• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ০৫ জুলাই, ২০২২, ২১ আষাঢ় ১৪২৯
প্রকাশিত: মে ১৭, ২০২২, ০৪:৩১ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : মে ১৭, ২০২২, ০৪:৩১ পিএম

তিনি ফিরে এসেছেন বলেই...

তিনি ফিরে এসেছেন বলেই...
স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকালীন জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে দাড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

৭৫’র পনেরো আগস্টের নির্মম, বর্বোচিত-নারকীয় হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে খন্দকার মোসতাক ও তার সাঙ্গ-পাঙ্গরা বাংলাদেশের রাজনীতি ও সরকার ব্যবস্থায় মৌলবাদকে প্রতিষ্ঠিত করতে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির এক অভূতপূর্ব সুযোগ করে দিয়েছিল। এই সুযোগটি কাজে লাগিয়েছিলেন জেনারেল জিয়া। নিজে মুক্তিযোদ্ধা হয়েও তিনি ক্ষমতায় আরোহন করেই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিটিকে ক্ষমতার অংশিদারিত্ব প্রদান করেছিলেন। যাদু মিয়া, শাহ আজিজসহ ডজন খানেক কুখ্যাত রাজাকার ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী তার ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল। জেনারেল জিয়া রাজনীতি ও সমাজ ব্যবস্থায় ধর্মনিরপেক্ষ চেতনাকে চিরতরে বিলীন করে ইসলামি হুকমাৎ এবং পাকি ভাবধারায় রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্রতি হয়েছিলেন। চিনপন্থী কমিউনিস্ট, ইসলামপন্থী রাজনৈতিক নেতা এবং কিছু বুদ্ধিজীবী, জেনারেল, সচিব-আমলাদের সমন্বয়ে জেনারেল জিয়া যে রাজনৈতিক দলটি প্রতিষ্ঠা করেন তা মূলত মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করে ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে সুসংহত করতে থাকেন। বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতি, উদার ভাবনা এবং অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ জেনারেল জিয়ার শাসনকালেই বিনষ্ঠ হয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধারা অবহেলিত হতে থাকেন। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনের মূলভাবনাকে ভূলণ্ঠিত করে অলিখিতভাবে নিষিদ্ধ করা হয় বাংলাদেশের মহানায়ক শেখ মুজিবুর রহমানকে।

ভাগ্যক্রমে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বাংলাদেশে না থাকায় ৭৫’র পনেরো আগস্টের বিয়োগান্ত দিনে প্রাণে বেঁচে যান। দেশে ফেরার জন্য উতালা হলেও জেনারেল জিয়া ও তার মন্ত্রীরা তাদের দেশে ফেরার সব রকম পথকে রুদ্ধ করে রাখে। ভারতে আশ্রয় নেয়া শেখ হাসিনা পাষাণে বাঁধা অন্তরে অপেক্ষা করছিলেন প্রিয় জন্মভূমির মৃত্তিকাকে স্পর্শ করার আকাঙ্ক্ষায়। কিন্ত জেনারেল জিয়া ও বঙ্গবন্ধুর খুনিরা কোনোভাবেই যেনো শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে না পারেন সেই ব্যবস্থা করে রেখেছিল পাকা-পোক্তভাবে। শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে এদেশের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অংশটি জেনারেল জিয়ার দেয়া প্রটিনযুক্ত খাবার খেয়ে এরই মধ্যে বেশ হৃষ্টপুষ্ট হয়ে ওঠে। একইসঙ্গে তারা নিত্য-নুতন ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করে মুক্তচিন্তা, ধর্মনিরপেক্ষ ভাবনা এবং উদার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে তিলে তিলে ধ্বংস করতে থাকে। ষড়যন্ত্রকারীরা জানতো এবং বিশ্বাস করতো যদি কোনোভাবে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে পারেন, হাল ধরেন পিতার রাজনৈতিক দর্শনের, তাহলে তাদের পরাজয় আসন্ন। তারা এসব কারণে বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশের সকল কর্মকাণ্ড থেকে নিষিদ্ধ করে রেখেছিল। এমন কি পাঠ্যপুস্তকে দেশের ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলির বিবরণ লেখার মধ্যেও বঙ্গবন্ধু ছিলেন নিষিদ্ধ। ধীরে ধীরে তারা জাতির মধ্যে বিভ্রান্ত তৈরি করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করেছে। কারণ, এতে তাদের বিরাট লাভ। শেখ মুজিব নিষিদ্ধ থাকলে মৌলবাদ প্রতিষ্ঠা সহজ হবে বাংলাদেশের আবহমান কালের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ইতিহাসকে সহজেই অবরুদ্ধ করে রাখা যাবে।

মুক্তচিন্তায় যারা নিজেদের নির্মাণ করেছিলেন তারও জেনারেল জিয়ার সামরিক শাসনামলে ভীত হয়ে ওঠেছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা সামরিক অফিসারদের নির্বিচারে হত্যা, সরকারি চাকুরিজীবী যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদের চাকুরি থেকে অব্যাহতি বা পদহীন করে রাখা, প্রচার মাধ্যমে ধর্মভিত্তিক মৌলবাদের উত্থানে ভীত মুক্তবুদ্ধি চর্চার বুদ্ধিজীবীরা খুব একটা সাহস দেখিয়ে বাঙালির আত্মপরিচয়কে জাগ্রত রাখতে পারেননি, খুব কম সংখ্যক বুদ্ধিজীবী মুক্তমত প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এবং তারই রোষানলে পড়েছিলেন জেনারেল জিয়ার শাসনকালে। কর্নেল তাহেরের প্রহসনমূলক বিচারকে এদেশের ছাত্র-জনতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ মেনে নিতে পারেননি। কিন্তু সেই বিচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও সংগ্রাম করার মানুষ তখন খুব একটা ছিল না। লক্ষ্য করা যায় বঙ্গবন্ধুসহ তাঁর পরিবারকে হত্যাকারী খুনিচক্র দেশে ও বিদেশে জিয়া সরকারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। দেশে তাদের জেনারেল জিয়ার লোকজন ‘জাতীয় বীর’ হিসেবে মর্যাদা প্রদানে উৎসাহী হয়ে ওঠে। এমন একটি পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতি তাঁর নিজ দল এবং মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের রাজনৈতিক ব্যক্তিরা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে থাকেন।

অনেক জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ১৯৮১ সালের ১৭ মে রোববার শেখ হাসিনা দেশে ফিরলেন। ক্রন্দনরত জনতার সাথে সাথে বাংলার প্রকৃতিও তাঁকে উষ্ণ অভিবাদন জানালো। ঘোর বৃষ্টির পানি ও গণমানুষের কান্নায় ঢাকা মহানগরীর সমস্ত সঞ্চিত বেদনা সেদিন প্রকাশিত হলো এক আবেগ আপ্লুত পরিবেশে। প্রকৃতি ভারী হয়ে ওঠেছিল শেখ হাসিনার কান্নায়। পিতৃহারা-মাতৃহারা-পরিবারহারা শেখ হাসিনা বাংলার মাটি স্পর্শ করেই শপথ নিলেন গণতন্ত্র রক্ষার, পিতা হত্যা বিচারের, মৌলবাদ অপসারণের এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের। আর পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মানে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়লেন।

১৯৮১ সালের ১৭ মে থেকে আজ অবধি এই একচল্লিশ বছর শেখ হাসিনা বাংলাদেশের মানুষের কাছে আছেন, যতটা না প্রধানমন্ত্রী হয়ে তার চেয়ে অধিক বাংলার মানুষের আপনজন হিসেবে। পিতার ‘স্বপ্নবাহু’ এই কন্যা জীবনের সব বেদনাকে ভুলে গিয়ে বাংলাদেশকে একটি উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্নে সদা তৎপর আছেন। এই স্বপ্নকে তিনি সার্থক করতে চান। অব্যাহত তাঁর পরিকল্পনা পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাকে প্রকৃত সোনায় রূপান্তরের। সেসব প্রচেষ্টায় তিনি অদম্য আগ্রহ ও পরিশিলিত চিন্তায় দিবা-নিশি কাজ করে চলেছেন। শেখ হাসিনা ১৭ মে, ১৯৮১ সালকে স্মরণে রেখেছেন বলেই তিনি জনতার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, বিশ্ব নেতৃত্বে তিনি আকর্ষণীয় স্থান অধিকার করেছেন। বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা হলো তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি। এই ভালোবাসাই তাঁকে সুখ দিয়েছে। জনগণের অকুণ্ঠ মমতায় সিক্ত হয়ে তিনি ৭৫’র পনেরো আগস্টের বর্বর হত্যাকাণ্ডের পর ঘুরে দাঁড়াবার শক্তি সঞ্চার করেছেন।

উল্লেখ্ করা প্রয়োজন, ১৯৮১ সালের ১৪, ১৫ ও ১৬ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল। এতে বাঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা নির্বাচিত হন সভাপতি হিসেবে। দলকে তিনি সংগঠিত করতে নিরলস শ্রম দেয়া শুরু করেন তখন থেকেই। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নের দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়ে তিনি এগিয়ে চলেন জনগণের মুক্তির অন্বেষায়। শত বাঁধা-বিপত্তি উপেক্ষা করেছেন, মৃত্যু এসে দুয়ারে হানা দিয়েছে। কিন্ত অটল শেখ হাসিনা সরে আসেননি জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে। বঙ্গবন্ধু হত্যা ও জাতীয় চার নেতা হত্যার বিচার, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারসহ যাবতীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছেন সবসময়। আজ বাংলাদেশ কলঙ্কমুক্ত হয়েছে, তাঁরই একান্ত প্রচেষ্টায়।

এক জীবনে আকাশ ছোঁয়া সাফল্য অর্জন করে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের জনগণের কাছে সবচেয়ে বিশ্বস্থ ও আপনজন হিসেবে আজ নন্দিত। বলা বাহুল্য, জনগণের কাছ থেকে যে অবিশ্রান্ত ভালোবাসা, আস্থা ও বিশ্বাস তিনি অর্জন করেছেন সেটা বিরাট বিরাট রাজনীতিবিদ কিংবা বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে ক্ষমতাধর সরকার প্রধানের ভাগ্যেও জোটেনি। অনন্য শেখ হাসিনা তাঁর উদারতা দিয়ে, মানবসেবা দিয়ে এবং একের পর এক কল্যাণমুখী জনসেবা দিয়ে মানুষের ভালোবাসা, আস্থা ও বিশ্বাসের এক মূর্ত প্রতীকে আসীন হয়ে আছেন। তাঁর কোনো বিকল্প নেই নেতৃত্বে, রুচীতে কিংবা দেশপ্রেমে। পঁচাত্তর বছর বয়সের এই কর্মবীর প্রধানমন্ত্রীকে ভালোবাসতে, আপনজন হিসেবে ভাবতে আমাদের আওয়ামী লীগের কর্মী হতে হয় না। এখানেই তাঁর সাফল্য, এখানেই তাঁর জীবনের সফলতা।

সমকালের নেতৃত্বে ছাপিয়ে মহাকালেও আপনি প্রবাহমান থাকুন।

 

লেখক- সাংবাদিক, গবেষক ও সংস্কৃতি কর্মী।।

 

দ্রষ্টব্যঃ প্রকাশিত লেখাটি লেখকের একান্ত নিজস্ব মতামত এবং এর দায়-​দায়িত্বও লেখকের একান্ত নিজস্ব।