• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ২৪ জুন, ২০২১, ১০ আষাঢ় ১৪২৮
প্রকাশিত: জুন ১০, ২০২১, ০২:০৩ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : জুন ১০, ২০২১, ০৩:১৩ পিএম

নষ্ট শহরের কষ্ট

নষ্ট শহরের কষ্ট

নষ্ট শহর ঢাকা, নামজানা মাস্তানদের দখলে। এই শহরে আমরা যারা স্থায়ীভাবে আছি, যারা রোজগারের জন্য আসা-যাওয়া করেন, সবাই আমরা ওই মাস্তানদের কথা ভেবে আতঙ্কের মধ্যে থাকি। মাথানত করে, মুখে কুলুপ এঁটে থাকি এমনটা বলাই ভালো। কোনো একটি এলাকাকে বা বসতকে আলাদাভাবে বস্তি বলার প্রয়োজন নেই। ঢাকা মানেই নর্দমা, গন্ধ ও ঘিঞ্জিময় এক নষ্ট শহর।

তিন নদীবেষ্টিত এই শহর ডানা মেলে বিস্তৃত হতে হতে আশপাশের শহরের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। একে রাক্ষুসে শহরও বলা যায়। ঢাকার নতুন পুরাতন প্রান্ত আছে। বুড়িগঙ্গার তীর থেকে শুরু হয়েছিল পুরাতনের যাত্রা। শুরুতে বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকার বিভাজন ছিল। যদিও আবাসিক এলাকা নামে বিভাজিত অংশটি বড় ব্যবসায়ী , আমলা বা অভিজাতদের জন্যই নির্দিষ্ট ছিল। শ্রমিকশ্রেণি বা প্রান্তজনের বসবাস ছিল বাণিজ্যিক এলাকার কারখানা ও বাজারের দেয়াল ঘেঁষেই। গোড়া থেকেই শহরটি সাজানোর জন্য কারও দরদ তৈরি হয়নি। তবে পরিকল্পনা, মহাপরিকল্পনা ছিল এবং আছে দিস্তা দিস্তা। কাগজে আঁকা সেই পরিকল্পনা পঞ্চায়েত, পৌরসভা পেরিয়ে সিটি করপোরেশন যুগেও মুখের বুলি ও চোখের ঝিকমিক স্বপ্ন হয়েই রয়ে গেছে।

ঢাকার বয়স যত বেড়েছে, ঢাকা থেকে ততই হারিয়ে গেছে উদ্যান, খেলার মাঠ ও জলাশয়। এগুলো যেমন ব্যক্তি দখল করেছে, তেমনি অপরিকল্পিতভাবে নিছক নিজেদের কবজায় নিতে অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠানও হজম করেছে। এই শহরের মানুষের চিরসঙ্গী দুর্ভোগ। পানীয় জল, পয়ঃনিষ্কাশন, আবর্জনা অপসারণ, জলাবদ্ধতা , অগ্নিনির্বাপণ, গণপরিবহন, আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা,  স্বাস্থ্য সুবিধা, শিক্ষা-- সবকিছুতেই না না ধ্বনি উঠবে। বিশাল বপুর ঢাকাকে সামলানো যাচ্ছিল না, এমন দোহাই দিয়ে দ্বিখণ্ডিত করা হলো। কিন্তু নাগরিক ভোগান্তুি কমার চেয়ে বেড়েছে। নাগরিক সুবিধার কোনো কিছুই ঢাকাবাসী উপভোগ করতে পারছে না। বরং নগর এখন তাদের কাছে এক যন্ত্রণার নাম।

খুব বেশি গবেষণার প্রয়োজন নেই। ইতিহাসের পাতা উল্টে দূর অতীতে যেতে হবে না। নিমতলীর কেমিক্যাল কারখানার বিস্ফোরণের পর কত কমিটি, কত প্রতিশ্রুতি। কারখানা, গুদাম কিছুই সরেনি। বরং একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। শাঁখারীপট্টিতে ভবন হেলে পড়া দুর্ঘটনারও তো কত দিন পেরিয়ে গেল, সেখানেও কমিটি হয়েছিল। প্রতিশ্রুতির ফুল ঝরে পড়েছিল, সেই ফুল কোথায় উড়ে গেল নগরবাসীর অজানা।

রাজধানীতে আগে বাঁশটিনের বস্তিতে থাকা মানুষ আগুনে পুড়ত। মেগাসিটির উন্নয়ন সেই আগুন পৌঁছে দিয়েছে বহুতল ভবনে। বনানী অফিস পাড়া, আবাসিক ভবন , জাপান গার্ডেন সিটি, দিলু রোড এগুলো একেবারে নিকট অতীত বা ঘটমান বর্তমানের ঘটনা। অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে গঠিত কমিটিগুলো ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লেও নগরবাসী জানেন, দুর্ঘটনার দায় রাজউক, গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থা, বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থাসহ সরকারের আরও অনেক বিভাগের। সবার কাঁধ পিচ্ছিল। তাই কেউ কারও কাঁধে দোষ রাখতে চান না। সবাই সবার কাঁধে তুলে দিতে চাচ্ছেন। এমন বালিশ নিক্ষেপ খেলা চলছে গলা-কোমরে ডুবে যাওয়া শহরকে নিয়েও। জল গলা অবধি ওঠেনি, এ নিয়ে যে শহরে বড়াই হয়, সেই শহর মানের দিক থেকে একেবারে তলানিতে ঠেকবে, এটাই স্বাভাবিক হওয়া উচিত না? অখণ্ড সিটি করপোরেশন থাকার দিনেও ঢাকার সড়ক সমুদ্রের সাজ নিয়েছে অসংখ্যবার। তখন থেকেই বক্স কালভার্টে ভরে যাওয়া, খাল হারিয়ে যাওয়াকে দায়ী করা হয়েছে। তখনই শুরু হয় ওয়াসা, পানি উন্নয়ন বোর্ড নাকি সিটি করপোরেশন এই দ্বন্দ্বের। দ্বন্দ্ব, লড়াই চলছে। নগরবাসীও ভাসছে ।

রাজউক তার বয়সে কতবার যে হুঙ্কার দিয়েছে--আবাসিক এলাকা থেকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সরিয়ে দেওয়া হবে, সেই হুঙ্কারের নোটিশে বোধ হয় তাদের মহাফেজখানা ভরে গেছে, কিন্তু আবাসিক এলাকা থেকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সরেনি বরং আরও এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের আরও ঘনত্ব বেড়েছে। ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী, ডিওএইচএস, উত্তরা, বনশ্রী, বসুন্ধরা নিকেতন, কোনো এলাকাকেই খাঁটি আবাসিক এলাকা বলা যাবে না। এখানে বলে রাখা ভালো, রাজউক নিজে যেসব প্লট, ফ্ল্যাট বাণিজ্য করেছে আধুনিক আবাসিক গড়ে তোলার নামে, সেই এলাকাগুলোতে পয়ঃনিষ্কাশন ও ড্রেনেজ সুবিধা যেমন গড়ে তোলা হয়নি, তেমনি রাজউক ওই এলাকাগুলোতে ভবন নির্মাণের অনিয়মও ও বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে পারেনি । নিশ্চিত করতে পারেনি যথাযথ সড়ক সুবিধাও।

ঢাকার কোনো এলাকার সড়ক নিয়েই নগরবাসীর তুষ্টির ঢেঁকুর তোলার সুযোগ নেই। তিন ফুট বা তার চেয়ে কম প্রশস্ত ‘চিপা’ গলির দুই ধারেও বহুতল ভবনের সারি। আধুনিক আবাসিক এলাকা বলে পরিচিয় যার, সেখানে পার্কিং সুবিধা নেই। সড়কও সংকীর্ণ । রাজউক পার্কিং পার্কিং বলে ভেঁপু বাড়ালেও পর্যাপ্ত পার্কিং সুবিধা না রেখে একের পর এক বিপণিবিতান, বাণিজ্যিক ভবন হচ্ছে । সরু রাস্তা আরও সরু হচ্ছে থেমে থাকা গাড়িতে। পার্কিং আর যানজট নিয়ে ট্রাফিক বিভাগ কত রেসিপি বের করল। কত যন্ত্র বসাল। সর্বশেষ ইউলুপও অকার্যকর প্রমাণিত হলো। বলা হচ্ছে ‘জ্যাম’কে আরও জমিয়ে দিচ্ছে ইউলুপ। উড়ালসড়কের ত্রুটি ও সুদূর পরিকল্পনার ঘাটতির কথা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। উত্তরের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর সেই পরিকল্পনাও চলে গেছে হিমঘরে।

তবে রাজধানীর বুকেই রয়েছে অনুসরণীয় আবাসিক এলাকা। সেনানিবাস ও আশপাশের এলাকা। এসব এলাকার ব্যবস্থপানা বিশেষ দপ্তর দিয়ে পরিচালিত হয়। কিন্তু মূল জাদুটি কিন্তু শৃঙ্খলার। আমরা যারা বেসামরিক এলাকায় বসবাস করি, সেখানে নাগরিক সুবিধা দেওয়ায় নিয়োজিত সংস্থাগুলোর মধ্যে  শৃঙ্খখলা ও সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। প্রায় তিন দশক ধরে নগর পিতারা নগর সরকারের দাবি তুলছেন। বলছেন, সেবা সংস্থাগুলো নগর সরকারের আওতায় এলে, সমন্বিত সেবা ও উন্নয়ন সম্ভব হবে। তাদের বিলাপ এখনো সরকারের মন আর্দ্র করতে পারেনি। এই অবসরে আড়াই কোটি জনসংখ্যার এই শহরকে লুটেপুটে নিচ্ছে চেনা মাস্তানরাই। আর আমাদের শহর ঢাকা নষ্টের শেষ সীমান্তে।

 

শহর ঢাকার একটা মনঃকষ্টও আছে , সবাই তাকে ভোগ করতে আসে। রোজগার করে ফিরে যায়। কিংবা রোজগারের জন্য এ শহরে থাকলেও মন পড়ে থাকে অন্য গ্রাম বা শহরে। সব তলার মানুষই এমন। মাঝ ও ওপর তলার মানুষেরা ঢাকার রোজগারের টাকা নিয়ে, মানে ভালো ওপরের দিকের শহরে চলে যায়। এমনকি ঢাকা নিয়ে যারা পরিকল্পনার নকশা আঁকেন, তাদের মনও পালাই পালাই। কারও কারও এক পা বাড়িয়ে দেওয়া আছে। নিচের তলার মানুষেরাও ভাবে একদিন গ্রামেই ফিরে যাবে। তাহলে এই শহরকে দরদ দেখিয়ে সুন্দর করবে কে? শহরে দরদি নাগরিক না থাকলে শহর তো নষ্ট হবেই!

 

লেখক: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক