• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০৭ অক্টোবর, ২০২২, ২১ আশ্বিন ১৪২৯
প্রকাশিত: মে ৩০, ২০২১, ০৭:২৮ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : মে ৩০, ২০২১, ০১:২৮ পিএম

নদীর সঙ্গে শত্রুতা বন্ধ হোক

নদীর সঙ্গে শত্রুতা বন্ধ হোক

এইতো দিন দুই আগে একটি অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে চোখ পড়লো।লেখার শিরোনাম পড়ে খানিকটা অবাকই হই। সংবাদটির শিরোনাম ছিল ‘নদীতে চলছে ট্রাক’। হ্যাঁ সত্যই নদীতে নৌকা নয়, ট্রাকই চলছে। পত্রিকাটির খাগড়াছড়ি প্রতিনিধির করা প্রতিবেদন থেকে জানা যায় মাটি, বালু আর ময়লা আবর্জনায় ভরাট হয়ে গেছে খাগড়াছড়ির তিন নদী। নদীতে থাকার কথা ছিল পানি, মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী। চলার কথা নৌযানের। অবাক করার বিষয় এসব কিছুই নয় এই তিন নদীতে এখন অবাধে চলছে বালু তোলার ট্রাক!

এমন সংবাদও পড়তে হচ্ছে, দেখতে হচ্ছে।  তাও এমনই এক সময়ে যখন ক্ষমতাসীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নদী সুরক্ষার ব্যাপরে সর্বাধিক তৎপর। তার কঠোর হস্তক্ষেপের কারণে নদী সুরক্ষায় দেশব্যাপী নানা পদক্ষেপ আমাদের নজরে আসছে। আমরা আশাবাদী হয়ে ওঠছি। এবার নিশ্চয়ই কিছু একটা হবে। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, কর্ণফুলিসহ দেশের নদ-নদী নিয়ে সরকারের উদ্যোগ আমাদের চোখে পড়ছে। অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় নড়েচড়ে বসেছে জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনসহ সরকারের নদীবিষয়ক প্রতিষ্ঠানগুলো। এর সাথে নদী সুরক্ষায় মহামান্য হাইকোর্টের রায় একটি বড় শক্তি হিসেবে কাজ করছে।  এসবের বিপরীতে নদী নিয়ে মন খারাপ হওয়ার মতো অসংখ্য সংবাদ আমরা দেখতে পাচ্ছি। তখন আশার জায়গায় বেদনায় মন বিধ্বস্ত হয়ে যাচ্ছে। দেশের নদ-নদী নিয়ে এমন অসংখ্য সংবাদচিত্র প্রতিনিয়ত গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। চলুন দেখি এর মধ্যে অতি সম্প্রতি প্রকাশিত কয়েকটি সংবাদচিত্র।

২৯ মে ২০২১ দৈনিক সমকাল পত্রিকায় প্রকাশিত শিরোনাম—‘বর্জ্যে মরছে নদী-খাল’। পত্রিকাটির রাঙ্গুনিয়া, চট্টগ্রাম প্রতিনিধির করা প্রতিবেদন থেকে জানতে পারি, চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কের রাঙ্গুনিয়ার রোয়াজারহাট সেতুর পাশে ইছামতী নদীতে বছরের পর বছর ধরে বর্জ্য ফেলে আসছেন রাঙ্গুনিয়া পৌরসভাসহ বাজারের ব্যবসায়ীরা। এতে পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ভোগ বেড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এ অবস্থা চলে এলেও সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষ সমস্যা সমাধানে কোনো উদ্যোগ নেয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে, আবর্জনার কারণে ইছামতী নদীর পানিপ্রবাহও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিষাক্ত পানি আটকে গিয়ে বর্ষাকালে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করছে আর শুস্ক মৌসুমে দুর্গন্ধ প্রকট হয়ে উঠছে। বছরের পর বছর অবাধে বর্জ্য ফেলার ফলে ইছামতী তার প্রকৃত রূপ হারাচ্ছে, নদী ভরাট হয়ে ছোট হয়ে আসছে। নদীর পানি দূষিত হয়ে নানা প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হচ্ছে।

একই তারিখের দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার দৌলতপুর, কুষ্টিয়া প্রতিনিধির করা রিপোর্টের শিরোনাম ছিল—‘দৌলতপুরে নদী দখল করে দরবার শরীফ নির্মাণ’। বোঝাই যাচ্ছে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও পিছিয়ে নেই নদী দখলের ক্ষেত্রে। সংবাদসূত্রে জানতে পারি, উপজেলার হোগলবাড়িয়া ইউনিয়নের কল্যাণপুর এলাকায় কল্যাণপুরী দরবার শরীফের জায়গা সম্প্রসারণের জন্য হিসনা নদী ভরাট করে তা দখল করে নিয়েছে দরবার শরীফের পীর তাছের ফকিরের লোকজন। এতে ভুক্তভোগীরা নিষেধ করলে দরবার শরীফের লোকজন তাদের ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দেয়।

একে তো তারা অন্যায় করছে, তার ওপরে অন্যায়ের প্রতিবাদকারীদের প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে। নদী দখলের এই ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিগণ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শন শেষে দৌলতপুর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে হিসনা নদী দখলমুক্ত করার নির্দেশ দেয়া হয়। জানি না নির্দেশনা কতটুকু কার্যকর হবে। তবে প্রশাসনের তৎপরতাকে সাধুবাদ জানাই।

২৯ মে-তে দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদিটির শিরোনাম ছিল এমন—‘মাগুরায় নবগঙ্গা নদী কচুরি পানায় ভর্তি, বন্ধ নৌচলাচল ও পানি ব্যাবহার’। পত্রিকাটির মাগুরা সংবাদদাতার করা প্রতিবেদন বলছে— মাগুরা শহরের সৈয়দ আতর আলী সড়কের পাশে দিয়ে বয়ে গিয়েছে এককালের প্রমত্তা নবগঙ্গা নদীটি। এককালে এই নদীতে স্টিমার চলতো বলে জনস্রুতি আছে। কালের পরিক্রমায় নদীটি ভরাট হলে গত বছর খনন করা হয়। কিন্তু নদীটি বর্তমানে কচুরিপানায় ভরে গিয়ে। নদীর কয়েক কিলোমিটার এলাকা কচুরিপানায় ভর্তি। ফলে নদীতে নৌ-চলাচল বন্ধের পাশাপাশি নদীতীরবর্তী মানুষ নদীতে গোসল করতে পারছে না। পানি ব্যবহার করতে পারছে না। জেলেরা বড়সি ও জাল দিয়ে মাছ ধরতে পারছে না। এই অবস্থা চলছে প্রায় এক মাস ধরে। বেকার হয়ে পড়েছে দুই শতাধিক জেলে। ফলে নদী পাড়ের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। এলাকাবাসী অবিলম্বে কচুরিপানা মুক্ত করার জন্য দাবি জানিয়েছেন।

‘গাংনীতে কাজলা নদী দখল করে পুকুর খননের অভিযোগ’ শিরোনমে নদীবিষয়ক আরও একটি সংবাদ প্রকাশিত হয় জাগো নিউজে। গত ২৭ মে পত্রিকাটির মেহেরপুর জেলা প্রতিনিধির করা রির্পোট থেকে জানা যায়— গাংনীর কাজলা নদীর পাড় দখল করে পুকুর খনন করছে একটি পরিবার। ইতোমধ্যে গ্রামের লোকজন ওই পুকুর খনন বন্ধে মানববন্ধন করেছেন।

২০ মে দৈনিক সমকালে প্রকাশিত ‘নদী দখল করে বাড়ি’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার নবাবগঞ্জের টিকারপুর এলাকায় একটি ঘাটলা ও ইছামতী নদী দখল করে পাকা বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে।

২৬ মে প্রকাশিত দৈনিক সমকালের ফুলবাড়ী, দিনাজপুর সংবাদদাতার আরও একটি প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, ফুলবাড়ীতে ছোট যমুনা নদী দখল করে নির্মাণ হচ্ছে ভবন ও মার্কেট। ফুলবাড়ী শহরের বুক চিরে বয়ে গেছে ছোট যমুনা নদী। সেই নদী ঘেঁষে পৌরবাজার অবস্থিত। নদী পারাপারের জন্য নদীর ওপরে অবস্থিত ফুট ওভারব্রিজ ঘেঁষে নদী দখল করে নির্মাণ করা হচ্ছে বহুতল মার্কেট।

এসবের বাইরে নিত্যদিন প্রকাশিত আরও অসংখ্য নদীকেন্দ্রিক সংবাদ আমাদের অগোচরেই থেকে যায়। সহসাই যে সংবাদগুলো আমাদের চোখে পড়ে, তা দেখে আমরা কথা বলি, প্রতিবাদে সোচ্চার হই। এখানে একটি বিষয় খুবেই পরিষ্কার দেশব্যাপী নদ-নদী দখলের এই মহোৎসবে নদী পাড়ের বা আশপাশের লোকজনই কোনো না কোনোভাবে জড়িত। যতদিন তারা সচেতন না হবে ততদিন এই সমস্যার সমাধান পুরোপুরি হবে না। শুধুমাত্র সরকারের ওপর দায় চাপিয়ে দিয়ে তো লাভ নেই। তবে হ্যাঁ, এটাও সত্য যে নদী সুরক্ষায় সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো যতদিন না সর্বাধিক তৎপরতা না চালাবে, নিরপেক্ষতার সাথে ব্যবস্থা না নিবে, ততদিন নদীর সুরক্ষা নিশ্চিত হবে না। বন্ধ হবে না নদীর সঙ্গে শত্রুতা। নদী তীরের মানুষ, জনপ্রতিনিধি ও সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মধ্যে ঐক্যমতই পারে সারাদেশের নদ-নদীকে বাঁচাতে।

লেখক : গবেষক, প্রাবন্ধিক।