভিড়। আইসিইউ, অক্সিজেন সংকট । ঢিলে ঢালা লকডাউনেও করোনা সংক্রমণের হার যখন কমিয়ে আনা যাচ্ছিল, তখন যেন আবারও বিস্ফারণের জন্য বারুদের মুখ খুলে দিলাম। এই বিস্ফোরণ ভয়াবহ রূপ নেবে কি না জানি না । না নিলে রক্ষা। কিন্তু ভয়াবহ ঝুঁকি নেওয়া হয়ে গেল । কাছের ভারতের বিপর্যয় ও নেপালে তা বিস্তৃত হতে দেখেও আমরা সচেতন হলাম না ।

করোনার একেকটি ঢেউ যে শুধু সরাসরি স্বাস্থ্যখাতকে বিপর্যস্ত করছে তা কিন্তু নয়, আমাদের অর্থনীতিতে বড় ক্ষত রেখে যাচ্ছে। সকল ক্ষত হয়তো দেখা যাচ্ছে না। এখনও হয়তো সয়ে নেয়া যাচ্ছে, কিছুদিন পর আর সেটা সম্ভব হবে না । খেয়াল রাখা দরকার একবছর পেরিয়ে গেল, বন্ধ আছে শিক্ষার স্বাভাবিক কার্যক্রম । এই ক্ষতিও আমাদের দীর্ঘসময় বয়ে বেড়াতে হবে। তাই করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকারি, বেসরকারি সিদ্ধান্তগুলো কেবল প্রজ্ঞাপনে নয়, বাস্তবে প্রয়োগযোগ্য করে তুলতে হবে। ঈদ-উল-ফিতরের পর আসছে ঈদ-উল-আযহা। তখনও করোনা থাকবে। তাই আড়াই মাস পরের প্রস্তুতি নিয়ে ভাবনা শুরু করতে হবে এখনই । তাহলে শোকের মাতম নয়, সীমিত আকারে হলেও উৎসবের ছোঁয়া পাবে সবাই।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট