• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০৭ অক্টোবর, ২০২২, ২১ আশ্বিন ১৪২৯
প্রকাশিত: জুন ২, ২০২১, ০২:২৯ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : জুন ২, ২০২১, ০৯:১১ এএম

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কারণেই ইসরায়েলকে সমর্থন নয়

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কারণেই ইসরায়েলকে সমর্থন নয়

আবারও শুরু হয়েছে ইসরায়েলের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের লাভ-ক্ষতি নিয়ে আলোচনা। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে তো বটেই, মূলধারার গণমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সম্পর্ক স্থাপিত হলে বাংলাদেশ বেশ লাভবান হবে বলে যাঁরা মনে করছেন, তাঁরা প্রসঙ্গটি এর আগেও বিভিন্ন সময় তুলেছেন। কিন্তু প্রবল বিরুদ্ধ জনমতের চাপে তা তেমন কল্কে পায়নি।

তবে নতুন করে তাঁরা বিষয়টি তোলার সুযোগ পেয়েছেন বাংলাদেশ সরকারের সাম্প্রতিক একটি পদক্ষেপের কারণে। পদক্ষেপটি হলো—বাংলাদেশি পাসপোর্ট ইসরায়েলে বৈধ নয় বলে যে কথাটি এত দিন ওই ট্রাভেল ডকুমেন্টটিতে লেখা ছিল, তা সম্প্রতি বাদ দেওয়া হয়েছে। পাসপোর্টে এত দিন লেখা ছিল—এ পাসপোর্টটি ইসরাইল ব্যতীত বিশ্বের সব দেশে বৈধ বলে গণ্য হবে। কিন্তু মাস কয়েক আগে ইস্যুকৃত ই-পাসপোর্টে এ কথাটি থেকে ইসরায়েল দেশটির নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।

এ থেকে এটা ধারণা করা অস্বাভাবিক নয় যে সরকার বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী কারও ইসরায়েল ভ্রমণ আর অবৈধ মনে করছে না। অনেকে এটাকে ইসরায়েলের প্রতি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আজন্ম লালিত নেতিবাচক মনোভাবে পরিবর্তনের ইঙ্গিত বলেও ধরে নিচ্ছেন।

জনপরিসরে পাসপোর্ট থেকে ইসরায়েল প্রসঙ্গ বাদ দেওয়ার এমন ব্যাখ্যা শুনে সরকার অবশ্য নড়েচড়ে বসেছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা খুব উঁচু স্বরে বলছেন যে পাসপোর্টের ‘আন্তর্জাতিক মান’ রক্ষার জন্য তাঁরা ইসরায়েল প্রসঙ্গটি বাদ দিয়েছেন এবং কথাটি বাদ দেওয়ার মানে এ নয় যে, ইসরায়েল সফর বাংলদেশিদের জন্য বৈধ হয়ে গেল। তাঁরা এমনও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, কেউ এ পাসপোর্ট নিয়ে ইসরায়েলে গেলে তাকে কড়া শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।

পাসপোর্ট থেকে ইসরায়েল প্রসঙ্গ বাদ দেওয়ার যুক্তি হিসেবে সরকারি এ বক্তব্য যে খুব একটা পোক্ত নয়, তা বলাই বাহুল্য। তা ছাড়া, এটাও একটা প্রশ্ন যে সরকার কোন আইনে ইসরায়েল ভ্রমণের জন্য একজন বাংলাদেশিকে শাস্তি দেবে? এখানে এমন কোনো আইন নেই, যাতে লেখা আছে যে বাংলাদেশি কোনো নাগরিক ইসরায়েল সফর করতে পারবে না।

তবে এটাও তো ঠিক যে যখন—এ পাসপোর্টটি ইসরাইল ব্যতীত বিশ্বের সব দেশে বৈধ বলে গণ্য হবে—কথাটি লেখা ছিল তখনো এমন কোনো আইন ছিল না। তাহলে শাস্তিটা কীভাবে দেওয়া হতো? অবশ্য এ পাসপোর্ট ব্যবহার করে কোনো বাংলাদেশি কখনো ইসরায়েল গিয়েছেন, এমন কোনো ঘটনা আজ পর্যন্ত জানা যায়নি। কেবল একজন কথিত সাংবাদিকের কথা আমরা জানি, যিনি কয়েক বছর আগে—সর্বশেষ বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে—ইসরায়েল সফর করেছিলেন বা সফরের চেষ্টা করেছিলেন বলে খবর বেরিয়েছিল। সরকার তাকে গ্রেপ্তার করে। তিনি জেলও খেটেছেন কয়েক বছর। তবে তাকে জেল দেওয়া হয়েছিল ইসরায়েলের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে।

সরকারের এমন দুর্বল যুক্তির কারণেই ইসরায়েলের এ দেশীয় বন্ধু বা যারা প্রাযুক্তিক বা সামরিক সহযোগিতা লাভের আশায় ইসরায়েলের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপনের পক্ষে যুক্তি করেন, তারা বিষয়টি এতটা জোরের সঙ্গে উত্থাপন করতে পারছেন। তারা এমনও বলছেন যে সরকার যখন নাইতে নেমেছে তখন চুল না ভিজিয়ে উঠে যাওয়ার কোনো যুক্তি নেই। একটু ঝেড়ে কাশলেই তো হয়। পাসপোর্টের লেখা সংশোধনের মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে ‘পরোক্ষ যোগাযোগের’ একটা পথ যখন তৈরি হয়েছে, তখন বাকিটুকু আটকে রাখার মানে হয় না।

তাঁদের দৃঢ় বিশ্বাস, বাংলাদেশ তাইওয়ানের সঙ্গে বর্তমানে যেভাবে একধরনের পরোক্ষ সম্পর্কচর্চা করছে, ইসরায়েলের ব্যাপারেও সে একই পন্থা ধরেছে। বাংলাদেশের পাসপোর্টে একসময় নিষিদ্ধ দেশের তালিকায় দক্ষিণ আফ্রিকা ও তাইওয়ানের নামও ছিল। দক্ষিণ আফ্রিকার নাম বাদ দেওয়া হয় ১৯৯৪ সালে বর্ণবাদী নীতি বাদ দিয়ে দেশটির সংবিধানে কালো মানুষদের অধিকার স্বীকৃতি পাওয়ার পর।

আর তাইওয়ানের নাম বাদ দেওয়া হয় ২০০৪ সালে স্রেফ বাণিজ্যিক স্বার্থ থেকে। তখন ঢাকায় তাইওয়ানকে একটা অফিসও খুলতে দেওয়া হয়েছিল, যদিও ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর চীনের জোরালো দাবির মুখে সেই অফিস বন্ধ করে দেওয়া হয়।

তবে যারা বলছেন সরকার তাইওয়ানকে যেভাবে ‘জায়েজ’ করে নিয়েছে, তেমনি ইসরায়েলকেও গ্রহণ করবে, তারা ঠিক বলছেন বলে মনে হয় না। প্রথমত, ইসরায়েলকে গ্রহণ না করার নীতিটা বাংলাদেশ গ্রহণ করেছে তার জন্মলগ্ন থেকে সংবিধানের মূল নীতি অনুসরণ করে। বাংলাদেশের সংবিধানে স্পষ্ট করে অঙ্গীকার করা হয়েছে—এ রাষ্ট্র সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশিকতাবাদ ও বর্ণবৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের সর্বত্র নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সংগত সংগ্রামকে সমর্থন করবে।

ইসরায়েল একটা চরম সাম্প্রদায়িক বর্ণবৈষম্যবাদী রাষ্ট্র। রাষ্ট্রটি গঠিত হয়েছে ফিলিস্তিনিদের জমি জোরপূর্বক দখল করে। যদি এমন হতো যে ফিলিস্তিনের ইহুদি আদি বাসিন্দাদের নিয়ে রাষ্ট্রটির প্রতিষ্ঠা ঘটেছে, তা একভাবে মেনে নেওয়া যেত। কিন্তু রাষ্ট্রটি যখন ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন এর জনসংখ্যার সিংহভাগ ছিল বিশ্বের নানা দেশ থেকে আসা ইহুদিরা, যাদের সেটলার বলা হয়।

শুধু তা নয়, এখনো এরা নানা ছুতোয় ফিলিস্তিনিদের জায়গা-জমি দখল করে চলেছে নিছক নতুন সেটলারদের বসতি গড়ার জন্য। আর তা করতে গিয়ে রাষ্ট্রটি তার আরব নাগরিকদের সঙ্গে, যাদের বেশির ভাগ মুসলিম, চরম বৈষম্যমূলক আচরণ করছে। ফলে অন্তত সাংবিধানিকভাবে ইসরায়েলকে এখন স্বীকৃতি দেওয়ার সুযোগ নেই।

দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধেও প্রায় একই ধরনের অভিযোগ ছিল। তাই ঔপনিবেশিকতা, জাতিবিদ্বেষ ও সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তের বিরুদ্ধে লড়াই করে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশ তাকে স্বীকৃতি দেয়নি।

কিন্তু তাইওয়ানের বিষয়টি আলাদা। এ দেশটিকে চীন এখনো তার অংশ বলে মনে করে। মূলত চীনকে খুশি রাখার জন্য তাইওয়ানের বিষয়টা বাংলাদেশের পাসপোর্টে যুক্ত হয়েছিল। এর সঙ্গে আমাদের রাষ্ট্রের মূলনীতির সম্পর্ক নেই বললেই চলে। তাই সময়-সুযোগমতে তা পরিষ্কার করে ফেলা হয়েছে। তবে চীনের বন্ধুত্ব যত দিন বাংলাদেশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ থাকবে, তত দিন তাইওয়ানকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দান সম্ভব হবে না, এটা বলা যায়। মোদ্দা কথা হলো, তাইওয়ানকে স্বীকৃতি দেওয়া না-দেওয়ার বিষয়টি ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো দিক থেকেই তুলনীয় নয়।

এটা সবার জানা যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো হলো বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজার। আবার এ দেশগুলোই ইসরায়েলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। হতে পারে, অল্প খরচে এ রাষ্ট্রগুলোকে খুশি করার উপায় হিসেবে সরকার ইসরায়েলের বিষয়টি পাসপোর্ট থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু যদি এর বেশি কিছু করা হয়, তা এ রাষ্ট্রের মূল ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেবে। কারণ আমরা বরাবরই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তিতে দেশ গড়ার কথা বলে আসছি। দশকের পর দশক ধরে নিপীড়িত-নির্যাতিত ফিলিস্তিনিদের পাশে থেকে ইসরায়েলবিরোধী অন্তত নৈতিক একটা যুদ্ধ চালানোও আমাদের জন্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।

কেউ কেউ বলতে পারেন, ফিলিস্তিনিদের বেশির ভাগ মুসলিম, তাই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশ ফিলিস্তিনের জন্য এতটা আবেগ দেখাচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক-সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিলে কথাটা উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু এটা তো ঠিক যে অন্তত ১৯৯০-এর দশকের আগ পর্যন্ত, যখন সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের অস্তিত্ব ছিল, মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে বিশ্বের বহু দেশ ফিলিস্তিনিদের পাশে ছিল। সেদিন তারা এ অবস্থান নিয়েছিল তাদের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয় চেতনার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে।

আজকে পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায়, বিশেষ করে দেশে দেশে চরম রক্ষণশীল শক্তির উত্থানের যুগে, রাজনৈতিক মেরুকরণের কারণে অনেক দেশ ফিলিস্তিনের পাশ থেকে সরে গিয়ে একধরনের নগদ লাভের আশায় ইসরায়েলের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। কিন্তু এটা তারা করছে তাদের জাতীয় চেতনা এবং জাতীয় ঐক্যকে বিপন্ন করে দিয়ে। এর পরিণাম তারা বুঝবে যদি কোনো দিন তারা সাম্রাজ্যবাদী কোনো শক্তির চক্রান্তের মুখে পড়ে। আমাদের জাতির নির্মাতারা এ বিষয়ে সচেতন ছিলেন বলেই আমাদের সংবিধানে এ বিষয়টি তাঁরা লিপিবদ্ধ করে গেছেন। আজকে আমরা যদি নির্যাতিত ফিলিস্তিনিদের পিঠ দেখিয়ে সাম্রাজ্যবাদের ক্রীড়নক একটা রাষ্ট্রের বুকে বুক মেলাই, তা শুধু ৩০ লাখ মানুষের ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত সংবিধানের লঙ্ঘন হবে না, যারা এ রাষ্ট্রটি আমাদের দিয়ে গেছেন, তাঁদের সঙ্গেও বেঈমানি করা হবে।

 

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক